ভালোবাসার মানুষের চোখের জল চাঁদের আলােয় ঝকমকিয়ে উঠলে পৃথিবীতে আসে এক আশ্চর্য শক্তি, যা জীবনভাের ঘিরে রাখে প্রণয়ী যুগলকে। মানবিক প্রেমের এই আখ্যানের পাকে পাকে জড়িয়ে যায় কিছু অদ্ভুত চরিত্র: জ্যোতিষার্ণব কালপুরুষ, সাইবার ক্যাফের মালিক শিশুপাল, সত্যান্বেষী উদ্দালক, বয়স্য রােগী শংকর সমাদ্দার, অনাবিলের বােন পিউ। আখ্যানের এক পিঠে হলুদ হয়ে আসা এক সুইসাইড নােট, অন্য পিঠে রাজপথে পড়ে থাকা অজস্র ক্যাসুরিনার রক্তরাঙা দেহ। আত্মম্ভরী শুভাশিসের নিজের সাথে লুকোচুরি ফুরােবে কোনওদিন, কস্তুরীর একলা ফ্ল্যাটের দিকে কোন কুহক মায়ায় ছুটে যায় সে?
তরঙ্গের পর তরঙ্গের মতাে সম্পর্কের মিছিল আসে জীবন জুড়ে। আজ যে তরঙ্গ ফণা তােলে প্রবল প্রতাপে, কাল সে মিলিয়ে যায় সময়ের সাথে। তটভূমিতে হয়তাে তার রেশ থেকে যায়, তবু যে তরঙ্গ মিলিয়ে গেল তা কি ফেরে আর কোনওদিন?
অভিনন্দন সরকার-এর জন্ম ৮ জুলাই, ১৯৭৯। স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা বেঙ্গালুরু থেকে , বিষয়: ‘ফিজিকাল থেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন’। পেশাগতভাবে একটি প্যারামেডিকাল কলেজের অধ্যাপক। দিনের একটা বড় অংশ কাটে রুগি আর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে । প্রথম গল্প ২০১৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ছাতিম ফুলের গন্ধ’। ‘দেশ’ এবং ‘আনন্দবাজার রবিবাসরীয়’তে একাধিক গল্প প্রকাশিত। ২০১৭-তে ছোটগল্প ‘অপেক্ষা ’ অনূদিত হয়েছে মারাঠি ভাষায় ‘মেনকা ’ পত্রিকার দীপাবলি সংখ্যায়। বন্ধুর সঙ্গে কয়েকটি শর্ট ফিল্ম বানিয়েছেন। তারই একটি ‘বিট্স ফরএভার’ প্রদর্শিত হয় কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, ২০১৪ সালে । ‘তরঙ্গ মিলায়ে যায়’ প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস।
উভয়সঙ্কট। ডিলেমা যাকে বলে। এ বই আমি নির্দ্বিধায় সবাইকে রেকমেন্ড করবো না। আবার এমনটা নয়, যে উপন্যাসটি আমার ভালো লাগেনি। বরঞ্চ উল্টোটাই অধিক প্রযোজ্য। পড়ে দিব্যি লেগেছে। মাস কয়েক পূর্বে 'নীল শাওন' পড়েছিলাম। ও জিনিসে লেখকের সাথে প্রাথমিক পরিচয় হলেও, উপন্যাস হিসেবে খুব একটা জমেনি। তবে, এবারে কিন্তু অনেক গোছানো, অনেক নিয়ন্ত্রিত এক অভিনন্দন সরকারকে পেলাম।
আনন্দবাজার গ্রুপের সাম্প্রতিক শারদীয়াগুলোতে লেখক বেশ জাকিয়ে বসেছেন। হালকা বিষয়বস্তু, সহজ গদ্য, মিষ্টি সংলাপ। স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর লেখনী (স্রেফ লেখনীশৈলী, প্লট নয়) ভালো লাগলে, এই জিনিসও ভালোই লাগবে। তরুণ পাঠক-পাঠিকাদের নাড়ি বুঝে লিখছেন। যা আবেগী তবুও মিঠে। যার ফাঁক-ফোকরে খুঁজলে পাওয়াই যায়, হালকা গভীরতার ছোঁয়া।
তবুও কেনো এই ডিলেমার গুতো? অপরাধী, বইয়ের বিষয়বস্তু। উপন্যাসটি এতটা ক্লিশেড্, এতটাই গতানুগতিক, না পড়লে বিশ্বাস করা কঠিন। আমাদের নায়ক গরীব, পেশায় টিউশন টিচার, খুচরো সাহিত্যচর্চার ঝোঁক। নায়িকা, সাহিত্যের ছাত্রী, মারকাটারি সুন্দরী, বিত্তবান পিতার একমাত্র কন্যা। কলেজের পড়া বোঝার মাঝেই স্যারের প্রতি অবাধ আকর্ষণ। বাধ সাধলেন, পিতৃদেব। নামকরা ডাক্তারের মেয়ে হয়ে সামাজিক পদস্খলন? নৈব নৈব চ।
চেনা চেনা ঠেকছে? ঠেকাই স্বাভাবিক। এই একটি গল্পের টেমপ্লেট, সত্যজিৎ-ঋত্বিক পরবর্তী টালিগঞ্জের ভাত-কাপড়ের দায়িত্ত্ব সামলেছে অনেক বছর। অবশ্য, স্রেফ বাংলা সিনেমাকে দুষে লাভ নেই। পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ যেখানেই দেখুন, কমন সুতো একটাই। হবু-শ্বশুরমশাইয়ের মুখে চিরাচরিত হুমকি-বাক্য। "ব্রিফকেসে টাকা আছে, ভালো চাইলে, এক্ষুনি শহর ছেড়ে চলে যাও!" এ জিনিস, বাংলাতেও যা হিন্দিতেও তাই, আবার তামিলেও একই।
অবশ্য, মাঝেমধ্যে এমন সব গল্প পড়তে খারাপ লাগে না। হোক না সেই একই গান। অ্যারেঞ্জমেন্টটা তো নতুন। মফস্বলের পটভূমিকা। অনেকটা গ্রাউন্ডেড। অমন সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে সবটা লিখেছেন লেখক। 'নীল শাওন'-এর মতন সব চরিত্রের ট্র্যাক হারিয়ে ফেলেননি। একবার কি দুবার পড়ে আরাম পাওয়াই যায়। তবে, মুশকিল হয় অন্য খাতে। ক্রুড হচ্ছি না, বিশ্বাস করুন। তবে টিউশন টিচার ও ছাত্র-ছাত্রীর প্রেমটা ব্যাক্তিগতভাবে আমার খুব একটা রোচে না। তাও ভালো, শুরুতে টিউলিপের বয়স আঠেরো। সে প্রাপ্তবয়স্ক। এদিকে, অনাবিলের বয়স প্রায় মধ্য-ত্রিশের কোঠায়, বইয়ের শেষে যা প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই।
একটা বড়সড় এজ-গ্যাপ, আরকি। অসমবয়সী সম্পর্কের গুঞ্জন। পুরো বইয়ের সাবলীল ভালো-লাগাতে যা সরীসৃপ-ন্যায় পেঁচিয়ে ধরে। যদি এটুকু উপেক্ষা করা যায়, তাহলে বইটিকে চার কি পাঁচ তারা দিতেই পারেন। আমি ঠিক পারলাম না।
..... আকাশ-বাতাস ভরে যাচ্ছে কবিগুরুর সুরের মূর্ছনায়, মুঠো মুঠো সুরের আবির কে যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে ভুবন জুড়ে । আজকে এমন রঙিন দিনে মন খারাপ করতে নেই । তারপরেও টিউলিপ বুঝল, তার গাল বেয়ে উষ্ণ এক ধারা নেমে আসছে । টিউলিপ বুঝল, তার প্রতিটি অশ্রুবিন্দুতে আজ থেকে শুধু একজনের নাম লেখা থাকবে ।
ভার্গবী শুনল, নতুন দিদিটা মায়াবী কণ্ঠে বলছে, "যাজ্ঞসেনী, আমি যাজ্ঞসেনী, শুনলে ভার্গবী ? এটাই আমার নাম।" এই নাম ভার্গবী তার পাঁচ বছরের জীবনে আগে শােনেনি ।
সে দেখল দিদিটার গালের আবিরের উপর দিয়ে হালকা জলের ধারা নামছে। একটু-একটু করে ভিজে, ধুয়ে যাচ্ছে আবিরের রং। সুন্দরী নারীর হাসির চেয়েও কান্না সুন্দর হয়। ভার্গবীর মিষ্টি চিবােনাে বন্ধ হয়ে গেল। সে মুগ্ধ চোখে দিদিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে বিড়বিড় করে উঠল, "যাজ্ঞসেনী... যাজ্ঞসেনী..."
🔹গতবারের শারদীয়া ‘পত্রিকা’য় প্রকাশিত এই নাতিদীর্ঘ উপন্যাসটি বেশ আলোচিত হয়েছিল, অনেক পাঠকের মতে এটি ছিল গতবারের শারদীয়ার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । এইবছরের শারদীয়া ‘দেশ’-এ লেখকের ‘এক যে ছিল মেঘ’ উপন্যাসটি পড়ার পর এক অদ্ভুত মুগ্ধতা ঘিরে ধরেছিল আমাকে, তখনই ঠিক করেছিলাম এই লেখকের অন্য সব লেখা পড়তে হবে ।
আচ্ছা, একটা উপন্যাস বা গল্প ঠিক কখন পাঠকের মনের গভীরে জায়গা করে নিতে পারে ? উত্তর লেখক নিজেই দিয়েছেন তার উপন্যাসের চরিত্র ‘টিউলিপ’এর মাধ্যমে - “আপনার লেখা বেস্টসেলার হবে কিনা জানি না । কিন্তু এটুকু চাইবো... সেই লেখা, পড়া শেষ হলে লােকে কিছুক্ষণ হলেও নিজের সঙ্গে থাকতে চাইবে । হয়তাে টেবিলল্যাম্প জ্বলা স্টাডিতে অথবা একলা অন্ধকার ব্যালকনিতে সে অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবে নিজের সঙ্গে ।”
🔸যদি আমাকে কখনো প্রশ্ন করা হয়, তোমাকে যদি কোনো উপন্যাসের চরিত্র হিসেবে বাঁচতে সুযোগ দেওয়া হয়... তুমি কোন্ চরিত্রটিকে বেছে নেবে ? .... আমি এতদিন অবধি নিঃসংকোচে বলতাম - আমি কম্পাসের ‘আদীপ্ত রায়’ হয়ে বাঁচতে চাই । কিন্তু, আজ থেকে বলবো - ‘অনাবিল রায়’ হতে পারলে আমার জীবনটা সার্থক মনে হতো ।
আগাগোড়া একটা প্রেমের উপন্যাস। বেশ সুন্দর গোছানো একটা লেখা। এই সব উপন্যাস পড়ার সময় একটা জিনিস কাজ করে, সেটা হল - খুব তাড়াতাড়ি পড়া যায়, যেহেতু প্রেমের উপন্যাস তাই পড়তে খুব ভালো লাগে। নিজেকে গল্পের হিরো মনে হয়। তার দুঃখ গুলোকে নিজের দুঃখ মনে হয়। কিন্তু পড়ার শেষ মনে হয় ধুর কি প্যানপ্যানে ন্যাক্যা ন্যাকা প্রেমের লেখা। সেই প্রেম, বিরহ, বড়লোক বাবা তার মেয়ের গরীব প্রেমিকে টাকা দিয়ে তার মেয়েকে ভুলে যাওয়ার প্রস্তাব। সেই নায়ক মানেই দেবতুল্য মানুষ। ফর্সা, লম্বা রাজকুমারের মত চেহারা। আর নায়িকা মানুষের বিশ্বসুন্দরী না হলেও রাজ্যসুন্দরী বা এলাকাসুন্দরী তো অবশ্যই। সবাই ওর জন্য পাগল কিন্তু ও শুধু নায়কের জন্য অপেক্ষা করে আছে।
উপন্যাস: তরঙ্গ মিলায়ে যায় কলমে: অভিনন্দন সরকার শারদীয়া পত্রিকা ১৪২৬ মুদ্রিত মূল্য: ১০০/-
সপ্তাহখানেক আগেকার ঘটনা। আমি ল্যাপটপে মুখ গুঁজে কাজ করে যাচ্ছি, ঠিক সেই সময় মা কিছু পুরোনো পূজাবার্ষিকী হাতে নিয়ে আমার ঘরে ঢোকে। আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে খুঁজে পেয়ে আমাকে দেখাতে নিয়ে এসেছে। ক্ষণিকের এই মূহুর্তগুলোই যেন অমূল্য হয়ে ওঠে। আমিও ওমনি কাজের ফাঁকেই সব নিয়ে বসে পাতা ওল্টাতে শুরু করলাম। এমন রত্নের সন্ধান লাভ করে চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলাম না। দেখলাম, পত্রিকা শারদীয়াতে "তরঙ্গ মিলায়ে যায়" উপন্যাসটি রয়েছে। যতদূর জানি, পরবর্তীতে এটি আনন্দ পাবলিশার্স থেকে বই আকারে বেরিয়েছে। তাই সময় পেয়েই গত দুরাত্তিরে পড়ে শেষ করলাম অভিনন্দনবাবুর লেখা এই সুদীর্ঘ উপন্যাসটি।
🔸 বিষয়বস্তু: শুভাশিস কলকাতা শহরের নামকরা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রথম তালিকায় বিরাজমান। মেয়ে জন্মানোর কিছু বছরের মধ্যেই তার পত্নী কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সেই থেকে টিউলিপের সিঙ্গেল প্যারেন্ট হয়ে তিনি দিনযাপন করছেন। কস্তুরী তার জীবনে বন্ধুত্বের স্থান পূরণ করছে ঠিকই, কিন্তু সেই সম্পর্কের গভীরতায় ডুব দিতে গেলেই কস্তুরীর কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ "শুভদা" ডাকে তিনি বারবার বাস্তবের মাটিতে ফিরে আসেন।
রূপে গুণে সমৃদ্ধা টিউলিপ উচ্চ মাধ্যমিকে অসাধারণ রেজাল্ট এনেও বাংলা অনার্স কোর্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়। কলেজের প্রফেসর অথবা নামকরা টিচারের কাছে টিউশনে ভর্তি হয়েও সে যেন কোথাও তার পছন্দের বিষয়ের সাথে একাত্ম হতে পারে না। শুভাশিস তাই এক হোম টিউটর রাখার ব্যবস্থা করেন বাড়িতে। অনাবিল রায়, টুকটাক লেখালেখি করে, তবে সাহিত্য পাড়ায় ইতিমধ্যেই তার নামডাক ছড়াতে শুরু করেছে, একাধারে টিউশন পড়ান এবং গল্প ছেড়ে এবার নিজের প্রথম উপন্যাসও লিখতে শুরু করেছেন। ছাত্রী টিউলিপ ধীরে ধীরে যেন অনাবিলের উদাসীনতার প্রেমে পড়ে যায়। অনাবিল যখন তার উপন্যাস পড়ে শোনাতে থাকে, টিউলিপ যেন নিজেকে সেই উপন্যাসের নায়িকা যাজ্ঞসেনী রূপে কল্পনা করতে থাকে। হয়তো সে যাজ্ঞসেনী হয়ে উঠতে পারলেই অনাবিল তাকে বুকে জড়িয়ে বলবে "হ্যাঁ, ভালোবাসি তোমায় টিউলিপ। তুমিই আমার যাজ্ঞসেনী।" তাদের ভালোবাসা কি কোনোদিনও পূর্ণতা পাবে নাকি বাস্তবের কড়া আঘাতে চাপা রয়ে যাবে কোনো এক কোণে? শুভাশিস কি সত্যিই কস্তুরীকে ভালোবাসেন নাকি একাকীত্বতা এবং হরমোনের দোলাচল তাকে কস্তুরীর কাছে বারবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে?
🔸পাঠ অনুভূতি: এটি একটি বাস্তববাদী প্রেমের উপন্যাস। চরিত্রগুলো যেন নিজেদের কাছেই নিজেদেরকে লুকোনোর খেলায় মত্ত। সমগ্র উপন্যাস জুড়ে আবেগ-ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-অহংকার-অভিমানের পারদ ওঠানামা করে চলেছে। উপন্যাসের গতি মন্থর হওয়ার কারণে মাঝে একটু অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম। তবে লেখার ধরণ এতটাই সুন্দর, এতটাই নিখুঁত যে সবকিছু পুষিয়ে দিয়েছে। ওয়ান টাইম রিড হিসেবে বেশ ভালো লেগেছে। যারা প্রেমের উপন্যাস পড়তে ভালোবাসেন, তাদের অনুরোধ করবো, সুযোগ পেলে অন্তত একবার এই লেখাটি পড়ে দেখবেন। আশা করছি সকলের ভালো লাগবে।