এই বইটি আমার জীবনের একটি বিরাট বড় প্রাপ্তি। কারন আমি শুধু এই বইটিই পাইনি, তার সাথে সাথে পেয়েছি একজন অত্যন্ত প্রিয় দিদিকে। যাকে প্রথমে ম্যাম বললে তিনি রেগে বলেছিলেন দিদি না বললে আমি কথা বলবো না। তাই এর অনুভুতি আরও special। আর তার সাথে, বইটি হাতে পাওয়ার পর প্রথম পাতাটা খুলেই দেখি একটা লাইন লেখা আছে, আর সেটা দেখার পর খুশিতে লাফিয়ে উঠেছিলাম প্রায়। তাই বললাম আমার জীবনের অনেক অনেক অনেক বড় একটা পাওনা এটি।এতো গেলো আমার কথা, এবার বইটির কথায় আসি। প্রথমেই বলি প্রচ্ছদ। কৃষ্ণেন্দু বাবুর অনেক বই এর প্রচ্ছদ ই মোটামুটি সকল বই পাগল মানুষ দেখেছেন আশাকরি। আর এই বই এর প্রচ্ছদ টি অত্যন্ত সুন্দর এবং প্রত্যেক বই পাগল দের কাছে লোভনীয়। এবং উপন্যাস এর বিষয় বস্তুর সাথে উপযোগী।তবে ঋজুদা এবং রীপ এর একটা ছবি আমরা দেখতে চাই পরের প্রকাশে। এবার আসি বই এর গঠন নিয়ে, বইটির বাঁধন এবং পাতার মান খুবই ভালো। বলাই বাহুল্য খোয়াই এর সমস্ত বই এর বাঁধন এবং পাতার মান উন্নত ধরনের। এর জন্য অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্তি, মাননীয়া রোশনী বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জয়শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় এর, এবং অবশ্যই ধন্যবাদ "খোয়াই পাবলিশিং হাউস" কে। এর পর আসি উপন্যাস এর মূল উপজীব্য বিষয় নিয়ে। উপন্যাসটির পটভূমি রচিত হয়েছে রাবন রাজার দেশ মানে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা কে কেন্দ্র করে। শ্রীলঙ্কা যার আয়তন ৬৫,৬১০ বর্গ কিলোমিটার, এবং জন সংখ্যা ২ কোটির উপরে। সেই রাবন রাজার দেশের মাটিতে খুন হয়েছেন ভারতীয় IB অফিসার হরিশ দাব্রিয়াল। আর সেই খুনের রহস্য উন্মোচন করতে শ্রীলঙ্কা গিয়ে উপস্থিত হন, উপন্যাস এর মূল চরিত্র ঋজুদা এবং তার ভাই রীপ। তদন্তের স্বার্থে তাদের ঘুরতে হয় শ্রীলঙ্কার নানান স্থান। এবং খুলতে থাকে একের পর এক জট, তার সাথে ঘটনাই আসে নতুন নতুন সব বাঁক। আরও এক নতুন এবং জটিল রহস্য ঘনীভূত হয় একটা খুনকে কেন্দ্র করে, আসতে থাকে একের পর এক বাধা। বিদেশের মাটিতে গিয়ে আক্রান্ত হয় ঋজুদা। বিশ্বাস করে যে বিপুল কে সঙ্গে নিয়ে ছিলো, সেই পেছন থেকে ছুরি বসিয়ে দেয়, অর্থের লোভে। কিন্তু না তাতেও থেমে যায় না ঋজু আর রীপ। রহস্যের আরও গভীরে ঢুকে গিয়ে উঠে আসে এমন কিছু তথ্য যা একসাথে শ্রীলঙ্কা এবং ভারতের ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো এর কপালে ভাঁজ ফেলে, চোখের ঘুম কেড়ে নেওয়া জন্য যথেষ্ট। শ্রীলঙ্কা মানেই অপার রত্ন ভান্ডার। আর সেই রত্ন ভান্ডার থেকেই সেখানের দামি দামি মহা মূল্যবান এবং দুপ্রাপ্প সব রত্নের চোরা চালান এর খবর উঠে আসে তদন্তের মাধ্যমে। এর সাথে সাথে উঠে এসেছে একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ও ভয়াবহ ব্যাপার। ভারতের টেরারিস্ট অ্যাক্টিভিটি, এবং তার সাথে টেরর ফান্ডিং এর নেপথ্যে কাহিনী। ভারতে বাইরে থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং উন্নত মানের বেআইনি অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে ভারতে থাকা মাওবাদীদের। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো সর্বত্র নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা। আর সেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সুযোগ নিচ্ছে গরীব মানুষদের অভাবের। তারা সেই গরীব মানুষদের বোঝাচ্ছে সরকার তাদের জন্য কিছু করবেনা। তাদের জন্য পানীয় জল, পাকা রাস্তা, শিক্ষা ব্যাবস্থা সবই ওই বিদেশি বন্ধু রা করবে, সরকার করবেনা। এই ভাবেই তাদের ভুল বুঝিয়ে রামজী এর মত কিছু লোক সেই বোকা লোকগুলোর বলি দিচ্ছে। তার সাথে সাথে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। এই সমস্ত ভয়াবহ সমস্যা সমাধান করে একেবারে বাঘের মত বেড়িয়ে এসেছে ঋজুদা। উপন্যাস এর প্লট তৈরি করে তাকে যে ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে লেখিকার চরম দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। ঋজুদা আর রীপের কাহিনী যেন ফেলুদা আর তোপসে কাহিনী হয়ে উঠেছে। এবারে চরিত্র দের নিয়ে একটু বলি। মূল চরিত্রে আছে ঋজুদা। যিনি নামেও ঋজু, আর স্বভাব সিদ্ধ ভাবেও ঋজু। মানে অত্যন্ত সোজাসাপটা। আর তার বুদ্ধির ধার এক কথায় অসাধারণ, এবং একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যাক্তি। ইংরেজি সাহিত্যে সার্লক হোমস যেমন মাঝে মাঝে একাই বেরিয়ে গিয়ে সমস্ত তথ্য প্রমাণ জোগার করে ফেলতেন , তেমনি গুন দেখা যায় আমাদের ঋজুদার মধ্যে। ঋজুদার চেহারার যে রুপ আমার চোখে ধরা পরেছে তা যেকোনো টলিউড হিরোকে হার মানাবে। সত্যি বলতে কী যেকোনো পাঠক ঋজুদার প্রেমে পড়তে বাধ্য। এবার আসি আপর এক চরিত্র রীপ যে আদতে ঋজুদার ভাই। তার চরিত্র ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য পূর্ণ। বয়সের তুলনায় বেশ শক্তিশালী। অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান, এবং মিশুকে ও উদার মনের একজন। আর সবথেকে বড় ব্যাপার হল সব জায়গায় নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে সে। আর অত্যন্ত ভ্রমণ পিপাসু একজন। আর যেকোনো বই এর পোকা। উপন্যাস এর মধ্যে একেবারে দুটি ভিন্ন জায়গায় ঘটনাকে লেখিকা তাঁর সুনিপুণ হাতের লেখনির মাধ্যমে যোগ সাধন করিয়েছেন।এর মধ্যে একটি স্থান শ্রীলঙ্কা এবং অপরটি হচ্ছে ওড়িশা বর্ডার লাগোয়া একটি অঞ্চল, বলতে গেলে একে অপরের বিপরীতে। কিন্তু তা হলেও কোনো স্থানে এত টুকু খাপছাড়া লাগেনি।এক কথায় আমার অসাধারণ এবং ফাটাফাটি লেগেছে। আর শুনলাম ঋজুদার এর আগে একটি উপন্যাস বেরিয়ে ছিলো, কিন্তু আমার পড়া হয়ে ওঠেনি, তবে সু্যোগ হলে অবশ্যই পড়বো। এবং ঋজুদার এর পরের আর এক চাড্ডা-র কাহিনী খুব শীঘ্রই আসছে। আশাকরি আরও বেশি জমজমাট হবে সেই অভিযান। সবশেষে আর একজন কে ধন্যবাদ না দিলে অপরাধ হয়, সেটি হলো India post , এটি না থাকলে, এমন প্রতন্ত গ্রামে থেকে আর বই পড়া হয়ে উঠতো না কখোনোই। 🙏 🙏
শ্রীলঙ্কার মাটিতে খুন হয়েছেন ভারতীয় ব্যবসায়ী হরিশ দাব্রিয়াল। জটিল বিষয়, তবু এর তদন্ত রুটিন পদ্ধতিতেই হতে পারত৷ কিন্তু... নিহত মানুষটি যে ভারতীয় ইনটেলিজেন্সের একজন শীর্ষস্থানীয় এজেন্ট ছিলেন! এ-জিনিস তো রুটিন বলে ছেড়ে দেওয়া যায় না। অতঃপর মঞ্চে প্রবেশ করলেন তথাগত অধিকারী, ওরফে ঋজু। ভাই রীপকে 'কভার' হিসেবে নিয়ে হরিশের আত্মীয় তথা একজিকিউটর হয়ে তিনি উড়ে গেলেন শ্রীলঙ্কায় এই হত্যার কারণ খুঁজে বের করতে। তারপর কী হল? প্রথমে লিখি এই বইয়ের ভালো দিকগুলো নিয়ে। ১. লেখনী চমৎকার। তাই গদ্য পড়তে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়নি। ২. ছোটো-ছোটো অধ্যায়ের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুতলয়ে এগিয়েছে কাহিনি। বোর হয়ে অন্য কিছুতে, বিশেষত মোবাইলে মনোনিবেশের কোনো সুযোগই দেননি লেখক। ৩. পলিটিক্যাল থ্রিলারের হৃৎপিণ্ড হল কিছু কঠোর সত্য, যা কাগজে লেখে না। পাঠককে সেই কঠোর সত্যের সম্মুখীন করানোর ব্যাপারে লেখকের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। ৪. প্রটাগনিস্ট তথাগত ও অজিথ-কে ভারি যত্ন নিয়ে গড়েছেন লেখক। তাই গল্প শেষ হওয়ার পর যখন পড়ি "ঋজুদা ফের ফিরবে!" তখন মনে হয়, এই যুদ্ধের অ্যাওয়ে-রাউন্ডে অজিথ না ফিরলে জেতার সম্ভাবনা কম। কী-কী খারাপ লাগল? ১) এমন একটি সেন্সিটিভ এবং হাই-প্রেশার মিশনে রীপের মতো নাবালক সিভিলিয়ান কোনো অবস্থাতেই কভার হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। ২) রীপের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার গাইডেড ট্যুর করানোর খুব একটা প্রয়োজন ছিল না। বইয়ের শেষে ডাম্বুলা কেভের ছবিটাও একান্তই অপ্রয়োজনীয়, কারণ সেখানে কোনো অ্যাকশন হয়নি। ৩) হরিশের মৃত্যুর তদন্তের বদলে আমরা বেশ কয়েকটা কোভার্ট অপারেশনের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। তাতে অ্যাড্রিনালিন রাশ পাওয়া গেল ঠিকই, কিন্তু মগজের পুষ্টি হল না। তবু, এ-সব সত্বেও বলব, তন্ত্র ও পিশাচ অধ্যুষিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যে এমন একটি ছিমছাম, সুলিখিত অ্যাকশন থ্রিলার পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য লেখককে কৃতজ্ঞতা জানাই। এর পরবর্তী অধ্যায় (অ্যাওয়ে রাউন্ড) যে ঘনঘোর অ্যাকশন-প্যাকড হবে— এটা বুঝে এখন থেকেই অপেক্ষায় রইলাম। বইটি সুমুদ্রিত। বানান-ভুল বা গোলমেলে লে-আউটে ক্লিষ্ট হতে হয়নি। প্রচ্ছদটা আরেকটু ভালোভাবে ল্যামিনেট করালে বইটি আরও দৃষ্টিনন্দন হত। যদি একটি সুলিখিত পলিটিক্যাল থ্রিলার পড়তে চান, তাহলে এই বইটির সাহায্য নিতেই পারেন। তবে 'ভূমিকা'টি শেষে পড়বেন। তাতে লেখক ভুল করে কিছু তাস দেখিয়ে ফেলেছেন!