ইসলামি চিন্তাধারায় ইমাম গাজালি (রাহিমাহুল্লাহ) স্বতন্ত্র এক নাম। বাগদাদের নিজামিয়া প্রতিষ্ঠানে ১০৯১-১০৯৫ সালের সময়টাতে তাঁর বক্তৃতা শুনতে ভিড় জমাতেন শত শত জ্ঞানীগুণি ব্যক্তি। ইসলামি আইন, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক বিষয়ে তাঁর লেখনীগুলো এখনো সমৃদ্ধ করে যাচ্ছে ইসলামি চিন্তাধারাকে। তাঁর সময়ে ইসলামের অভ্যন্তরীণ দলাদলি নিরসনে তাঁর শক্ত ভূমিকার কারণে তিনি পরিচিত ‘ইসলামের প্রমাণ’ (হুজ্জাতুল-ইসলাম) নামে।বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি গাজালির লেখনীর উপর ভিত্তি করে সংক্ষিপ্ত সারমর্ম এটা। তবে ছোট হলেও লেখক গাজালির দর্শনের মূল নির্যাস তুলে আনতে পেরেছেন। নতুন কিংবা অভিজ্ঞ—সবার জন্য ইসলামের বিভিন্ন আচার-চর্চার মর্ম ও নির্যাস বুঝতে চমৎকার এক বই এটি।
🟥 বৃটিশ দার্শনিক হোয়াইটহেড বলেছিলেন, 'বিজ্ঞান ও দর্শন মানব মনের একই উদ্যোগের দুইটি দিক মাত্র।' এই কথাটা বলার একটা বড় কারণ আমাদের নবীজি ﷺ তার ওফাতের আগে বলেছিলেন,🔸 আমার উম্মতের জন্য আমি দুইটা জিনিস রেখে যাচ্ছি প্রথমত কুরআন এবং দ্বিতীয়ত আমার জীবন দর্শন🔸 অর্থাৎ তার দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজ থেকে শুরু করে আদেশ, নির্দেশ, উপদেশ সবকিছু আমরা হাদিস হিসেবে অভিহিত করি। বহু বছর কেটে গেলেও ইসলামকে বিজ্ঞান ও দর্শনের আলোকে সেভাবে গবেষণা করা হয়নি। যখন গ্রিক দার্শনিকরা তাদের বড় বড় মতামত দেয়া শুরু করলো, ইসলামের অনেক বিষয় তখন ব্যাখ্যাহীন থেকে গেল এবং সেটা নিয়ে অনেকে কটূকথা বলা শুরু করল। ইসলামের সেই সংকটময় মুহূর্তে একজন শিক্ষক গ্রিক দর্শনের যুক্তিতর্ক মোকাবেলা করেছিলেন। বাগদাদের নিজামিয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সেই শিক্ষক যখন মান মর্যাদা, সম্মান, সাফল্যের মধ্যগগনে তখন তার অন্তরে এক আধ্যাত্মিক চেতনার সৃষ্টি হয়। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন,🔸'৪৮৮ হিজরীর রজব মাস থেকে শুরু করে প্রায় ৬ মাস__আমি যেনো একবার পার্থিব জীবনের মোহ আরেকবার পরকালের মধ্যে দুলছিলাম। এরপর আল্লাহ আমার মুখ বন্ধ করে দিলেন।'🔸 এরপর তিনি মনের শান্তি পেতে চাকরি ছেড়ে দিলেন, নিজের খ্যাতি আর মর্যাদা রেখে চলে গেলেন দূর দেশে। এরপর বহু বছর বিভিন্ন দেশ ঘুরে অভিজ্ঞতা অর্জন করে একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে আবির্ভূত হলেন তিনি, ইতিহাস যাকে চেনে ইমাম গাজ্জালী নামে। 🟥 গ্রিকরা মানুষের অন্তর্জগতের প্রতি যতটুকু না আগ্রহী ছিল তার থেকে বেশি আকৃষ্ট ছিল বহিঃপ্রকৃতির প্রতি। আধুনিককালে আমরা ধর্মচিন্তায় যে পরিমাণ অন্তর্মুখিতা এবং আধ্যাত্মিকতা লক্ষ্য করি, গ্রিকদের মধ্যে সেসবের ছিটেফোঁটাও ছিল না।🔸গ্রিক দর্শনের ভিত্তিটা ছিল মূলত অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস। অদৃষ্টবাদ বলতে আসলে বোঝায় কারোই কোনো রকম নিয়মশৃঙ্খলা বা সীমালঙ্ঘন করার অধিকার থাকবে না, সে মানুষ হোক অথবা দেবতা। মহামতি প্লেটো ও অ্যারিস্টটল তাদের সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শনে ন্যায়নীতি ও নিয়ম-শৃঙ্খলার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং সব সময় অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলাকে মানুষের সুষ্ঠু বিকাশের পক্ষে বিপজ্জনক বলে অভিহিত করেছেন।🔸এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে, কিছু বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিতে দেখলে গ্রিক দর্শন এবং বর্তমানের পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা একই রকম। পশ্চিমারা চিন্তা করেন বর্তমান দুনিয়ার সবকিছু নিয়ে এবং তাদের সব সুখ ও দুঃখের গণ্ডি এই পৃথিবীর মধ্যেই আবদ্ধ। তাদের মতে মানুষের জীবনে যা কিছু ঘটে বা ঘটতে পারে তা এই আসমান আর জমিনের মধ্যেই ঘুরপাক খাবে, পরকাল বা পরজীবন বলতে কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই তাদের দর্শনের পাণ্ডুলিপিতে। কিন্তু ইসলামে সুখের বা দুঃখের পরিসর অনেক ব্যাপক। ইসলামে একদিকে আছে পার্থিব সুখ আরেক দিকে আছে পরজীবনে অনন্ত সুখ। আবার অন্যদিকে আছে পার্থিব জীবনে দুঃখ এবং পরকালে জাহান্নামের সীমাহীন সাজা। মোটকথা ইসলামের আলোকে মানুষের জীবনের হিসাব নিকাশ শুধু নিশ্বাস বন্ধ হলেই শেষ হয়ে যায় না, দুনিয়ার বুকে নিশ্বাস বন্ধ হওয়া মানে পরজীবনের অনন্তকাল ধরে নিশ্বাস নেওয়ার রাস্তা করে দেওয়া। 🟥 এবার আসা যাক ইমাম গাজ্জালীর কথায়। গাজ্জালীর সবচেয়ে অসাধারণ দিক হচ্ছে তিনি সব মুসলিমদের তরফ থেকে কলম তুলেছিলেন দার্শনিকদের বিরুদ্ধে। শুরুতে তার বিরোধীতা যতটা না ভিন্নধর্মীরা করেছিলো, তারচেয়ে বেশি তিনি সমালোচিত হয়েছিলেন খোদ মুসলিম সমাজে। তবে তিনি কখনই মুসলিমদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করেননি। ইসলামে বিভিন্ন মাযহাবের নামে যে ভেদাভেদ রয়েছে তা তিনি মেনে নেননি, তার দৃষ্টিতে সবাই এক - মুসলিম। গ্রিক দর্শনে প্রভাবিত কিছু গোষ্ঠীকে শুরুতেই তিনি বিবেচনা করেছেন ইসলামের বাইরের গোষ্ঠী হিসেবে। ইমাম গাজ্জালীর আমলে যুক্তিভিত্তিক ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদীরা পরিচিত ছিলেন মুতাজিলী নামে। তারা মনে করতেন, কোনটা ভালো কোনটা খারাপ এই সত্য বুঝতে শুধু মাত্র বিচারবোধই যথেষ্ট। এজন্য কুরআন-সুন্নাহর দারস্থ হওয়ার দরকার নেই। এই দার্শনিক দলগুলো বিশ্বাস করত দুনিয়া চিরন্তন,আল্লাহ সামনের ঘটনা গুলো সম্বন্ধে জানেন না, শেষ বিচারের দিনে মানুষ শারীরিকভাবে পুনরায় জেগে উঠবে না। অনেকেই আছেন যারা সমাজ স্বীকৃত জ্ঞানীদের থেকে নিজেদের বেশ খানিকটা জ্ঞানী বলে মনে করেন, খন্ডিতবাদ গবেষণা করতে চান, যা পরীক্ষা করা যায় না তার কোন অস্তিত্ব নেই এটা প্রমাণ করতে চান। এর উপযুক্ত জবাব পবিত্র কুরআনে বলা আছে,🔸'আল্লাহর অস্তিত্বের ব্যাপারে সন্দেহ, যিনি আকাশমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের স্রষ্টা?'🔸(সূরা ইবরাহীম) 🟥 ইমাম গাজ্জালীর সবচেয়ে চমৎকার যে দিকটি ছিল, তিনি কোন দার্শনিকের মতাদর্শ না পড়ে অথবা সেটা যাচাই-বাছাই না করে কোন মতামত দিতেন না। সেন্ট আগাস্টিনের চিন্তাভাবনা বা রাষ্ট্রবিষয়ক অ্যারিস্টটলের মতাদর্শ তিনি নিয়মিত পড়তেন। এই সব গুণী মানুষদের তত্ত্বগুলোকে ভুল প্রমাণ বা বিতর্কিত করার বদলে তিনি ইসলামের আলোকে ব্যাখ্যা দিয়ে আরো আধুনিক রূপ দিয়েছেন। গ্রিক দর্শন নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করেই তারপর গ্রিক দর্শনকে সঙ্গী করে ইসলামের আলোকে পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন।🔸গাজ্জালী মনে করতেন,পার্থিব জীবনের ক্ষেত্রে যেমন বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ মূল্যবান তেমনি পরকালের জীবনের ক্ষেত্রে ধর্মতত্ত্ব ও বিশ্বাস অত্যন্ত জরুরী। এজন্যই তিনি কুরআন ও হাদিসের শিক্ষাকে পরকালের জীবনে একমাত্র চাবিকাঠি হিসেবে ধরেছেন। গাজ্জালীর কথার মূল বক্তব্য ছিল ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্র এক অবিচ্ছেদ্য সূত্রে আবদ্ধ থাকে। আমরা যেমন একই সাথে মুসলিম, বাঙালি ও বাংলাদেশী - যার কোনোটাই অস্বীকার করার উপায় নেই, এগুলো আমাদের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। ঠিক তেমনি ধর্ম, রাষ্ট্র ও সমাজও একে অন্যের পরিপূরক। এর কোনোটির বিচ্যুতি ডেকে আনতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিণতি। এই বিষয়গুলো যেমন আমাদের মনে রাখতে হবে তেমনি রাষ্ট্রের উচিত বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর এই দেশে অস্প্রদায়িক ও শান্তিপূর্ন শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা। 🟥অ্যারিস্টটলের মতে, রাষ্ট্রের উৎপত্তি সাধারণ মানুষের উন্নত জীবনযাপন অর্জনের লক্ষ্যে। আর ইমাম গাজ্জালী সেটাকে আরো একধাপ এগিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় দর্শনের ন্যায়নীতির মূল লক্ষ্য জনসাধারণের কল্যাণ হওয়া উচিত।🔸এসব বাস্তবায়নের জন্য তিনি একজন যোগ্য শাসকের রূপরেখা দিয়েছেন যিনি হবেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সুবিচারক, রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ও ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে জনগণের কল্যাণে শাসন করবেন। গাজ্জালীর এই "যোগ্য শাসক" এর সাথে প্লেটোর🔸"দার্শনিক রাজা বা ফিলোসফার কিং"🔸এর কোনো মিল পাচ্ছেন কি? পাওয়ারই কথা, তাই নয় কি? পূর্বেই বলা হয়েছে গাজ্জালী পূর্বতন দার্শনিকদের দর্শনগুলো অধ্যয়ন করে সমসাময়িক কালের উপযোগী করে সেগুলো উপস্থাপন করেছেন, তাতে দর্শনে যেমন যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা, তেমনি মানুষ পেয়েছে সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নতুন চিন্তাভাবনার খোরাক। এবার যদি আমরা বর্তমান বিশ্বের দিকে দৃষ্টি দেই তাহলে কী দেখি? শাসক কি জনকল্যাণের জন্য কাজ করছে না কি নিজেদের আখের গোছানোর পাঁয়তারা করছে? গাজ্জালী রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে যে জনকল্যাণকে চিহ্নিত করেছেন তার কতটুকু অর্জিত হচ্ছে বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায়? হোক না সে আমাদের দেশের বা বহির্বিশ্বের আলোকে! এবার কল্পনা করুন এমন এক রাষ্ট্র যেখানে শাসন পরিচালিত হচ্ছে গাজ্জালীর বাতলানো পন্থান���সরণ করে! দিকে দিকে যে অনাচার, মজলুমের হাহাকার - তার কতটুকু থাকতো? গাজ্জালী বা তার মতো মনীষীদের চর্চা যতদিন শুধু কালো কালিতে সাদা পৃষ্ঠায় আব���্ধ থাকবে ততদিন আফসোস আর দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না আমাদের। 🟥 ফিরে আসা যাক আবার মূল আলোচনায়।🔸ইসলামে সবকিছুর মূল কথা সুবিচার–হোক সেটা পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন বা রাষ্ট্রীয়। ইমাম গাজ্জালী বলেছেন সুবিচার হলো পুঁজি আর উত্তম হওয়া তার লাভ। মুসলিম-অমুসলিম, নর-নারী, বন্ধু-শত্রু নিবিশেষে সবার সাথে সুবিচার করতে হবে। নিজেদের স্বজনপ্রীতি থেকে দূরে রাখতে হবে। কুরআনে বলা আছে, 'সুবিচারে সাক্ষী থাকো। সুবিচার করো। আল্লাহকে ভয় করো, তোমরা কি করো না করো তা তিনি খুব ভালো করে জানেন।'🔸দেশে একজন নারী নির্যাতিত হলে তার যতটা সমাজের সাহায্য প্রয়োজন, আমাদের সমাজে তারা সেটা পান না। খু*ন,ধ*র্ষণ থেকে শুরু করে নারী, শিশু নির্যাতনে তেমন কঠোর বিচার এদেশে দেখা যায় না। ওপর মহলে কলকাঠি নাড়তে পারবে এমন কেউ যদি কারো থেকে থাকে তাহলে সমাজের গর্হিততম কাজ করেও সে বা তারা বুক ফুলিয়ে চলতে পারে বা পারছে। সুবিচার বা ন্যায়বিচার এখানে অনেকটা মিশরীয় পুরাণের মতো, শুধু তার মুখরোচক গল্পই শোনা যায়, বাস্তবে দেখা পাওয়া ভার। এদেশে বিভিন্ন সময় সাধারণ মানুষ, ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শী, মুসলিম থেকে শুরু করে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এবং এই ধরনের ঘটনার পর বরাবরই রাষ্ট্র দায়সারা ভাবে সেই ঘটনাগুলো সামাল দিয়েছে। একজন মানুষ তিনি যে ধর্ম বা মতাদর্শের হোক না কেন তার উপর জুলুম করা হলো নিকৃষ্টতম কাজ। আমরা একটা কথা সবসময় ভুলে যাই আমরা বাংলাদেশী হবার আগে ছিলাম বাঙালি। সেই বাঙালি সভ্যতায় কালের বিবর্তনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসাথে বসবাস করছে। এত ডাইভার্স একটি সভ্যতার মানুষের অবশ্যই সবার মধ্যে প্রীতি ও ভালবাসার বন্ধন থাকা আবশ্যক।🔸নবীজী ﷺ বলেছেন,তোমরা মজলুমের বদদোয়া থেকে বেঁচে থেকো, যদিও সে ভিন্নধর্মের হয়। কারণ মজলুমের আর আল্লাহর মাঝখানে কোনো পর্দা থাকে না।(মুসনাদে আহমাদ) 🟥 ইমাম গাজ্জালী বলেছেন,🔸ইসলামের অন্যতম খুঁটি ভাল কাজের আদেশ এবং খারাপ কাজে নিষেধ। আল্লাহ নবী রাসুলদের যেসব কাজের গুরুভার দিয়ে পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। একজন মানুষের ভেতরকার নীতিবোধের ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় তার আচার আচরণে। মনে মনে সে কি ভাবছে না ভাবছে সেটা ফুটে ওঠে তার কাজকর্ম। নবীজী ﷺ বলছেন, প্রত্যেক আদম সন্তান অপরাধী। তবে যারা অনুশোচনা করে তারা অপরাধীদের মধ্যে উত্তম। এজন্যই ইমাম গাজ্জালী বলেছেন, ভাল কাজের চেয়ে অপরাধমূলক কাজ থেকে দূরে থাকার বিষয়টি প্রাধান্য দিতে হবে আগে।🔸খারাপ কাজের দায় নিতে হবে এবং সেগুলা শোধরানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষ মাত্রই আপনি ভুল করতে পারেন, তবে অনুতাপের মানসিকতা থাকতে হবে। ইমাম গাজ্জালীর মতে, সত্য জ্ঞান,সঠিক কাজ,সুসংকল্প আর খাঁটি আন্তরিকতার সমন্বয়ে একজন মানুষ সুন্দর জীবন যাপন করতে পারেন। 🟥 ইহুদিদের তাওরাত, মুসলিমদের কুরআনে শুকরের মাংস হারাম ছিল। যিশুও শূকরের মাংস খাওয়ার কোনো অনুমোদন দেননি। তিনি সব সময় নবী মুসা(আ) এর অনুশাসন মেনেছেন। মাংস না হয় আপনারা নাই খেলেন কিন্তু প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা অসৎভাবে শুকরের মাংসের মত মানুষ খেয়ে যাচ্ছে সেটার কি হবে? নানা সমস্যার সাথে সাথে এদেশে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ঋণখেলাপীদের সংখ্যা। তারা কি জানে না মৃত্যু আসন্ন? তারা কি জানে না মালাকুল মউত কাউকেই রেহাই দিবে না? তারা কি এটাও জানে না হাজার কোটি টাকা পকেটে পুরলেও তার বিন্দুমাত্রও তার শেষ যাত্রায় সঙ্গী হবে না?🔸মৃত দেহের উচ্চতা অনুসারে কবরের দৈর্ঘ্য হয়, এত হাজার কোটি টাকা রাখার কি জায়গা হবে? বিচারের দিন এই সব অবৈধ সম্পদের পাই পাই দানা দানা হিসাব দিতে হবে। ইমাম গাজ্জালী সতর্ক করে বলেছেন, পশুপাখি যেভাবে সারাদিন খেয়ে খেয়ে পেট ভরে আমরা যেন তেমন না হই। নবীজীর ﷺ হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, পেটে তিন ভাগের একভাগ খাবার, এক ভাগ পানি, এক ভাগ শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য রাখার সতর্কতা দিয়েছেন।🔸একটা বিষয় কি কেউ উত্তর দিতে পারবেন আপনারা যারা বাইরে ইফতার পার্টি, বার্থডে পার্টি, বিয়ের দাওয়াত, মিলাদ মাহফিল, কুলখানি আরো কত অনুষ্টানে ব্যস্ত থাকেন, আপনার বাসার আসে পাশের মানুষগুলোর পেটের অবস্থা কি জানেন? নিজের বাসার কর্মচারীর পেট ভরছে কিনা সেটাও কি কখনো খেয়াল করেছেন? উত্তর আসতে পারে: এদের নিয়ে ভাবার সময় কই? গান শোনা নিয়ে আমাদের ধর্মে প্রবল বাক-বিতণ্ডা আছে। ইমাম গাজ্জালী গানের বিষয়টা নিয়ে বলেছেন, গানের কথা হবে সুন্দর ছন্দবদ্ধ। গানের ভিতর অশ্লীলতা এবং যৌনতার ইঙ্গিত থাকবে না। আর গান শোনাটা অনেকের কাছে নেশার মত হয়ে যায়, যারা ঘন্টার পর ঘন্টা গান শুনে সেই বিষয়টা তিনি অনুৎসাহিত করেছেন। 🟥 ইমাম গাজ্জালী দেশান্তরী হওয়ার বিষয়ে কিছু অসাধারণ কথা বলেছেন, কোন বিপদের আশঙ্কা বা নিরাপদ জীবন কাটানো অথবা কল্যাণকর কাজে মানুষ দেশান্তরী হতে পারে। বর্তমানে যারা দেশের বাইরে যাচ্ছেন তারা মূলত উচ্চশিক্ষা, উন্নত জীবনযাপন এবং টাকা-পয়সার দিকে তাকিয়েই যান। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য রাখা উচিত, যে দেশের মাটিতে পা রেখে একদিন দাঁড়াতে শিখেছেন, সেই মাটিকে কিছু ফিরিয়ে দেয়ার মানসিকতা যেন মন থেকে মুছে না যায় অর্থাৎ আপনার দেশপ্রেম যেন থাকে কারন দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। অন্যদিকে মুসলিমদের জন্য আর্থিক-শারীরিক সামর্থ্য থাকলে হজ্জ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্তমানে পশ লাইফস্টাইলে কাবাঘর তাওয়াফের জায়গায় ফুডশপ,সুপারশপ, শপিং কমপ্লেক্স, রিসোর্ট,মুভি থিয়েটার তাওয়াফে মহাব্যস্ত সুধীজনেরা। অবশ্য এসব বিষয় নিয়ে কথা বললে অনেকেই "ব্যক্তি স্বাধীনতা" নামক ব্রহ্মাস্ত্র ব্যবহার করে নিমিষেই ধরাশায়ী করে দিবেন। যারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে ব্যস্ত, এর মায়াজালে বন্দী, আপন মনের খেয়ালের দাস, মৃত্যুর কথা তারা ভুলে যান। এজন্যই ইমাম গাজ্জালির পরিবর্তিত জীবনের মূলমন্ত্র ছিল চরিত্রশুদ্ধির প্রশিক্ষণ। মন থেকে শুরু করতে হয় এই শুদ্ধিযাত্রা। এর মাধ্যমে মন থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব সবকিছুই পরবর্তীতে শুদ্ধ হয়ে যায়। 🟥 অর্থের প্রবাহ সবসময় যেন বাজারে থাকে এবং টাকা আটকে বা কোন কিছু মজুদ করে কৃত্রিম বিজনেস পলিসি ইসলামে সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমানে রমজান মাস আসার আগেই পন্য মজুদের হিড়িক পড়ে। চিনি, সবজি, তেল থেকে শুরু করে পেঁয়াজের মত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য মজুদ করে সাধারণ মানুষকে কষ্ট দেয়া অবৈধ কাজ। বৈধভাবে সম্পদ অর্জনে বাধা নেই তবে সেই সম্পদ ধরে রাখাটা উৎসাহিত করা হয়নি। ইসলামে বরং জনকল্যাণে প্রচুর টাকা পয়সা দান, সমাজসেবা, অসহায় দুস্থদের জন্য খরচ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। সমাজের সবাই মিলে যদি কাজ না করা হয় তাহলে সে সমাজ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে কিভাবে?🔸নশ্বর দুনিয়ায় ধূলিকণার উপর যা থাকে তাও তো ধূলিকণাই। এজন্যই ইমাম গাজ্জালী বলেছিলেন, ডুবন্ত জাহাজে শুধু বাঁচার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, তাই সাথে রাখবেন। বর্তমান সমাজে টাকা-পয়সা হওয়ার পর ভিতরে অহংকার চলে আসে অথবা ঘুষ দিয়ে কোন পদবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে চান অনেকে। বাস্তব মূর্তি পূজা থেকে তো মুসলিমরা খুব হুঁশিয়ার থাকে, কিন্তু খ্যাতি আর সম্পদের মত রূপক মূর্তির আরাধনার ব্যাপারে কি সতর্ক আছেন? 🟥"মুগ্ধতায় ইমাম গাজ্জালী" - আপনি মুগ্ধ হবেন তাঁর চিন্তার পরিধি দেখে, মুগ্ধ হবেন তাঁর দূরদর্শী দর্শনের কথা চিন্তা করে। একই সাথে আহ্নিক গতি ও বার্ষিক গতি দিয়ে সূর্যের চারপাশে অক্লান্তভাবে ঘুরতে থাকা পৃথিবী যেমন ক্লান্ত হয় না, তেমনি সভ্যতার ইতিহাসের চারপাশে ঘুরতে থাকা ইমাম গাজ্জালীর দর্শনও কখনো ক্লান্ত ��বে না। তবে গাজ্জালী যেন বইয়ের পাতায় বা ক্ষণিকের জন্য এমন রিভিউ এর মধ্যে আটকা পড়ে হাসফাঁস না করে; গাজ্জালীর দর্শন যেন মুক্ত বাতাসের সন্ধান পায়, যেখানে তাঁকে মানায়। গাজ্জালী যেন হয় সবার জন্য, তাঁর দর্শন যেন মুগ্ধ করে সবাইকে।