সপ্তদশ থেকে একবিংশ শতক,এ উপাখ্যান পার হয়ে এসেছে চারশোটি বছর।বারবার করে বদলে গেছে দৃশ্যপট, দেশ, কাল,ভাষা এবং লোকাচার।এক বিদেশি পর্তুগিজ যুবার প্রেমে পড়েছে ডোমনি অহল্যা,আত্মপ্রকাশ করেছেন প্রথম বাংলা পুস্তকের রচয়িতা,কিংবদন্তীর নায়ক,বাঙালি,দম আন্তনিও দ্য রোজারিও! এসেছেন অমৃতপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ। কুমারী শাকম্ভরীর গর্ভে জন্ম নিয়েছে কাহিনীর পরবর্তী কুশীলব। কিন্তু শেষ অবধি এই আখ্যান অতি সাধারণ মানুষের,যাদের কথা কখনও কোনও ইতিহাসে লেখা হয়নি।
কত শান্ত জনপদ সুপুরি বাগান শাপলা ফুলে ছাওয়া দীঘি কার্তিকের জ্যোৎস্নালোকিত ধু ধু চর অতিক্রম করে সেই সব মানুষের জীবনস্রোত আজও এগিয়ে চলেছে সুদূর মোহনার দিকে। বেথুর ঝোপের গা বেয়ে কোনকালের বট অশ্বত্থের ঝুরির আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকা ভাঙা শ্যাওলা-ধরা পৈঠা পার হয়ে বয়ে যাচ্ছে তাদের মান অভিমান আনন্দ আর বেদনার অপরূপ সব মুহূর্ত। সেই কাল স্রোতকেই স্পর্শ করতে চেয়েছেন লেখক, এই উপন্যাসে। এক আঁজলা জল তুলে দেখতে চেয়েছেন অনিত্য,সদা চঞ্চল জীবনের প্রতিবিম্ব।
ইদানিংকার বাংলা কথাসাহিত্যের বহুব্যবহৃত প্লট— সুদূর অতীত দিনের কোনো কাহিনির সঙ্গে বর্তমান সময়ের চরিত্র এবং ঘটনাকে মিলিয়ে দেওয়া। ক্রমে একঘেঁয়ে লাগছে এই ব্যাপারটা। আলোচ্য উপন্যাসটির গদ্যশৈলীর কারণে বিরক্তির মাত্রা আরো বেড়ে গেছে।
বিভূতিভূষণ তাঁর রচনায় সুললিত গদ্যে প্রকৃতি কিংবা পরিবেশের বর্ণনা দিতেন। কিন্তু সেই বর্ণনায় মাত্রাজ্ঞান থাকতো। এই উপন্যাসের লেখকের গদ্যশৈলী ভালো, কিন্তু পরিমিতিবোধের নিদারুণ অভাব। যৎসামান্য সুযোগ পেলেই আকাশ বাতাস ফুল লতা পাতার বর্ণনা দিয়ে গেছেন গোটা উপন্যাস জুড়ে। শুরুর দিকে কিন্তু এই বর্ণনা মন্দ লাগছিল না। ক্রমে যখন বুঝলাম এই বর্ণনা দেওয়ার ব্যাপারটা লেখকের ব্যাধিবিশেষ, তখন বিরক্তি লাগা শুরু হলো। সেই একই বৈচিত্র্যহীন কয়েকটি উপমা, পুনরাবৃত্তিময় কয়েকটি রূপকের উপর্যুপরি ব্যবহার করে প্রকৃতির রূপবর্ণনার স্রোতে ভেসে গেছে উপন্যাসের মূল কাহিনির বাঁধন, গল্পের গতি এবং পরিণতি, কিংবা রচনার উদ্দেশ্য। "উত্তর দিক থেকে বয়ে আসছে বাতাস, রুক্ষ জলহীন, তার স্পর্শে মনে কী এক অজানা টান ধরে। আর কিছুক্ষণ মাত্র, তারপরেই অপূর্ব ইন্দ্রজালের মতো হঠাৎ ভুবনডাঙার উঠানে নেমে আসবে সন্ধ্যা।"— পৃথিবী কিংবা জগৎ কিংবা চরাচর বোঝাতে এই "ভুবনডাঙা" শব্দটির প্রয়োগ করা হয়েছে কিছু-না-হোক অন্তত দুশো বার (বাড়িয়ে বলছি না, বরং কমিয়ে বলে থাকতে পারি)।
আমার খুব সন্দেহ হয়, একটি শক্তপোক্ত প্লটের অভাব ঢেকে রাখার জন্যই কি কোনো কোনো লেখক form-এর নামে, আঙ্গিকের নামে, রচনাসৌন্দর্যের নামে, এই অহেতুক বাগবিস্তার ফেঁদে বসেন?
কিছু বই আছে যার সন্মুখে নতজানু হয়ে বসতে ইচ্ছা হয়।বসে থাকতে হয় নির্বাক,নিস্তব্ধ।এক মনকেমনিয়া অনুভূতি প্রবল হয়ে ওঠে।অবশ করা,ঝিম ধরানো এক অনুভবের মধ্যেই আখ্যানের চরিত্রগুলি এসে যেন ডাক দিয়ে যায় -দেখো আমি এসেছি।স্পর্শ করা যায় না তাদের।মাঝে আছে বহুকালের ব্যবধান।সায়ন্তন ঠাকুরের 'শাকম্ভরী' তেমনই একটি বই।ইচ্ছা করে প্রত্যেকটি শব্দ বারবার করে পড়ি। এমন একটি বই নিয়ে আলোচনা করার সাধ্য আমার নেই।তাই কিছু অনুভূতি আরও একটু নিজের করে পাওয়ার জন্য আমরা বইটি নিয়ে গিয়েছিলাম বীরভূমের হেতমপুরে-যে জায়গা 'শাকম্ভরী' তে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অধিকার করে আছে। *****************************************পৌষের এক সকাল।পাকা গমের মত রোদ্দুর উঠেছে আজ।আমি আর আমার ভাই,চুনী,বেরিয়ে পড়লাম হেতমপুরের উদ্দেশ্যে।অজয় সেতু যখন পেরোচ্ছি তখনও দূরে পাতলা কুয়াশার স্মৃতিমেদুরতা।ইলামবাজার পেরিয়ে দু-পাশে পড়ে আছে ফসলশূন্য,একাকী মাঠ।একসময় পৌছালাম হেতমপুর।প্রথমে গেলাম চন্দ্রনাথ শিবের মন্দিরে। এই মন্দিরেই নীলাঞ্জনা আর সায়মের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মহিমানিরঞ্জনের।আমরা বইটি নিয়ে ছবি তুললাম।সামান্য একটু ভিডিও।চারপাশে বেশকিছু লোকজন দেখছিল আমাদের পাগলামো।আমার ইউটিউব চ্যানেল 'বই-কী' তে বেশকিছু মুহূর্ত ধরা আছে,দেখতে পারেন।একসময় পূজার জন্য এলেন বর্তমান পুরোহিত নিখিল ভট্টাচার্য।ছবি তুললেন আমাদের সঙ্গে।ফোন নম্বর দিলেন।এরপর আমরা গেলাম হেতমপুর রাজবাড়ীর দিকে।ইতিহাসের গন্ধ লেগে থাকা এই বাড়ি তখন উপভোগ করছে পৌষালী শীতের ওম।বিশাল এই মহলের বেশিরভাগ অংশেই বর্তমানে স্কুল এবং কলেজ।অনলাইন ক্লাস চলছিল তাই এখানে ইচ্ছা থাকলে ও বই নিয়ে ভিডিও করতে পারলাম না।কিছু ছবি তুললাম।সম্ভবত কোভিড বিধির কারণেই রাজবাড়ীর ভিতরে যেতে নিষেধ করলেন এক শিক্ষক মহাশয়।দুশো বছর আগে রাঢ়ী ব্রাহ্মণ শ্রী রাধানাথ চক্রবর্তী এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন।তার ও আগে রাজনগরের শাসক বাদি ওজ্জমান খাঁয়ের খাসতালুক।রাঘব নামের এক শাসক প্রবল প্রতাপশালী হয়ে ওঠেন এবং এই জায়গার নাম দেন রাঘবপুর।তাকে পরাস্ত করেন বাদি ওজ্জমান খাঁয়ের সেনাপতি হাতেম খাঁ।লোকমুখে রাঘবপুর হয়ে ওঠে হাতেমপুর বা হেতমপুর।কাহিনীসূত্রে নীলাঞ্জনার পূর্বপুরুষ রাধামোহন দাস কে চিনতেন মহিমানিরঞ্জন।ক্ষণিকের জন্য কালসীমানা অতিক্রম করে মিলেছিল অতীত ও বর্তমান।হাতেম খাঁয়ের দত্তক পুত্র হাফেজ খাঁ এবং তার স্ত্রী শেরিনা বিবিকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলে কাহিনী সূত্র।১৭৪২ এর মারাঠা আক্রমণে প্রচন্ড লড়াইয়ের পর নিহত হন হাফেজ খাঁ ও শেরিনা বিবি।নিছক তথ্যকেন্দ্রিক ইতিহাস নয় বরং চালচিত্রে থাকা ইতিহাসের সঙ্গে অসাধারণ গদ্যশৈলী আর কালসমূদ্রে যাত্রার অনবদ্য মিশেল আমার আকর্ষণের মূলকেন্দ্র। *****************************************এবার যাবো শেরিনা বিবির সমাধি স্থলে।রাস্তার ধারের একটি দোকানে দাঁড়িয়ে একথা -সেকথায় জিজ্ঞেস করলাম এখানকার ইতিহাস।তিনি ও বললেন রাঘব রায়,হাতেম খাঁ,হাফেজ খাঁ,মহিমানিরঞ্জন,শেরিনা বিবির কথা।বললেন 'আধাঁরে মুসাফির'নামে একটি সিনেমার (নাকি বইয়ের কথা) যাতে নাকি আছে এই কাহিনী।যদি ও পরে আমি গুগল করে এরকম কিছু খুঁজে পাই নি।কত কাহিনী,কত দীর্ঘশ্বাস,কত বেদনা,অতৃপ্তি হারিয়ে যায় কালসমুদ্রে যার খোঁজ কেউ রাখে না।সায়ন্তন ঠাকুরের কলমে এরকম মনকেমনিয়া না থাকলে আমিও হয়তো আসতাম না এখানে।পেট্রোল পাম্পের কাছে এসে একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে খানিকটা ধাঁধিয়ে বলল"অ..শোরিনা বিবির কবর।কেউ তো ওখেনে খুব একটা যায় না।তাই বুয়তে পারি নাই "।সে দেখিয়ে দেয় মোরামে ঢাকা একটা রাস্তা।দুপাশে জঙ্গল।সমাধির প্রাচীরের গেট ঠেলে ভিতরে যায়।কেউ শুকনো শাল পাতার উপরে রেখে গেছে চারটি বাতাসা।পাশে কিছু আধপোড়া ধূপ।সমাধির ভিতরে ঘরে একবার উঁকি দিয়ে ফিরে আসি চাতালে। জঙ্গলে পাখির ডাক,লাল ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া বাইকের শব্দ ছাড়া নিস্তব্ধতা চারপাশে।কয়েকটি ছবি তুলি।সামান্য একটু ভিডিও 'শাকম্ভরী' হাতে নিয়ে। বুনোফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিই, ঠিক যেমন নীলাঞ্জনা দিয়েছিল।বইটি নামিয়ে রাখি দ্বারপ্রান্তে -অমরলোকের বাসিন্দাকে মনে মনে বলি স্বপ্নদ্রষ্ট লেখক লিখেছেন তাঁর উপাখ্যান।অদূরে তিরতিরে বয়ে চলেছে শাল নদী।এই নদী পেরিয়েই শেরিনা বিবির মৃত্যুর পর তার কন্যা শ্যামমণিকে নিয়ে অন্য স্থানে পাড়ি দিয়েছিল ভানুমতী।কাহিনী নিয়েছিল নতুন বাঁক। সূর্য এখন মাথার উপরে।একটু পরেই বিকেল নামবে"ভুবনডাঙায়"।তারপর স্বল্পায়ু বিকেল মিশে যাবে সন্ধ্যায়।পাখিরা ফিরবে বাসায়।হয়তো বা জোনাকিরা সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালিয়ে যাবে এখানে।নির্জন জঙ্গলাবৃত সমাধিতে নেমে আসবে অপরূপ শীতের রাত।