পুরনো দিনের সিনেমার খোঁজ খবর যারা রাখেন, লিলি চক্রবর্তী খুব পরিচিত একটা নাম। এখনও এই বুড়ো বয়সেও সমান দাপটে তরুণদের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছেন। যখন তার আবির্ভাব এবং ক্যারিয়ার চলাকালীন সময়টা ছিল বাংলা সিনেমার দোর্দণ্ডপ্রতাপের যুগ। তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা কী এক বাঘা বাঘা অভিনেত্রী। সুচিত্রা সেন, অপর্ণা সেন, শর্মিলা ঠাকুর আরও অনেকে। ঠিক করলেন তথাকথিত নায়িকা হবার চেয়ে চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। হয়েছেনও তাই। অনেক নামকরা পরিচালকের সাথে কাজ হয়েছে, কাজ করেছেন বম্বেতে এমনকি মালায়লাম ইন্ডাস্ট্রিতেও। এখনও কাজ করছেন তরুণ প্রজন্মের নামকরা পরিচালকদের সাথে। অথচ তার অভিনয়ের শুরুটা হয়েছিল বেশ ভিন্নরকমভাবে। অভাবের তাড়নায়। কী অদ্ভুত!
লিলি চক্রবর্তীর উত্থান এবং তার ক্যারিয়ারের গল্প নিয়ে ছোটখাটো আত্মজীবনী 'আমি লিলি'। পড়ে ভালো লাগলো। সাবলীল লেখা আর প্রচুর রেফারেন্স।
তখন কলকাতা দূরদর্শন থেকে সপ্তাহে একদিন করে সম্প্রসারিত হত কোনো বাংলা চলচ্চিত্র। তাতেই একবার স্ক্রিনে প্রধান অভিনেত্রী, মানে নায়িকার সঙ্গে অন্য একজনকে দেখেছিলাম। নায়িকার ডানাকাটা সৌন্দর্য এবং ক্রন্দনোন্মুখ সংলাপের বদলে আমার নজর কেড়ে নিয়েছিলেন সেই অন্য অভিনেত্রীটি। তাঁর মুখ, চোখ, হাসি, কথা বলার ভঙ্গি— সব দেখে মন বলে উঠেছিল 'বাহ্!' ভেবেছিলাম, আচ্ছা, ইনি কেন নায়িকা নন? পরে আরও বহু সিনেমায়, এমনকি হালের সিরিয়ালেও তাঁকে দেখেছি ও দেখে চলেছি ছোট্ট বা পার্শ্ব চরিত্রে। সর্বত্রই নিজের কাজটুকু তিনি করেন ভারি পরিপাটি ভঙ্গিতে। তাতে থাকে না অতি-অভিনয়ের চিৎকৃত উপস্থাপনা বা আরোপিত আবেগ। আজও তাঁর সেই ছোট্ট ভূমিকাটুকু দেখে, রূপ বা অন্য সব ছাপিয়ে মন বলে ওঠে 'বাহ্!' তিনি লিলি চক্রবর্তী। বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের অনেক গয়না আর জরির ঝলকের মধ্যেও নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বাংলায় শুধু নয়, সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেও অত্যন্ত বড়ো মাপের পরিচালকদের ফিল্মে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছেন লিলি চক্রবর্তী। পেয়েছেন পুরস্কার, পেয়েছেন তাঁর মতো করে অকুণ্ঠ সম্মান ও শ্রদ্ধাও। তবু আমরা তাঁর সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানি না! ভুল বললাম। জানতাম না। এবার জানলাম, কারণ দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং অময় দেব রায় দীর্ঘদিনের আলাপচারিতার মাধ্যমে অবশেষে আমাদের সামনে তুলে এনেছেন এই অভিনেত্রীর ইতিহাস। মহানায়িকা বা স্বপ্নসুন্দরী জাতীয় আখ্যা না পেয়েও সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চলচ্চিত্র জগতে ছ'টি দশক কাটিয়ে দেওয়া এই শিল্পীর কিছু কথা অন্তত আমাদের সামনে এবার এসেছে সপ্তর্ষি প্রকাশন-এর নিবেদন, এই ছোট্ট হার্ডকভারটিতে। শৈশব, কৈশোর, জীবনসংগ্রামের নানা ধাপ, একরকম হঠাৎ করেই খুব বড়ো মাপের পরিচালক ও কলাকুশলীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ, অনেক বঞ্চনা আর অভিমানের মৃদু গুঞ্জন, কিছু কান্না, আর সব পেরিয়েও ভবিষ্যতের দিকে সহজ ও সুন্দরভাবে তাকিয়ে থাকা— এভাবে বললে কি বোঝানো যাবে সেই কথাগুলোকে? বোধহয় না। তাঁকে জানতে গেলে, তাঁর এই কথাগুলো জানতে গেলে আপনাকে বইটা পড়তে হবে। বইটা অসামান্য হয়ে উঠেছে দুই সংকলকের তরফে লিলি চক্রবর্তী অভিনীত সিনেমাগুলোর ডকুমেন্টেশন এই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়। সেই সিনেমাগুলোর যাবতীয় টেকনিক্যাল ডিটেইলস জুড়ে আছে এই বইয়ের প্রায় অর্ধাংশ। দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অনুরাগী মানুষের কাছে এই অংশটি গোল্ডমাইন বলেই গণ্য হবে। শুধু বইটার দাম আরেকটু কম হলে বোধহয় ভালো হত। প্রবাসী বাঙালিরা যে এই নায়িকার কথাগুলো পড়ে স্মৃতির নদীতে ডুব দিতে চাইবেন— এ প্রায় হলফ করে বলে দেওয়া চলে।তাই আরও ভালো হয় যদি প্রকাশক বইটির একটি বৈদ্যুতিন সংস্করণও প্রকাশ করেন। ইতিমধ্যে, এই বইটা আবার ফুরিয়ে যাওয়ার আগে কিনতে ও পড়তে দ্বিধা করবেন না। আমি নিশ্চিত যে এই ছোট্ট, ছিমছাম, সুমুদ্রিত, তথ্যসমৃদ্ধ এবং আন্তরিকতায় ভাস্বর বইটি পড়ার পর পাঠকের মুখ দিয়েও একটিই শব্দ বেরোবে— 'বাহ্!'