অভিনন্দন সরকার-এর জন্ম ৮ জুলাই, ১৯৭৯। স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা বেঙ্গালুরু থেকে , বিষয়: ‘ফিজিকাল থেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন’। পেশাগতভাবে একটি প্যারামেডিকাল কলেজের অধ্যাপক। দিনের একটা বড় অংশ কাটে রুগি আর ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে । প্রথম গল্প ২০১৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ছাতিম ফুলের গন্ধ’। ‘দেশ’ এবং ‘আনন্দবাজার রবিবাসরীয়’তে একাধিক গল্প প্রকাশিত। ২০১৭-তে ছোটগল্প ‘অপেক্ষা ’ অনূদিত হয়েছে মারাঠি ভাষায় ‘মেনকা ’ পত্রিকার দীপাবলি সংখ্যায়। বন্ধুর সঙ্গে কয়েকটি শর্ট ফিল্ম বানিয়েছেন। তারই একটি ‘বিট্স ফরএভার’ প্রদর্শিত হয় কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে, ২০১৪ সালে । ‘তরঙ্গ মিলায়ে যায়’ প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস।
...."না বলতেই যে কথা শােনা হয়ে যায়, না ছুঁতেই যে ছোঁয়ার আবেশে মনে জাগে পদ্মকাটা.....সেই কথার চেয়ে নিবিড়,সেই স্পর্শের থেকে চিরন্তন কি আর কিছু আছে এই পৃথিবীতে??"
এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডাঃ মেঘালি চৌধুরী, একজন মনস্তাত্ত্বিক, 'মেঘলা মন' নামের এক ক্লিনিকের প্রতিষ্ঠাতা ও সর্বেসর্বা মনের ডাক্তার । ছবির মতন সাজানাে সুন্দর জীবন তার । কিন্তু মনের ডাক্তারের মনও মেঘলা হয় কখনো কখনো, এক পশলা বৃষ্টিও হয় । পেশাদার সাইকোঅ্যানালিস্ট মেঘালি তার ক্লিনিকের শেষ রেজিস্টার্ড পেশেন্ট প্রান্তরের মধ্যে প্রাথমিক সাক্ষাতে কোনও অস্বাভাবিকতা খুঁজে পায় না । এই রোগীর 'চোখের তারা কালো, ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত, কোনও মনের অসুখের ছায়া পড়েনি । সেখানে সচরাচর যে টক থেরাপি, ফিল গুড মেডিসিনের সাহায্য নিয়ে থাকেন ডাক্তাররা, এক্ষেত্রে তবে কিসের সাহায্য নেবেন ডাঃ মেঘালি ?
এই উপন্যাস একজন সাইকোঅ্যানালিস্ট ও একজন রোগীর উপাখ্যান । এই গল্প একজন মনের ডাক্তার ও একজন প্রেমিকের । এই গল্পে একজন ডাক্তার তার রোগীর গোপন ব্যথার অতলস্পর্শ খুঁজতে থাকে, রোগীর মনের অলিগলি পেরিয়ে । সে কী খুঁজে পাবে... রোগীর সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের মনের গােপন গন্তব্যের ঠিকানা ?
আবার একইভাবে এই গল্প একজন বাবা ও তার ছােট্ট রাজকন্যার গল্প । একরত্তি মেয়ে টায়রার একটা গল্প মেঘ আর প্রান্তরের গল্পের সাথে মিশে আছে এই উপন্যাসে । আর অদ্ভুতভাবে মেঘালির মনের গতি প্রকৃতির সাথে টায়রার গল্পের আকাশ আর প্রকৃতির রঙ বদলাচ্ছে সমান্তরাল ভাবে । এই গল্পে রূপকথা আছে, আর আছে মেঘ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামানাের প্রতিশ্রুতি । কিন্তু বৃষ্টিকে নামতে হলে মেঘকে তাে কাঁদতে হবে... মেঘ কী তাহলে কাঁদবে ??
....."সবকিছু না পাওয়াই ভালো কিছু অপ্রাপ্তিই জীবনকে সহনীয় করে তােলে আলাে আর আঁধার,দিন আর রাত্রি এরা কিন্তু নিছক পরস্পরের বিপরীত শব্দ নয়,এরা একে অপরের পরিপূরক তেমনি ভালোবাসার মতাে ভালােবাসাহীনতারও প্রয়ােজন আছে জীবনে।"
এইরকম অনেক শব্দের আর বাক্যের অলংকারে সজ্জিত এই লেখাটি । পড়তে পড়তে পাঠক ভিজতে থাকে এক অপরূপকথায়, যেখানে শেষমেষ প্রান্তর জুড়ে বৃষ্টি আসে । অজান্তেই চোখ ভিজে যায় এক অদ্ভুত আবেগে, যে রূপকথার নাম, 'এক যে ছিল মেঘ' ।
অনেক দিন ধরেই পড়ব পড়ব করছি পড়া হয়ে উঠছিল না, ফাইনালি পড়লাম, হ্যাঁ আর তার সাথে আমি প্রেমে পড়লাম প্রান্তর ব্যানার্জীর। বই টা শেষ করে রাতে শুয়ে চোখ বন্ধ করেই প্রান্তর ব্যানার্জীর কথা মনে পড়লো। বুঝলাম এই রেশটা সহজে কাটবার নয়। এত সুন্দর রোমান্টিক উপন্যাস আমি অনেক দিন পর পড়লাম, এক কথায় অনবদ্য। Must read ♥️
"তারপর পৃথিবীর কোনও এক ছোট্ট দেশে হয়তো-বা মেঘ ভাঙল,ভেঙে আছড়ে পড়ল প্রান্তরের বুকে।নিঝুম বৃষ্টিতে গাঢ় সবুজ হল জগতের সব বৃক্ষরাজি। আর চারপাশের পৃথিবীর সবাইকার হঠাৎ একসঙ্গে মনকেমন করে উঠল। হয়তো নাম-না জানা কোনও ফুলের জন্য,বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাওয়া শিশিরবিন্দুর জন্য অথবা ভুলে যাওয়া কোনও প্রিয়জনের কথা ভেবেই হয়তো-বা হু-হু করে উঠল সবার বুকের গহীন.........."
"সে এক আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য। মেঘভাঙা বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া পথে-প্রান্তরে ছড়িয়ে রইল অজস্র হলুদাভ কদম ফুলের রাশি। জামরুল গাছের ভিজে পাতায় গা লুকিয়ে ডেকে উঠলো অসময়ের কোকিল,ফুরফুরে হাওয়ায় উড়ে বেড়াল হাজারটা প্রজাপতি আর হাসিমুখে তাদের পিছনে ধাওয়া করল একরত্তি এক মেয়ে। খুঁড়িয়ে ছুটছে,ছুটতে ছুটতে ব্যাথায় যেন ভেঙে পড়ছে তার পায়ের পেশি,তবু সেই মেখের মুখে হাজার ওয়াটের হাসি,যেন সে এসেছে সব পেয়েছির দেশে...🌧️☁️💦🌻" না আলাদা করে আর কোনো বর্ষার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না,উপন্যাসের শেষে পৌঁছে নিজের অজান্তেই মনের কোনো এক গোপনতম স্থানে পুঞ্জীভূত মেঘ অঝোরেই বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে,ভিজিয়ে দেয় অনুভূতিদের। এ যেন এক বৃষ্টিভেজা রূপকথা।🌧️ "সেই গল্পে হৈমন্তী বিকেলের কুয়াশার মত আবছা বিষাদ থাকে,সেই গল্প যন্ত্রণার,সেই গল্প আঘাতে চুরচুর হয়ে যাওয়ার আখ্যান।..."
এই উপন্যাস আবর্তিত হয়েছে এক মনোবিদ ড.মেঘালি চৌধুরী ও তার নিজের হাতে গড়া রিহ্যাব ক্লিনিক 'মেঘলা মন'-এর শেষ পেশেন্ট প্রান্তর-কে নিয়ে।তার(প্রান্তরের) মনের রোগের কারণের সন্ধান পেতে গিয়েই মেঘ খোঁজ পাই তার মনের সুপ্ত ব্যাথা-যন্ত্রণাগুলোর। ট্রিটমেন্ট চলাকালীন মেঘ আরও তিনটি চরিত্রের আবিষ্কার করে মেঘ,যাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প উপন্যাসেকে এক আলাদা মোড় দেয়।কিন্তু কোথাও গিয়ে যেন মেঘ আর প্রান্তরের মনের গন্তব্য মিলে যায়।আর হাজার দোলাচলের মধ্যে মেঘ ভালোবাসার পথই বেছে নেয়।❤️🌧️💦 ☁️💦"ভালোবাসাকে কি ট্রেনিংয়ে পাল্টানো যায়?রক্তবীজের মতো প্রাণ থেকে প্রাণে ছড়াক ভালোবাসা,ছড়িয়ে যাক প্রান্তর থেকে প্রান্তরে.."💦☁️
এরই সঙ্গে রয়েছে একজন বাবা ও তার ছোট্ট টায়রাবেবির গল্প।ছোট্ট টায়রার জেদ তার রবিদাদুর মৃত্যুদিবসে বৃষ্টি না পড়লে সে কিছুতেই নাচ করবে না।কিন্তু তার বাবা তাকে প্রতিশ্রুতি দেন এমন এক রূপকথার গল্প শোনানোর,যা বৃষ্টি নামাবে অঝোরে।কিন্তু মেঘ কি কাঁদবে? মেঘ না কাঁদলে কেমন করে ছোট্ট টায়রার শহরে বৃষ্টি নামবে?🌼🌧️
'এক যে ছিল মেঘ' এক অপরূপ রূপকথার গল্প,মেঘ ও প্রান্তরের নিখাদ বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার গল্প। লেখকের জাদুকলমে সত্যিই মনের সবটুকু জুড়ে মেঘালির মেঘ-আলপনায় ও এক পশলা বৃষ্টির পর অদ্ভুত সুন্দর এক অনুভূতি ঘিরে ধরে।কুর্নিশ জানাই লেখককে।📖📖👏🏻👏🏻🌼🌼❤️❤️