Jump to ratings and reviews
Displaying 1 of 1 review
#বইপড়া – নির্বাচিত জঁর ফিকশন
--------------------------------------------------------------
পড়ে শেষ করলুম “নির্বাচিত জঁর ফিকশন”। প্রথমেই বলি আমি সাধারণ পাঠক গোত্রে পড়ি, পড়ি মনের খিদেয়, তার প্রকার, উপপ্রকার নিয়ে কিচ্ছুটি না জেনে এবং বিন্দুমাত্র মাথা না ঘামিয়ে। অতএব বইয়ের নামেই থমকে যেতে বাধ্য হয়েছি, কারণ “জঁর ফিকশন” শব্দটাই এই প্রথম শুনলাম।
সেই কারণেই, যদিও সাধারণত বই হাতে পেলেই সোজা ব্যাঘ্রঝম্পনে গোগ্রাস গল্প গিলতে শুরু করি, এক্ষেত্রে আগের ভূমিকা, এবং তারপর সলতে পাকানো নামে ব্যাখ্যা, বা সাক্ষাৎকার-সদৃশ আলাপচারিতা – যাই বলা যাক, সেটা থেকেই পড়তে শুরু করেছিলাম। কী পড়তে যাচ্ছি, কী আশা করব সেটা বুঝে নিতে। ভূমিকাতে ত্রিদিববাবু বিষয়টা স্বল্প পরিসরে সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন। কিন্তু তার পরবর্তী দীর্ঘ আলোচনাটি পড়ে বইটি হওয়ার ইতিহাস আর সম্পাদকদ্বয়ের ঈর্ষোদ্রেককারী পঠিত তালিকার অসংখ্য বইয়ের নাম জানা ছাড়া আর কিছু স্পষ্ট হল না – হয়তো আমারই অক্ষমতা সে।
যাইহোক, পড়ে এবং নিজে ভেবে ভেবে এটুকুই বুঝলাম, আমাদের প্রাত্যহিক ঘটনার, দৈনন্দিন জীবনের গল্প থেকে সরে দাঁড়িয়ে, অন্যরকম কিছু - তা সুপারন্যাচারাল-ই হোক, অভাবনীয় সাইকোলজিক্যাল অস্বাভাবিকতা-ই হোক, বা স্পেকুলেটিভ (সদ্য শিখেছি এটা) “হোয়াট ইফ” ভাবনার অন্তর্গত সায়েন্স ফিকশন বা ফ্যান্টাসিই হোক, এইগুলোকে জঁর ফিকশন বলা যায়। এমন গল্প, যা পড়ে ধক্ করে নিত্যনৈমিত্তিকের বাইরে গিয়ে পাঠক অন্তত একবারও অনভ্যস্ত কোনো দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ভাবতে বাধ্য হয়। আমার মত সাধারণ পাঠকের বোঝার সুবিধের জন্য হয়তো বলা যায়, সত্যজিৎ রায়ের “পটলবাবু ফিল্মস্টার” মেইন্সট্রীম গল্প, আর “খগম” বা “ফ্রীৎস” জঁর ফিকশন।
এই বোধ নিয়ে গল্পে ঢুকলুম। এক এক করে বলি এবার।
---
“চিরযৌবন প্রাইভেট লিমিটেড” – অনীশ দেব।
এটা সম্ভবত ক্লাসিক জঁর ফিকশনের উদাহরণ (ইয়ে, সোনার পাথরবাটির মত শোনাল তো? সদ্য শেখা পাঠকের কাছে এ গল্পটা সত্যিই পার্ফেক্ট শুরুয়াৎ হয়েছিল।) শ্রদ্ধেয় লেখকের পাকা হাতে গল্পটা নিরীহভাবে শুরু হয়ে, মোচড়ের পর মোচড় দিয়ে, ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে নিখুঁত ছোট গল্পের মত পাঠককে ভাবিয়ে ছাড়ে, তারপর কী হল? সত্যি যদি এমন হয়?
“হিরের চেয়েও দামি” – ঋতা বসু।
এঁর লেখা আমি খুব পছন্দ করি। প্রতিটা গল্পে একটা খুব ঝলমলে, পরিচ্ছন্ন, সুন্দর কাহিনি নির্মাণ থাকে। চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়, পরিবেশ সম্ভবত তার চেয়েও বেশি। গল্প নিজের গতিতে , তাড়া নয়, স্লথ নয়, সুন্দর এগিয়ে যায় ঝরঝরে ভাষার গুণে। এটিও ঠিক তেমনই একটি গোয়েন্দা গল্প। হারানো প্রাপ্তির গল্প, সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মিশেল। গল্পটা আমার পড়তে দিব্যি লেগেছে, কিন্তু এই সংকলনে, ‘জঁর ফিকশন’ হিসেবে ভাবতে একটু অসুবিধা হয়েছে। এতক্ষণ ধরে যা বুঝেছি, সেই ‘হ্যটকে’ ব্যাপারটা এই গল্পে নেই। শুধুমাত্র গোয়েন্দা গল্প হলেই জঁর ফিকশন হয় কি? সম্পাদকদ্বয়ের কাছে মৃদু এবং ভীত আপত্তি জানিয়ে গেলাম।
“কীড়া জড়ি” – সৈকত মুখোপাধ্যায়।
চাইল্ড রেপের মত এক ভয়াবহ বিষয় নিয়ে, তার সঙ্গে বায়োথ্রিলারের উপাদান জুড়ে, বাস্তব অবাস্তবের মিশেলে এরকম একটা টানটান গল্প লেখা এই লেখকের পক্ষেই সম্ভব। সামান্য কয়েক লাইন স্বগতোক্তিতে এক হতদরিদ্র গ্রামের, অসহায় কিশোরীর আখ্যানকে লেখক লোম খাড়া করে দেওয়া এক অভিজ্ঞতা করে তুলেছেন পাঠকের সামনে। তবে আমার ব্যক্তিগত মত, শেষতম প্যারাগ্রাফটা বাহুল্য এবং বর্জনীয়, গল্পটা তার আগের লাইনেই তার শীর্ষবিন্দু ছুঁয়ে ফেলেছে।
“চোখ” – কাবেরী রায়চৌধুরী।
আমার খুব ভাল লেগেছে এই গল্পটা। অত্যন্ত বাস্তব এবং হয়তো প্রেডিক্টেবল একটা প্লটকে শুধু হিউম্যান সাইকোলজির এরকম দুর্ধর্ষ ট্রীট্মেন্ট দিয়ে, পাঠককে তার গতানুগতিক ভাবনার পথ থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে সরিয়ে দিয়ে এরকম একটা মনে ছাপ রাখতে পারা গল্প লেখার জন্য অনেক ধন্যবাদ লেখককে।
“আবহমান” – রঞ্জন দাশগুপ্ত।
প্রাচীন ভয়ের আবহ গড়ে উঠেছে গল্পে। ঘটনা অমোঘভাবে এগিয়ে গেছে যেদিকে যাবার। নিশির ডাকের মতটেনে নিয়ে গেছে পাঠককেও, কী হতে চলেছে বুঝেও শেষ অবধি ‘যেন না হয়, যেন না হয়’ জপ করতে করতে পাতা উলটোতে বাধ্য করেছে।
“সোনার বালা” – চুমকি চট্টোপাধ্যায়।
আরেকটি হারানো প্রাপ্তি, খুন নিয়ে রহস্য গল্প কিন্তু কী দারুণ আবহ সৃষ্টি হয়েছে লেখার গুণে! গ্রাম বাংলা, লেখকের চমকে দেওয়ার মত বটানির তথ্যের ব্যবহার, রহস্য, পারিবারিক জটিলতা নিয়ে চলতে চলতেই , পাঠককে প্রস্তুত হবার সুযোগ না দিয়ে পরাবাস্তব অনায়াসে টুক করে মিশে গিয়ে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মত জীবন্ত ( নাকি অলৌকিক বলব? ) হয়ে উঠেছে কাহিনির পরিবেশ। ভালো লেগেছে।
“চন্দনবনের সাপ” – শাশ্বতী চন্দ।
অপরাধ, খুন, কিছু আশ্চর্য সমাপতন ও পরিশেষে মানবচরিত্রের এক অবিশ্বাস্য উন্মোচন। এরই মধ্যে থাকে কি ওপারের কারো উপস্থিতি? গল্পটি জটিল, পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে।
“সুরঞ্জনা” – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য।
সাররিয়ালিজম। মিস্টিক। ম্যাজেস্টিকও। যে লেখা সম্যক অনুধাবনের জন্য আলাদা করে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। ঘটনা প্রবাহ, যুক্তি বা বাঁধা নিয়মে ফেলা যায় না এ গল্পকে, চেতনার বহুবিধ স্তর নিয়ে যেভাবে খেলেছেন লেখক তা শুধু ছবি দেখার মত উপভোগ করতে হয়।
“যেখানে পথ শেষ” – সৌরভ চক্রবর্তী।
সম্ভবত ইনিই এই সংকলনের কনিষ্ঠতম লেখক। অসম্ভব প্রতিশ্রুতি এঁর লেখায়। আমার বিচারে এ সংকলনের সেরা প্লট এটি। আর কিছু বললে গল্পটা বলে দেওয়া হবে যেটা আমি করতে চাই না।
(কী লিখেছেন মশাই! ফ্যান হয়ে গেছি।)
“দৌড়” – ঋজু গাঙ্গুলী।
টানটান সাসপেন্স, রোমহর্ষক। গল্প পড়ছি না হলিউড মুভি দেখছি বুঝতে পারছিলুম না। যুক্তিগত দিক দিয়ে আমার কিছু খটকা আছে যা লেখকের স্বকর্ণে নিবেদন করব পরে (একই কারণে, এখানে বললে গল্পটা বলে দেওয়া হয়।)। কিন্তু ঐ,অন্যের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো হিরোটিকে আমদানি করার জন্য লেখক আমার ধন্যবাদার্হ হলেন।
লেখকদের হাতেই তো এই আকালেও স্বপ্ন দেখানোর ভার থাকে!
“ক্রুডিয়া” – অরুণাভ ঘোষ।
জঙ্গলের আদিম পরিবেশে ফ্যান্টাসি, হরর। গাছের রূপকল্প এ গল্পেও ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু এক্ষেত্রে সেটা কিছুটা আরোপিত লাগল। যদিও অপ্রাকৃত আবহ এবং তার ফলে বহুবিধ সম্ভাবনা ছিল, গল্পটি তুলনায় হতাশ করেছে আমায়।
( এ প্রসঙ্গে না বলে পারছি না। এরকম আদিম পরিবেশে, এবং এরকমই নরনারীর সম্পর্কের জটিলতার সঙ্গে অপ্রাকৃত আবহ নিয়ে লেখা একটা দুর্দান্ত ভালো গল্প পড়েছিলুম গত বছরের বৃশ্চিকে, অদিতি সরকারের লেখা, নাম যদ্দূর মনে হচ্ছে ‘পূর্ণিমা’। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন।)
“আবর্ত” – বিবেক কুণ্ডু।
সংকলনের সম্পাদকের লেখা থেকে আমার প্রত্যাশা স্বভাবতই খুব বেশি ছিল, কারণ সংকলন গড়ে উঠছে তাঁরই ভিশনে। চমৎকার প্লটে, সুখপাঠ্য ভাষার গল্পটি সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছে। এক একবার হ্যারি পটারের অনুষঙ্গ মাথায় এসেছে গল্পটি পড়তে গিয়ে, বিশেষ করে বাসের অংশে।
বইটির বাঁধাই, কাগজ, ছাপা ও ফন্ট রীতিমত ভালো। প্রচ্ছদ মানানসই। প্রতি লেখার শেষে লেখকের কথা থাকাটাও আকর্ষ��ীয় নতুনত্ব। বানান ভুল অথবা ছাপার ভুল আছে কিছু কিছু। (যেমন, পাতা ২৬১, পিশাচীনি)।
-----
বই – নির্বাচিত জঁর ফিকশন
সম্পাদনা – সৌভিক চক্রবর্তী ও বিবেক কুণ্ডু
প্রকাশক – ফেরিওয়ালা
মূল্য – ৩৫০/-
অনলাইনে পাবেন
https://www.boichoi.com/NirbachitaGen... Displaying 1 of 1 review
Can't find what you're looking for?
Get help and learn more about the design.