ছয় ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর কে ছিলেন কোথায়, যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে প্রফেসর সাজিদ এলাহীর খুনের জন্য? পাঁচ তলার বাসিন্দা সাজিদ এলাহীর নিচ তলা গুলোতে বসবাস করা নাসির উদ্দিন, রেনুফা ইয়াসমিন কিংবা মেহেদী আশিক। অথবা নাহিনের বড় ভাই দিদার, বন্ধু দীপ্ত, মিশু, আরিফ। সবাইকেই সন্দেহ করা যায় কোন না কোন ভাবে খুনের জন্য। ডিটেকটিভ অদিত আর তার সহযোগী কায়েসের সন্দেহের বাইরে নেই প্রফেসর সাহেবের মানসিক সমস্যার ডাক্তার রাদিব কিংবা আঁধারে হারিয়ে যাওয়া মৃত নাহিনও।
প্রফেসর সাহেবের মারা যাওয়ার আগের দিন বাসার সামনে মৃত নাহিনকে দেখতে পাওয়া অথবা মিশু কিংবা আরিফের রাতের গলিতে মৃত নাহিনের অবয়ব দেখার মাঝে কি কোন সম্পর্ক আছে? প্রফেসর সাহেবের লাশের পাশে পড়ে থাকা বই, ছুরি, সিগারেটের ফিল্টার কি বলতে চায় কিছু?
সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে কেউ হয়ত জড়িয়ে যাচ্ছে নতুন কোন সমস্যায়, কেউ হয়ত পাচ্ছে ভাবনার বাইরে কিছু। কেউ হয়ত নিজের মনের ছায়ার মায়ায় কায়ার কথা ভুলে বসে আছে। মধ্য বৃত্ত রহস্যের আড়ালে মানসিক সমস্যার উপন্যাস, সে সমস্যায় জড়িয়ে থাকা মানুষ গুলোর উপন্যাস। এ রহস্য, এ মানসিক সমস্যা একটা জটিল অঙ্ক। মধ্য বৃত্ত সে জটিল অঙ্কের সহজ সমাধান।
গল্পের শুরু সাতান্ন বছর বয়সী প্রফেসর সাজিদ এলাহীকে নিয়ে। ছাত্র নাহিনকে ফেল করিয়ে দেন বলে নাহিন আত্মহত্যা করে—বিষয়টি কেন্দ্র করে প্রফেসরের সাথে কথা বলতে যায় নাহিনের বন্ধু দীপ্ত এবং আরিফ। নাহিনের আত্মহত্যার পেছনে প্রফেসরকে দায়ী করে তারা। বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয় দীপ্ত। কিন্তু শেষমেষ জানা যায় এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। মরে গেলেও গ্রামের বাড়ি নেওয়ার পথে নাহিনের লাশ নাকি ট্রাক থেকে পালিয়ে যায়! ভীতসন্ত্রস্ত প্রফেসর সাজিদ এলাহী অতঃপর ডিটেকটিভ অদিতের শরণাপন্ন হন।
এরই মধ্যে এক রাতে প্রফেসর তার বাসার সামনে মৃত নাহিনকে দেখতে পান। ভয়ে কুঁকড়ে যান তিনি। শরণাপন্ন হন মানসিক সমস্যার ডাক্তার রাদিবের। কিন্তু এর পরপরই খুন হন তিনি৷ মৃতদেহের পাশে পড়ে থাকে একটি বই, ছুরি, সিগারেটের ফিল্টার।
সবকিছু খানিক এলোমেলো লাগলেও এক ধরণের যোগসূত্র খুঁজতে চাওয়ার আকুতি তৈরি হবে, যা মেটানোর জন্য অবশ্যই বইটি পড়তে হবে। ডিটেকটিভ অদিত এবং মানসিক সমস্যার ডাক্তার রাদিবের সহযোগিতায় পাঠক রহস্যের জট খুলতে লেগে পড়বেন। কেউ কেউ রহস্যের জট খানিকটা খুলে ফেলেছেন বলে বোধ হবে। কিন্তু শেষমেশ আদৌ পারবেন তো দুই-দুটো ঘটনার একীভূতকরণে চৌকস অবস্থান নিতে?—পাঠকের ওপরই ছাড়া থাকল সেটা।
'মধ্য বৃত্ত' খুবই গতিশীল সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। বইটি 'ডিটেকটিভ' ঘরানার মধ্যেও পড়ে। সব মিলিয়ে এটিকে 'ডিটেকটিভ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার' বলা যায়। গল্পের প্লট, উপাদান, মসৃণ লেখনী বেশ তৃপ্ত করেছে। তবে চরিত্রায়নে আরেকটু কাজ করা যেত বলে মনে হয়েছে। নাহিনের ক্যারেক্টার বিল্ডাপের জায়গাটা আর নাহিনের রহস্যের জট খোলার কায়দাটায় ব্যক্তিগতভাবে অতৃপ্ত কিছুটা।
আমার সবথেকে ভালোলাগার যায়গা ছিল, গল্পের মোটামুটি প্রতিটি চরিত্রই কোনো না কোনোভাবে এমন একটি মারাত্মক দ্বন্দ্বের সম্মুখীন হয়েছে, যার জন্য কেউ-ই প্রস্তুত ছিল না।
বইটির প্রথম প্রকাশ ২০১৮ সালে। সর্বমোট ৩ বার প্রকাশ হলেও বইটিতে টাইপো আছে বেশ কিছু। তিনবার প্রকাশিত হওয়ার পরও এগুলোর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি কেন—কর্তৃপক্ষ-ই ভালো বলতে পারবে।
থ্রিলার প্রেমীদের জন্য 'মধ্য বৃত্ত' অবশ্যপাঠ্য না হলেও অবশ্যই একটি মডারেট বই, কিনে পড়ে দেখার জন্য৷
রেটিং ৩ দিলে কম হয়ে যায়, ৪ দিলে অনেক বেশি হয়ে যায়। মাঝামাঝি বা তার কাছাকাছি রাখতে পারলে জুতসই হয়।