রাষ্ট্র এক তুলনামূলক নতুন ঘটনা পৃথিবীতে কিংবা এই বঙ্গে। বাংলার পুরোনা সমাজে আধুনিক অর্থে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র কায়েম হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ফলে। সমাজের আগাপাছতলা প্রচণ্ড ঝাঁকি দিয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার যবনিকা তুলে নতুন রাষ্ট্র কায়েম হয় জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতিতে, যার মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। কিন্তু গণবিরোধী, কর্তৃত্বপরায়ণ রাজনীতির ঘুরপাকে গত পাঁচ দশকে এই বিপ্লবের মূল প্রতিশ্রুতি পরিণত হতে চলেছে খেলাপি ঋণে। বাংলাদেশকে এখন পেয়েছে ঊনপঞ্চাশ বায়ুর ভূতগ্রস্ততায়, রাষ্ট্র প্রবেশ করেছে এক অনন্ত ক্রাইসিসে, যার উৎক্ষেপ গত দশকের রাজনৈতিক ঘাত-অভিঘাতে প্রকাণ্ড মূর্তি ধরে উপরিতলে ভেসে উঠে আবার বুদবুদের মতো মিলিয়ে গেছে।
মানব জনমে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা কখন হাজির হয়, কে তাহারে চিনতে পারে? কে এসে গো মদিনায় তরিক জানায় এ সংসারে? কী সেই তরিক, সেই বৈপ্লবিক সম্ভাবনা– যা চিরহাজির? একদা লালন ফকির এই প্রশ্ন তুলেছিলেন কুষ্টিয়ায় বসে। অনেকটা একইরকম প্রশ্ন চিন্তায় অনুবাদ করার একটা দম না-ফেলা চেষ্টা থেকেই পারভেজ আলম ‘মদিনা’ নামক বইটি রচনা করেছেন। বইটির অধ্যায়গুলো মদিনা প্যারাডাইম নিয়ে এমন একটি সুসামঞ্জস্য আলোচনা হাজির করে যে এটিকে একটি স্বতন্ত্র সন্দর্ভ হিসেবে পাঠ করা যেতে পারে। জাতি-রাষ্ট্র ও জাতি-পরিচয়ের ব্যাপারে লেখক এমন অনেক প্রশ্ন জাগ্রত করেছেন, যার পূর্ণাঙ্গ রফা তিনি এই দুই মলাটের ভেতর নিবিষ্ট করতে পারেন নাই। সেই সব চোখা প্রশ্নকে পাঠক প্ররোচনা হিসেবে বিবেচনা করবেন।
ইসলামের যে আবির্ভাব আরব্য উপদ্বীপের মক্কা-মদিনায় ঘটেছিল ও পরে সিরিয়া-ইরাক হয়ে ক্রমশ দুনিয়ার নানা প্রান্তে বিস্তার লাভ করেছিল, তার নানা পূর্বাপর ঘটনা থেকে জন্ম নেয় মানবমুক্তি বা পরিত্রাণের নানা ভাবকল্প, যাকে পারভেজ চিহ্নিত করেছেন মাহদিবাদ বলে। এই ধারণার দার্শনিক তাৎপর্য খুঁজতে তিনি ওয়াল্টার বেঞ্জামিন কিংবা জর্জিও আগামবেন – এই দুই পাশ্চাত্য দার্শনিকগণের লেখাজোখা বাংলায় আলোচনা করেছেন, ইবনে সিনার মতো দার্শনিকদের রচনা বিশ্লেষণ করেছেন, স্বদেশের মনীষী ও শিল্পীদেরও পর্যালোচনা থেকে রেহাই দেন নাই।
অপরের মুক্তির সাথে নিজের মুক্তির যে জটিল নফি-এজবাত, তা নিয়ে প্রশ্ন করতে প্ররোচিত হলেই সার্থক হবে এই বইপাঠ, এই দ্বন্দ্বপ্রপীড়িত বঙ্গমুলুকে। নইলে, মিছেই আমাদের পড়াশোনা।
Parvez Alam is a Bangladeshi writer and activist. He uses blog platforms to write on history, religion and politics and also writes for newspapers and magazines. His first book ‘Muslim jogoter gyantattik lorai’ (epoistemological battle in the Muslim world, 2011) is about the history of battle between liberal and conservative thoughts during the rise and fall of Islamic golden age of science and philosophy. His second book Shagbager Rashtroprokolpo’ (State-project of shahbag, 2014) deals with the question of secularism in Bangladesh and provides a historical narrative of Shahbag movement. His third and foruth book ‘Jihad O Khelafoter Silsila’ (Geneology of Jihad and Caliphate,2015) and 'Muslim Duniar Khomota Shomporker Itihash' (History of power-relation in the Muslim world,2016) does historical analysis of some of the political Islamist and jihadist ideas and beliefs that are central to many debates in the contemporary world, and a historical analysis of plurality and diversity in the Muslim world. Parvez recently also wrote an English book titled 'Disappearing Public Spheres' which is a brief history of the rise and decline of internet era public spheres in Bangladesh.
রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব প্রসঙ্গে জর্জিও আগামবেনে, ওয়াল্টার বেনিয়ামিন আর বায়োপলিটিক্স প্রসঙ্গে মিশেল ফুকোর আলাপের বাংলাদেশি-করণ করেছেন পারভেজ আলম। কিছু আলাপের, বিশেষত উপসংহার অংশটুকু সত্যিই চমৎকার। তবে মোটা দাগে আলমের অগোছালো বর্ণনায় আম-পাঠকের পক্ষে তার চিন্তাসূত্র অনুসরণ প্রায়ই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।
৪০০ পেইজের মোটা কাটখোট্টা সন্দর্ভমালা স্বরূপ একটা বই ৩০০ পৃষ্ঠার কাছাকাছি পড়ার পর পাঠক হিসেবে ইস্তফা দিতে হলেও বইয়ের রিভিউ লেখার জন্য নিশ্চয় এটা যথেষ্টই।
বইটি মোটেও সুলিখিত নয়। এত অগোছালো আলোচনা বইটিতে করা হয়েছে যে রিভিউ লিখতে গিয়ে আমি নিজেই বইয়ের কোন জিষ্ট বা নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুু খুজে পাচ্ছিনা যেটা নিয়ে আলোচনা করবো।
সহজভাবে বললে এই বঙ্গে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বইটির আলোচ্য বিষয়গুলো আবর্তিত হয়েছে। আরও সহজ করে বললে মদিনা প্যারডাইম আর মাহাদীবাদের ধারণা নিয়ে বলতে গিয়ে লেখক হিজরত, রোহিঙ্গা, স্বৈরশাসন, নাস্তিক, ভূ-রাজনীতি, ক্রসফায়ার ইত্যাদি বিবিধ বিষয়ের অবতারণা করেছেন।
বেসিক্যালি ওয়াল্টার বেনিয়ামিন ও জর্জ আগামবেন নামক দুই পাশ্চাত্য দার্শনিকের চিন্তাভাবনা দিয়ে লেখক এই অঞ্চলের ধর্ম ও রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। ঘুরেফিরে এই দুই দার্শনিকের কথাই বারবার এসেছে।
বস্তুত আমপাঠকের জন্য দুর্বোধ্য একটি বই। নীটসে, হেগেল পড়া পাঠকের কাছেও সুখপাঠ্য হলোনা। মুলকথা বলতে গিয়ে লেখক কেন বইটি এত দীর্ঘায়িত করলো বোঝা গেলোনা। আর বইয়ের ভাষা মোটেও প্রাঞ্জল নয়। তবে রাজনৈতিক ও ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের অনেক কৌশলী সত্যকথন পাওয়া যাবে যা ধর্মজীবীরা গ্রহণ বর্জন কোনটাই করতে পারবে না।