জীবনের স্রোতে ভাসতে ভাসতে আমরা ভুলে যাই মরণের কথা । কবর পথের যাত্রী হয়েও আমাদের যাবতীয় চিন্তা ও কর্ম আবর্তিত হয় এই তুচ্ছ দুনিয়াকে ঘিরে । সর্বাঙ্গে গাফিলতির চাদর জড়িয়ে আমরা জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার ব্যাপারে কেমন যেন নির্বিকার হয়ে থাকি । আল্লাহ না করুন, এই অপ্রস্তুত অবস্থায়ই যদি চলে আসে মৃত্যুর ডাক—কী করুণ পরিণতিই না হবে আমাদের !প্রখ্যাত ফকিহ ও মুহাদ্দিস ইমাম ইশবিলি রহ. রচিত বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য এক অমূল্য উপহার । শাইখ এখানে পরম মমতায় পাঠককে মৃত্যু ও মৃত্যুপরবর্তী জীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন । তাঁর অনুপম ভাষাভঙ্গী ও সাবলিল উপস্থাপনা যে কারও হৃদয় ছুঁয়ে যাবে । বইটি পড়তে পড়তে মনের অজান্তেই পাঠকের হৃদয়ে জেগে উঠবে মৃত্যুর হিমশীতল অন্ধকারের কথা, কবরের অসীম নির্জনতার কথা, কিয়ামত ও হাশরের ভয়াবহ দৃশ্যগুলোর কথা, মিজান ও পুলসিরাতের অকল্পনীয় আশঙ্কার কথা—যা তাকে আখিরাতের প্রতি মনোযোগী করে তুলবে আর মৃত্যুর প্রতি তার গতানুগতিক বিশ্বাসকে করে তুলবে সত্যিকারের কর্মোদ্দীপক উপলব্ধি।
জীবনের অন্যদিক। অবশ্যম্ভাবী ও অনিবার্য বাস্তবতা। একদিকে করোনার মৃত্যু মিছিল আরেকদিকে আমাদের ভোগ-বিলাসিতা আর দীর্ঘ আশা ও তা নিয়ে সব আয়োজন ও পরিকল্পনা। বইটির বিরাট এক অংশ জুড়ে আলোচনা করা হয়েছে জীবন ও মৃত্যুর বাস্তবতা নিয়ে। জীবনের অস্থায়িত্ব ও অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুর নিশ্চয়তার বিষয়টি বিভিন্ন আঙ্গিকে মনে গেথে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এই অংশে। কারো শক্ত অন্তর বিগলিত করার জন্যে ও হেদায়েতর জন্য এতোটুকুই যথেষ্ট।
এখান থেকেই যে কেউ নেক আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়া ও নাফরমানী থেকে সরে আসার যথেষ্ট অনুপ্রেরণা পেয়ে যাবে ইন শা আল্লাহ। যদি বাস্তবেই এটা তার কাম্য হয়। অন্যথায় হাজার হাজার পৃষ্ঠার অধ্যয়নও অন্তরে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে না। আমরা আল্লাহর কাছে পানাহ চাই। বইটি নিয়ে এর বেশি আলোচনায় যাবো না ইন শা আল্লাহ।
বইয়ের প্রচ্ছদ থেকেই বুঝতে পারছেন এর বিষয়বস্তু। মৃত্যু ও তার পরবর্তী সকল ধাপ নিয়েই বিস্তারিত, সার্থক ও হৃদয়গ্রাহী আলোচনা এসেছে বইটিতে। তো আমার মতো যাদের এসব বিষয় নিয়ে খুব একটা ভালো জানাশোনা নেই তাদের জন্যে এটি একটি ভালো বই প্রমাণিত হবে ইন শা আল্লাহ। কুরআনের আয়াত ও প্রচুর নির্ভরযোগ্য হাদিসগুলোর উপরই মূলত নির্ভর করা হয়েছে বইটিতে। সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। সকল প্রশংসা এই বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর।
ইমাম আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক আল-ইশবিলি রহ.। সম্পূর্ণ নামের শেষের অংশটুকু আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয়, ইশবিলি। যা বর্তমানের স্পেনের সেভিয়া (Seville)। যখন আইবেরিয়ান পেনিনসুলা মুসলমানদের অধীনে ছিলো এরকম হাজার হাজার জ্ঞানী - গুণীদের জন্ম হয়েছিলো তখন।
বইটা আমার জন্য অনেক কাঙ্ক্ষিত এক বই৷ অনেকদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলাম৷ অনুবাদের ভাষাও অত্যন্ত সাবলীল ইসলামী সভ্যতার গৌরবময় সময়ের এরকম সোনা আর বেশী বেশী অনুবাদ করা উচিৎ। আমি খুবই মুগ্ধ আর আচ্ছন্ন হয়ে আছি বইটা পড়ে৷
জন্ম-মৃত্যু-বারজাখ-হাশর-জান্নাত-জাহান্নাম। এর এক অনবদ্য যাত্রা। মুসলিম-অমুসলিম, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী প্রতিটি মানুষকেই এই যাত্রায় সামিল হতেই হবে। হবেই! কিন্তু এরপর?
আল্লাহ তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা ও রাসূলের (সা.) মাধ্যমে তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। আর সেসবই খুঁজে এনে লেখক এক মলাটে সংকলন করেছেন। প্রতিটা বিষয়েই অজস্র রেফারেন্স। আর লেখকের নসীহা।
বইটা পড়ার পর মৃত্যু নিয়ে অন্যভাবে ভাবনা আসছে। ভয়ও লাগছে, আশাও আছে। ভাবুন তো কেমন হবে সে মুহূর্তটি যখন আমরা আমাদের রবকে সরাসরি দেখবো?
- ওপারের জীবনের বাস্তবতা নিয়ে আমরা কতটুকু জ্ঞাত? - ওপারের জীবন নিয়ে কতটুকু ভাবি? সেই ভাবনা অনুসারে কতটুকু প্রস্তুতি গ্রহণ করি? - পূর্বসূরীরা ওপারের জীবন নিয়ে কিভাবে চিন্তা করতেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীদের উপদেশ দিতেন বেশি বেশি করে মৃত্যুকে স্মরণ করতে। ওপারের জীবনের যাত্রা শুরু হয় মৃত্যুর মাধ্যমে। আচ্ছা মৃত্যু কি?
মুতাররিফ বিন আব্দুল্লাহ শিখখির রহঃ বলেন,‘মৃত্যু আরাম-আয়েশে লিপ্ত লোকদের সুখ-আহ্লাদ বিনষ্টকারী। সুতরাং এমন আরাম-আয়েশ তালাশ করো, যাতে কোনো মৃত্যু নেই।’
মৃত্যু হলো মুমিনের মুক্তির দুয়ার।
ইবনে উমর রাদিঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাঃ -এর সাথে আমরা দশজন লোক উপবিষ্ট ছিলাম। সে সময় জনৈক আনসারি প্রশ্ন করলেন,ইয়া রাসুলাল্লাহ,সবচেয়ে বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে? তিনি বললেন,যে বেশি বেশি মৃত্যুকে স্মরণ করে এবং মৃত্যু আসার আগে থেকেই তার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। এরাই হলো প্রকৃত বুদ্ধিমান। দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে তাদের জন্য রয়েছে সম্মান ও মর্যাদা।
এখানে এটা সুস্পষ্ট যে ওপারের যাত্রা নিয়ে আমাদের ধারণা যত স্পষ্ট হবে, ওপারের প্রস্তুতি নেয়া আমাদের জন্য তত সহজ হবে।
ওপারের জীবন নিয়ে ধারণা দিতেই রুহামা পাবলিকেশন এনেছে ইমাম ইশবিলি রহঃ এর “আল আকিবা ফি জিকরিল মাওত” গ্রন্থের অনুবাদ “জীবনের ওপারে”।
কেমন বইটি?: বইতে উঠে এসেছে ,মৃত্যু পরবর্তী জীবনযাত্রার সূচনা, তার বাস্তবতা, বিচার দিবসের বর্ণনা, কিয়ামাত, হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা, পুলসিরাত, রাসুল সাঃ সুপারিশ, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদির বর্ণনা। আরো এসেছে মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিত ব্যক্তির দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা। মৃত্যুর সময়ের বেশ কিছু ঘটনা উল্লেখ করে চেষ্টা করা হয়েছে জীবনের ওপারের ভাবনায় মশগুল হতে।
লেখক যিনি: বইটি রচনা করেছেন ইমাম আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক আল ইলবিশি রহঃ যিনি জন্মগ্রহণ করেন ১১১৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান স্পেন শহরের সেভিলে। হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রের গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারি এই ইমাম মৃত্যুবরণ করেন ১১৮৫ খ্রিষ্টাব্দে।
অনুবাদকের পরিচয়: মুফতি তারেকুজ্জামান হাফিঃ তার অনুবাদ কর্ম, সম্পাদনা, সমসাময়িক বিষয়াদি নিয়ে লিখা রিসালা (প্রবন্ধ), তাহকিকী আলোচনা দিয়ে বেশ সুপরিচিত।তার রচিত প্রসিদ্ধ বইয়ের মাঝে ইসলামের বুনিয়াদি নিয়ে লিখা “ইসলামি জীবনব্যবস্থা, সিরাত নিয়ে লিখা উসওয়াতুন হাসানাহ অন্যতম। তার গবেষণা বইয়ের মাঝে “সহিহ হাদিসের আলোকে হানাফিদের নামাজ” বইটিও বেশ প্রসিদ্ধ।
বই নিয়ে কিছু কথা: সংক্ষিপ্ত পিডিএফ পড়ে একটা বইয়ের আলোচনা,সমালোচনা করা কখোনই সম্ভব না। এতে বেশ কিছু দিক আলোচনায় স্থান পায় না। তার ওপর এটা প্রিভিউ। ৪৪ পৃষ্ঠার পিডিএফ পড়ে যা বুঝলামঃ - সুচিবিন্যাস পছন্দ হয়নি - বইয়ের শুরুর আলোচনা ছিল হৃদয়গ্রাহী। শুরুটা হয়েছে কিছু ছোটছোট গল্পের মাধ্যমে। - বইতে শুধু ওপারের জীবনের আলোচনাই নয়, ওপারের পথযাত্রীর জন্য এপারের মানুষের করণীয়, শেষ পরিনতি ভালো হওয়ার ব্যাপারে উতসাহ ইত্যাদিও উঠে এসেছে।
বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়: মূল বইঃ আল আকিবা ফি জিকরিল মাওত অনুবাদঃ জীবনের ওপারে লেখকঃ ইমাম আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক আল-ইশবিলি রহঃ অনুবাদকঃ মুফতি তারেকুজ্জামান হাফিঃ পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৪০৮ মূল্যঃ ৫৩৪ প্রকাশনীঃ রুহামা পাবলিকেশন