পুস্তকের দুটি অংশ। সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত বৈদিক উপাদান এবং সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার। ঋগ্বেদ পাঠ করলে যে দুই বিবাদমান গোষ্ঠীর বিবাদের চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসে তাদের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকভাবে চিহ্নিত করার প্রয়াস করা হয়েছে প্রথম পর্বে। বেদোক্ত আর্য কারা এবং অসুর বলে কাদের বোঝানো হয়েছে তারও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর্য সংস্কৃতি বলতে যজ্ঞ, অগ্নিবেদি, অশ্ব ও অন্যান্য যে সকল উদাহরণকে আমরা চিহ্নিত করে থাকি তা সিন্ধু সভ্যতায় কোথায় কোথায় পাওয়া গিয়েছে তার বর্ণনাও এই পুস্তকে তুলে ধরা হয়েছে। গঙ্গা - যমুনা দোয়াব অঞ্চলের সেদিনের কৃষিনির্ভর গ্রামীন সভ্যতার সঙ্গে এক তুলনামূলক আলোচনাও করা হয়েছে। জিনগতভাবে R1a ( Y chromosome haplogroup) দিয়ে যে আর্য মানুষদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। দেশে বিদেশে প্রকাশিত 30 টি গবেষণাপত্র এই অধ্যায়ে তুল্যমূল্য বিচার করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব হল সিন্ধু লিপির পাঠোদ্ধার। সিন্ধু লিপির চিহ্নগুলি হল ব্রাহ্মীলিপির পূর্বসূরি। ভারতের বাইরে পৃথিবীর অন্যত্র কোথায় কোথায় এসব চিহ্নের ব্যবহার হয়েছে এবং ভারতে সিন্ধু সভ্যতার কালের পরেও কোথায় কোথায় এ চিহ্ন পাওয়া গেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা এই পর্বে রয়েছে। আধুনিক প্রত্নবিদ কেনোয়ার প্রমাণ করেছেন বাণিজ্যিক কারণে সিন্ধু লিপির চিহ্নগুলির উদ্ভব হয়েছিল। মূলত পণ্যের পরিমাপ ও পরিমান নির্ধারণে এসব চিহ্নের ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তীকালে Acrophony/ Acrology পদ্ধতিতে নানা বর্ণ বা letter এর জন্ম হয়। ক্রমে ব্যক্তির নাম ও পণ্যের পরিমাপ সিল, মৃৎপাত্রাদিতে পাওয়া গেছে। সেভাবেই লিপির পাঠোদ্ধার করে অনেক টেক্সট এর পাঠ তুলে ধরা হয়েছে এই পর্বে।
সময় ও জোয়ারভাটা কারও মুখাপেক্ষী নয় , এ কথা বহু উচ্চারিত। সময়কে একমাত্র বাঁধা পড়তে হয় সাহিত্যিক বা শিল্পীর কাছে কিংবা ঐতিহাসিকের কাছে। নীহাররঞ্জন বাবুর লেখা পড়লে জানতে পারি যে আমাদের নেতৃস্থানীয় ঐতিহাসিকেরা প্রায়শ বলে থাকেন, তাঁদের একমাত্র প্রয়াস হচ্ছে 'to tell the truth, the whole truth and nothing but the truth' - শুনতে খুব ভালো শোনায় সন্দেহ নেই। কিন্তু এই truth কোন 'truth'? 'Truth' কথাটার অর্থ কী? পশ্চিমি বৌদ্ধিক বিচারে 'absolute' বা ধ্রুব 'truth' বলে কিচ্ছু নেই , একমাত্র ভগবান ছাড়া। আর আজকের যুগে তো সব truth-ই আপেক্ষিক truth! সুতরাং ঐতিহাসিক চিন্তার ক্ষেত্রেও truth মাত্রই 'আপেক্ষিক'। আর যদি তাই হয় , তাহলে ইতিহাসের ক্ষেত্রে the whole truth, nothing but the truth এসব কথাও অর্থহীন। আসল কথা, আমাদের ঐতিহাসিকেরা যখন 'truth' বা সত্যের নামে শপথ গ্রহণ করেন তখন তাঁদের চিত্ত ও চেতনায় যে বস্তু বিরাজ করে তার নাম হচ্ছে 'fact' বা যথাযথ তথ্য।
অর্থাৎ একজন ঐতিহাসিক, fact বা তথ্যের কাঠামো, প্রণালী অনুসরণ করে, প্রথাবদ্ধ পদ্ধতিতে তথ্য, গবেষণা ও ভাষার সমন্বয়সাধন করে বিধৃত করেন ইতিহাস।
ইতিহাসের এক মাত্রা 'কাল' অর্থাৎ time। আর এক মাত্রা 'দেশ' অর্থাৎ space। তৃতীয় ও সর্বশেষ মাত্রা অবশ্যই 'পাত্র' অর্থাৎ agent of history বা 'মানুষ'। দেশ ও কাল এক অর্থে নিষ্ক্রিয়। পাত্রই এই ত্রয়ী মধ্যে একমাত্র সক্রিয় জীব। এই পাত্র নামক জীবই সদাক্রিয়ারত দেশের নাট্যমঞ্চে, এবং সে ক্রিয়া স্বতত ঘটমান কালের পেক্ষাপটে। মানুষের এই ক্রিয়ার ফলেই কালের পটপরিবর্তন, এবং এই পটপরিবর্তনই 'ইতিহাস'। এই অর্থে ভারতবর্ষের চলমান মানুষই ভারতবর্ষের ইতিহাসের নায়ক, সে ইতিহাসের রচয়িতা।
কিন্তু ভারতবর্ষের এই মানুষ কারা? কী এদের জন-পরিচয়?
‘আর্য দিগন্তে সিন্ধু সভ্যতা’-র পরে শ্রী রজত পাল যখন দ্বিতীয় বই লিখলেন, পূরণ করার চেষ্টা করলেন ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসকথনের বিগতদিনের বহুবিধ ঘাটতি। আলোচনায় প্রবেশ করার আগে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়-চতুর্থ সহস্রাব্দে উত্তর-পশ্চিম ভারতে এক সুবিশাল তটিনীর কথা দিয়ে আখ্যানের সূচনা হোক পাঠক। হিমালয়ের সিমুর পর্বতের প্লক্ষ প্রস্রবণ ছিল এই নদীর উৎসস্থল। জলপ্রবাহ নির্মল, স্বচ্ছ, পবিত্র। নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠে বৈদিক সভ্যতার প্রধান প্রধান তীর্থক্ষেত্র। এই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হত বৈদিক সারস্বত যজ্ঞ। এই নদীর জলে পিতৃতর্পণ করা ছিল অতি পুণ্যের কর্ম।
সরস্বতী নদী।
ঋকবেদে অবশ্য সরস্বান নামে এক নদী-দেবতার কথা আছ। তাঁরই স্ত্রী-লিঙ্গ কি এই সরস্বতী? যিনি দেবীশ্রেষ্ঠা ও নদীশ্রেষ্ঠা রূপে স্তূত হয়েছেন, ‘অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী।’ সারস্বত সমভূমি ছিল অতি উর্বরা। কৃষিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। এই কারণে সরস্বতী এক সময়ে কৃষিদেবী হিসেবে পূজিত হয়েছেন। আমাদের দেশের মেয়েরা ‘সারস্বত ব্রত’ পালন করতেন উত্তম ফসল প্রাপ্তির আশায়। আবার সরস্বতী আরোগ্য, শুশ্রুষা অর্থাৎ চিকিৎসা শাস্ত্রেরও দেবী। শুক্ল যজুর্বেদে সরস্বতী দেববৈদ্য অশ্বিনীদ্বয়ের স্ত্রী রূপে পরিচিত। ইন্দ্র তাঁর পুত্রসন্তান। একাদশ শতকে রচিত কথাসরিৎসাগর গ্রন্থ থেকে জানা যায় পাটলিপুত্রের নাগরিকরা রুগ্নব্যক্তির চিকিৎসার জন্য যে ঔষধ ব্যবহার করতেন তার নাম ছিল সারস্বত। নদীর সঙ্গে, দেবীর সঙ্গে চিকিৎসাশাস্ত্রের এখনও যোগ লক্ষ করা যায়। পুজোর উপকরণে বাসক ফুল ও যবের শিষ আম্রমুকুল প্রদানে। আয়ুর্বেদে এগুলির ভেষজ মূল্য অপরিসীম।
কাজেই বৈদিকসভ্যতার প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল সরস্বতী নদী। দুই তীরে গড়ে উঠেছিল লতাকুঞ্জে ঘেরা সারস্বত তপোবন। ঋষিরা সেখানে বেদপাঠ করতেন। সূচনা ও সমাপ্তিতে করতেন সরস্বতী নদীর বন্দনা। রচনা করতেন বৈদিক সূক্ত। মহাজাগতিক ভাবরসে পুষ্ট মন্ত্রগাথা। কালক্রমে নদী হয়ে গেলেন বিদ্যার দেবী। বেদের দেবী। এক সময়ে অভিনয়ের দেবী হিসেবেও সরস্বতী পূজিত হতেন। বাৎসায়নের কামশাস্ত্র থেকে জানা যায়,...
কী সুমহান ইতিহাস আমাদের !!
প্রথম খন্ডের মতো রজতবাবুর এই বইটিও দু'টি পর্বে বিভক্ত। প্রথমপর্বের শিরোনাম 'সভ্যতা'। এই পর্বে সর্বমোট আটটি অধ্যায়; যথাক্রমে :-
১. হিমযুগের পরে এক আশ্চর্য সভ্যতার গল্প ২. আর্য কে ? সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা কি আর্য? ৩. সিন্ধু সভ্যতার বৈদিক উপাদান ও ভারতীয় প্রত্নতথ্য ৪. গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ,বেদের সাক্ষ্য ও প্রত্নপ্রমাণ ৫. নৃতাত্বিক আলোচনা ও জিনতত্ত্ব ৬. ধর্মীয় আলোচনা ৭. ঋত ও মায়া ৮. যজ্ঞ এবং যজ্ঞবিরোধী, দুই সংস্কৃতি মিলিয়ে সিন্ধু সভ্যতা
২০০৯ এবং ২০১৮ সালে ডেভিড রাইখ এবং তাঁর টিম দুটি জিনতাত্ত্বিক গবেষণার পেপার প্রকাশ করে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। মূলতঃ এনশিয়েন্ট ডিএনএ নিয়ে তাঁদের গবেষণা।
তাঁরা বললেন, ১৪০০ খৃষ্টপূর্ব নাগাদ R1a প্রজাতির একদল মানুষ ভারতে প্রবেশ করেছিল এবং এই প্রজাতির মানুষই দীর্ঘদিন ভারতীয় উপমহাদেশ নিয়ন্ত্রণ করেছে। মজার কথা হল এঁরা ‘আর্য’ কথাটি উল্লেখ করলেন না বটে তবে আকারে ইঙ্গিতে সেটাই বলে দিলেন।
হরিয়ানার হিসারের কাছে সরস্বতী অববাহিকায় থাকা রাখিগড়হি এলাকায় হরপ্পা সভ্যতার শেষ পর্বের পুরাতাত্ত্বিক নির্দশন ও দু’টি কঙ্কালের সবিস্তার পরীক্ষার ভিত্তিতে গবেষণাপত্র লিখলেন মূলত তিনজন - ১) ডেকান বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ববিদ বসন্ত শিন্দে, ২) বীরবল সাহনি ইনস্টিটিউট অব প্যালিয়োবোটানির গবেষক নীরজ রাই এবং ৩) হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডেভিড রাইখ্। প্রথম সারির আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সেল’-এ গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেল। তা নিয়ে দিল্লিতে সরব হলেন বসন্ত-নীরজেরা। যদিও প্রায় সাথে সাথেই বিরোধী শিবির বললো যে, শুধু একটি প্রত্নস্থলের প্রমাণের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যুক্তিযুক্ত নয়।
পূর্বতন গবেষকদের দাবির সারমর্মটি কী? এটাই যে, শেষ পর্বের হরপ্পা সভ্যতাই হল আদি বৈদিক সভ্যতা।
শিন্দের কথায়, ‘‘ঋক-বৈদিক সভ্যতায় সরস্বতী নদীর নাম পাওয়া যায়। রাখিগড়হি ছাড়াও সরস্বতীর অববাহিকার কতিপয় অঞ্চলে হরপ্পা সভ্যতার বিস্তার ঘটেছিল। বৈদিক সভ্যতায় যে ভাবে অগ্নিকুণ্ডের বর্ণনা রয়েছে, তার প্রমাণ রাখিগড়হি, কালিবঙ্গানের মতো হরপ্পার সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে পাওয়া গিয়েছে। কচ্ছের কাছে সুরকোটডার ধ্বংসাবশেষে মিলেছে ঘোড়ার হাড়। সুতরাং আর্যেরাই প্রথম ঘোড়া নিয়ে আসে, সেই তত্ত্বও ভুল।’’
রজতবাবু এই সিরিজের দ্বিতীয় বইয়ের সুচিমুখে স্বভাবতই এই বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করলেন। জিনতত্ত্ব নিয়ে প্রকাশিত প্রায় ৩০ টি দেশি-বিদেশি গবেষণাপত্র নিয়ে আলোচনা করলেন তিনি।
একদম শুরুতেই লেখক হেমফিল, লুকাস ও কেনেডি (Brian E. Hemphill, John R. Lukacs, K.A.R. Kennedy) নামক তিনজন মার্কিন অ্যানথ্রপলজির প্রফেসরের তিনটি গবেষণাপত্রের কথা বললেন। এঁদের মধ্যে হেমফিল ও কেনেডি Cornell University-র 'Division of Biological Sciences', ও কেনেডি University of Oregon-এর 'Department ofAnthropology' তে অধ্যাপনা করেন। তাঁদের গবেষণার ফিল্ডের টেকনিক্যাল নাম 'bioarchaeology'
এই গবেষক ত্রয়ী, হেমফিল-লুকাস-কেনেডি জানালেন যে তথাকথিত ‘আর্য’ অধ্যূষিত গান্ধার ও ‘অনার্য’ হরপ্পাবাসীদের করোটির মাপ, দাঁতের গড়ন ইত্যাদি নানা বৈশিষ্ট্য তুলনা করে দেখা গিয়েছে যে এই দুই জায়গার অধিবাসীদের মধ্যে অজস্র্র তাৎপর্যময় সাদৃশ্য রয়েছে। ‘আর্য দিগন্তে সিন্ধু সভ্যতা’ বইয়ে রজতবাবু দেখিয়েছিলেন যে ‘আর্য জাতি’ বলে আসলে কিছু হয় না। প্রমাণস্বরূপ নানাবিধ নৃতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উপাত্ত পেশ করেছিলেন তিনি। বর্তমান বইয়ের অভিমুখ কিঞ্চিৎ ভিন্ন।
রাখিগড়হিতে পাওয়া কঙ্কালের জিনগত পরীক্ষা বা ‘জিনোম সিকোয়েন্স’ করা হয়। এই পরীক্ষা হরপ্পা গবেষণার ইতিহাসে প্রথম। রজতবাবু এই বইয়ের মাধ্যমে যে স্পষ্ট বার্তাটি দিতে চেয়েছেন তা হলো এই যে, হরপ্পার জনগোষ্ঠীর মধ্যে মধ্য এশিয়ার কোনও জনগোষ্ঠীর জিন পাওয়া যায়নি।’ প্রজননশাস্ত্র বা জেনেটিকস নিয়ে যে আলোচনার দৃঢ়নিষ্ঠ, অক্ষীণ ধারার সূত্রপাত ঘটেছে, সেটির পক্ষে-বিপক্ষে প্রকাশিত ত্রিশটি গবেষণাপত্রের সারমর্ম নিয়ে রজতবাবু প্রায় ২৫ পাতা আলোচনা করলেন।
তিনি শুরু করলেন রেনফ্রু, স্ফোর্জা, ওপেনহাইমার, থঙ্গরাজ, ফিল্ড ইত্যাদি সমসাময়িক গবেষকদের বক্তব্য দিয়ে। প্রস্তর যুগে আফ্রিকা থেকে পরিযায়ী হয়ে আধুনিক মানুষের ভারতে আগমনের তত্ত্ব থেকে এই কাহিনি শুরু। কিন্তু তারপরে পরিযান দেখা যাচ্ছে না। mDNA অথবা mtDNA [Mitochondrial DNA] হল সেই ডিএনএ যার বৈশিষ্ট্য মায়ের থেকে মেয়েতে প্রবাহিত হয়। ওপেনহাইমার ১৯৯৮ এবং ২০০৪ সালে দুটি বই লিখেছিলেন - ১) Eden in the East: The drowning continent of South Asia ও ২) The Real Eden। এই দুটি বইয়ে ওপেনহাইমার দেখালেন যে সমগ্র ইউরোপের মাতৃজিনের উৎপত্তিস্থল হল ভারত। ২০১০ সালে এই বিষয় নিয়ে উন্নততর গবেষণা করলেন Underhill এবং অন্যান্যরা ।
রজতবাবু এই সবকটি মনোজ্ঞ গবেষণাপত্র cite করে দেখালেন যে পশ্চিম থেকে ভারতে জনপ্রবাহ একেবারেই হয়নি।
আর্য আগমনবাদীরা প্রথমে কিছুদিন ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে রইলেন। কিন্তু বেশিদিনের জন্য নয়। তাঁরা অচিরেই ফিরে এলেন এই তত্ত্ব নিয়ে যে, আর্যরা কেবল পুরুষ এসেছিল। সঙ্গে মহিলা ছিল না। ফলত মাতৃজিনের মাধ্যমে এই তত্ত্ব বোঝাই নাকি যাবে না। কিমাশ্চর্যম্ ! একদল মানুষ জলবায়ু বা অন্য কারণে দেশান্তরে যাচ্ছেন, কিন্তু মহিলারা পুরানো স্থানেই থেকে যাচ্ছেন? পৃথিবীর কোথাও কখনও জন অভিসরণের ক্ষেত্রে যেটা ঘটেনি। আর্যদের ক্ষেত্রে নাকি সেটাই ঘটেছিল? বিশ্বাস করা যায়?
আরও প্রচুর কাউন্টার আর্গুমেন্ট তোলা হলো। বলা হলো নিম্নোক্ত পয়েন্টগুলি: ১) রাখিগড়হি হরপ্পা সভ্যতার অংশ। আর হরপ্পা যুগে বাইরে থেকে কেউ আসেনি। তাই দেখতে হবে হরপ্পা সভ্যতার পরবর্তী সময়ে বাইরের জনগোষ্ঠীর জিনগত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে কি না। পেলে তা খতিয়ে দেখতে হবে। ২) জিনগত যে তথ্য সামনে এসেছে, তা নতুন ধাঁচের প্রমাণ। আগে আলোচনা হয়নি। আগে জিন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে দেখা উচিত, ওই তথ্য কতটা প্রামাণ্য।
তাই সই। এবার গবেষণা শুরু হল পিতৃজিন নিয়ে। আন্ডারহিল ও অন্যান্যরা একটি গবেষণা পত্রে বললেন যে ইউরোপ থেকে জনপ্রবাহের প্রমাণ নেই। বরং ভারতীয় R1a z93 প্রজাতি সিনতস্তায় ২৫০০ খ্রিস্টপূর্ব নাগাদ পাওয়া গেল। অথচ সেই অঞ্চলের নমুনা ভারতে পাওয়া গেল না। স্কলভ (২০১৬) ককেশাসের 'মইকপ' সংস্কৃতিতে ৩৭০০ খ্রিস্টপূর্বে ভারতীয় M52 নমুনা পাওয়ার কথা বললেন।
এইরকম একের পর এক গবেষণাপত্র ধরে ধরে রজতবাবু আলোচনা করলেন। একটিও গবেষণাতে বাইরে থেকে ভারতে আগমনের কোনো প্রমাণ নেই। বরং বিপরীত প্রমাণের সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষ স্বভাবে পরিযায়ী। নানা কারণে এক স্থান থেকে অন্যত্র চলে যায়। পশ্চিম থেকে ভারতে কিছু মানুষ এসে থাকতেই পারেন। কিন্তু সেই কিছু সংখ্যক মানুষ এই উপমহাদেশে ‘আর্য সংস্কৃতি’ গড়ে তুলেছিল, এমনটা কখনই হয় নি। বরং তারা এখানকার সংস্কৃতির সাথে নিজেদের যুক্ত করেছিল। Ancient DNA গবেষণা নিয়ে ডেভিড রাইখের যে মর্মভেদী প্রবন্ধ এল ২০০৯ সালে, তাতে তিনি দুটি জনগোষ্ঠীর কথা বললেন : ১) ASI = Ancestral South Indians, ২) ANI = Ancestral North Indians
সিন্ধুসভ্যতা গড়ে তুলেছিল সেই গোষ্ঠীর মানুষেরা, যারা R1a দের আগমণে দক্ষিণে চলে যায়। অর্থাৎ ঘুরিয়ে সেই ‘আর্য’দের কথাই বলা হল। রজতবাবু এই প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর বইয়ে। যদি তথাকথিত আর্য জনজাতিই হন R1a (Y chromosome Haplo group) তাহলে তাদের সংখ্যা ভারতে কত? দেখা যাচ্ছে সেই সংখ্যা মাত্র ১৭.৫%। যাদের আমরা দ্রাবিড় বলছি, অর্থাৎ ধরে নিচ্ছি সেই দক্ষিণ ভারতীয়দের মধ্যে এই সংখ্যা ২২-২৮%।
আরও কিছু প্রশ্নের মাধ্যমে লেখক বললেন যে, ২০১৮ সালের রাইখের গবেষণাপত্র দিয়ে আদতে কিচ্ছু প্রমাণ হলনা। ‘আর্যজিন’ বলে যে আসলেই কিছুই হয়না। এ তো জোর করে একদল মানুষকে ‘আর্য’ বানাবার চেষ্টা মাত্র। রাখীগড়ি। হরিয়ানার হিসার জেলায় অবস্থিত এই গ্রামে 'প্রি ইন্ডাস ভ্যালী সিভিলাইজেশন' (খ্রিস্টপূর্ব ৬৫০০) আর 'ম্যাচিউর ইন্ডাস ভ্যালী সিভিলাইজেশনের' (খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০) প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া গেল। খনন করা হলো ডেকান ইউনিভার্সিটির বসন্ত শিন্দের নেতৃত্বে। প্রচুর নিদর্শন পাওয়া গেল সেখানে। পাওয়া গেল ৪৬০০ বছর পুরনো ৬১টি কঙ্কাল। সেই কঙ্কালগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা করানো হলো। তাতে ইউরোপীয় বা স্তেপ অঞ্চলের কোনও যোগসূত্র তো পাওয়া গেলই না, উল্টে পাওয়া গেল দক্ষিণ ভারতীয় ট্রেস। উন্মোচিত হলো ইতিহাসের বহু অবগুন্ঠন।
গোদা বাংলায় বলতে গেলে , জিনগত গবেষণার মাধ্যমে দাবি করা হলো যে হরপ্পা সভ্যতার শেষ পর্যায়ে (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০) উপমহাদেশে আর্য তথা বহিরাগতদের কোনও আগমন বা আক্রমণের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জিনগত প্রমাণের সঙ্গেই পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে গবেষকেরা দাবি করলেন যে বৈদিক সভ্যতা আসলে হরপ্পা সভ্যতারই ধারা। শিন্দে সাংবাদিক সম্মেলন করে বললেন - ‘আর্যআগমন তত্ত্ব’ বাতিল হয়ে গিয়েছে'।
এই কথাটি রজতবাবুও বলতে চেয়েছেন তাঁর বইয়ে।বহিরাগত কেউ নন, এই উপমাহাদেশের যা কিছু সবই স্থানীয়দের সৃষ্টি। বিরুদ্ধমত উঠলো আবারও।
ঐতিহাসিকদের একাংশ বললেন যে, অগ্নিকুণ্ড বা অগ্নিপুজো মানেই হরপ্পা সভ্যতা বৈদিক সভ্যতার অংশ, এ কথা মানতে রাজি নোই আমরা। প্রাচীন যুগে বহু সভ্যতাই অগ্নির উপাসক ছিল। হরপ্পা সভ্যতায় ধর্ম কী ছিল, তা জানা যায়নি। তাই বৈদিক সভ্যতার সঙ্গে হিন্দু সভ্যতাকে মিশিয়ে দিয়ে সেটিকে হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে তুলনা করা সত্যের অপলাপ। বলা হলো যে হরপ্পা বিশেষজ্ঞ হিসেবে শিন্দের খ্যাতি থাকলেও, আগের কোনও গবেষণাপত্রেই তিনি বৈদিক সভ্যতার সঙ্গে হরপ্পার তুলনা করেননি। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কেন তা করা হচ্ছে? এ তো ঘোরতর অন্যায়। মহাপাপ!!
এ নিয়ে আমরা প্রচন্ড সন্দিহান! আর আর্যেরা যে বিদেশ থেকে আসেনি, হিন্দুত্ববাদী শিবিরের অনেকেই এই মতকে সমর্থন করে থাকেন। এ তো হিন্দু অ্যাকাডেমিক সন্ত্রাসবাদ। বুঝুন কান্ড। কে করছে কার বিচার !!
আর্যদের কথা রয়েছে আমাদের বৈদিক সাহিত্যে এবং আমাদের হাতে রয়েছে সিন্ধুসভ্যতা। আর উপরোক্ত প্রশ্নের ফক্কিকা যাঁরা উত্থাপন করেছিলেন তাঁরা তো সরস্বতী সভ্যতা সম্পর্কে দু'টি চিরাচরিত বিন্দুতেই অবস্থান করছেন:
১) ঘগ্গর- হাক্রা তীর বরাবর যতগুলো হরপ্পীয় এলাকার অস্তিত্ব প্রতিপন্ন করা হয়, বাস্তবে এলাকা তার চাইতে কম; ও ২) যে কোনও অবস্থাতেই এই ক্ষুদ্র নদী সিন্ধুনদের এক উপনদী মাত্রই ছিল। এই অধুনা শুষ্ক নদীই যে ঋগ্বেদের সেই প্রবল প্রবাহিনী , তা নিয়ে এঁদের সাথে তর্ক করবেন? এঁরা করবেন আমাদের বিচার?
মহাভারত কাল খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০১। মহাভারতের সময়কালে সরস্বতী পুরোপুরি লুপ্ত হয়নি। বলরাম যুদ্ধের সময় সরস্বতী পরিক্রমা করেন (নর্মদা পরিক্রমার মত)! সরস্বতী একটু পরে লুপ্ত হচ্ছে। তবে তার কয়েকটি স্রোতধারা প্রবাহিত হয় ভিন্ন নামে, যে���ন চমসোদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ ও নাগোদ্ভেদ নামে। রবীন্দ্রনাথ যেন সেই নদী সরস্বতীকে স্মরণ করেই লিখেছিলেন, ‘যে নদী মরুপথে হারালো ধারা...’।
এই সরস্বতী নদীতীরে গড়ে উঠেছিল বৈদিক সভ্যতা। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদেরা প্রথমে ঋগ্বেদে উল্লিখিত সপ্তসিন্ধুর মধ্যে সরস্বতীর অস্তিত্বকে কাল্পনিক ধরে নিয়েছিলেন। পরে আবিষ্কৃত হয়, থর মরুভূমি লুপ্ত সরস্বতীর প্রবাহখাত। সরস্বতী বর্তমানে মরুময় হলেও বৈদিক সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে ছিলেন রসময়ী। তাই, ‘সরসবতী’ থেকে সরস্বতী। বৈদিক ঋষিরা নদী সরস্বতীকে প্রাণহীন জলপ্রবাহ হিসেবে দেখেননি। সরস্বতীর প্রবাহে প্রাণ অনুভব করেছিলেন। আজ পৃথিবী জুড়ে পরিবেশ সচেতনতার স্লোগান উঠেছে। অথচ ভেবে অবাক লাগে, খ্রিস্টের জন্মের বহু যুগ আগে থেকেই ভারতভূমির বৈদিক ঋষি-কবিরা পরিবেশ সচেতন ছিলেন। নদীর সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের প্রথম প্রমাণ ধরা রয়েছে ঋগ্বেদেই। এই বেদ ধ্বনিত হওয়ার প্রথম যুগে অর্থাৎ প্রথম মণ্ডলের ৩৪তম সূক্তে বেদের সাতটি নদীকে মায়ের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, অশ্বিদ্বয় দেবতার জন্য সপ্তমাতৃ জল দিয়ে—‘সিন্ধুভিঃ সপ্তমাতৃভিঃ’—হব্য তৈরি হয়েছে। সূক্তটির মন্ত্রদ্রষ্টা বা রচনাকার হলেন ঋষি অঙ্গিরার ছেলে হিরণ্যস্তুপ। দ্বিতীয় মণ্ডলের ৪১ সংখ্যক সূক্তের রচনাকার গ্রিৎসমদ ঋষি। ইনি তাঁর যজ্ঞে নদী সরস্বতীকে প্রথমে ‘অম্বিতমে’ অর্থাৎ মায়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলেছেন। পরে বলেছেন, ‘নদীতমে দেবিতমে সরস্বতী’ (নদী ও দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ)। ঋষি গ্রিৎসমদ সরস্বতী নদীমায়ের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছেন, আমরা সমৃদ্ধহীন রয়েছি, আমাদের সমৃদ্ধিশালী করুন। সরস্বতীর উদ্দেশে সোমরস নিবেদন করে তিনি সন্তান চেয়েছেন। নদীরূপা মা সরস্বতীর কাছে চেয়েছেন অন্ন-জলও। বৈদিক যুগে ভরত নামে গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল। তৃতীয় মণ্ডলের ২৩ সংখ্যক সূক্তের দ্রষ্টা ঋষিরা হলেন ভরতের দুই ছেলে দেবশ্রবা ও দেবরাত। এঁরা অগ্নিদেবের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছেন, অগ্নি যেন দৃষ্যদ্বতী, আপযা ও সরস্বতী নদীতীরের মানুষের ঘরে ধনরূপে দীপ্ত হন। ঋগ্বেদের পুরো ষষ্ঠ মণ্ডলের দ্রষ্টা ঋষি ভরদ্বাজ। এই মণ্ডলের চোদ্দটি মন্ত্রে গাঁথা ৬১ সংখ্যক সূক্তের দেবতা স্বয়ং নদী সরস্বতী। যে সরস্বতী কালের প্রবাহে ভারতের ভূগোল থেকে মুছে গেল, সেই নদী বৈদিক যুগে কী বিপুল পরিমাণ জল নিয়ে সবেগে প্রবাহিত হত, তার প্রমাণ মেলে উক্ত সূক্তের দ্বিতীয় ঋকে। ভরদ্বাজ জানাচ্ছেন, সরস্বতী প্রবল ও বেগবতী হয়ে পর্বতের সানুদেশ ভাঙছেন। নদীদেবী সরস্বতীর ভয়ঙ্করী রূপ দেখে ঋষি বলেছেন, আমরা নিজেদের রক্ষার জন্য স্তুতি ও যজ্ঞে দু’কুলনাশিনী সরস্বতীর পরিচর্যা করছি।
এখানেই শেষ নয়। যে ‘কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে’ শান্ত সরস্বতীকে আমরা দেখি, ঋষি ভরদ্বাজের বয়ানে তিনি সম্পূর্ণ উল্টো। মায়াবী বৃসয়ের ছেলে তথা দেববিরোধীদের দেবী বধ করেছিলেন। সরস্বতী এখানে ‘ঘোরা হিরণ্যবর্তনিঃ’ (সোনার রথে চড়ে ভীষণারূপে শত্রু নিধন করেন)। তাই ঋষি ভরদ্বাজ নদী সরস্বতীর অধিষ্ঠাত্রী দেবী, সরস্বতীর কাছে সংগ্রামে রক্ষা করার প্রার্থনা জানিয়েছেন। এমনকি, নিন্দুকদের হাত থেকে বাঁচার জন্যও সরস্বতীর শরণ নিয়েছেন। নদী সরস্বতীর বন্যায় যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হতে হয় সে জন্য প্রার্থনা জানিয়েছেন, ‘স্ফরীঃ পয়সা মা ন আ ধক’ (বেশি জলে স্ফীত যেন না হন)। রোজকার জীবনে চাওয়া-পাওয়ার সব কথাই নদী সরস্বতীকে বলেছেন ঋষিকবিরা। কারণ, নিছক নদী তো নন, তিনি যে মা। বাপ-মা কারও চিরকাল থাকেন? মহাকালে বিলীন হওয়াই তো ভবিতব্য। কিন্তু তা বলে তাঁদের অস্তিত্ব অস্বীকার করবো এমন কৃতঘ্ন আমরা নই।
তাহলে কি লেখক সিন্ধু সভ্যতাকেই আর্যসভ্যতা বলতে চেয়েছেন? না, লেখক তেমন কিছু বলেননি। তাহলে কী বলেছেন লেখক? বৈদিক সাহিত্য পাঠ করলে দেবতা, অসুর, নাগ, মানব ইত্যাদি বিভিন্ন গোষ্ঠীর কথা যেমন জানা যায় ঠিক তেমনই 'মিশ্রসংস্কৃতি' রয়েছে সিন্ধুসভ্যতায়। যে নিদর্শনগুলিকে আমরা ‘আর্যসংস্কৃতি’-র সাথে যুক্ত করে থাকি সেই অশ্ব, রথ, চাকা, যজ্ঞবেদি সিন্ধু সভ্যতার কোন কোন প্রত্নক্ষেত্রে পাওয়া গিয়েছে তার তালিকা দিয়েছেন লেখক। লোহার ব্যবহার যে সপ্তদশ খ্রিস্টপূর্বের ভারতে শুরু হয়ে গিয়েছিল সেটাও জানিয়েছেন। ‘গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বেদের সাক্ষ্য ও প্রত্নপ্রমাণ’ নামক অধ্যায়ে যুযুধান দুই পক্ষের কথা বিস্তারিত জানিয়েছেন রজতবাবু। ‘যজ্ঞ ও যজ্ঞবিরোধী’ গোষ্ঠী নিয়ে একটি অধ্যায় রয়েছে। রয়েছে নদীর জল নিয়ে লড়াইয়ের কথা। নদীর বাঁধ দেওয়া এবং বিরোধীদের দ্বারা সেই বাঁধ ভেঙ্গে দেওয়ার কথাও রয়েছে। এ যাবৎ মনে করা হত, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদীর মাঝখানে যে উর্বর চন্দ্রাকৃতি অঞ্চল (ফারটাইল ক্রিসেন্ট) ছিল, সেখান থেকেই ইরানিদের মাধ্যমে ভারতে কৃষিকাজ ছড়িয়ে পড়েছিল। রজতবাবু প্রমান করার চেষ্টা করেছেন যে উপমহাদেশের কৃষিকাজ স্থানীয়দেরই দান। বাইরের প্রভাব খুব সামান্য। বরং উপমহাদেশের মানুষেরাই নিজেদের কৃষিজ্ঞানকে পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে দেয়।
বইটির দ্বিতীয়াংশে নিজের মতো করে সিন্ধু লিপির পাঠ করেছেন লেখক। দ্বিতীয়পর্বের শিরোনাম 'সিন্ধু লিপি ও পাঠ'। প্রথম পর্বের মতো এখানেও আটটি অধ্যায়, যথাক্রমে:
১. উলটো পুরাণ - সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের আগে সিন্ধুলিপির হদিস ২. মেহুলা দেশের কথা ৩. স্বচ্ছ দেশ ও স্বচ্ছ ভাষা ৪. সিন্ধুলিপি সব ভারতীয় লিপির পূর্বপুরুষ ৫. পনি তথা বণিক ৬. ওজন ও পরিমাপক ব্যবস্থা ৭. সিন্ধুলিপির উদ্ভব ও কার্যকারিতা ৮. লিপির পাঠন
রজতবাবু মনে করেন ব্রাহ্মীলিপির পূর্বপুরুষ হল সিন্ধুলিপি। ‘অ্যাক্রোলজি’ নামক এক ভাষাতাত্ত্বিক তত্ত্বের সাহায্যে তিনি বহু সিন্ধু চিহ্নের মাননির্ণয় করেছেন। সেই মান বসিয়ে একের পর এক সিল ও অন্যান্য লেখার পাঠোদ্ধার করেছেন। লেখক দেখিয়েছেন যে ভারতের বাইরে এবং ভারতে সিন্ধু সভ্যতার পতনের পরেও সিন্ধু চিহ্নের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। মূলত বাণিজ্যের জন্য এই চিহ্নগুলির উদ্ভব হয়েছিল। সিন্ধুলিপি-উৎকীর্ণ সিলমোহর ও ফলকগুলি বহু লক্ষ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত সভ্যতার জনপদগুলিতে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন উৎপাদন সামগ্রীর বণ্টনব্যবস্থায় প্রামাণ্যতার সূচক হিসেবে ব্যবহার হত। কাজে লাগত প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও। রজতবাবুর মতে সিন্ধু লিপি হল ভারতীয় উপমহাদেশের সব লিপির পূর্বপুরুষ।
প্রথমে সংখ্যাবাচক অর্থ হয়ে চিহ্নগুলি কালের অমোঘ গতিধারায় বর্ণের রূপ ধারণ করেছিল। পরবর্তীকালে পাশাপাশি বসিয়ে নানাবিধ নামবাচক ও পরিমানবাচক শব্দের জন্ম নেয়, সেদিনের বৈদেশিক বাণিজ্যে যা একান্ত জরুরি ছিল। পরিণত সিন্ধু সভ্যতার যুগে উদ্ভব হয়েছিল প্রায় ৪১৯টি চিহ্নের। রজতবাবু ব্রাহ্মী লিপির সঙ্গে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে তেরোটি মূল বর্ণের চিহ্নিতকরণ করেছেন। ব্যঞ্জনের সাথে স্বর যোগ করে এবং যুক্তাক্ষর মিলিয়ে প্রায় ১৫০টি চিহ্নের অর্থ বের করেছেন লেখক। উক্ত ৪১৯টির মধ্যে বেশ কিছু চিহ্নের ব্যবহার, সভ্যতার বিবর্তনের সাথে সাথেই পরিত্যক্ত হয়, এবং বেশ কিছু চিহ্নের স্থানীয় ভ্যারিয়েশন বা রূপবদল ঘটে।
সিন্ধু সিলে 'শিব', 'শিবক', 'লব', 'বল', 'মদ' ইত্যাদি আর্য সংস্কৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেশ কিছু নাম পাওয়া গিয়েছে। সঙ্গে রয়েছে পণ্যের পরিচয় ও পরিমাপের বিবরণ। প্রসঙ্গত সেই সময়কার বিস্তারিত লেখাপত্র (চিঠিপত্র, সরকারি দস্তাবেজ ইত্যাদি) ভিন্ন ভিন্ন উপাদানে লেখা হত। আলেকজান্ডারের সাথে আগত ঐতিহাসিকেরা সিন্ধু অঞ্চলে কাপড়ের উপর লেখার কথা বলেছেন। এছাড়াও লেখা হত ভূর্জপত্রে। সেসব উপাদান নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে সিন্ধু লিপি যে হারিয়ে যায় নি, তার প্রমাণ পরবর্তী সময়ের বহু উদাহরণ তুলে দেখিয়েছেন রজতবাবু। এই লিপিতেই যে একদিন বেদ, উপনিষদও লিপিবদ্ধ হয়েছিল এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই.
ভারতের অতীত কোনওদিনই ভারতের ভবিষ্যৎ হয়ে উঠতে পারেনি। সে কারণেই ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসকে দেখবার ও বুঝবার জন্য যে চিন্তার স্বচ্ছতা ও দৃষ্টির প্রয়োজন তা একটি সুবৃহৎ সময়কাল পর্যন্ত আমরা আয়ত্ত করতে পারিনি। এই নিরিখে রজত বাবুর এই দ্বিতীয় বইটিকে 'আত্মনির্মাণের মহাকাব্য' বলাই যেতে পারে। এই গবেষণা-প্রয়াস সনাতন সভ্যতার মর্মস্থলে অবস্থিত ইতিহাস ও লোকশ্রুতির সমন্বয়ী ধারার আকর সূত্রের সন্ধান দেবে। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসকে তুলে ধরার যে মহৎ প্রয়াস করেছেন লেখক সেই প্রয়াসের অন্তর্গত এই বইটি অবশ্যপাঠ্যই মনে হয়েছে
"No Bronze Age can be traced in India." "The Indo-Aryan movement must have continued for a long time. The guesses of some of the best European scholars place it somewhere between 2400 and 1500 B.C., but they are only guesses, and no near approach to accuracy is possible. Perhaps 2000 B.C. may be taken as a mean date. It is a strange fact that the Vedic Indo-Aryans, the earliest known swarm of immigrants, have stamped an indelible mark on the whole country from the Himalaya to Cape Comorin. Modern Hinduism, however much it may differ from the creed and social usages of the ancient Rishis, undoubtedly has its roots in the institutions and literature of the Vedic Indo-Aryans. Plenty of other strangers have come in since, but none of them, not even the Muslims, have produced effects comparable in magnitude with those resulting from the Indo-Aryan settlements made three or four thousand years ago." (Ancient and Hindu India, being Part I; Oxford at the Clarendon Press, 1920) ভিনসেন্ট স্মিথের লেখা এই ইতিহাস ছিল সেই সময়ে ভারতের অতীত জানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ছাত্রপাঠ্য টেক্সট। এর দু'বছরের মধ্যে কয়েকটি আবিষ্কার এই অধ্যায়গুলোকে তামাদি করে দেয়। ক্রমে স্মিথের সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা-প্রসূত লেখার স্থান হয় আবর্জনার পাত্রে। কিন্তু... ভদ্রলোককে যতই গালি দিন, ভারতের অতীত ইতিহাসের সবচেয়ে রহস্যময় দুটো জিনিসকে তিনি এইটুকুর মধ্যেই ধরে ফেলেছিলেন। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদরো তথা সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা আবিষ্কৃত হওয়ার পর ভারতে ব্রোঞ্জ যুগের সাংঘাতিক সব নিদর্শন পাওয়া তো গেলই। তারই সঙ্গে তিনটি প্রশ্ন প্রবল হয়ে উঠল। সেগুলো হল, ১) এই সভ্যতা কি ভারতীয় ছিল? তাই হয়ে থাকলে তারা কোনোরকম চিহ্ন না রেখে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল কীভাবে? ২) (তথাকথিত) হানাদার বা অভিবাসীদের সংস্কৃতি ভারতীয় জীবন ও চর্যাকে এতটাই প্রভাবিত করল; অথচ তাদের পূর্বসূরিরা কোনো প্রভাবই ফেলল না! এটা কীভাবে সম্ভব? ৩) যদি পরবর্তী অভিবাসীরা এসে এদের ঝাড়েবংশে শেষ না করলেও প্রতিস্থাপিত করে থাকে, তাহলে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বা আচরণগত জিনিসপত্রের আকরে তাদের নিজস্ব দেশের কথা না থেকে শুধু এদেশের কথাই কেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর হিসেবে স্কুল-কলেজের তোতাকাহিনি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের একটি জিনিস শিখিয়ে এসেছিল। গত তিন দশকে সেগুলোকে প্রবলভাবে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। যে-সব গবেষণার ভিত্তিতে সেই ধ্যান-ধারণাগুলোকে নড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারই ভিত্তিতে রচিত হয়েছে এই সুমুদ্রিত, নানা অলংকরণ ও স্কেচে সমৃদ্ধ বইটি। 'গৌরচন্দ্রিকা' ও 'ভূমিকা' অংশের মাধ্যমে লেখক এই বইয়ের প্রেক্ষাপট তথা উদ্দেশ্যটি স্পষ্ট করেছেন। তারপর শুরু হয়েছে মূল আলোচনা। তাতে থেকেছে~ প্রথম পর্ব: সভ্যতা ১. হিমযুগের পরে এক আশ্চর্য সভ্যতার গল্প ২. আর্য কে? সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরা কি আর্য? ৩. সিন্ধু সভ্যতায় বৈদিক উপাদান ও ভারতীয় প্রত্নতথ্য ৪. গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বেদের সাক্ষ্য ও প্রত্নপ্রমাণ ৫. নৃতাত্ত্বিক আলোচনা ও জিনতত্ত্ব ৬. ধর্মীয় আলোচনা ৭. ঋত ও মায়া ৮. যজ্ঞ এবং যজ্ঞবিরোধী— দুই সংস্কৃতি মিলিয়ে সিন্ধু সভ্যতা দ্বিতীয় পর্ব: সিন্ধু লিপি ও পাঠ ১) 'উলট পুরাণ— সিন্ধু সভ্যতা আবিষ্কারের আগে সিন্ধুলিপির হদিস' ২) মেলুহা দেশের কথা ৩) ম্লেচ্ছ দেশ ও ম্লেচ্ছ ভাষা ৪) সিন্ধুলিপি সব ভারতীয় লিপির পূর্বপুরুষ ৫) পণি তথা বণিক ৬) ওজন ও পরিমাপক ব্যবস্থা ৭) সিন্ধুলিপির উদ্ভব ও কার্যকারিতা ৮) লিপির পাঠ শেষে থেকেছে সহায়ক পুস্তক-তালিকা। সহজ ভাষায় বললে, লেখকের প্রতিপাদ্য হল~ প্রথমত, বেদ রচয়িতা তথা অনুসারী সম্প্রদায় আধুনিক আব্রাহামীয় ধর্মের মতো কোনো একটিই বিশেষ আচার বা প্রথা পালন করত না। বরং চিরন্তন ভারতীয় প্রথায় সেই সমাজেও ছিল বহু প্রথা, আচার ও সংস্কার। তারই একাংশ হরপ্পা সভ্যতার আদিপর্বের শহরগুলো প্রতিষ্ঠা করেছিল। পরবর্তীকালে এই সভ্যতার কর্তৃত্ব চলে যায় অন্য এক গোষ্ঠীর হাতে। তাদেরই উদ্যোগে ধ্বংস হয় বিভিন্ন নদীবাঁধ। এর ফলে একদিকে যেমন অববাহিকার দক্ষিণাংশের শহরগুলো বারংবার প্লাবিত হয়, তেমনই পরবর্তীকালে উপনদীর গতিপথ বদলালে জলাভাবে শুষ্ক হয়ে যায় বিস্তীর্ণ প্রান্তর। দ্বিতীয়ত, এই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর একটি অংশই বাণিজ্যিক যোগাযোগ বজায় রাখার জন্য পশ্চিম এশিয়ায় তথা মধ্যপ্রাচ্যে নিজস্ব কিছু আচার নিয়ে যায়— যাদের উলটো অভিমুখে দেখিয়ে ভারতে আগত হানাদারদের তত্ত্বটিকে এতদিন সার ও জল দেওয়া হয়েছিল। তৃতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রেই অ্যাক্রোলজি (চিহ্ন দিয়ে বোঝানো বস্তুটির নামের প্রথম ধ্বনিটি কালক্রমে সেই চিহ্নের সমার্থক হয়ে ওঠা) প্রয়োগ করে সিন্ধুলিপির একটি সম্ভাব্য পাঠ-নির্দেশিকা দাঁড় করানো যায়। ঠিক কীভাবে এই বইটি নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে এগিয়েছে? এতে চার ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে~ (১) বৈদিক সাহিত্যের পাঠ ও ব্যাখ্যা; (২) এর সমান্তরালে ব্যবহৃত হয়েছে সিন্ধু সভ্যতায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে পাওয়া নানা জিনিস; (৩) সাম্প্রতিকতম জিনগত গবেষণা এবং তার বিশ্লেষণ করে পাওয়া তথ্য; (৪) পশ্চিম এশিয়ার এবং ভারতের নানা সময়ের বিভিন্ন লিখিত উপাদানের নমুনা। শেষে প্রশ্ন ওঠে, লেখকের এই অনন্য গবেষণা (যা শুরু হয়েছিল 'আর্য দিগন্তে সিন্ধু সভ্যতা' নামক বৈপ্লবিক কাজটির মাধ্যমে) কি আমাদের কাছে ইতিহাসের কণ্টকময় প্রশ্নগুলোর কোনো মসৃণ উত্তর দিতে পারল? খোলা মনে বইটা পড়ুন। চাড্ডি বনাম মাকুর তত্ত্ব সরিয়ে নিজেই যুক্তি আর তর্ক দিয়ে গল্পগুলো বিচার করুন। তারপর সিদ্ধান্ত নিন, লেখকের দাবি সমর্থনযোগ্য কি না। আমার নিজের লেখকের কাজটি অত্যন্ত সৎ ও সূচিমুখ লেগেছে। শেষ বিচারে তিনি নানা সম্ভাবনারই সন্ধান দিয়েছেন মাত্র। সেই সম্ভাবনার বিচার করতে-করতেই হয়তো একদিন আমরা সত্যিকারের ইতিহাসের সন্ধান পাব— যা থেকে তৈরি হয়েছিল এইসব গল্প, পুরাকথা, আর বিশ্বাস। আর একবার তার নাগাল পেলে? "যতকামাস্তে জুহুমস্তন্নো অস্তু বয়ং সয়াম পতয়োরয়ীণাম্।।" (যা চেয়ে আমাদের এই প্রার্থনা, তা যেন আমরা পাই; আমরা যেন বহু সম্পদের অধিকারী হই) সত্য নামক হিরণ্যগর্ভের সন্ধানে আমাদের এই অন্বেষণ চলতে থাকুক। ইতিমধ্যে এই চমৎকার বইটি উৎসুক পাঠকের আনুকূল্য লাভ করুক— এই শুভেচ্ছা জানাই।
পৃথিবীর কমবেশি সব আবিষ্কৃত প্রাচীন সভ্যতার মধ্যে, সিন্ধু সভ্যতা ঘিরে আবর্তিত ধোঁয়াশা হয়ত বা সবচেয়ে বেশী। ১৭৯৯ সালে যখন মিশরে "রোসেট্টা শিলালিপি" বিশ্বব্যাপী হুলুস্থুল ফেলে দিয়েছে, তখনও ভারত পশ্চিমাদের মতে পিছিয়ে থাকা কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অথচ উপনিবেশযোগ্য বৃহৎ এক উপমহাদেশ। জেমস প্রিন্সেপ তখনও এদেশের ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য ব্রাহ্মী অনুশাসন পাঠোদ্ধার করে "দেবনমপিয় অশোক"-কে আবিষ্কার করেন নি। বুদ্ধদেব তখনও কুহেলিছায়ায় ঘেরা বিষ্ণুর আরেক অবতার মাত্র, জিশু খ্রিস্ট ও হজরত মুহম্মদ তুল্য ঐতিহাসিক চরিত্র নন। 'সিন্ধু' শুধুমাত্র যাযাবরগোষ্ঠী সন্নিবিষ্ট উত্তরভারতের এক নদ।
.
কিন্তু মাত্র একশো বছরে, একে একে আবিষ্কৃত হতে থাকা পুঁথি ও প্রত্নতথ্য- কুজ্ঝটিকা-বিস্তৃত প্রাচীন এক ভারতবর্ষকে তুলে আনল কালকূপ থেকে।
বিপাকে পড়তে হল আপাত ঊর্ধ্বতন বণিকরুপী ইউরোপীয় মনিবদের। নিজেদের প্রাচীনত্ত্ব বজায় রাখতে, নিজেদের সভ্যতার মানদণ্ডের শ্রেষ্ঠত্ত্ব আরোপ করতে, নিজেদের কতৃত্ব কায়েম রাখতে উদ্ভাবিত হল ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্রের : "আর্য আক্রমণ তত্ত্ব"। যা কিছু প্রাচীন বা বৈদিক হিসেবে চিহ্নিত, সবই নাকি সুভ্রাংশ অশ্ববিজড়িত ককেশীয়দের দান। কালের স্রোতে, "ভারতের যা কিছু সভ্য, সবই বহিরাগত", এই হাস্যস্পদ মতবাদ খণ্ডাতে উপস্থিত হল সিন্ধুনদ পাড়ের এক প্রত্নক্ষেত্র। বলা বাহুল্য, মাছ ঢাকতে শাক আনা হল- 'সিন্ধু সভ্যতা প্রাচীন হলেও, আর্যদের দ্বারা পরাজিত, দ্রাবিড় জাতিরই পুর্বপুরুষ' ইত্যাদি ইত্যাদি।
.
এই বইয়ের 'গৌরচন্দ্রিকা' থেকে শুরু করে, দুই পর্বে সম্মিলিত আট-দুগুনে ষোলোটি রত্নাকর অধ্যায়ে প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে লেখক নানাবিধ গবেষণাধৃত উদাহরণ, প্রমাণ ও যুক্তিযুক্ত আলোচনা দ্বারা পাঠকের পাতে তুলে দিয়েছেন বর্তমানের অন্যতম বিতর্কিত বিষয়টি। বইটির সুচিপত্রেই এই বিবিধ বিষয়ের পদার্পণ করেছেন তিনি - ভাষাতত্ব, সংস্কৃতি, জীন ও জাতিতত্ত্ব, নৃবিদ্যা(Anthropology), ধর্মীয়-লৌকিক-শাস্ত্রীয়, প্রত্নতাত্বিক ও ঐতিহাসিক চর্চার teaser পেয়ে যাবেন পাঠক।
দ্বিতীয় পর্বের "সিন্ধু লিপি ও পাঠ" রীতিমত এক revelation.
বইটির প্রতিটি অধ্যায়ের আলোচনা সুসংবদ্ধ ভাবে টীকায়িত, ও কয়েক স্থানে অলংকৃত হয়েছে স্পষ্ট মানচিত্র, প্রত্ন ও লিপিচিত্র দ্বারা । প্রসারিত তথ্য প্রচুর পরিমাণে থাকায় পাঠ অনুধাবন করতে আপনাকে বিরতি নিতেই হবে। এইরকম প্রবন্ধসুলভ পাঠে, সঠিক infodumping কিরূপ কার্যকারী, তা পাঠক নিজেই প্রতি অধ্যায়েশেষে মেপে নিতে পারবেন।
.
"যুগে যুগে মানুষ পরিযায়ী। এদেশে 'শক, হুন, পাঠান, মোঙ্গল' অনেকেই এসেছে। ১৪০০ খ্রি. পূ. নাগাদ একদল লোক আসতেই পারে। তারা কিছু এলাকা দখল করতেই পারে। তবে তারা শকদের মতো বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে ভারতীয় হয়ে উঠেছিল, নাকি পাঠানি-মোগলদের মতন নতুন ধর্ম-সংস্কৃতি এদেশে চালু করেছিল, সেকথা বুঝব কি করে?"
.
বুঝতে চাইলে পড়তে পারেন লেখকের ট্রিলজির এই শেষ খন্ডটি। নির্দিষ্ট জায়গায়, আগের দুই খন্ডের সুচিন্তিত পুনরুল্লেখ আপনাকে বইটির স্বয়ংসম্পূর্ণপাঠে বিঘ্নপ্রাপ্ত করবে না।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আপনি যদি উপরের বিষয়গুলিতে কিছুমাত্র কৌতূহলী, তাহলে আপনার জন্যে কিরূপ অবশ্যপাঠ্য এই বইটি। উল্লেখযোগ্য, আলোচিত অনেক বিষয়ের উপরেই গবেষণা, আলোচনা ও উদ্ধারকার্য এখনও হয়ে চলেছে। জিগস-পাজেল সমাধান হতে এখনও বাকি। কিন্তু জ্ঞানলোকের এই দৌড়ে, আপনাকে অনেক এগিয়ে দিতে পারে এই বইটি।
লেখক, খড়ি প্রকাশনী ও এই বইয়ের সাথে থাকা জড়িত সব সুধীজনদের ধন্যবাদ।