কলকাতায় বসন্ত আসিয়াছে, সঙ্গে এক দুর্নিবার সংবাদ।নর-রাক্ষস আসিয়াছে , একের পর এক হত্যাকান্ড প্রতিটি হত্যাকান্ডের সহিত সে সাজাইয়া রাখিয়াছে নির্দিষ্ট চিহ্নসমূহ। রাখিয়া গিয়াছে এক রক্তাক্ত মহাজাগতিক গতিপথের হদিস।ওদিকে যতীন বাবু পাঠোদ্ধার করিয়াছেন সুশ্রুতের লিপির কিন্তু তিনিও নিরুদ্দেশ বেশ কয়েকদিন যাবৎ। তবে কি তিনিও শিকার নর- রাক্ষসের, নাকি তাঁহার অন্তর্ধানে লুকিয়ে আছে অন্য কোন ষড়যন্ত্র। "মরু নেকড়ের কান্না"র পর হরিপদ আর হরনাথের দ্বিতীয় সত্যান্বেষণ অভিযান - "একটি রক্তিম বসন্ত"।
প্রচুর পরিমাণে ট্রু-ক্রাইম থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা, ইতিহাস, শরদিন্দু'র প্রগাঢ় প্রভাব, কলকাতা, সেই শহরের ইতিহাসে নথিভুক্ত প্রথম সিরিয়াল কিলার... এমন নানা উপাদান নিয়ে গড়ে উঠেছে এই উপন্যাসটি। ইংরেজিতে লন্ডন বা নিউ ইয়র্কের পটভূমিতে লেখা এমন বহু গল্প-উপন্যাস আমরা পড়েছি৷ তবে বাংলায় এ-লেখা, ফিকশনের ক্ষেত্রে, আক্ষরিক অর্থেই অভূতপূর্ব। কিন্তু... ১) ভাষাটা একেবারেই জুতের হয়নি। সাধু ভাষায় লেখা অংশই হোক বা মুখের কথ্য/অকথ্য অংশগুলো— সবই বড়ো কর্কশ লেগেছে। হয়তো কাহিনির নৃশংসতা এবং সামগ্রিক একটা মিথ্যাময় পরিমণ্ডলের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষার জন্য সচেতনভাবে লেখক এমনটা করেছেন। কিন্তু লেখাটা পড়তে ভালো লাগেনি। ২) নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভেও কীভাবে কাহিনিকে গতিশীল রাখতে হয়— তা রনিন বিলক্ষণ জানেন৷ তাঁর 'মরু নেকড়ের কান্না' সম্পূর্ণ ভিন্ন স্থান ও কালের মধ্যে নিপুণভাবে সংযোগরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এবার কাহিনিটি বারবার ধৈর্যচ্যুতির কারণ হয়েছে। ৩) সচরাচর এমন অন্ধকার কাহিনিতে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকে কাহিনির মুখ্য চরিত্র তথা প্রটাগনিস্ট(রা)। এই বইয়ে মানিকজোড়ের একজন তাত্ত্বিক কচকচানিতে নিষ্প্রভ থেকেছে। অন্যজন... থাক, তার কথা বলতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে৷ মোদ্দা কথা, এই দু'জনের প্রতি কোনো আকর্ষণ বা সহানুভূতি অনুভব করিনি বলে আমার বইটা পড়তে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে। রনিন আমার অতি প্রিয় লেখক। কিন্তু তাঁর হরিহর সিরিজের এই বইটি আমাকে দুঃখই দিল।
লেখক বর্তমান কালের হলেও লেখেন সাধু ভাষায়, এবং হরিহর গোয়েন্দাযুগল যেহেতু বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকেই কর্মরত, ভাষাটা বেশ লাগে। যদিও বেশ কয়েক জায়গাতেই কথোপকথনে সাধু-চলিত মিশ্রণ চলে এসেছে। কাহিনীতে রহস্য কম, গোয়েন্দাদের নিজস্ব কৃতিত্বও খুব একটা দেখা যায় না, ঘটনার প্রবাহই বেশি। নন-লিনিয়ার স্টোরিলাইনটা সমস্যা ছিল না, কিন্তু প্রথমদিকে বাঁদরের মত এক ডাল থেকে আরেক ডালে লাফিয়ে বেড়ানোর পর (মোটামুটি উদ্দেশ্যবিহীনভাবেই বলা যায়) হঠাৎ করেই আবার হরিনাথের জবানিতে চলে এসেছে লেখা পুরোটা, সেটাও চোখে লাগে। এই সিরিজের প্রথম বই 'মরু নেকড়ের কান্না'-কে এগিয়ে রাখবো। মনে হচ্ছে সিরিজে আরো বই আসবে। রহস্যের জন্য না হলেও, লেখার টানেই পড়বো সম্ভবত।