যদি অভয় দেন, একটা প্রশ্ন করতাম । ইয়ে মানে, চা-টা খাওয়ার অভ্যাস আছে নাকি? চা কিন্তু খুবই ইনােসেন্ট পানীয়, গাঁজা বা আফিমের মতাে মাদক নয়। তবু যদি অভ্যাস বা ইচ্ছে না থাকে, জোর করব না। চলুন, একটা চায়ের দোকানে বসি কিছুক্ষণ। আমি খেলাম, আপনি বসে বসে মাছি মারলেন! মাইন্ড করলেন জনাব? আপনি নায়িকা রূপা গাঙ্গুলি হলে অভিমান ভাঙাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাতাম, অথচ আপনি হলেন তামিম কিংবা তামান্নাজাতীয় প্রচলিত কোনাে নামের নিতান্ত সাদাসিধে মানুষ; আপনার আবার অভিমান কিসের, অ্যা? কথা হলাে গিয়ে জনাব, আপনি কি এমন কাউকে চেনেন যিনি একটানা ৯ বছর দেশের ৫৮ জেলার ১৫০০ পরিবারে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন? চেনার কথা নয়। কারণ জীবন ব্যয় করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আর সন্তান উৎপাদনের বাসনায়। কোথাকার কোন পাগল-ছাগল মানুষের বাড়িতে বাড়িতে উৎপাত করেছে, এ জেনে আপনি কী করবেন। ১০০পাসের্ন্ট হালাল কথা।
শেষ প্রশ্ন। আপনি কি সেই মানুষটিকে দেখতে চান যিনি নারী-পুরুষনির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষকেই অবিকল নিজের চেহারায় দেখতে পান, মানুষকে পৃথক করেন কেবলমাত্র কণ্ঠস্বরের ভিন্নতায়? এ কী, জুতা ছুড়ে মারলেন যে বড়। ছিঃ, এই আপনার শিক্ষা-দীক্ষার নমুনা! মারাত্মক অশ্লীল কোনাে গালি দিতে পারলে রাগ কমত, তবু ভদ্রভাবেই বলি, আপনি একটি ইতরশ্রেণির খাটাশ; যান মুরগি ধরার ধান্ধা করুন। আমি চললাম চায়ের দোকানে ...
বই পড়া মানে গল্প শোনা নয়। কিছু বই চিন্তাকে জাগ্রত করে, প্রচলিত ভাবনাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। বইটা গল্প নাকি গল্পে বলা চিন্তার স্ফূরণ। জানার তীব্র তৃষ্ণা প্রত্যেক মানুষের আছে। কিন্তু প্রচলিত চিন্তার বাইরে আমরা কয়জন ভাবতে পারি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা আর পারিবারিক শিক্ষার বাইরে আমাদের চিন্তার গন্ডি খুবই ছোট। গুরুজন বলে গেছে, বইয়ের পাতায় মনীষীর বাণী, সামাজিক নিয়ম বলে আমার চোখ বুজে সব মেনে নিই। কখনো চিন্তা বা বিশ্লেষণ করি না।
বইটা গল্প নয় ঠিক আবার গল্পও। আরশাদ নামের এক যুবকের গল্প। সে একসময়কার ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডার ছিল। স্ত্রী, সন্তান, অর্থবিত্ত ফেলে সে সঙ্গী করে নেয় পথকে। কপর্দকহীন অবস্থায় বেরিয়ে পরে পুরো বাংলাদেশ ঘুরার পরিকল্পনা নিয়ে। সারা বাংলাদেশ ঘুরবে আর সম্পূর্ণ অপরিচিত বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করবে। পরে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আবার সেই বাড়ি থেকেই অর্থ নিবে। ঘুরাঘুরি মানে মানুষের সাথে কথা বলা। শেষ পর্যন্ত আরশাদ থিতু হয় মানিকগঞ্জে যেখানে তার সাথে পরিচয় হয় অজন্তা হালদার নামের এক নারীর। তারপরের ঘটনা আরো বিস্তৃত।
মৌনতা ক্লাব কি? এটা একটা চায়ের দোকানের নাম। যেখানে বিভিন্ন স্বাদের চা পাওয়া যায়।চায়ের দোকানে বিচিত্র ধরনের মানুষ আসে, কথা বলে, আড্ডা দেয়।
বইতে তিনটা অধ্যায় আছে। প্রত্যেক অধ্যায় পাঠককে ভাবাবে, চিন্তার উপকরণ দিবে, মানুষের প্রতি আগ্রহ তৈরী হবে।
বইটা পড়ার পর থেকে ভাবছি। আমাদের ভাবনাগুলো আমাদের নয়। আমরা যা দেখি বা যা শুনি সেটা নিয়ে জীবন কেটে যায়। কখনো চিন্তা বা বিশ্লেষণ করি না।
বইতে জীবনানন্দ দাশ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং সাকিব আল হাসানকে নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণ আছে। আমার অসাধারণ লেগেছে।
মৌনতা ক্লাব। এই ব্যাকরণিক ভুল না? ভুল ভেবেই শুরু করি। কিন্তু মাঝে গিয়ে বুঝতে পারি এটা প্রয়োজনের তাগিদেই এই ভুল। কাউন্টার ন্যারেটিভ ব্যাপারটাই আমার অজানা ছিল। গুগল টুগল করে কিছুটা বোঝার চেষ্টা করেছি। পড়ে যখন পড়তে যাই অন্য রকম এক জগতে প্রবেশ করি। মনে হচ্ছিল আরে আমিও তো এমনই ভাবি আর এমন কিছুই পড়তে চাই, এমনকিছু করতে চাই। আরশাদের মতো জীবন থেকে পালিয়ে দূরে কোথাও কিংবা সারা বাংলাদেশে। মানুষের জীবনে এতকিছুর সত্যিই কী দরকার আছে? ক্ষমতার মোহ, ভায়োলেন্স ছেড়ে সবারই কি একটা সময় ইচ্ছে হয় না , সব ছেড়েছুড়ে সাধারণ এক জীবনের? হয় হয়তো। মৌনতা ক্লাব এক চায়ের দোকানের নাম যেখানে আরশাদ বসে জ্ঞানের আলাপ করে। যেসব জ্ঞানের আলাপ প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে পাল্টে দেয়। মানুষের কমন ভাবনাগুলোকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। আরশাদ একটা সময়ে গিয়ে এমন এক পরিস্থিতিতে পড়ে যে সে আর আলাদা করে মানুষ চিহ্নিত করতে পারে না। সবাইকে একই রকম দেখে।
আমাদের পরিচিতি পৃথিবীর যে ধরণ যে ভাবনা তা মৌনতা ক্লাবে ভালোভাবেই দেখানো হয়েছে। ক্ষমতার দ্বন্ধ , লোভ লালসা।
আরশাদ যে জীবন বেছে নিলেন সে জীবনে অজন্তা হালদারের চলে আসাকে আমার কাছে একটা আরশাদের স্ববিরোধী আচরণ মনে হয়। আবার একই সাথে মনে হয় অজন্তা হালদার না এলে মৌনতা ক্লাবও আসত না। আমার কাছে সুখপাঠ্যই লেগেছে।
তবে লেখকের ধারণা তার বই বোঝার মতো পাঠক বাংলাদেশে কম।এমন ধারণা করছেন কি না আমার মনে পড়ছে না , তবে ৪০০-৪৫০ বই চলে কেবল বলেই হয়তো তাঁর এই ধারণা। তবে আমার ধারণা বইয়ের বাজার ব্যবস্থার কারণেই এমন।
তবে লেখকের কথা মিথ্যেও না। এইযে মৌনতা ক্লাব , এটাকে মানুষ পড়তে গেলে প্রথমে ভাবে আরশাদ মনে হয় মনে মনে লেখকই, আবার কেউ বলে এটা তো ফিকশন, তবে লেখক কেন বলছেন যে এটা নন ফিকশন।
আমারও যে শুরুতে ফিকশন মনে হয়নি তা না। পড়েই না পরে বোঝলাম ফিকশন এভাবেও লেখা যায়।
মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়কে আমার কাছে মনে হলো প্রচুর মেধাবী এক লেখক যিনি সত্যিকার অর্থেই একজন লেখক। লেখালেখিতে যাঁর প্রস্তুতি নিয়েই আসা। আশা করছি একদিন সত্যিই তাঁর যোগ্য মূল্যায়ন হবে।
ভাবনার জগতকে এলোমেলো করে দিতে পুরনো বিশ্বাসকে নতুন করে ভাবাতে মৌনতা ক্লাবের তুলনা আপাতত করতে পারছি না।
প্রথম ২০-৩০ পেজ বুঝতে কষ্ট হয়েছে। এরপর একটানা পড়ে যেতে পেরেছি। এখানে মেইনলি আরশাদ নামের সামাজিকভাবে সফল কিন্ত হঠাৎ করে বাউন্ডুলে হয়ে পড়া এক যুবকের পিঠে সওয়ার হয়ে লেখক নিজের জীবনতত্ত্ব হাজির করেছেন। অবশ্য মাঝে দাবী করেছেন আরশাদের জীবনতত্ত্বের সাথে তার নিজের জীবনতত্ত্ব পুরোপুরি মিলবে না। ত্রিধা হঠাৎ করে আলোচনার বাইরে চলে গেল, ফেসবুক পেজ থাকার পরেও পরিবারের কেউ আরশাদের সাথে যোগাযোগ করলো না এগুলো বইটার দুর্বল দিক।
'মৌনতা ক্লাব' নামটা শুনে গুরুতর মনে হলেও এটি ১২ বছর ভবঘুরে জীবন কাটানো একটা মানুষের চায়ের দোকান মাত্র। তবে এখানে চায়ের কাপে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠবে না, কিন্তু আপনাকে ভবঘুরে মানুষটার চিন্তার মাঝে আটকে ফেলা হবে। অবশ্য আপনাকে চায়ের গুরুগম্ভীর গুরুত্বও বোঝানো হবে না, তবে ইরেশনাল থিংকিং এর সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়ানো হবে। এখানে আপনি সিদ্ধান্ত নামক তেলাপোকাকে ধরতে গিয়ে উদ্দেশ্যের উদ্দেশ্যহীতায় ভুগতে পারেন। আবার আইডেন্টিটি ক্রাইসিসের পিচ্ছিলতায় আছাড় খেয়ে ভুলের ভূগোল-পৌরণীতি খুঁজে দেখতে পারেন। অতঃপর নার্সিসিজমের ক্যালকুলাস থেকে ঈর্ষার রোডম্যাপ, নৈতিকতার ধোঁকা থেকে ভক্তি দূষণ এমন কিছু আনঅর্থোডক্স বিষয়ের উপর কিছু বাক্সের বাইরের চিন্তা ও মতামত খুঁজে পাবেন এই বইটিতে। লেখক আপনাকে আপনার পরিচিত কিছু ধারণা ও সমাজের কিছু কনভেনশনকে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখানোর চেষ্টা করবে, যা আপনার মেনে নেয়া কিছু ধারণাকে সামান্য হলেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
এই বইয়ে প্রোটাগনিস্ট লেখকের এই চিন্তাগুলোকে প্রকাশের জন্য একটি প্রেক্ষাপট তৈরি দেবে কেবল, তার জীবনের ঘটনাকে এখানে মূখ্য করে দেখানো হয় নি। ফিকশন হিসেবে বইটি শুরু হবে, নন-ফিকশন হিসেবে এগিয়ে যাবে এবং ফিকশন হিসেবেই শেষ হবে। পরিশেষে বলবো বইটি আপনাকে চিন্তায় আটাকাবে, তার গল্পে নয়...