গসমিটার হাতে নিয়ে জীববিজ্ঞানী নাফিস বাসর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। পৃথিবীর ভূচৌম্বক প্রাবল্যের হঠাৎ ব্যাপক অবনমনের কারণ জানতে ছুটে চলল বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা সংস্থাতে। কিন্তু সেখান থেকে কোন সন্তোষজনক উত্তর মিলল না। এদিকে নাফিসের ইরানি বন্ধু জাবির এক নতুন প্রাণির জীবাশ্ম আবিষ্কার করে ফেলেছে, যা ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কারের চেয়েও যুগান্তকারী আবিষ্কার। সে আবিষ্কার বিবর্তনবাদকে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করতে যাচ্ছে। . অপরদিকে পূর্ব প্রেমিককে সাথে নিয়ে নাফিসের স্ত্রী ফারিন নাফিসকে হত্যার মিশনে নেমেছে। শুধু তারা দুজনে নয় নাফিসকে হত্যা করতে ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন, দূর্ধর্ষ আর গুপ্ত এক গুম বাহিনীও মাঠে নেমেছে। কেন তারা নাফিসকে হত্যা করতে চায়? সবমিলিয়ে পৃথিবীর শান্ত নিবিড় পরিবেশ হঠাৎ এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের বার্তা দিচ্ছে। কী সেই অনাগত ভবিষ্যৎ? নাফিস সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ঘুরে বেড়াচ্ছে পৃথিবীতে প্রাণ জন্ম, বিস্তৃতি আর বিবর্তনের প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বর্তমান কালের পরতে পরতে। . নাফিসের কাছে যখন সে প্রশ্নের উত্তর ধরা দিলো, সে বিষ্ময়ে শিউরে উঠল। এক নিয়মতান্ত্রিক মহাবিপর্যয় পৃথিবীতে আঘাত হানতে চলেছে। সেই সাথে পৃথিবীর এক গোপন ইতিহাস সামনে আসতে চলেছে। সে গুপ্ত ইতিহাস পৃথিবীর সর্বশেষ সিনোজয়িক মহাকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণসত্তা হোমো সেপিয়েন্সদের চিরায়ত ইতিহাসকেই মুছে ফেলতে চাচ্ছে। পৃথিবীর ইতিহাসকে নতুন করে সাজাতে যাচ্ছে। কী সেই পৃথিবীর নিয়মতান্ত্রিক মহাবিপর্যয় আর কী সেই ইতিহাস যা মানুষের চিরায়ত ইতিহাসকে পরিবর্তন করতে যাচ্ছে?
পৃথিবী, প্রাণ-প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহ, বিচিত্র জীববৈচিত্র্যের একমাত্র আবাসস্থল। কিন্তু প্রকৃতি কি স্থিরতা সত্যি পছন্দ করে, নাকি দানবীয় হুংকার ছেড়ে নিজ স্বেচ্ছাচারিতায় ওলোট-পালট করে দেয় স্বাভাবিক ভারসাম্য। এমনই এক অস্বাভাবিক ব্যাপার নজরে পড়ল বিজ্ঞানী নাফিসের, যখন সে পৃথিবীর চৌম্বক প্রাবল্যের ব্যাপক অবনমন খেয়াল করল। স্থানভেদে পৃথিবীর চৌম্বকপ্রাবল্য ০.২৫ থেকে.০.৬৫ গস। কিন্তু বর্তমান মান দেখাচ্ছে ০.০১ গস! এই ঘটনা কি নতুন কোনো ধ্বংসের বার্তা জানান দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নাফিস হারিয়ে গেল পৃথিবীর প্রাণজন্ম, বিস্তৃতি আর বিবর্তনের প্রাগৈতিহাসিক যুগের পরতে পরতে। এক নিয়মতান্ত্রিক বিপর্যয়ের সুর ভেসে এলো, বেরিয়ে এলো এক গুপ্ত ইতিহাস। কী সেই ইতিহাস, যা হোমো সেপিয়েন্সের চিরায়ত ইতিহাসকে পালটে দিবে? আগত মহাপ্রলয় রুখতে পারবে কি নাফিস?
জলতরঙ্গ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত নাজমুল হাসানের 'হোমো সেপিয়েন্স'-কে রহস্য উপন্যাস বলা হলেও খানিকটা সায়েন্স ফ্যান্টাসি এবং তথ্যভিত্তিক থ্রিলারও বলা চলে। গল্পের শুরুটা বেশ চমকপ্রদ ছিল। প্রথম থেকেই আগ্রহ জাগানিয়া ব্যাপার-স্যাপার থাকায় একদম বুঁদ হয়ে পড়ছিলাম। শুরু থেকেই অনুভব করছিলাম–লেখক বেশ কাঠখড় পুড়িয়েছেন গল্প সাজাতে, পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক ইতিহাস এবং এক কোষী প্রাণীর চলন থেকে শুরু করে উন্নত মানব প্রজাতির বিচরণ–সবই অনেক স্টাডি করে গল্পে ব্যবহার করেছেন। সাগর থেকে উঠে আসা এককোষী প্রাণী, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, গণবিলুপ্তি, মহাদেশীয় সঞ্চারণ, জুরাসিক যুগ, বিশ প্রজাতির মানবসদৃশ প্রাণীর আবির্ভাব ও তাদের পরিণতি– একদম শুরু থেকে শেষ অবধির ইতিহাস সংক্ষিপ্ত পরিসরে লেখক দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। ফলে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। তথ্যের ভারে গল্পের প্লট মোটেও ক্লিশে লাগেনি, বরং প্রতিটা তথ্য গল্পের গভীরতা বুঝতে বেশ সাহায্য করেছে। চরিত্রায়ন তেমন গভীর ছিল না, কিন্তু প্লটকেন্দ্রিক থ্রিলার হওয়ায় তা প্রভাব ফেলেনি। বইটা মাঝের দিকে খানিকটা স্লো হয়ে গেলেও শেষের দিকে পুনরায় গতি ফিরে পেয়েছিল। বানান ভুল মোটামুটি ছিল বইয়ে, তবুও আমার তেমন সমস্যা হয়নি। মহাবিপর্যয়ের আগমন, প্রোটাগনিস্টদের সামনে আসা বাঁধা, অন্তিম সমাপ্তি–সবই ছিল বেশ উপভোগ্য। বিশেষ করে সমাপ্তিটা অনন্য ছিল, একটা দারুন মেসেজ লেখক আমাদের দিতে চেয়েছেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণভেদে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুন্দর প্রতিবাদ ছিল শেষটায়।
পরিশেষে, মানবপ্রজাতির পৃথিবীতে আসা এবং সেই আগমনে লুকিয়ে থাকা হোমো সেপিয়েন্সের আচ্ছাদিত ইতিহাস নিয়ে লেখক যে কনসেপ্টে গল্প বুঁনেছেন তা এক কথায় অসাধারণ। ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে ফিকশনের পার্ফেক্ট মিশেলে চমৎকার এক প্লট ছিল, তথ্য ও সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ ছিল পুরোটা। নিঃসন্দেহে প্রথম মৌলিক হিসেবে চমৎকার কাজ করেছেন লেখক, সবাইকে রেকমেণ্ড করব বইটা।
বইঃ হোমো সেপিয়েন্স লেখকঃ নাজমূল হাসান নতুন লেখকের বই। মেলার শুরু থেকেই কেনার ইচ্ছা ছিল বইটা এবং কিনেও ফেলি। ২১৫ পেজের একটা বই, কিন্তু তথ্য দিয়ে ঠাঁসা। কাহিনীর ছলে কিছুটা থ্রিলার টেস্ট দিয়ে সূর্যের উৎপত্তি থেকে শুরু করে কিভাবে পৃথিবী তৈরি হলো, কিভাবে আজকের এই মানবজাতি- সব কিছুই খুব সুন্দর করে লেখা আছে। আমার আগে জানা ছিল না পৃথিবীতে এর আগে ৫টা মহাবিলুপ্তি হয়েছে। ডাইনোসর কিভাবে এসেছে, কিভাবে মারা গেছে, জিরাফ কি, আগে কি ছিলো, বিবর্তন হয়ে এই জিরাফ কিভাবে হয়েছে- সব কিছু আছে। ধর্ম আর বিজ্ঞান যে সাংঘর্ষিক না, এইটাও খুব সুন্দর করে বলে দিয়েছে ২-৩ লাইনে। অনেক ভালো কথা হলো, এইবার দেখা যাক কিছু নেগেটিভ দিক। বইয়ের ৩২ পেজে ফারিন আর তানিশার নাম উল্টা-পাল্টা হয়ে গেছে, একই অবস্থা ৩৬ পেজে নাফিস আর জাবির নামের। কিছু স্থানে শব্দের উপস্থিতি ছিলো না যেমন, "তোর আর তানিশার নাকি ফেসবুকে আপলোড দিয়েছিস" মাঝে 'ছবি' শব্দটা নেই। আর কিছু কিছু বানান ভুল ছিলো। কাহিনীর দিক দিয়ে ফারিনের প্রেম কাহিনীটা আমার কাছে পুরাই খাপছাড়া লেগেছে বইয়ে, সাথে নাফিসে বোনের প্রেম কাহিনীটাও। শেষে এইটার কোন পরিণতি ছিলো না। লেখক বাচ্চা ছেলে, প্রথম বই তার, লেখায় হাত ভালো, আরো একটু ঘষা-মাজা করলে সামনে আগুন বের হবে।