সুকুমার সেন (১৬ জানুয়ারি ১৯০১ - ৩ মার্চ ১৯৯২) ছিলেন একজন ভাষাতাত্ত্বিক ও সাহিত্য বিশারদ। বৈদিক ও ধ্রুপদি সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত, বাংলা, আবেস্তা ও প্রাচীন পারসিক ভাষায় তাঁর বিশেষ বুৎপত্তি ছিল। তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও পুরাণতত্ত্ব আলোচনাতেও তিনি তাঁর বৈদগ্ধের পরিচয় রেখেছিলেন।
ভাষার ইতিবৃত্ত (বাংলা ভাষাতত্ত্বের একটি পূর্ণাঙ্গ আলোচনা) Women's Dialect in Bengali (বাংলা মেয়েলি ভাষা নিয়ে গবেষণামূলক রচনা) বাংলা স্থাননাম (বাংলা স্থাননাম নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ) রামকথার প্রাক-ইতিহাস (রামায়ণ-সংক্রান্ত তুলনামূলক পুরাণতাত্ত্বিক আলোচনা) ভারত-কথার গ্রন্থিমোচন (মহাভারত-সংক্রান্ত তুলনামূলক পুরাণতাত্ত্বিক আলোচনা) ব্রজবুলি সাহিত্যের ইতিহাস বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (৫ট খণ্ডে, সুকুমার সেনের সবচেয়ে বিখ্যাত বই, বাংলা সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক ইতিহাস) বাঙ্গালা সাহিত্যের কথা বাঙ্গালা সাহিত্যে গদ্য বঙ্গভূমিকা (বাংলার আদি-ইতিহাস সংক্রান্ত গ্রন্থ) বাংলা ইসলামি সাহিত্য দিনের পরে দিন যে গেল ( আত্মজীবনীমূলক রচনা )
সুকুমার সেনের বটতলার ছাপা ও ছবি গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্য ও মুদ্রণ ইতিহাসের এক বিরল ও মূল্যবান প্রামাণ্য দলিল। এটি কেবল বটতলার ছাপা গ্রন্থ ও চিত্রের বিবরণ প্রদান করে না; বরং বাংলা সচিত্র বইয়ের উত্স-অনুসন্ধান, প্রাথমিক মুদ্রণপ্রযুক্তির ইতিহাস এবং লোকরুচিনির্ভর সাহিত্যের একটি সমাজ-সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণকে একসূত্রে গাঁথে।
উনিশ শতকের কলকাতায় বটতলা একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী জনসাহিত্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। এখানে উৎপাদিত সাহিত্যে ধর্মকাহিনি, গীতিনাট্য, রোমাঞ্চ ও বীরত্বগাথা-নির্ভর কাহিনির পাশাপাশি চটুলতার এক নিজস্ব শৈলী লক্ষ করা যায়। এই পাঠ্যবস্তুসমূহ কাঠ ও ধাতুখোদাইচিত্রে সমৃদ্ধ হয়ে পাঠকমানসে তীব্র প্রভাব বিস্তার করেছিল। সুকুমার সেন পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণায় প্রতিপাদন করেছেন যে এই সচিত্র উপস্থাপনা বাংলা সাহিত্যে ও মুদ্রণ সংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা সংযোজিত করেছিল—যা কেবল ধর্মীয় বা পাঠ্য বই নয়, বরং গণবিনোদন ও পাঠ-সাংস্কৃতিক মনোভূমিকে চিত্রায়িত করেছিল।
১৮১৬ সালে ফেরিস প্রেস থেকে প্রকাশিত ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর রচিত অন্নদামঙ্গল–কে বাংলা সাহিত্যে প্রথম সচিত্র গ্রন্থ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে ছিল তিনটি কাঠখোদাই ও তিনটি ধাতুখোদাইচিত্র, যেগুলির দুইটির নিচে লেখা ছিল “Engraved by Ramchaund Ray”। পরবর্তী কালে গঙ্গাভক্তিতরঙ্গিণী এবং সঙ্গীততরঙ্গ গ্রন্থেও রামচাঁদ রায়ের চিত্রাঙ্কনের উপস্থিতি লক্ষণীয়। এই ধারাবাহিক দলিলসমূহের মাধ্যমে লেখক বাংলা সচিত্র গ্রন্থের ইতিহাস নির্মাণে এক সুসংহত ভিত্তি স্থাপন করেছেন।
গ্রন্থটির তাৎপর্য শুধুমাত্র ঐতিহাসিক তথ্যউপাত্তে সীমাবদ্ধ নয়। লেখক সুস্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন, কীভাবে তথাকথিত ‘অপসংস্কৃতি’র আড়ালে এক গভীর জনমানস-প্রসুত সাহিত্যচেতনা সক্রিয় ছিল। এই চিত্রাবলি ও সাহিত্যে ভাষা, শ্রেণিচেতনা ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির আন্তঃক্রিয়াকে বোঝা যায়—যেখানে অভিজাত বাঙালি পাঠকের রুচিবোধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং ‘অশ্লীলতা’ ও ‘লোকরুচি’র দ্বৈত সংঘাত প্রকাশিত হয়। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের আধিপত্য এবং আত্মচেতনার উন্মেষের টানাপোড়েন গ্রন্থের বিভিন্ন স্তরে অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ভাষাতত্ত্ব ও ইতিহাসে সুকুমার সেনের স্বাতন্ত্র্য এই গ্রন্থেও প্রতিফলিত। তাঁর লেখনী সংযত, পাণ্ডিত্যসমৃদ্ধ এবং মাঝে মাঝে সূক্ষ্ম কৌতুকপ্রবণতায় আভাসিত, যা পাঠ্যকে একঘেয়ে নয় বরং বোধগম্য ও আকর্ষণীয় করে তোলে—even in long annotations and detailed footnotes.
অতএব, বটতলার ছাপা ও ছবি কেবল গবেষকের জন্য নয়—ইতিহাসানুরাগী, সাহিত্যচর্চাকারী ও বাংলা মুদ্রণ-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে আগ্রহী যে কোনও পাঠকের জন্য অপরিহার্য পাঠ্য। বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত “উচ্চ” ও “নিম্ন” ধারার মধ্যবর্তী বিভাজনকে এই গ্রন্থ যুক্তি, তথ্য ও প্রজ্ঞার আলোকে ভেঙে দেয়।
সংক্ষেপে, এটি এক ‘প্রামাণ্য জীবন্ত দলিল’, যার পৃষ্ঠায় ধ্বনিত হয় উনিশ শতকের ছাপাখানার কালি-ঘামের গন্ধ এবং বটতলার চিত্রসমৃদ্ধ কল্পলোকের হালকা পদধ্বনি।
আমি এই বইয়ের প্রথম পাঠ করেছিলাম নিতান্ত ঝোঁকের বশে , ১৯৯৯ সালে। কিছুই বুঝতে পারিনি বিশেষ। পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, পর্নোগ্রাফির ইতিহাস, বাংলা সমাজের ইতিহাস নিতে গভীরতর পড়াশোনা করার সময় এই বই দ্বিতীয়বার পড়ি, ২০১১ সালে।
এই বই বাংলা ননফিক তথা পপ্যুলার ইতিহাসের নিরিখে একটি অমূল্য রতন।