নরবলি নিয়ে আলোচনা হলেই এই বইটির কথা শুনেছি। আলোচনা শোনার ও দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। শেষ অবধি সৌরভ চক্রবর্তী রচিত 'চন্দ্রহাস' পড়ার পর বইটা পড়তেই হল। বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক বলে টানা পড়ে বইটা শেষও করে ফেলা গেল। তারপর যা মনে হল তা নিম্নবৎ: ১. পুরো বইটি শোনা কথা, অনুমান, ইতিমধ্যেই ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে এমন কথা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে প্রচারিত মিথ্যা এবং হেত্বাভাস নিয়ে গড়ে উঠেছে। ২. এই হেত্বাভাসের খাতিরেই একই কথা প্রায় প্রতিটি অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যাতে শেষমেশ আমরা প্রমেয় আর প্রমাণিত গুলিয়ে ফেলি। ৩. পুরুষের ধর্ষকাম আর নারীর মর্ষকাম প্রীতির যে তত্ত্ব শতবর্ষ আগেই নাকচ হয়ে গেছে, তাকে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে ধর্ষণ -> রক্তক্ষরণ -> পবিত্রতা -> নারীবলি -> নরবলি ~ এমন একটা যুক্তি সাজাতে। ৪. বাইবেল থেকে সংহিতা - সবকিছুর মনগড়া ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। অশ্বমেধ, নরমেধ, পশ্বাচার - সব একাকার করে দেওয়া হয়েছে। 'দেবতার গ্রাস' কবিতাকে তান্ত্রিক আচারের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে! ৫. প্রায় আশি বছর আগের একটি ভিত্তিহীন লেখার ভিত্তিতে সিন্ধুসভ্যতার নব ইতিহাস রচনা করা হয়েছে। মিশর থেকে শুরু করে নিকট প্রাচ্যের সমাজ ও সংস্কৃতিকে জানার জন্য হেরেডোটাসকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ভারতের ইতিহাস ব্যাখ্যা করার জন্য ভিনসেণ্ট স্মিথকে অনুসরণ করা হয়েছে! সব মিলিয়ে ইতিহাসকে বলিই দেওয়া হয়েছে এই বইয়ে। ৬. পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধকে প্রাইমারি সোর্স হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে। লেখক নিজে একটি জায়গায় গিয়ে একটি তথ্য বা তত্ত্বেরও উৎস যাচাই করেননি। এই বই ২০০৮ সালে লেখা। তা সত্বেও লেখক অনলাইনে বা কনসুলেট লাইব্রেরি থেকে জার্নাল অফ অ্যানথ্রপলজিক্যাল রিসার্চ-এর কোনো সংখ্যা পড়ে এই বইয়ের রাশিকৃত তথ্য ও তত্ত্বের সত্যাসত্য যাচাইয়ের প্রয়োজনটুকু বোধ করেননি। ৭. বলির মাধ্যমে সমাজে ভীতিসঞ্চার ও শাসনের প্রতিষ্ঠার যে যৌক্তিক মডেলের অজস্র প্রমাণ ইতিহাসে বর্তমান, সেটার দিকে দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজনও বোধ করেননি লেখক।
একদা শশিভূষণ দাশগুপ্ত থেকে বিনয় ঘোষ অবধি বহু সারস্বত সাধক ক্ষেত্রসমীক্ষা ও অধীত জ্ঞানের সমন্বয়ে লেখা বই দিয়ে আমাদের মতো সাধারণ পাঠককেও সঞ্জীবিত রাখতেন। সেই ঘরানা শেষ হয়ে এখন চলছে এমন 'চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য' টাইপের মিথ্যা ও ভুলে পরিপূর্ণ বই। বোঝাই যাচ্ছে, এখানেও অচ্ছে দিন এসেই গেছে! এই বই পড়বেন কি না, সেটা একান্তই আপনার সিদ্ধান্ত। আমি এটা পুরোনো খবরের কাগজের সঙ্গে বেচে দেব বলে ঠিক করেছি।
বইটি অনেক আগ্রহ নিয়ে শুরু করেছিলাম। কারণ বইটি এমন একটি টপিকের উপর লেখা হয়েছে যেটা মানব সভ্যতার ইতিহাসের সাক্ষী বলা যায়। এখানে মানুষের সভ্যতার এক ইতিহাসের কালো অধ্যায় উল্লেখিত করা হয়েছে। . তো বইটির শুরুতেই বেশ কিছু চকমপ্রদ তথ্য দেয়া হয়েছে। বলা যায় শুরু দিকেই লেখক নরবলির বেশ কিছু ঘটনা ও তার বিবরন দিয়েছেন। নরবিল কোথায় কেমন ছিল, কোন জাতি কিভাবে নরবলি দিত। তাদের মধ্যে কিসের ভিত্তিতে নরবলি দেয়া হতো তিনি বেশ ভালো ভাবেই উল্লেখ করেছেন। . কিন্তু বইটির ভেতরে প্রবেশ যতই করা হয়েছে একই কথা বার বার ঘুরে ফিরে লেখা হয়েছে। এক অধ্যায়ে যেটা ছোট করে বর্ণনা করা হয়েছে সেটা অন্য অধ্যায়ে বড় করে লেখা হয়েছে। যা বেশ বিরক্তিকর। . তবুও গবেষণা মুলক বই হিসেবে বেশ দারূণ বই। অনেক তথ্য রয়েছে। ছোট ছোট করে সেই তথ্য গুলো আপনাকে অবাক করে দেবে। . তবে বইটি সবার জন্য নয়। কারণ এই ইতিহাস আড়ালেই থাকাই শ্রেয়।
সৌরভ চক্রবর্তীর চন্দ্রহাস পড়ে এই বইটির কথা জানতে পারি। ২০২১ বইমেলায় কেনা এটি প্রথম বই। পড়ে যৎপরোনাস্তি হতাশ হলাম। কারনগুলো পর্যায়ক্রমে বলছি- ১. অজস্র বানান ভুল ২. অহেতুক একই প্রসঙ্গের অবতারনা ৩. লেখার বাঁধুনির অভাব। ভীষণভাবে unstructured লেখনশৈলী ৪. হেত্বাভাষ নির্ভর লেখা ৫. আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন ছিল ৪. মৌলিক চিন্তার অভাব অনুভূত হল। মোটের ওপর ভালো লাগেনি। গিন্নির ৩৫০ টাকা জলে গেল!