খুবই সাধারণ বা তুচ্ছ ঘটনাকেও যে ছোটগল্প করে তোলা যায়, এ বইয়ের প্রতিটি গল্পে তারই স্বাক্ষর রেখেছেন আমাদের পুরোধা কথাসাহিত্যিক শওকত আলী। মুক্তিযুদ্ধের যে কয়টি গল্প এ বইয়ে আছে, লেখকের গভীর অন্তদৃর্ষ্টির গুণে সেগুলো হয়ে উঠেছে ধ্রুপদি চরিত্রের। অন্যান্য গল্পে সমাজের নানা শ্রেণির নরনারীর দৈনন্দিন চাওয়া-পাওয়া, আশা-নিরাশা, প্রেম-ভালোবাসা ও তাদের স্মৃতিমেদুরতা পাঠককে আকর্ষণ করবে।
Shawkat Ali (Bangla: শওকত আলী) is a major contemporary writer of Bangladesh, and has been contributing to Bangla fiction for the last four decades. Both in novels and short stories he has established his place with much glory. His fiction touches every sphere of life of mass people of Bangladesh. He prefers to deal with history, specially the liberation war in 1971. He was honored with Bangla Academy Award in 1968 and Ekushey Padak in 1990.
যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে লিখিত যুদ্ধ পরবর্তী সময় নিয়ে লেখা গল্পগুলো ভালো। পরেরদিকের গল্প টানলো না তেমন। বৃদ্ধ বয়সের সমস্যা ও মানবীয় চাহিদা, বিবাহবিচ্ছেদ ও সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের দোটানা নিয়ে কিছু গল্প আছে ; এ ধরনের গল্প পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা অনেক লিখেছেন (বছরের শুরুতেই পড়েছিলাম সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্প), তাই গল্প খারাপ না হলেও নতুনত্ব পেলাম না।
বইঃ সাক্ষাৎ আর মার্জনার গল্প লেখকঃ শওকত আলী প্রকাশনীঃ প্রথমা পৃষ্টাঃ ১২৭
শওকত আলী একজন শক্তিমান কথা সাহিত্যিক হিসাবে পাঠক মহলে বেশ সুপরিচিত মুখ। কীর্তিমান কে পরিচয় করিয়ে দিতে হয় না নতুন করে৷ জীবন আমার মনের মত হবে না কখনও৷ জীবন বলে যায় তার আপনধারার গল্প। সেই গল্প রসেই ডুবতেই পড়তে হবে সাক্ষাৎ আর মার্জনার গল্প। এই গ্রন্থে জায়গা করে নিয়েছে শওকত আলীর অপ্রকাশিত ১১টি গল্প। যেগুলো ১৯৭৩ থেকে ২০০৭ সময়ের পরিসরে লেখা৷ এখানে এসেছে যেমন মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষাপট তেমনেই প্রেম-ভালোবাসা, যাপিত জীবনের টানা পোড়েন, আশা নিরাশা৷ খুব অল্প করে প্রতিটা গল্পের ব্যাপারে কিছু না বললেই নয়৷
নিঃশব্দ আয়ুধ
একজন মুক্তিযোদ্ধার জীবনের টানাপোড়েন নিয়ে মূলত এই গল্পের শুরু৷ সময়ের স্রোতে দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ একজন যোদ্ধার ও লোভের কাছে হার মানতে হয়৷ আঁধারের মাঝে আলোর নিবাস। সেই আঁধারে ডুব দিয়েও আত্মার মাঝে বেঁচে থাকে আলোকিত এক মানুষ৷ সেই মানুষের খোঁজ হায়দারের কি ছিল? লেখক শুধু একজন হায়দারের জীবন দেখাতে চাননি৷ দেখাতে চেয়েছেন মানুষ জীবনের আঁধার অংশের গল্প।
মনি হারেনি
মুক্তিযুদ্ধ এ জাতির ইতিহাসের এক বড় অংশ জুড়ে রয়েছে৷ "মনি হারেনি" সেই যুদ্ধের আত্মত্যাগের গল্পই যেন বলে যায়৷ বুলেটের গুলিতে উঠবে শহীদের নাম৷ তবু হারবে না তারা৷ এই রকম অসংখ্য বীর সেনানির আত্মত্যাগের মাধ্যমেই স্বাধীন হয়েছে এই দেশ৷ যুদ্ধ মানুষের মন কে কঠিন করে দেয়, চায় আত্মত্যাগ৷ এই রকম অসংখ্য আত্মত্যাগের গল্পের মেটাফোর যেন "মনি হারেনি"৷ মনিরা কখনও হারতে পারে না৷
পারাপার
জীবন মাঝে মাঝে নিষ্ঠুর, বড় বাস্তব৷ এইটা কোন সেলুলয়েড সিনেমা নয়৷ সব কিছু হারিয়ে আগে বাড়তে হয়, পারি দিতে হয় খেয়া৷ এ খেয়া পারি দিতে গিয়ে মাঝে মাঝে মানুষের হৃদয় পাষান হয়ে যায়৷ শত ঝড় তাকে টলাতে পারে না৷ মৃত্যুর দূতের সাথে চলে জীবনবোধের আয়োজন৷ হুজুরালি মাঝির জীবনের গদ্যটা যেন এমনই৷ সত্তরের ঝড়, একাত্তর তার জীবনবোধ কে নিস্তব্ধ করে দিয়েছে, জন্ম দিয়েছে জীবনের প্রতি এক নিয়তির ক্রোধ।
পরিচয়
জীবনের দোটানায় পরিচিত মানুষও হারিয়ে যায় অপরিচিত ভুবনে। হঠাৎ চলার পথে আবার দেখা হলে ভাবি এই মানুষ কি আমার বড় আপন ছিল৷ পরিচয় গল্পটির পেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের কথা এসেছিল, এসেছিল দুইটি মানুষের সম্পর্কের টানাপোড়েন এর কথা৷ যুদ্ধের ঠিক ২৭ বছর পর আবার মুখোমুখি নীলু ও সাহেদ৷ নীলু কে ক্ষমা করবে নাকি সে ক্ষমায় মিশ্রিত থাকবে করণা৷ জানতে হলে পড়তে হবে গল্পটি৷
বিকেলের আলাপ
বিকেলের আলাপ এক চমৎকার জীবনবোধের গল্প। নীলা ও আবিদ দুজন কে ঘিরে গল্পটি এগিয়েছে৷ মানুষ যখন মন থেকে বিশ্বাস করে পরিবর্তন আসবেই সে পরিবর্তনের জন্য দিনরাত সে স্বপ্নের চাষ করে যায়৷ হয়তো সময়ের বির্বতনে সেই স্বপ্ন চুপসে যায় কিন্তু এরপর স্বপ্ন দেখতে বাধা কোথায়৷ তবে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে আত্মত্যাগের গল্পটি কেউ দেখে না৷ কারও আত্মত্যাগ তাকে সুইচ্চ পাহাড়ের উচ্চতায় নিয়ে গেলেও কারও আত্মত্যাগ পূর্ণতা পায় না৷ আবিদের আত্মত্যাগটিও পূর্ণতা পায়নি। সেই পূর্ণতা না পাওয়ার গল্পে আবিদ নিজের ভিতরেই গুটিয়ে যায়৷ এরপরও তার চোখে ঘোর লেগে থাকে৷ বিপ্লবী আত্মা কি এমন হয়। হয়তো তার দর্শণ কে পরের প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে নতুন করে বিপ্লবের সেচ করতে চায়৷ তারও জীবনে প্রেম ভালোবাসা ছিল৷ সেই ভালোবাসাটি বিপ্পবের আড়ালে হারিয়ে গেল। নীলার জীবনটাও কেটে গেল দ্বিধা-দ্বন্দ্বের দোটানায়। আবার দেখা কত বছর পর দুটি মানুষের। তাদের মনে কি অভিমান ছিল, ক্রোধ ছিল, ছিল অনুযোগ?
সেই ফেরা
জীবনের গদ্যময় বাস্তবতা যেন এই গল্পের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করেছেন লেখক। রুঢ় বাস্তব ও ফেলে আসা সময় কখন পরিবর্তন করা যায় না৷ জীবন নামক গল্পের ছোট্ট একটা প্রতিচ্ছবি যেন দেখা যায় এই গল্পে৷ অনেক কিছু চাইলেই পরিবর্তন হয় না৷ সেই ফেরা হয়তো তেমনেই চাওয়া ও না পাওয়ার আকাংখার গল্প৷
ভিখারি না ভূত, নাকি অন্য কেউ
অদ্ভূত এক গল্প৷ মিশ্র প্রতিক্রিয়া এই গল্পের ব্যাপারে৷ একাকি মানুষের গল্প বলার চেষ্টা করেছেন লেখক৷ তবে গল্পের টোনটা ধরতে পারেনি। একাকিত্ব কি নিজের মাঝেই অতীতের ছায়া তৈরি করে নাকি নিছক গল্প বলার জন্যই গল্প বলা৷
কেনাবেচার বৃত্তান্ত
পুরো গল্প গ্রন্থের ভিতরে এই গল্পটি সব থেকে ভাল লেগেছে৷ কি অপূর্ব জীবন বোধের ঘোরে বর্ষীয়ান লেখক আমায় নিয়ে গেলেন৷ মুক্তযুদ্ধের গণ-ধর্ষিতার আত্মচিৎকার যেন ফুটে উঠেছিল দূর্গা বুড়ির কন্ঠে৷ দিন শেষে কিছু জিনিষ যায় কি বেচা৷ স্মৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণ যে চিনাবে আগামী প্রজন্ম কে আমার এই দেশ৷ এক কথায় চমৎকার লেগেছে এই গল্পটি৷
দুর্নিবার ডাক
কিছু স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে মানুষ ফিরে যায় সোনালী সময়ে৷ সে সময় পাড়ি দিয়েই ধীরে ধীরে ধাবিত হতে হয় বার্ধক্যে। তবুও অতীতের সেই দুর্নিবার ডাকে সাড়া না দিয়ে কি থাকা যায়৷ ভাষা আন্দোলন কে কেন্দ্র করে খুব সুন্দর একটি গল্প দুর্নিবার ডাক৷
সাক্ষাৎ আর মার্জনার গল্প
এইটি সংকলনের প্রধান গল্প৷ আমি মুগ্ধ হয়েছি পড়ে৷ শওকত আলীর লেখায় জাদু আছে৷ এত চমৎকার ভাবে জীবনবোধের গল্প গুলো তুলে ধরেন ভাবতে হয় বারংবার৷ এই গল্পটিও সে রকম৷ জীবনের চলার পথে কত প্রিয় মানুষ হারিয়ে যায়৷ আমরা ভুলে যাই তাদের জীবন নামক বহমান নদীর স্রোতে৷ কিন্তু জীবনের জোয়ার শেষে যখন আসে ভাটা তখন স্মৃতি গুলো কুড়েকুড়ে খায়৷ স্মৃতি রোমন্থন করতে ফিরে আসে মানুষ তার প্রিয় সব জায়গায়, তার অতীতে যেখানে সুখের স্মৃতি, তিক্ত অভিজ্ঞতা সমন্বয়ে জীবনের খেয়া পাড়ি দিয়েছিল৷ সাক্ষাৎ ও মার্জনার গল্প সেই রকম জীবনবোধের গল্প৷ দুই বন্ধুর গল্প গল্প শেষে বার বার মনে হবে সত্যি কি জহির আলী ক্ষমা করতে পেরেছিলেন৷ নাজিম হাসান কি তার আত্মগ্লানির জায়গা থেকে বের হতে পেরেছিলেন৷
নিরালম্ব এক মন
১১টি গল্পের মধ্যে এইটি শেষ গল্প৷ শেষ হয়েও যেন রেশ থেকে যায়৷ ভাবায় নতুন করে৷ জীবনের প্রয়োজনে মানুষ একা থাকতে পারে না কিন্তু মেনে নিতে হয়। যখন জীবনের শেষে এসে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলে সমাজের চোখে হয়ে দাঁড়ায় চক্ষুশূল৷ ফিসফাস কত গুঞ্জন চলে বাতাসে৷ সেই সম্পর্ক গুলো কে স্বাভাবিক ভাবে দেখতে পারে না সমাজ। এই সমাজ ব্যবস্থার শেকল কি একদিন ভাঙ্গবে? মেনে নিতে পারবে দুইজন পৌঢ়ার বন্ধুত্বের সম্পর্ক৷
���ক কথায় প্রতিটি গল্প চমৎকার লেগেছে আমার কাছে৷ শওকত ওসমান ও শওকত আলীর মাঝে সব সময় আমার গণ্ডগোল লেগে যেত বিধায় এই শক্তিমান লেখকের লেখা কোন দিন পড়া হয়নি৷ "সাক্ষাৎ ও মার্জনার গল্প" লেখকের পড়া আমার প্রথম বই৷ এই বই আমায় আগ্রহী করে তুলেছে লেখকের পুরান লেখনীর ব্যাপারে৷ আশা করি পাঠকের কাছে গল্প গ্রন্থটি সুখ পাঠ্য হবে৷