বাংলা ভাষায় হিমালয় পর্বত কিংবা এভারেস্ট শৃঙ্গ নিয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচিত হয়েছে বটে, কিন্তু সেসব নিছক ভ্রমণ কাহিনিই থেকে গেছে এবং গ্রন্থকাররা নিজেদেরকে মহান বানাবার অর্থহীন চেষ্টা করেছেন । মুনতাসির মামুন ইমরান বাংলা ভাষায় এই প্রথম বিজ্ঞানমনস্ক, ইতিহাস নির্ভর তথ্যবহুল গ্রন্থ লিখলেন । তার বর্ণনা ভঙ্গি অত্যন্ত সাবলীল । গ্রন্থে তিনি নিজের কথা প্রাসঙ্গিকতার বাইরে কখনো তুলে ধরেননি । অতীশ দীপঙ্করের মতো বাংলার উজ্জ্বল নক্ষত্র থেকে শুরু করে শেরপা তেনজিং কিংবা হিলারি , অগণিত পর্বতারোহীদের উদ্যম সাফল্য ব্যর্থতা স্মৃতিচিহ্ন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সংস্কৃতি সরলতা ও দেড়শতাধিক বছরের বাদানুবাদ, এভারেস্ট নামকরণ, উচ্চতা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে প্রকৃত সত্যকে দাঁড় করাতে চেয়েছেন, পেরেছেনও । পাঠকের জন্য এ এক বিরাট প্রাপ্তি ।
এমন বিশালত্বের কাছে পরাজয়ও গৌরবের, সুউচ্চ আর ভয়ংকর সুন্দর এভারেস্টকে দেখে উপলব্ধি হয় সেরকমই। কি বলা যায় এই বইকে? উপলব্ধির লগবুক, নাকি ইতিহাস, নাকি ভ্রমণ, নাকি সবগুলোই? ভ্রমণ বা অভিযান-কাহিনী মানেই যেনো 'আমি এই করলাম, আমি সেই করলাম' জাতীয় কথামালা, যার ভীড়ে আসলে হারিয়ে যায় মূল জিনিসটাই। কিন্তু এই বইয়ে এভারেস্টকে খুঁজে পাওয়া গেলো পূর্ণ-মহিমায়, সগৌরবে। পর্বতকে আসলে কখনো জয় করা যায়না, তাকে শ্রদ্ধা করাটাই সেখানে সব।
শেষ করছি আমার প্রিয় কয়েকটি লাইন দিয়ে...... মানুষ কেন পাহাড়ে আসে কিংবা ওঠে? এই প্রশ্নটা সবার মনেই একবার না একবার দানা বাঁধেই। কেনই বা মানুষ এত কষ্ট সহ্য করে পর্বতারােহণ করে? শুধুই কি শিখর আরোহনের জন্য? কাড়ি কাড়ি টাকা, জীবনের মায়া সবই তাচ্ছিল্য করে একচিলতে ভূমির উপর দাঁড়ানোর তাড়নাই কি সব?
বোধ হয় না।
হিমালয়ের এত উপরে এসে, শ্বাস প্রশ্বাসের সময় যখন ফসফস শব্দ হচ্ছিল, বাতাসগুলো কেটে বসছিল লোমকূপে তখন কেন জানি আমার মনে হলো মানুষ এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এখানে আসে শুধু তার নিজেকে বােঝার জন্য। নিজেকে জানার এর চেয়ে বড় সুযােগ আর কখনো হয় বলে মনে হয় না। এ উচ্চতায় মানুষ এক প্রতিযােগিতায় লিপ্ত হয়। এ প্রতিযােগিতা তার নিজের সাথে নিজের। কোনাে দর্শক না থাকলেও জয়-পরাজয়ের দর্শক তখন সে নিজেই। প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি বনাম পার্থিব শারীরিক যাতনা। তারাই মনে হয় আরোহণ করতে পারেন যারা নিজ মনে নিজ দেহের চেয়ে অনেক বেশি সচল-শক্তিশালী।
নিজের ক্ষমতা পরিমাপের একক কাব্যময় ক্রীড়ার নাম পর্বতারোহণ। এই ক্ষমতা শারীরিক এই ক্ষমতা তার চেয়ে বেশি মানসিক এই ক্ষমতা তার থেকে অনেক বেশি ইচ্ছাশক্তির।