হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অপারেশনটা ছিল হিট এন্ড রান। অর্থাৎ হোটেলের আশেপাশে গ্রেনেড বাস্ট করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পালিয়ে আসা। অপারেশনের মূল লক্ষ্য ছিল বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধি এবং বিশ্বকে দেখানো যে পাকিস্তান সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীন ঢাকা শহর স্বাভাবিক নেই। কিন্তু দুই নাম্বার সেক্টরের গেরিলা দল সেদিন হোটেলের লবিতে এবং পাকিস্তানি সেনাদের কড়া নিরাপত্তাধীন বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিনিধির গাড়িতে গ্রেনেড ব্লাস্ট করে আসে। গেরিলাদের ব্লাস্টের পর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশারফ উল্লাসিত হয়ে বলেছিলেন “ These all are crack people “. সেইখান থেকেই দুই নাম্বার সেক্টর গেরিলাদের নাম হয়ে গেল ক্র্যাক প্লাটুন।
মেজর খালেদ মোশারফ ও মেজর এ.টি.এম হায়দারের অধীনে মেলাঘরে প্রশিক্ষিত একদম অদম্য তরুণ সাহসীদের দলটির নাম ক্র্যাক প্লাটুন। শহরের নানা জায়াগায় আতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদলকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রেখেছিল গেরিলারা। পাকিস্তানি সৈন্যদের অমানবিক অত্যাচারে বিপন্ন জনজীবনে ক্র্যাক প্লাটুন হয়ে উঠেছিল মুক্তির নিঃশ্বাস। কারা ছিল সেই গেরিলা দলে? ঢাকা শহরের সবচেয়ে বনেদি এবং শিক্ষিত পরিবারের মেধাবী সব তরুণে ভীড় করেছিল মেলাঘরে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে। প্রথমদিকে ১৭ জন সদস্য নিয়ে গঠিত দলটির সদস্য সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। সেই তরুণদের দলে ছিল রুমি, সেপ্টেম্বর থেকে এমআইটিতে পড়ার জন্য যার আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দেশেকে মুক্ত করার দায়ভার রুমির কাছে ছিল আরো বেশি মূল্যবান। ঢাকার সবচাইতে বিত্তবান পরিবারের ছেলে আজাদ, এল্ভিস প্রেস্লির গানের জন্য যে হাজার টাকা খরচ করত, ছিল না কোনো অভাববোধ। এছাড়াও দলের অন্যতম সদস্য বদিউল আলম বদি, হাবিবুল আলম, আব্দুল হালিম জুয়েল, ফতেহ আলী চৌধুরী, স্বপন, সামাদ সহ আরো অনেকের ক্র্যাক প্লাটুন হয়ে উঠার পেছনের গল্প বইয়ে বিস্তারিত বলা আছে।
ঢাকা শহরে সবমিলিয়ে প্রাণ ৮২টি দুঃসাহসিক গেরিলা অভিযান চালিয়েছিল এই খুদে গেরিলা দল। কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পাঁচ ছয়জনের দল হয়ে গেরিলারা ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়াগায় অপারেশণ চালিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের মধ্য দারূন আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। বইয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য অপারেশন, যেমনঃ অপারেশন ফার্মগেট চেক পয়েন্ট, অপারেশন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, অপারেশন এলিফ্যান্ট রোড পাওয়ার সহ আরো ছোট কিছু অভিযানের বর্নণা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সদস্যদের আটক হওয়া, বাসাবাড়িতে অভিযান, নির্মন অত্যাচারের ঘটনাও বইয়ে সুনিপুণভাবে উঠে এসেছে।
সবমিলিয়ে ক্র্যাক প্লাটুন সম্পর্কে জানার জন্য ‘’অর্ফিয়াসের বাঁশি’’ বইটা ভালো। তবে আরো কিছু বইপত্র/রেফারেন্স খতিয়ে নিয়ে এবং সাক্ষাৎকারসহ সবকিছু ঠিকঠাক ব্যবহার করে লেখক নিজস্ব স্বকীয়তায় বইটাকে আরো মৌলিকরূপে তুলে ধরতে পারতেন – এইদিকে স্বল্পতা চোখে লেগেছে। তবুও এত সব তথ্য সম্মিলিত করে নির্ভীক গেরিলা দল ‘’ক্র্যাক প্লাটুন”কে নিয়ে বইটির জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাই।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনী, বিশেষ করে 'ক্রাক প্লাটুন' এর কাহিনিগুলো থ্রিলার উপন্যাসকেও হার মানায়। ক্রাক প্লাটুন যেন হয়ে উঠেছিল বাংলার অর্ফিয়ুসের বাশি - যা দোলা লাগায়, একাত্তরের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীর মনে।
'অর্ফিয়ুসের বাশি' উপন্যাসটিতে মূলত ক্রাক প্লাটুন ও সেক্টর টু এর কথাই এসেছে, জানা অজানা অনেক তথ্য নিয়ে সন্নিবেশিত বইটি। যদিও উপন্যাসটি ঠিক উপন্যাস হয়নি- বরং ক্রাক প্লাটুন নিয়ে প্রামাণ্য বা ডকুমেন্টারি বলে মনে হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসকে সুন্দর করে উপস্থাপনের জন্য বইটি পড়ে ভালো লেগেছে। ক্রাক প্লাটুন নিয়ে এই রকম বইয়ের অভাব সবসময়ই ছিল, আশা করি তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বইটি পড়ে দেশের জন্য অন্তত একটু হলেও ভাববে।
ফেসবুকের ফিডে হুট করেই এসেছিল, মেলায় বের হবে অর্ফিয়াসের বাঁশি। দুই নম্বর সেক্টরের দুর্ধর্ষ গেরিলাদল ক্র্যাক প্লাটুন নিয়ে লেখা উপন্যাস। কেন যেন লিস্টে টুকে রাখা হয়নি তখন, কিন্তু বই মেলায় গিয়ে সামনে পরা মাত্রই কিনে ফেললাম। ভারতীয় উপমহাদেশ, দেশ ভাগ, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেজায় আগ্রহ আমার। সাধ্যে যা থাকে কিনে ফেলার চেষ্টা করি। পাশাপাশি নতুন লেখকদের বই কেনার চেষ্টা করি।
যাই হোক, বইটি পড়ে হতাশ হলাম। ঠিক উপন্যাস হয়ে উঠতে পারে নি। মনে হচ্ছিল রেফারেন্স থেকে কপি পেস্ট করা হয়েছে মাত্র। অপারেশন গুলোর বর্ণ্না ছিল দায়সারা গোছের। হুট করে শুরু হুট করে শেষ হয়েছিল প্রত্যেকটা অপারেশন। ক্র্যাক প্লাটুন এর ঘটনা প্রবাহ এমনিতেই চমকপ্রদ, লেখক সেসব ঘটনাকে এক সুতায় বাঁধতে পারেননি বলেই আমার মনে হয়। এছাড়া প্রিন্টিং এর সিনট্যাক্টিকাল ও সিমান্টিকাল ভুল তো ছিলই। যত্নের অভাব ছিল।