প্রাচীন কাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইতিহাসবিস্মিত কিন্তু দেশের রাজনৈতিক ও দেশীয় নিরাপত্তায় বিশেষ ভূমিকা নেওয়া এই সব দেশহিতকর গুপ্তচরদের জন্য পাঠ্য বই একটি লাইনও খরচ করেনি,পর্দার আড়ালে কাজ করতে করতে আদতে তাঁরা পর্দার আড়ালেই থেকে গেছেন। সারা বিশ্বের তেমনই ২০ জন গুপ্তচরের দুর্ধর্ষ কীর্তি সমন্বিত এই বই।
কৌশিক রায়ের জন্ম ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে, কলকাতার উপকণ্ঠ সোনারপুরে। কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছেন রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিক মহাবিদ্যালয়, নরেন্দ্রপুর থেকে। কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেছেন তামিলনাড়ুর ভেলোর ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি থেকে। পেশায় তথ্যপ্রযুক্তিবিদ। কর্মসূত্রে ব্যাঙ্গালোর প্রবাসী। ফরেনসিক বিজ্ঞানে বিশেষ আগ্রহ। ২০২২ সালে ফরেনসিক সায়েন্স অ্যান্ড ডি এন এ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং-এর উপর ইন্টারন্যাশনাল ফরেনসিক সায়েন্স থেকে করেছেন শর্ট টার্ম সার্টিফিকেট কোর্স। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে লেখালেখির জগতে আবির্ভাব। ভালোবাসেন দেশ-বিদেশের নানাজাতীয় রহস্য ও থ্রিলারধর্মী বই পড়তে।
'গুপ্তচর' শব্দটা শোনা বা পড়ামাত্র আমাদের মাথায় এসে ভিড় করে 'জেমস বন্ড' আর 'মিশন ইমপসিবল' সিরিজের নানা সিনেমায় দেখা অজস্র দৃশ্য। কিন্তু আদতে এই পেশাটা কি আদৌ ওইরকম? কারা হয় গুপ্তচর? কেন তারা বেছে নেয় এই পেশা, যাতে স্বীকৃতি বা সম্মান নেই, বরং ধরা পড়লে আছে চরম অসম্মান, অত্যাচার আর মৃত্যু? অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য গবেষণা এবং আবেগের মিশ্রণে তরুণ লেখক কৌশিক রায় আলোচ্য বইয়ের কুড়িটি আখ্যানে এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন। 'লেখকের কথা'-র পর যে-সব কাহিনি এতে আছে, তারা হল: * দেশ~ ১. মহাভারতের কথা ২. চন্দ্রগুপ্তের চোখ ৩. পৃথ্বীরাজের পক্ষীরাজ ৪. শিবাজির শিরস্ত্রাণ ৫. হরি সিং-এর হৃদয় ৬. সিপাহি বিদ্রোহের সিপাহি ৭. কুডি পাঞ্জাব দা ৮. নেতাজির নীল নকশা ৯. লেডি ম্যান্ডেলিন ১০. এক থা টাইগার * বিদেশ~ ১) ডবল এজেন্ট ২) এজেন্ট এইচ টুয়েন্টি ওয়ান ৩) নো ম্যানস ল্যান্ড ৪) সত্যিকারের জেমস বন্ড ৫) মুখোশ মানুষ ৬) খানসামার খাসখবর ৭) দ্য মাইক্রোডট ফাইভ ৮) সেলসম্যান ৯) বিশ্বাসঘাতক ১০) বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট লেখাগুলোর নাম থেকেই বুঝতে পারবেন, রসকষহীন রৈখিক ন্যারেটিভের বদলে লেখক স্বল্প পরিসরে স্থান-কাল-পাত্র সমভিব্যাহারে এক-একটি গল্প বলতে চেয়েছেন৷ এই বইয়ের ভালো দিক কী? (ক) লেখকের পড়াশোনা সলিড। বইয়ের পেছনে বিস্তৃত তথ্যসূত্র দিয়ে এবং নিজের গল্পের কাউন্টার-ন্যারেটিভ হিসেবে কিছু প্রচলিত থাকলে সেটিকেও বলে লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন, গল্প বলতে চাইলেও তিনি শুধু 'সনসনিখেজ' জিনিস ওগরাতে আগ্রহী নন। বরং ইতিহাসকে অটুট রাখাতেই তিনি বেশি আগ্রহী। (খ) ইতিহাসের বেশ কিছু অকথিত অধ্যায় তথা দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়েও বিস্মৃত হওয়া দেশপ্রেমিকের নাম আমরা জানতে পারি এই লেখাগুলো থেকে। আজ মিডিয়ার একাংশ তাঁদের হৃত সম্মান পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট। তবু তাঁদের জীবন, কর্ম ও মরণ এমন উজ্জ্বলভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য লেখককে অকুণ্ঠ সাধুবাদ দেব। এই বইয়ের খারাপ দিক কী? [১] অজস্র বানানভুল ও মুদ্রণপ্রমাদ বইটিকে দুর্বল করে দিয়েছে। বিষয়গত বিচারে যেখানে এমন একটি বইয়ের তুলনা হবে আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সঙ্গে, সেখানে এত দুর্বল কপি-এডিটিং ও প্রুফরিডিং রীতিমতো দুঃখদায়ক। [২] লেখনী একেবারে শুষ্কং-কাষ্ঠং। গল্প বলার সময় সংলাপ, পারিপার্শ্বিক বিবরণ এবং গতি— এই তিনটি জিনিসের সুষম ভারসাম্য না থাকলে তার পাঠযোগ্যতা হ্রাস পায়। এই বইয়েরও বেশ কিছু লেখায় থার্ড পার্সন ন্যারেটিভ এতটাই বেশি থেকেছে যে ঘটনাটি রোমাঞ্চকর হলেও পড়তে গিয়ে হাই উঠেছে। এগুলো সম্পাদনার মাধ্যমে সামলে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু যে বিষয়টা নিয়ে লেখক একেবারে নীরব রইলেন দেখে কিছুটা হতাশই হলাম তা হল 'ইনটেলিজেন্স' নামক শাখাটির উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস। এস্পিওনাজের প্রশিক্ষণ পুরোপুরি নির্ভর করে ইনটেলিজেন্স তাদের কাছ থেকে কী আশা করে— তার ওপর৷ তাই আগামী পর্বে চরিত্রদের ক্লোক অ্যান্ড ড্যাগার অপারেশনের পাশাপাশি এই তাত্ত্বিক কাঠামোটি যদি আলোচিত হয়, তাহলে বড়ো খুশি হই। ইতিমধ্যে, যদি লে কের এবং অন্যান্য লেখকের ক্লাসিক বইপত্র পড়ে এই পেশার মানুষদের নিয়ে জানতে আগ্রহী হয়ে থাকেন, তাহলে এই বইটি অবশ্যই পড়ুন। এই বিষয় নিয়ে এত তথ্যনিষ্ঠ আলোচনা সচরাচর পড়ার সুযোগ হয় না।