পাঁচজন মানুষ অপহরণ হল একই কায়দায়। উঠতি লেখক, জ্যোতিষী, টুকটাক ব্যবসা করা ব্যক্তি, মুভি পাগল থেকে মুভি বানাতে চাওয়া যুবক আর সংসদ সদস্যের পুত্র সবাই আছে এই তালিকায়।
অপরদিকে জিম্মি অবস্থায় আটকে আছে, সংসদ সদস্যের ছোট ভাই ও তার পরিবার সমেত।
তদন্তকারী পুলিশ অফিসার যখন খুনের দায়ে জেলে বন্দী রাদিবের কাছে সমস্যার সমাধানের জন্য যায়, ততক্ষণে সমস্যা আকার নিয়েছে দারুণ জটিলতায়।
লোভ, ক্ষোভ কিংবা মানসিক বিভ্রান্তিতে যে নাম গুলো আসে, যে প্রমাণ গুলো দৃশ্যমান হয় অপরাধীর তা বিস্ময় জাগানিয়া।
নিঁঁখুত অপরাধের পিছনে লুকিয়ে থাকা অভিসন্ধি হয়ত সামনে নিয়ে আসবে অপরাধীকে কিংবা সে সবসময়ই ধরা ছোঁঁয়ার অনেক বাইরে।
"The greatest trick the Devil ever pulled, was convincing the world he didn't exist." - The Usual Suspects - অভিসন্ধি - ঢাকার এক জায়গায় ঘটে এক অদ্ভুত কিডন্যাপিং। মুভি ডিরেক্টর হবার স্বপ্ন দেখা রক্তিম, টি শার্ট ব্যাবসায়ী ফরিদুর, জ্যোতিষী দুলাল বিশ্বাস, উঠতি লেখক রিমন এবং এক এমপির ছেলে ফরহাদ অপহৃত হয়। তারা আবার অপহরণের জন্য একে অপরকে দোষারোপ করছে। - এদিকে শহরের আরেক জায়গায় পরিবার সমেত জিম্মি আরেক পরিবার। এই কেসের কুল কিনারা খুজতে তদন্তকারী কর্মকর্তা কায়েস ছুটলেন আরেকজনের কাছে। রাদিব নামের সেই ডাক্তার আবার খুনের দায়ে জেলে বন্দী। - এখন কে করেছে এই অদ্ভুত কিডন্যাপিং? কাদের কাছে জিম্মি একটি পরিবার? রাদিবের কাছেই বা কেন ছুটে গেলেন কায়েস? তা জানতে হলে পড়তে হবে লেখক রিয়াদুল রিয়াদের সাসপেন্স থ্রিলার "অভিসন্ধি"। - "অভিসন্ধি" মুলত একটি ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার উপন্যাসিকা। নন লিনিয়ার স্টাইলে লেখা হয়েছে। পুরো বইটিই আসলে মেইন টুইস্টের উপর নির্ভর করে ছিল। কিন্তু সেটি তেমন একটা ভালো লাগলো না, ওভার দ্য টপ মনে হয়েছে। - "অভিসন্ধি" একটি নভেলা বলে চরিত্রায়নে খুব বেশি জোর দেয়া হয়নি, তার ভিতরে রাদিব চরিত্রটাকেই ইন্টারেস্টিং লাগলো। ছোট বই হলেও লেখনী স্মুথ, এক বসায় শেষ করার মতো। বইতে প্রিয় কিছু মুভির এস্টার এগ ছিলো বাড়তি পাওনা। - "অভিসন্ধি" বইয়ের বাধাই, কাগজ ইত্যাদি ভালোই। তবে মাত্র ৪ ফর্মার বই হিসেবে দাম একটু বেশিই লেগেছে, এই অতিরিক্ত দামের কোন রিজন দেখলাম না বইতে। প্রচ্ছদ প্লটের সাথে মানানসই। ওভারঅল, মেইন টুইস্ট বাদ দিলে মোটামুটি ভালোই লাগলো এ নভেলাটি। সামনে লেখকের আরো বড় সাইজের বই পড়ার আশায় রইলাম।
"খুব চিন্তায় থাকলে, সব বড় জটিল লাগলে, মানসিকভাবে বিভ্রান্ত হয়ে গেলে, সিগারেট ধরিয়ে পুড়তে দেখবেন। দেখবেন চিন্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে, সমস্যা সহজ হয়ে যাবে, বিভ্রান্ত ভাব শান্ত হয়ে যাবে।"
তদন্তকারী কর্মকর্তা কায়েসকে বহু আগে এটা একবার বলেছিল রাদিব। তারপর থেকে কায়েস মাঝেমধ্যেই সিগারেট পোড়া মনযোগ দিয়ে দেখে। এই যেমন, এখন দেখছে। কিন্তু চিন্তা পরিষ্কার হচ্ছে না।
ঘটনাটা এক সপ্তাহ আগের। আসলে ঘটনা একটা না, দুইটা। দুইটা আপাতদৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন জিম্মি ঘটনা ঘটলো ঢাকায়। একটা ঘটনায় আটকে পড়ে আছে এক ক্ষমতাধর সংসদ সদস্যের ছোট ভাই ও তার পরিবার। পুলিশ, মিডিয়াকর্মী এসে হুলুস্থুল একটা ব্যাপার শেষে তাদের অক্ষত উদ্ধার করা হলো।
সেদিনই আরেকটা জিম্মি ঘটনা থেকে উদ্ধার করা হলো আরও পাঁচজনকে। পাঁচজনের কাজকর্ম পাঁচরকম। তারা হচ্ছে জ্যোতিষী, উঠতি লেখক, টুকটাক ব্যবসা করা এক লোক, সিনেমা পাগল এক ছেলে এবং বেকার তবে বখাটে হয়ে যায়নি এমন এক এমপি-পুত্র। এদের সবার উচ্চতা এক, গায়ের রঙ এক, শরীরের গঠন এক, এমনকি দাড়ি গোঁফের ব্যাপারটাও এক।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে দেখা গেলো সবাই একই কথা বলছে। কিডন্যাপের ধরনগুলো সবার ক্ষেত্রেই একরকম। কিন্তু ঝামেলা অন্য জায়গায়। একেকজন ভিক্টিম দোষারোপ করছে একেকজনকে এবং দোষারোপ করা সকল ব্যক্তিই ভিক্টিম।
মোটামুটি এই হচ্ছে কাহিনী। কাহিনী বিন্যাস নন-লিনিয়ার। এই এখানে, তো সেই সেখানে। এ ধরনের ন্যারেশন আমার ভাল্লাগে। ৬৪ পৃষ্ঠার পিচ্চি এই বইটার বেশিরভাগ অংশই ভাল্লাগছে। লেখা ভালো। পাতায় পাতায় ভালো রোমাঞ্চ আছে। লেখার মৌলিকত্ব বেশ চোখে পড়ছে। তবে প্লট হোল প্রচুর। অনেক অতি জরুরী প্রশ্নের উত্তর নাই। যেমন- 'বন্দী পাঁচজন জিম্মি'কে কিভাবে উদ্ধার করা হলো! এবং তার থেকেও বড় প্রশ্ন হচ্ছে জিম্মি দুটো করাই বা হলো কেন! প্রথম জিম্মি-ঘটনার কারণের ব্যাপারে বইতে কিছু বলা না হলেও, দ্বিতীয় ঘটনার ব্যাপারে বলা আছে। এখানেই টুইস্ট।
মেইন টুইস্টটাই হচ্ছে এ বইয়ের সবচেয়ে বিরক্তিকর অংশ। লেখক পাঠককে চমকে দিতে ভালবাসেন- উনার লেখা 'মধ্যবৃত্ত' পড়ে বুঝছি। ঐ বইটাও মোটামুটি ভালো লেগেছিল, টুইস্টটা ছাড়া। এ বইয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা বলতে হচ্ছে।
আর সব থ্রিলার পাঠকের মতো আমিও চমকে যেতে ভালবাসি। তবে অবশ্যই এই চমকানিকে যৌক্তিক হতে হতে হবে। যতই অপ্রত্যাশিত হোক না কেন, সম্পুর্ন অযৌক্তিক এবং বেখাপ্পা টুইস্ট আমার মতো অনেক পাঠকের মনেই বিরক্তি তৈরি করে।
এ বইয়ের কনসেপ্টটা দারুণ। লেখক আরেকটু সময় দিতে পারলে, বইটা বেশ থ্রিলার হতে পারতো।
বাই দ্য ওয়ে, এ দুইটা খারাপ ব্যাপার বাদ দিলে, লেখকের ডেভেলপমেন্ট ('মধ্যবৃত্ত' থেকে 'অভিসন্ধি') বেশ ভালো। উনাকে শুভকামনা।।