ছোটকা - জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার, আর নিশু ঠিক তোমাদেরই বয়সী। বয়সের বিস্তর দূরত্ব সত্ত্বেও তুমুল সখ্য দু'জনের। কক্সবাজার-মহেশখালি এলাকার রাখাইনদের ওপর এক গবেষণার জন্যে ছোটকা গেলেন সেখানে। বাড়তি পাওনা রাতের সমুদ্র, দ্বীপের মোহনীয় হাতছানিতে ভ্রমণ।
কিন্তু যাওয়ার আগে ছোটকার বন্ধুর সাধারণ দুর্ঘটনা, যা টেলিফোনে কক্সবাজার থেকে জানানো হয়েছিল, তা যেন ক্রমশ রহস্যময় হয়ে উঠছে। নির্জন সী বিচে নিশু চিৎকার করে ওঠে - লাশ! ফুলে ঢোল হয়ে আছে। মহেশখালি দ্বীপের আশে পাশে ঘটেছে ব্যাখাহীন সব ঘটনা। প্রচণ্ড জলের তোড়ে উল্টে যাচ্ছে ট্রলার, নৌকা, স্পীডবোট। আদিনাথের মন্দিরে রাতে দেখা যায় আগুনে ভূত।
এই সুন্দর দ্বীপে কোন অশুভ শক্তি? কোন অশান্ত আত্মা? সমুদ্রের কোন নাম না জানা আজব প্রানী? সমুদ্রের কোন নাম না জানা আজব প্রাণী? দ্বীপবাসীর তাই বিশ্বাস।
বিজ্ঞানমনষ্ক ছোটকার সিদ্ধান্ত - ভাঙতে হবে এই অন্ধবিশ্বাস। কিন্তু কাজটা সহজ নয় - জীবনের ওপর হুমকি, আঘাত। রহস্যের জট খুলতে গিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ছোটকা। কি ঘটছে এখানে? ছোটকার মত বিজ্ঞানীও বিস্ময়ে হতবাক।
কল্প বিজ্ঞানের কৌতূহল রোমাঞ্চের স্বাদের সঙ্গে গা ছম ছম রহস্যের দুর্দান্ত মিশেলে এক চমকপ্রদ কাহিনী শুনিয়েছেন কুশলী লেখক সেজান মাহমুদ। সেজান মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার পাশাপাশি বিজ্ঞান নির্ভর ছোটকা-নিশু অ্যাডভেঞ্চার সিরিজ শুরু করেছিলেন ১৯৯২ সাল থেকে। ছোটকা-নিশু সিরিজের প্রথম গ্রন্থ দ্বীপ পাহাড়ে আতঙ্ক। প্রাকৃতিক উৎস সামুদ্রিক গ্যাস থেকে শক্তি উৎপাদনের যে কথা এখন পত্র-পত্রিকায় দেখা যাচ্ছে, সেই গ্যাস হাইড্রেড নিয়ে সেই ১৯৯২ সালেই লিখেছিলেন 'দ্বীপ পাহাড়ে আতঙ্ক', যেখানে এক ক্ষমতালোভী বিজ্ঞানীর কুপরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন ছোটকা আর নিশু, এই বাংলাদেশের মাটিতেই, মহেশখালির দ্বীপে। ছোটকা আর নিশুর অ্যাডভেঞ্চারের প্রথম কাহিনীতে সবাইকে স্বাগতম।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত বইটা আমি পড়লাম ১৪ বছর পর এসে। কিশোর কল্পবিজ্ঞান নভেলা। আমার আগ্রহ জেগেছিল মূলত ফ্ল্যাপের কাহিনীর প্রথম কয়েকটা লাইন পড়েই। "ছোটকা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার", মানে আমার ফিল্ডের মানুষ। সুতরাং আশায় ছিলাম বইয়ের ভেতরে হয়তো DNA, RNA, CLONING- এসব নিয়ে অনেক কিছু দেখবো।
না, অনেক কিছু পাইনি। কিন্তু যেটুকু পেয়েছি, যথেষ্ঠ। বইটার অডিয়েন্সের কথা চিন্তা করলে বেশ সহজবোধ্য ভাবেই জটিল বিষয়গুলো উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন সেজান মাহমুদ। বাচনভঙ্গী একদম সাবলীল, পড়তে আরাম লাগে। সাহিত্যের মার-প্যাচ খুঁজতে এই বই হাতে নেবেন না প্লিজ। এরকম কিশোর অ্যাডভেঞ্চার আমরা অনেক পড়েছি, জাফর ইকবাল, শাহরিয়ার কবির। তবুও এই বইটা একটু অন্যরকম এর মূল প্লটলাইনের কারণে। কিছুটা ভায়োলেন্সও আছে, যেটুকু দরকার ছিল। মু.জা.ই-এর বইগুলোতে অনেকটা ইচ্ছেকৃতভাবেই কিছু ব্যাপার-স্যাপার বাদ দেয়া হয়। এখানে তা দেয়া হয়নি, আবার ভিলেনকেও স্টেরিওটাইপ "মাথায় টুপি, থুতনিতে দুইটা দাড়ি, চেতনা বিরোধী" ধরণের কাউকে দেখানো হয়নি বলে সেই জায়গাগুলো রিফ্রেশিং লেগেছে।
দ্বীপ পাহাড়ে আতঙ্ক, এমন একটা বই যেটা পড়ে কিশোর-কিশোরীদের মনে আগ্রহ জাগবে কিছু নির্দিষ্ট ব্যাপারে জানার। এবং একটু চেষ্টা করলেই সে ব্যাপারে তারা জানতে পারবে, কারণ ইন্টারনেট এখন হাতের মুঠোয়। সেক্ষেত্রে তাদের আগ্রহের উদ্দীপক হিসেবে কাজ করবে বইখানা।
সুন্দর ছিমছাম, একটা রহস্য গল্প। প্লট বিল্ড-আপ আছে, চরিত্রায়ণের সুযোগ খুব বেশি না থাকলেও সিকুয়েন্স অনুযায়ী কম-বেশি আছে বলবো, ক্লাইম্যাক্স আছে, সুন্দর একটা শেষও আছে। অনায়াসের ৫ এর মধ্যে ৪ তারা দেয়া যায়।