অলৌকিক তথা ভয়ালরসের কাহিনির চাপে বাংলায় জঁর ফিকশনে ইদানীং কিছুটা একপেশে ভাব এসেছে। সেই স্রোতের বিপরীতে গিয়ে, একেবারে ধ্রুপদী হু-ডান-ইট ধাঁচে গোয়েন্দা গল্প লেখার চেষ্টা করেছেন তরুণ লেখক অনিরুদ্ধ। তেমন পাঁচটি কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে আলোচ্য বইটি। কতটা সফল হয়েছেন লেখক? এ-প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে বলি, কী-কী লেখা আছে এই বইয়ে~ ১. গোয়েন্দি'র গোয়েন্দাগিরি: দক্ষ পুলিশ অফিসার অনুরাগ নন্দী এবং তাঁর স্ত্রী গোপা নন্দী'র সঙ্গে আমরা পরিচিত হই এই গল্পটির মধ্য দিয়েই৷ সেই সঙ্গে তৈরি হয় শব্দের খেলা এবং সব ক্লু পাঠকের সামনে দিয়ে রহস্য সমাধানের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার ফেয়ার-প্লে প্যাটার্ন। ২. বিশ্বাসের বিষ: লাভা-য় নিজের মতো থাকা এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারকে কে খুন করতে চাইছে? এই জটিল গল্পটিতে যে মনস্তাত্ত্বিক কানামাছি খেলার অবতারণা করা হয়েছে তা পড়তে গিয়ে 'এবিসি মার্ডার্স' বা 'ডাম্ব উইটনেস' মনে পড়ে যাচ্ছিল। গল্পটা নিঃসন্দেহে ইমপ্রোবাবল, কিন্তু অত্যন্ত উপভোগ্য। ৩. দূরভাষে কিস্তিমাত: 'সেরা ইচ্ছেডানা' সংকলনে প্রকাশিত এই গল্পটির মাধ্যমেই অনিরুদ্ধ'র লেখনীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। গল্পটা ছোট্ট— কিন্তু রসবোধ, বুদ্ধির মারপ্যাঁচ আর গতির সমন্বয়ে রীতিমতো চিত্তাকর্ষক। ৪. স্বর্ণমৃগ রহস্য: নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কিছু রহস্যজনক চরিত্র, তাদের আচরণে বহু অসঙ্গতি, প্রচুর রেড হেরিং, শেষে একটি বীভৎস হত্যা— এইসব উপাদানের মাপমতো ব্যবহারে একটি ক্রিস্টীয় কাহিনি নির্মাণ করেছেন লেখক। আবার ইমপ্রোবাবল, আবারও দুর্দান্ত মনোরঞ্জনের উৎস! ৫. অর্জুন বধের নেপথ্যে: ক্রিস্টির ঘনঘোর ছায়া এই গল্পকেও আচ্ছন্ন করেছে। এমনকি অন্য গল্পগুলো শুধুমাত্র অনুরাগের জবানে লেখা হলেও এই কাহিনিতে এসেছে গোপা'র নিজস্ব পিওভি! এসেছে ইস্পাতকঠিন অ্যালিবাই আর অজস্র মিথ্যের নিগড় ভেঙে সত্যিকে খুঁজে বের করার চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে এই গল্পটিকে প্রাপ্তমনস্ক এবং বুদ্ধিমান পাঠকের জন্য দারুণ রকম বুদ্ধির খোরাক বলেই আমার মনে হয়েছে। বইটি এমনিতে সুমুদ্রিত, তবে কয়েকটি মুদ্রণ-প্রমাদ ছন্দপতন ঘটিয়েছে কোথাও-কোথাও। গল্পগুলো ফেয়ার প্লে ট্র্যাডিশনের সঙ্গে ক্রিস্টির মনস্তাত্ত্বিক গঠন মিলিয়ে অত্যন্ত উপভোগ্য হয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে তাদের মধ্যে এসে গেছে এক অনিবার্য অসম্ভাব্যতা। বইয়ের শেষ অনুচ্ছেদে সিকুয়েলের রাস্তা বানানোটা আমার মোটেই ভালো লাগেনি। তবু, রহস্যপ্রেমী পাঠকেরা এই সরস, বুদ্ধিদীপ্ত ও পরিণত কাহিনির সংকলনটি পড়ে আনন্দ পাবেন বলেই আমার বিশ্বাস। তাই সুযোগ পেলেই বইটি পড়ে ফেলুন।
অনিরুদ্ধ সাউ রচিত "অর্জুন বাধের নেপথ্যে" একটি আকর্ষক বই, এর দুর্দান্ত রচনা, চরিত্রের গভীরতা এবং সুপরিকল্পিত রহস্য গল্পের জন্য প্রশংসিত। এটি পাঠকদের একটি মারাত্মক মজার অভিজ্ঞতা দেয় যা রহস্য ও থ্রিলারের প্রেমিকদের মুগ্ধ করবে।
পাঁচটি কাহিনি নিয়ে গড়ে উঠেছে আলোচ্য বইটি।যার মধ্যে ২টি ছোট গল্প, আর তিনটি বড়ো গল্প। কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের উচ্চপদস্থ অফিসার অনুরাগ নন্দী আর তাঁর স্ত্রী গোপা নন্দী, এঁরাই কাহিনীর মুলচরিত্র।
থ্রিলার পড়তে আমি সব থেকে ভালোবাসি। আর সেটা যদি হয় ক্রাইম থ্রিলার তাহলে সেটা অনেকটা আমার স্পেশাল পেপারের মতো। মানে তখন প্রত্যেকটা লাইন পড়ি, প্রত্যেকটা শব্দ ধরে ধরে পড়ি আর সব কিছুকেই তলিয়ে দেখার চেষ্টা করি। গল্পগুলোর কথা আগে বলে নিই। সব মিলিয়ে বইয়ে আছে পাঁচটা গল্প। তারমধ্যে শেষের দুটো বোধহয় উপন্যাসিকা বললেও খুব ভুল হবে না।
লেখকের প্রথম বই বলেই কিনা জানি না, তবে প্রথম গল্প থেকে দ্বিতীয় গল্প তারপর তৃতীয় গল্প হয়ে ধীরে ধীরে মূল চরিত্রগুলোকে পরিণত হতে দেখা যায়। মানে প্রথম গল্পে তাদের যেভাবে দেখা যাচ্ছে তৃতীয় গল্পে তাদের সেই তুলনায় বেশি পরিণত লাগে আবার পাঁচ নম্বর গল্পে গিয়ে আরও বেশি পরিণত লেগেছে। পুরো বইটা পড়তে থাকলে চরিত্রগুলোর সাথেই যেন সময় এগিয়ে যাচ্ছে এই অনুভূতিটা অজান্তেই হয়। সাধারণত গোয়েন্দা সাহিত্যে গোয়েন্দার চরিত্রটিকে প্রথম থেকে শেষ গল্প অবধি একই রকম রাখা হয়, সেটা এখানে হয় না। এই ব্যাপারটা আমার বেশ ভালো লেগেছে।
প্রথম গল্পে যেমন গোপাকে একটা খুব সাধারণ পারিবারিক ঘটনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে জমাট বাঁধতে দেখা যাচ্ছে। একই সাথে অনুরাগও(গোপা গোয়েন্দির পুলিশ স্বামী) যেন নিজের বিবাহিত স্ত্রীর প্রতি ইতস্তত করছে, সেখানে মাঝের গল্প গুলোতে দেখা যাচ্ছে গোপা আর অনুরাগ দুজন দুজনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একে অন্যের যুক্তিকে খন্ডন করে অন্তিম মতটিকে নির্ণয় করতে চাইছে; আবার শেষের গল্পে গোপাকে অনুরাগ পুরো মাঠটাই ছেড়ে দিয়ে নিজে শুধু সাহায্যকারী হিসেবে গোপার পাশে থাকছে। এই সমীকরণটি আমার বেশ ভালো লেগেছে। গোয়েন্দা সাহিত্যে প্রেমের অ্যাঙ্গেল খুব একটা নতুন নয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা খুব জোলো দিকে টার্ণ নেয়। সেখানে গোপা গোয়েন্দি আর স্বামী অনুরাগের যে ঈষৎউষ্ণ প্রেমালাপ দেখা যায়, সেটা যেন গল্পগুলোতে আলাদা মাত্রা যোগ করে।
আমার ব্যক্তিগতভাবে সব থেকে ভালো লেগেছে ‘বিশ্বাসের বিষ’ গল্পটি। এই গল্পটিতে একদিকে যেমন রহস্য আছে সঙ্গে মানুষের মনের জটিল কিছু বিশ্লেষণ তুলে ধরার চেষ্টা চলেছে আবার হিউমর ও প্রেম আছে। এই সব কিছু একসাথে ক্রাইম থ্রিলারে হলে খুব চান্স থাকে ধেড়িয়ে যাওয়ার। কিন্তু লেখক খুব সুনিপুণভাবে হালকা আঁচে আস্তে আস্তে উপাদেয় একটি পদ রান্না করেছেন। ‘দূরভাষে কিস্তিমাত’ গল্পটা একটু এক্সপেরিমেন্টাল উপস্থাপনা বললে খুব ভুল হবে না। এই গল্পে শুধুমাত্র দূরভাষিক কথোপকথনের মাধ্যমের রহস্যোদ্ধার হয়েছে। গল্পটি পড়তে ভালোই লাগে, কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবলে বাকি গল্পগুলোর প্লটের তুলনায় একটু বালখিল্যন্যায় লাগে।
এই পুরো বইয়ের যদি দুটো ইউ এস পি বলতে হয়, তাহলে বলব গোপা গোয়েন্দির অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও লেখকের লেখার হাতটি। মাঝে মাঝে অতি বড় রহস্য রোমাঞ্চ পাঠকও গোয়েন্দির পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা দেখে চমকে যেতে পারে। লেখকের ভাষার বাঁধন অসাধারণ বললেও কম বলা হবে। রহস্য রোমাঞ্চের মেদহীন গল্পেও যে একটু অন্যরকম ছোঁয়া দেওয়া যায়, সেটা এই বই না পড়লে বিশ্বাস হত। বইয়ের অনেক জায়গাতেই অসাধরণ লেখনীর চিহ্ন আছে, কিন্তু আমি একটি প্রেমের দৃশ্য সরাসরি কোট করতে চাই। প্রেমের দৃশ্য আমি খুব বেশি না পড়লেও যে কটা পড়েছি তাতে এরকম হাস্যরসাত্মক প্রেমের দৃশ্য পড়েছি বলে মনে করতে পারি না। এই দৃশ্যটা গোপা গোয়েন্দির স্বামীর বয়ানে লেখা-‘আমি রাগে ফেটে পড়ার আগেই গোপা আদরের জল নিয়ে হাজির। আমার মুখ মণ্ডলে লিপস্টিকের ছাপ এঁকে ‘সরি বেবি, রাগ করে না বেবি’ ইত্যাদি আদুরে বিশেষণ দিতে শুরু করল।……অগত্যা বত্রিশ বছরের বেবি, কোলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা অফিসার বুকের রাগ বুকে চেপে বৌয়ের হস্ত বন্ধনে গ্রেপ্তার হলেন কম্বলের নিচে।’
তবে ��ত কিছু ভালোর মধ্যে ছোট কিছু সমস্যা আছে। সেটা হয়েছে একদম শেষের গল্পটায়। ‘অর্জুন বধের নেপথ্যে’ গল্পে শুরুর দিকে এক জায়গায় বলা হচ্ছে, নির্জন মন্দারমণি সী বিচে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় খুঁজতে গিয়ে একটু দূরে ঝাউবনের মধ্যে একাকী এক বাংলোতে অর্জুনের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। পরে তদন্তের সময় বলা হচ্ছে, ঘরে খুনি এসি চালিয়ে রেখে গিয়েছিল যাতে মৃতদেহ দ্রুত না পচে এবং খুঁজে পেতে দেরি হয়। এখন এই দুটো পরস্পর বিরোধী মন্তব্য! ঘরে এসি চললে সে ঘর বন্ধ ছিল, তাই বাইরে সী বিচ থেকে পচা গন্ধ পাওয়া সম্ভব নয়; একমাত্র বাংলোতে ঢুকে ঘরের কাছে না আসা পর্যন্ত। আবার যদি ধরা হয় যে এসিও চলছিল আর দরজা জানলাও খোলা ছিল তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মৃতদেহ আরও আগেই আবিষ্কৃত হত! এখানে একটু লজিক্যাল কনফ্লিক্ট আছে! তবে মূল গল্পে তাতে কিছু আসে যায় না।
শেষের গল্পটায় আরও একটা এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে। সেটা হয়েছে অফিসার অনুরাগ নন্দী ও গোপার ডায়েরি বা লেখনী দুটোকেই পাশাপাশি রেখে গল্পের অন্তিম চরণে উপনীত হতে চেষ্টা করা হয়েছে। এই নতুন চেষ্টাটা প্রশংসাযোগ্য কিন্তু একটা ছোট্ট জিনিস একটু খেয়াল রাখা দরকার ছিল। সেটা হচ্ছে দুজন মানুষ যখন তাদের ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি লেখে সারাদিনের অভিজ্ঞতার সাথে মিশিয়ে তখন কিন্তু নারী ও পুরুষের ঘটনাগুলো এক হলেও অনুভূতির ধরণ একটু আলাদা হয়। ফলে তাদের লেখার ধরণও আলাদা হয়। কিন্তু প্রথমে অনুরাগের কলম ও গোপার কলম আলাদা করে চেনা গেলেও, পরে যখন অনুরাগ তার কলম নিয়ে ফিরে আসে তখন সেটার সাথে গোপার লেখার প্রায় কোনো পার্থক্য নেই। এটা একটু খেয়াল রাখলে বোধহয় এই গল্পটা এই বইয়ের সব থেকে সেরাই বলতাম। কারণ প্লটগত দিক থেকে এই শেষের গল্পটা বাকী চারটের থেকে বেশ অনেকটাই এগিয়ে আছে।
তবে শেষ করার আগে এটাই বলব, এই বই আমায় কেউ মাসে একবার করে পড়তে বললেও না বলব না। কারণ, লেখকের উপস্থাপনাটি মারত্মকরকমের শক্তিশালী। আমি নিজেও বেশ কিছু নতুন জিনিস শিখেছি আর কম করে মোটে না হলে গোটা চারেক নতুন বাংলা শব্দ শিখেছি। তাই গোপা গোয়েন্দির অভিযান পড়া হয়ে না থাকলে পড়ে ফেলুন। বিভা পাবলিকেশনের প্রচ্ছদটি বেশ লেগেছে।
বই - অর্জুন বধের নেপথ্যে লেখক - অনিরুদ্ধ সাউ বিভা প্রকাশনী, মুদ্রিত মূল্য - ২২২/-
Goodreads এ অনিরুদ্ধ সাউ এর লেখা ২টো বইয়ের review পড়ে মনে হয়েছিল, বইগুলো অবশ্যপাঠ্য। 'গোপা গোয়েন্দি'র প্রথম বইটি পড়ে শেষ করলাম, লেখক হতাশ করেননি। শুধু তাই নয়, আধুনিক গোয়েন্দা গল্পের মধ্যে এরম লেখা সত্যি বিশেষ স্থানের দাবীদার। সুচিত্রা ভট্টচার্যের মৃত্যুর পর মিতিন মাসীর কাহিনীর অভাব বড্ড বেশি অনুভব করেছিলাম। মনোজ সেন এর 'দময়ন্তী' ও যেন সেভাবে দাগ কেটে উঠতে পারেনি, তবে সেদিক দিয়ে অনিরুদ্ধ সাউ এর 'গোপা গোয়েন্দি' অনেক বেশি সেই অভাব পূরণে সক্ষম হয়েছে। কলকাতা পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের উচ্চপদস্থ অফিসার অনুরাগ নন্দী আর তাঁর স্ত্রী গোপা নন্দী, এঁরাই কাহিনীর মুলচরিত্র। এই বইতে মোট ৫টি কাহিনী আছে। যার মধ্যে ২টি ছোট গল্প, আর তিনটি বড়ো গল্প (নভেলেট বলা চলে)। ছোটো গল্প গুলো নিজেদের স্বল্প পরিসরে স্বয়ং সম্পূর্ণ, বড়ো গুলোও পাঠকের রহস্য রোমাঞ্চ রসনায় ভরপুর তৃপ্তি জোগাতে সমর্থ বলেই আমার মনে হয়েছে। নিজেরা পড়ে দেখতে পারে, আশা করি হতাশ হবেন না। লেখকের ভাষা ও রচনাশৈলী যথেষ্ট সাবলীল, বুদ্ধিদীপ্ত এবং প্রশংসনীয়। গল্পের বুননও খুব গোছানো আর নিপুণ, তাতে যত্নের ছাপ স্পষ্ট। কাহিনীর প্লট ও বিন্যাস সম্পূর্ণ মৌলিক এবং ঘরোয়া, কোনো বিদেশি কাহিনীর ছাপ নেই।
একটাই যা নেগেটিভ point সেটা যদিও প্রকাশককে, এরকম বই Hardcover হলেই ভালো, সযত্নে সংগ্রহে রাখা যায়, paperback হওয়ায় পড়তে গিয়েই রীতিমতো ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে, বাংলা সাহিত্যে এই paperback এর প্রচলনের প্রচার ঘটলে সামনে সত্যি সংগ্রাহকদের জন্য দুর্দিন আসতে চলেছে। এই বইয়ের পরবর্তী সংকলন, 'মায়াবী মারীচ'...।
শেষ পর্যন্ত নিজের লেখা বইটাই খুঁটিয়ে আর একবার পড়ে ফেললুম। কয়েকটা জায়গায় মনে হল - বাঃ, বেশ লিখেছিলুম তো এখানে, আবার কয়েকটা জায়গায় নিজেই নিজের কাঁচা লেখনী দেখে লজ্জা পেলুম। সব মিলিয়ে তিন তারা'র বেশি দেওয়া গেল না। পরেরবার লেখার ধার বাড়াতে আরো যত্নশীল হতে হবে, যাতে পাঠক অনিরুদ্ধ, লেখক অনিরুদ্ধ'কে ফাইভ স্টার দিতে পারে।
ছোটবেলা থেকেই রহস্য বা গোয়েন্দা গল্পের প্রতি আমাদের সকলেরই কম-বেশি একটা আলাদা আকর্ষণ থাকে। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি🥴। আর তা যদি কোনো মহিলা গোয়েন্দা থুড়ি গোয়েন্দি হয়, তাহলে তো আর কোনো প্রশ্নই থাকেনা। কারণ সত্যি বলতে কি, বাংলা সাহিত্যে হাতে গোনা কিছু মহিলা গোয়েন্দার কথাই জেনে এসেছি। তাই প্রথম যখন এই বইটা দেখি,তখন থেকেই ইচ্ছে ছিলো,বরং বলা যাই উইশলিস্টে add করা ছিল যে এই বই অবশ্যই পড়তে হবে।
🍂১. গোয়েন্দির গোয়েন্দাগিরি :---🍂
এই গল্পের মধ্যে দিয়েই গোয়েন্দির পথ চলা আদতে শুরু। কলকাতা পুলিশের এক নামকরা পুলিশ অফিসার অনুরাগ নন্দীর কাছে এসে পৌঁছোয় তার এক দূর সম্পর্কের মামার চিঠি । যে চিঠিতে রয়েছে সস্ত্রীক ঘুরে আসার আহবান এবং সাথে রয়েছে একটি শব্দধাঁধা, যার সমাধানে মিলবে অত্যন্ত মূল্যবান মোঘল আমলের একটি নীলা। গোপা গোয়েন্দি তার ক্ষুরধার মগজাস্ত্রের দ্বারা খুব সুচারু কৌশলে শীঘ্রই এই ধাঁধার সমাধান করে। প্রথম গল্পে গোয়েন্দির এই বিশ্লেষণী ক্ষমতাই যা যুক্তি তথ্যের ওপর নির্ভরশীল, তা সকলের মন কাড়তে বাধ্য।
_________________________________
🍂২. বিশ্বাসের বিষ :---🍂
এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারের ধারণা কেউ তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলতে চাই ও তাকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় দুটি খুন। রহস্যের টানটান উত্তেজনা, প্রত্যেকটি চরিত্রের রহস্যময়তার পাশাপাশি মহাভারতের কিছু তথ্যের অসাধারণ মিশেল ও লাভার নৈসর্গিক পরিবেশের অপরূপ বণর্নার কারণেই গল্পটি আমার অন্যতম প্রিয় একটি গল্প ।
_________________________________
🍂৩. দূরভাষে কিস্তিমাত :---🍂
তিলোত্তমা নগরীর বুকে লক্ষ্মীপুজোর রাতে খুন দাবাড়ু সংঘমিত্রা বিশ্বাস, মৃতদেহের মুখের মধ্যে মেলে দাবার একটি কালো ঘুঁটি। অন্য সকল গল্পের থেকে এই গল্পটি যে সম্পূর্ণ আলাদা,তা নিঃসন্দেহেই স্বীকার্য। কারণ শুধুমাত্র কানে শুনে কোনো রকম প্রত্যক্ষ প্রমান চোখে না দেখেই কেসের সমাধান করেন গোপা গোয়েন্দি। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত, এই গল্পের বাঁধন আরও খানিকটা মজবুত হলে ব্যাপারটা কিন্তু মন্দ হতো না,কারণ শেষের দিকটা একটু প্রেডিক্টেবেল হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। তবুও বলবো গল্পটা বিষয়ের দিক থেকে বেশ ইউনিক।
_________________________________
🍂৪. স্বর্ণমৃগ রহস্য :---🍂
এই গল্পের ক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয়,প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ বর্ণনা ভ্রমণপিপাসুদের মন জয় করতে বাধ্য। ওড়িশার এক ছোট্ট শহর 'দারিংবাড়ি' তে বেড়াতে ��সে খুন হন দুই যমজ বোনের একজন। গোপা গোয়েন্দির তুখোড় বুদ্ধিমত্তা,প্রতিটা চরিত্রের কিছুঅসামঞ্জস্যতা, 'দারিংবাড়ি'র ভয়ঙ্কর সুন্দর পরিবেশ গল্পের মোড় কে এক অন্য রূপ দিয়েছে।
_________________________________
🍂৫. অর্জুন বধের নেপথ্যে:---🍂
এই গল্পটি আমার সবচেয়ে পছন্দের। গল্পের প্লট , অ্যালিবাই , সকল চরিত্রের মোটিভকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করলেই বোঝা যায় এটি সবচেয়ে পছন্দের বলার কারণ। বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা কুমার অর্জুনের খুন হওয়াকে কেন্দ্র করেই মূলত গল্পটি । এই গল্পের ক্ষেত্রে আর একটা জিনিস না বললেই নয়, অনুরাগ নন্দীর কলমের পাশাপাশি গোপা গোয়েন্দির কলমের জোরও টের পাওয়া যায়। আলাদা করে নিশ্চয় আর বলতে হয়না, কেন এই বই এর নামকরণ "অর্জুন বধের নেপথ্যে" রাখা হয়েছে।
_________________________________
আর কয়েকটা লাইনের কথা না বললেই নয়💝🔥🙏🏻.... 💝🔥 "ভালোবাসা আসলে বরফের মতো।বিশ্বাসের হিমাঙ্ক পেরোলে সে বরফ গলে যায়। আর সেই বরফ গলা জলেই জন্ম নেয় ঘৃণা,বিদ্বেষ আর আক্রোশের ব্যাকটেরিয়া।"...🔥💝
এককথায় অসাধারণ একটি বই 'অর্জুন বধের নেপথ্যে'...গোপা গোয়েন্দি এগিয়ে চলুক...অনেকটা পথ চলা বাকি এখনো✊🏻💝🔥
🍂🌼থ্রিলার পড়তে আমার বেশ ভালোই লাগে, আর সেটা যদি হয় ক্রাইম থ্রিলার তাহলে তো আর ....... পুরো বইটা পড়তে পড়তে চরিত্রগুলোর সাথেই যেন সময় এগিয়ে যাচ্ছে এই অনুভূতিটা হয়। গোপা গোয়েন্দির অসাধারণ পর্যবেক্ষণ আমার বেশ ভালো লেগেছে। রহস্য রোমাঞ্চে ভরপুর এবং সারা বই জুরে টানটান উত্তেজনা কোথাও বোর করেনি।🌼🍂
💮গোয়েন্দির গোয়েন্দিগিরি : “ বর্ণমালায় জোড়া লাল কিন্তু না - লা ইস্তিরি দিয়ে মোড়া বর্মতেও ছেদ কোন রহস্যের চাবিকাঠি মোগল যুগের নীলা তিরে কি লক্ষ্যভেদ ! " লুকিয়ে আছে ধাঁধার অন্তরালে ?
💮বিশ্বাসের বিষ : - পাহাড়ের কোলে শান্ত এক গ্রাম- ' লাভা ' । দূরে সপার্ষদ কাঞ্চনজঙ্খার উদ্ধত উপস্থিতি । ভয়ঙ্কর সুন্দর এই গ্রামে সপরিবারে বাস করেন এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার । কিন্তু কে বা কারা যেন সরিয়ে দিতে চায় তাঁকে পৃথিবী থেকে । একে একে ঘটে যায় দু - দু'খানি খুন । আর কার জীবনে নেমে আসতে চলেছে মৃত্যুর হিমশীতল থাবা ? লোভ , প্রতিহিংসা নাকি বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা , খুনি কেন মেতে উঠেছে নিষ্ঠুর হত্যালীলায় ?
💮দূরভাষে কিস্তিমাত : - নিরাপত্তার অভাবে ভুগছে তিলোত্তমা । এক মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার খুন হয়ে পড়ে আছেন তাঁর বাড়িতে । মৃতদেহের মুখের ভিতর থেকে উদ্ধার হয় দাবার একটা খুঁটি ? সম্পূর্ণ টেলিফোনিক কনভারসেশনে লেখা ভিন্ন স্বাদের রহস্য গল্প ।
💮স্বর্ণমৃগ রহস্য : - ওড়িশার এক ছোট্ট শহর দারিংবাড়ি । রক্তের দাগে লাল হয়ে ওঠে পূর্বঘাট পর্বতের বন্য সৌন্দর্য । খুন হয়ে যান জমজ বোনের একজন । গোপা গোয়েন্দি কি পারবে মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা খুনিকে খুঁজে বের করতে ।
💮অর্জুন বধের নেপথ্যে : - বাংলা সিনেমার সুপারস্টার কুমার অর্জুনের পচা গলা মৃতদেহ উদ্ধার হয় মন্দারমনির সমুদ্রতট সংলগ্ন একটি বাংলো থেকে । সন্দেহের তির ঘনিষ্ট মানুষদের দিকে । কিন্তু সন্দেহভাজন প্রত্যেকেরই মোটিভ যথেষ্ট স্ট্রং অথচ অ্যালিবাই নিশ্ছিদ্ৰ । এই কঠিন সময়ে নিজের বাড়ি থেকে উধাও মিসেস গোলাবায়েন্দিও । খ্যাতি , ঐশ্বর্য আর ক্ষমতার এলিন্দেই রিপুর তাণ্ডব বোধহয় ।
বিভা প্রকাশনীতে চলছিল আষাঢ়ে সেল। কি কিনব কি কিনব ভাবতে ভাবতে শরণাপন্ন হই Goodreads এর। সেখান থেকেই সন্ধান পাই লেখক অনিরুদ্ধ সাউয়ের। তার লেখা প্রতিটি বই 4+ rating দেখে স্থির করি, তার লেখা বইগুলি জোগাড় করার।
অনিরুদ্ধ সাউয়ের লেখা "গোপা গোয়েন্দি" চরিত্রটির আত্মপ্রকাশ ঘটে "অর্জুন বধের নেপথ্যে" বইটির মাধ্যমে। ২৪০ পাতার এই বইটিতে মোট পাঁচটি গল্প সংকলিত হয়েছে। গল্পগুলি যথাক্রমে: ১. গোয়েন্দির গোয়েন্দাগিরি, ২. বিশ্বাসের বিষ, ৩. দুরাভাষে কিস্তিমাত, ৪. স্বর্ণমৃগ রহস্য, এবং শির্ষক গল্প ৫. অর্জুন বধের নেপথ্যে। চায়ের সঙ্গে যদি টা যদি থাকে তাহলে চা্ খাওয়ার আমেজে যে আলাদা মাত্রাযুক্ত হয়, এই বইটিও সেই কাজটি সুচারু ভাবে সম্পন্ন করে। বইটি খুবই সাবলীল ভাষায় রচিত, যার ফলে পাঠক্রিয়ায় কোথাও বাধা সৃষ্টি হয় না। গল্পের বুননও পাঠের গতিকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। প্রথম গল্পে গোপা গোয়েন্দির সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে তারই স্বামী অনুরাগ নন্দীর একটি পারিবারিক ধাঁধা সমাধানের মধ্যে দিয়ে। দ্বিতীয় গল্পে, গোপা সম্মুখীন হয় একটি চ্যালেঞ্জের। যেখানে চ্যালেঞ্জার আর কেউ নন বস ডিসিডিডি অফ কলকাতা পুলিশ, গোপার পাতানো মেশোমশাই। তৃতীয় গল্পে, গোপা তার পারদর্শিতা দেখায় ওভার দ্য টেলিফোন একটি প্রবলেম সলভ করে। চতুর্থ ও পঞ্চম গল্প দুটি আকারে অন্যগুলি থেকে বড় এবং চ্যালেঞ্জিং ও বটে।
বইটি অবশ্যই চায়ের টেবিলে অথবা যাত্রাপথে একজন দারুন সঙ্গী হতে পারে আপনার। বানান জনিত ত্রুটি যথেষ্টই কম। বিভা থেকে প্রকাশিত এই বইটি ছাড়ে যথেষ্ট কম মূল্যে ক্রয় করে নিতে পারেন, ঠকবেন না।