কালো কেশরওয়ালা ওই প্রাণীটা কি আসলেই সিংহ? নাকি কুহকী ক্ষমতাধারী এক ওঝা, রাতের অন্ধকারে সিংহের রূপ ধরে যে নরহত্যায় নামে? ...ভয়ঙ্কর এক মানুষখেকো বাঘের অত্যাচারে মালয়ের রাবার শ্রমিকদের কাজ বন্ধ হওয়ার জোগাড়। ...বাঘ আর চিতার জুটি বেঁধে শিকারের কথা কখনও শুনেছেন? ...ল্যাংটংয়ের রেললাইনের চারপাশে আস্তানা গাড়া চার নরখাদকের হাত থেকে অসহায় মানুষগুলোকে কে রক্ষা করবে? ...রাতের ওই অমানুষিক চিৎকারের মালিক কি উন্মাদ এক হাতি নাকি অশরীরী! জঙ্গলের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা দুই ফুটি ভয়ানক চেহারার জিনিসটাই বা কী?
ভারত, বার্মা, মালয় এবং আফ্রিকার জঙ্গলের রোমাঞ্চকর সব সত্যি কাহিনী নিয়ে জমজমাট এক বই। গণ্ডার, বুনো মোষ, বাঘ, চিতাবাঘ, পাগলা হাতি—কী নেই! উপরি হিসাবে আছে সিলেটের খুনে বাঘ আর জাল দিয়ে চিতা ধরার কাহিনী।
অরণ্য ও রহস্য-রোমাঞ্চপ্রেমী পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
বইটার রেটিং এত কম কেন? অন্তত ৩ তো দেয়াই যায়! মানছি যে, হান্টার-করবেটএন্ডারসনের মত অত টানটান কিছু নেই, কিন্তু আমাদের পড়া প্রায় সব শিকার কাহিনীর কেন্দ্রস্থল হয় আফ্রিকা নয়তো ভারত; সেখানে এই বইতে বারমা আর মালয়ের বনজঙ্গল নিয়ে দু'টো লেখা রয়েছে, এই নতুনত্বের জন্যই ৩ দেয়া যায়।
ইশতিয়াক হাসান অনূদিত জেরানগাওয়ের বিভীষিকা একাধিক বিখ্যাত শিকারীর অভিযান কাহিনীর অনুবাদ। বইটা পাঁচমিশালী। কিছু কাহিনী একদম সাদামাটা, কিছু রক্ত জল করা। লে কর্ণেল ইসমাইলের লেখা খানগ্রিয়া বাবার আশীর্বাদপুষ্ট বাঘ আর বুড়ো বাঘ-চিতাবাঘের জোড়ার কাহিনীটা দারুণ। এছাড়া আরেক ভয়াবহ কাহিনী হলো জন টেইলরের 'অশুভ সিংহ-মানব'। কাহিনীতে আছে পূর্ব আফ্রিকার ক্ষমতাশালী গ্র্যান্ড মাস্টারদের কথা, যারা সিংহের রূপ নিতে পারে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। সাথে টাঙ্গানিকা (বর্তমান তানজানিয়া) এর উসুরিতে উৎপাত চালানো এগারোটা মানুষখেকো সিংহ শিকারের বিবরণ। এদের মাঝে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো কালো কেশরের এক বিশালদেহী সিংহ। এবং যথারীতি স্থানীয়দের অন্ধবিশ্বাস- এই সিংহটাই ছদ্মবেশী গ্র্যান্ড মাস্টার।
এছাড়া ভালো লেগেছে অগাস্টাস সামারভিলের 'আত্নাশিকারি' ও সারফিল্ডের 'বার্মার জঙ্গলে'।
বইটিতে লে কর্ণেল উডের তিনটা লেখা আছে। লেখাগুলোতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের নরখাদক বাঘের কাহিনী, সিলেটে প্রচুর লামচিতা/ক্লাউডেড লেপার্ড পাওয়ার তথ্য ও ফাঁদ পেতে চিতাবাঘ ধরে বিক্রি করার উল্লেখ আছে। এসব পড়ে বর্তমান সিলেটের দিকে তাকালে হাসি আসে। বাঘ তো বিলুপ্ত, মনে হয়না চিতাবাঘও খুব বেশি অবশিষ্ট আছে।
আরেক ট্রাজেডি হয়েছে বার্মার সাথে। 'বার্মার জঙ্গলে' নামে একটা বিবরণ আছে - সারফিল্ড (ছদ্মনাম) নামে এক সার্ভে অফিসারের। সেখানে বার্মায় অসংখ্য বাঘ থাকার উল্লেখ আছে, আছে মানুষখেকো বাঘের কয়েকটা লোমহর্ষক কাহিনী। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল টাইগার ফোরামের ২০১০ এর একটা জরিপ অনুসারে মাত্র ৮৫ টা বাঘ টিকে আছে বার্মায়। ২০২৩ এ হয়ত ১০০ এর আশপাশে হবে। ভেরি প্যাথেটিক।
গজমুক্তা, হাতির মৃত্যুস্থল, খুনী হাতি, কিং কোবরা, লামচিতা, চিতাবাঘের স্বভাব, মোষের পালের গুঁতিয়ে বাঘ হত্যা, ভীল জাতির আত্নাশিকারের বিবরণ, বার্মার নাট ও মুন্ডু শিকারী উপজাতি, মালয়েশিয়ার রাবার বাগানের মানুষখেকো বাঘ - ইত্যাদি বিভিন্ন রঙের তথ্য, বিবরণ, কাহিনী আছে বইটা জুড়ে। ইশতিয়াক হাসানের অনুবাদও পারফেক্ট। যদিও বেশিরভাগ কাহিনীই সাধারণ, সাসপেন্স তৈরীতে ব্যর্থ।
মোট ২৮০ পৃষ্ঠার স্বল্পমূল্যের পেপারব্যাক। রেটিং ৪/৫।