ঘরোয়া অবনীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা হলেও তার লেখা নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন তার শেষ জীবনে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন বেশ কিছু মানুষ তার সেবার জন্য জোড়াসাঁকোর বাড়িতে গিয়ে থেকেছিলেন, তাদেরই একজন ছিলেন রাণী চন্দ। অবনীন্দ্রনাথও জোড়াসাঁকোয় ছিলেন, মাঝে মাঝে তিনি রাণী চন্দকে পুরোনো দিনের অনেক গল্প করতেন, সেগুলোই লিখে রেখেছিলেন রাণী চন্দ, পরে রবীন্দ্রনাথ যখন লেখাগুলো পড়েন তার উৎসাহেই বই আকারে প্রকাশিত হয় ঘরোয়া। অবনীন্দ্রনাথ এখানে কথক, রাণী চন্দ লিপিকার। লিপিকার যিনিই হন, কথাগুলো অবন ঠাকুরের, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ীর, সেই বাড়ীর মানুষদের পুরোনো সব দিনের কথা। কে আসেন নি এই স্মৃতিকথায় ঘুরেফিরে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অল্পচেনা, অচেনা ঠাকুর বাড়ীর বা তার বাইরের অনেক মানুষ, আর অবশ্যই অবনীন্দ্রনাথের রবিকাকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বয়সে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের দশ বছরের বড় ছিলেন, বয়সের ফারাকটা কম বলেই অবন ছিলেন রবিকাকার নানান কর্মকান্ডের সঙ্গী, সে ড্রামাটিক ক্লাবই হোক, কি খামখেয়ালী সভা। পয়সাওলা লোক সেকালেও আরও অনেক ছিলেন, সবকালেই থাকেন। তবে ঠাকুর বাড়ীর মতো সৃষ্টিশীল শখ সবার থাকে না। ছিল বলেই হয়তো একজন রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্য সঙ্গীতের দিকপাল হতে পেরেছিলেন, অবনীন্দ্রনাথ হতে পেরেছিলেন শিল্পী, লেখক। বাড়ীটাই ছিল নানা নিত্যনতুন সৃষ্টির কারখানা। ড্রামাটিক ক্লাব বন্ধ হবার পর রবীন্দ্রনাথ তৈরী করেছিলেন খামখেয়ালী সভা। সেটাও একসময় ভেঙ্গে যায়। তবে এর মধ্যে দিয়েই বের হয়ে এসেছিলো জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অনেক নাটক, রবীন্দ্রনাথের নাটক, গল্প, কবিতা, গান আর অবন ঠাকুরের শিল্পীসত্ত্বা। ছোটদের জন্য অবনীন্দ্রনাথের লেখা ক্ষীরের পুতুল, শকুন্তলা সেও তো রবীন্দ্রনাথের অনুরোধেই। এই লেখায় আমরা এক অন্য রবীন্দ্রনাথের পরিচয় পাই। যে রবীন্দ্রনাথের সাথে ভূমিকম্পের বছর (মনে হয় ১৮৯৭) অবন আর অন্যরা গিয়েছিলেন নাটোরে কংগ্রেসের প্রভিন্সিয়াল কনফারেন্সে যোগ দিতে। কনফারেন্স চলাকালীনই সেই ভূমিকম্প হয়, যদিও এদের কারো ক্ষয় ক্ষতি হয় নি। সেই সভায় রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব ছিল বাংলায় বক্তৃতা হবে। চাঁইদের আপত্তির পরও উপস্থিত বুদ্ধিতে সেটা কার্যকর হয়েছিল। স্বদেশী যুগে রবীন্দ্রনাথ শুরুতে কিরকম অগ্রণী ছিলেন পরে বিদেশী পণ্য বয়কটের সিদ্ধান্ত মনঃপুত না হওয়ায় যে সরে আসেন সে কথাও জানা যায়। এর বাইরে নাটকের রবি, গানের রবির কথাও তো জানা গেল, রবীন্দ্রনাথ যে ভালো গাইতেন, ভালো অভিনয়ও করতেন সেভাবে তো জানতাম না। শুধু রবীন্দ্রনাথ না স্মৃতিকথার একটা বড় অংশ জুড়ে আছেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ, আর তার শখ, শৌখিনতা। দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রীর কথা, আর অবন ঠাকুরের নিজের দিদিমা (নাকি ঠাকুরমা?) দের কথা। নাটোরের মহারাজা, অক্ষয় দত্ত, দীপুদা, ঈশ্বর গুপ্ত এদের কথাও ঘুরে ফিরে বারবারই এসেছে। আর এসেছে জোড়াসাঁকোর সেই ঠাকুর বাড়ীর কথা। সেই বাড়ী নিয়েই তো এতকথা। দুই বাড়ী নিয়ে একসাথে যে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ী, তারই ঘরোয়া কথা।