বিষবৈদ্য সনাতন চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম আলাপ হল অবশেষে। এই সিরিজের বিভিন্ন অভিযানের সময়কাল অনুযায়ী দশ নম্বরে আসে 'নিবাত কবচ অভিযান'। মতান্তরে বই হিসেবে তৃতীয় অভিযান। মাইলস্টোন হিসেবে বলা যেতে পারে অরন্যমন প্রকাশনীর পথচলা শুরু এই বইয়ের হাত ধরে, আর 'অরণ্যমন বেস্টসেলার' তকমাও পেয়েছে এটি।
সিরিজটি কল্পবিজ্ঞানের আশ্রয়ে বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর ওপর গড়ে উঠেছে। বয়স্ক গল্পকথক শ্রী সনাতন চৌধুরী তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতার কথা শোনান কৌতূহলী নীতু, সুকল্যাণ আর তাদের সতীর্থদের। মহাভারতের বনপর্বে অর্জুন দৈবাস্ত্রের প্রশিক্ষণ শেষ করার পর দেবরাজ ইন্দ্র একটি গুরুদক্ষিণা চাইলেন। নিবাত কবচ দানবদের নিপাৎ করতে হবে। সমুদ্রের নিচে পাতালপুরীতে তিন কোটি দানবের সভ্যতা। অর্জুনের আক্রমণে সেই দানবের দল পরাজিত তো হল, কিন্তু যুদ্ধের শেষে দানবদের স্ত্রী পুত্রদের প্রাণভিক্ষা দিয়ে অর্জুন ফিরলেন মর্ত্যে। সেখানেই শুরু হল গোলোযোগ।
বিষবৈদ্যের এই কথায় কাহিনীর সারাংশ বুঝতে অসুবিধা হয় না।
"ওদের প্রাণ বখশিস দিয়ে, পরবর্তী সময়ে কত মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছিল অর্জুন, তার কথা মহাভারতে লেখে না। ফলে তোরা তো জানবি না। নিবাত কবচদের অর্জুন যদি সেইদিনই ঝাড়েমূলে নির্বংশ করে আসত, তাহলে খৃষ্টীয় ৫০০ সনে পুমপুহারের মতো উন্নত একটা মেট্রোপলিস তার পুরো বাসিন্দাদের নিয়ে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যেত না। আর বদমাশ রাক্ষসগুলোকে উৎখাত করতে গিয়ে ১৯৪১ এর সেই কুখ্যাত সুনামি তৈরির মরাল নৈতিক দায়িত্বটাও আমায় বইতে হত না।"
জলের তলায় পুঁথির সন্ধানে বিষবৈদ্য, আক্কা, কোভালান আর পাণ্ডুরং-এর সঙ্গে পাঠকও ঝাঁপ দিলেন, আর একের পর এক বাধা বিপত্তির মোকাবিলা করে তারা সেই রসাতলপুরীর খোঁজ পেল কিনা, তা গল্পটা পড়লে জানা যাবে।
মাঝখান থেকে কোনো সিরিজ পড়া শুরু করলে একটু অসুবিধা হয়। প্রধান গল্পকথককে ভালো করে না চিনলে তার বলা গল্পের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করা কিছুটা কঠিন। লেখকের গল্প বলার ধরন আর গতি সেই ফাঁক ভরাট করল অনেকটা। অভিযানের পরতে পরতে রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের আনাগোনা পাঠকমনকে আকৃষ্ট রাখতে সক্ষম। শিশু ও কিশোরদের এই অ্যাডভেঞ্চার খুব ভালো লাগবে আশা করি।
এক্ষেত্রে কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলকে ঠিক মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না। কাহিনীর চলন উপভোগ্য হলেও যুক্তিনির্ভরতার দিক থেকে অনেক প্রশ্ন মাথায় এলো পড়ার সময়। সেসবের উত্তর খোঁজার আগে বিষবৈদ্যের আরো কিছু অভিযানের সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন যা বুঝলাম। দেবজ্যোতিবাবু গোটা উপন্যাস জুড়ে সচেতনভাবে ইংরাজি শব্দের প্রয়োগ থেকে দূরে থেকেছেন। তাতে উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যায় ব্যবহৃত কিছু শব্দের শুদ্ধ বাংলা রূপান্তর কানে লাগলেও এই প্রয়াস সাধুবাদের যোগ্য।
বইয়ের নির্মাণ, প্রচ্ছদ আর প্রিন্ট খুব ভালো। বড় পকেটে রেখে বাসে ট্রামে আরামসে পড়া যায়। বড় ফন্টের জন্য চোখের আরাম হয়। অল্প কিছু মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়ল। বিষয়ের দিক থেকে কিছুটা অলীক লাগলেও মনোরম পাঠের জন্য লেখককে ধন্যবাদ জানাই।
বই ~ নিবাত কবচ অভিযান লেখক ~ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য প্রকাশক ~ অরন্যমন প্রকাশনী প্রচ্ছদ ~ সুমিত রায় প্রথম প্রকাশ ~ বইমেলা ২০১৭ মূদ্রিত মূল্য ~ ১৬০ টাকা
শেষপর্যন্ত বিষবৈদ্য সিরিজ পড়া কমপ্লিট করলাম।এর আগে ২ টো সিরিজ পড়া ছিল, এবার সময় বের করে লাস্ট সিরিজটাও শেষ করে ফেললাম।প্রথমটায় সত্যি বলতে কি এ বইএর প্রতি একটুও আকর্ষন বোধ করিনি।লাস্ট একটাই সিরিজ ছিল, বাকি রাখবো কেনো তাই শুরু করেছিলাম।প্রথম ৬৫ পৃষ্ঠা পর্যন্ত কোনো আগ্রহই জাগেনি, তারপর থেকে তবু একটু পড়ার জোশ পেয়েছি।মূল চরিত্রে আছে - সনাতন, কোভালান,আক্কা ও পান্ডুরঙ। পাতালপুরীর উন্নত টেকনোলজির ব্যবহার দেখে মুগ্ধ হয়েছি। গল্পের বিষয়টা ইন্টারেস্টিং হলেও লেখনীতে অ্যাডভেঞ্চারের ফিলিং কম লেগেছে।অ্যাডভেঞ্চার গল্প পড়ার সময় যে একটা উত্তেজনার ভাব তৈরি হয়, আমার ক্ষেত্রে এখানে তা অনুভব হয়নি।
মহাভারতের বন পর্বে আছে, ইন্দ্র গুরুদক্ষিণা হিসাবে চেয়েছিলেন সমুদ্রের নিচে নিবাত কবচ দানবদের ধ্বংসলীলা। অর্জুন তাই করলেন, তাঁর শক্তির কাছে পাতালপুরীর তিন কোটি দানব ধ্বংস হয়।কিন্তু অর্জুন একটা ভুল করলেন, দানব জাতকে পুরোপুরি নির্মূল না করে দানবদের স্ত্রী সন্তানদের প্রাণভিক্ষা দিলেন। আর কথা তেই আছে শত্রুর শেষ রাখতে নাই।তাঁর ওই ভুলের মাসুল গুনতে হয় পৃথিবীর মানুষদের। ভিতরে ভিতরে আবারও দানব রাজ্য গড়ে ওঠে ও পৃথিবীর মানুষদের ধ্বংসের চক্রান্ত করতে থাকে। এর পরিণতি স্বরূপ '৪১ এর সুনামি আর ভূমিকম্প।