জীবিকা-অনুসন্ধানের ভারসাম্যপূর্ণ পথের সন্ধান পাওয়া যায় রাসূল স.-এর হাদীস ও সাহাবিদের বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যে। সেসব দিকনির্দেশনার ভিত্তিতেই ইমাম আবূ হানীফা রাহ.-এর সুযোগ্য ছাত্র ইমাম মুহাম্মাদ রাহ. হিজরি দ্বিতীয় শতকে রচনা করেছিলেন “আল কাস্ব”। যেখানে তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র তুলে ধরেছেন। ইসলামি অর্থনীতির প্রাচীনতম গ্রন্থ এটি। কিতাবটি ব্যাখ্যা করেছেন ইমাম সারাখসি রাহ. এবং শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবূ গুদ্দাহ রাহ. এতে প্রয়োজনীয় টীকা সংযুক্ত করেছেন। নিঃসন্দেহে হাজার বছর পূর্বে ইসলামের সোনালি-যুগে রচিত এই বইটি জীবিকা অর্জনের পথে আপনার দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।
By considering the time, this book is called the "Microeconomics Book" of Islam.
🔳বইটি ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান শাইবানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক রচিত "আল কাসব" গ্রন্থের প্রথম বাংলা অনুবাদ। বইটি পড়ার আগে সর্বপ্রথম আপনার মাথায় যে জিনিষটি ঢুকিয়ে নিতে হবে, তা হচ্ছে: ইমাম মুহাম্মাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এমন এক যুগের বিদ্বান, যে যুগে ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) এর 'আল-মুওয়াত্তা' ছাড়া বর্তমানে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ অন্য কোনোও হাদীসগ্রন্থ গ্রন্থাকারে সংকলনের কাজ শুরুই হয়নি। তাই, ঐ যুগে রচিত গ্রন্থাবলীর একটি সাধারণ রীতি হলো- সেখানে কোনোও হাদীসগ্রন্থের উদ্বৃতি থাকেনা, এর পরিবর্তে থাকে লেখকের নিজস্ব সনদ, আবার কখনো সনদ উল্লেখ না করেই মূল বক্তব্যটুকুই উল্লেখ করা হয়। 'কিতাবুল কাসব' গ্রন্থে যেসব হাদিস ও আসার উল্লেখ করা হয়েছে, আবু গুদ্দাহ (রাহিমাহুল্লাহ) সেসব হাদীসের উৎস নির্দেশ করার পর সেসব হাদীস প্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থেগুলোর কোন অধ্যায়ের কোন পরিচ্ছেদে স্থান পেয়েছে , তা উল্লেখ করার পাশাপাশি হাদীসের মূল পাঠটিও তুলে ধরেছেন। সেইসাথে হাদীস বিশারদগণের মূল্যায়নও তুলে ধরেছেন (হাদিসের প্রকৃতি, জাল, যঈফ ইত্যাদি)। .
🟩যাইহোক, বইয়ের বিষয়বস্তুতে ফিরে আসি। আবারো লিখছি, বইয়ে প্রচুর যঈফ হাদিস বিদ্যমান। সেইসাথে এক/দুইটা জাল হাদিসও আছে। যা টীকায় উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে। শামসুল আইম্মা সারাখসি (রাহিমাহুল্লাহ) উনার ভূমিকায় লিখেছেন: "গ্রন্থটিতে জ্ঞানের এমন কিছু বিষয় আছে, যে ব্যাপারে অজ্ঞ থাকার কোনও সুযোগ নেই। না জেনে বসে থাকার কোনও উপায় নেই।" .
🟦বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, যা আমাকে নতুনভাবে ভাবনার খোরাক দিয়েছে: "রশি-নির্মাতা, মৃৎশিল্পী বা কুমার, তাঁতি, দর্জি ও পোশাক-শ্রমিক, তাদের সকলের জীবিকা অন্বেষার মধ্যে ভালো কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করার অর্থ বিদ্যমান রয়েছে; কারণ, পবিত্রতা অর্জন ছাড়া সালাত আদায় করা সম্ভব নয়, আর পবিত্রতা অর্জন করতে গেলে একটি পাত্রের প্রয়োজন দেখা দেয় যেখান থেকে পানি নেওয়া হবে; কুয়ো থেকে পানি তোলার জন্য বালতি ও রশির প্রয়োজন পড়ে; সালাত আদায় করতে গেলে লজ্জাস্থান ঢেকে রাখতে হয়, আর তাঁতি-দরজি ও পোশাক শ্রমিকের কাজ ছাড়া বস্ত্র পাওয়া যায়না"। .
🟥উপার্জনের চারটি প্রকার: ইজারা, ব্যবসা, কৃষিকাজ ও হস্তশিল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটিতে। এছাড়া চাষাবাদ ও ব্যবসার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা, জ্ঞানার্জনের বাধ্যবাধকতা, অর্জিত জ্ঞান মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া শীর্ষক বিভিন্ন দ্বন্দেরও প্রাথমিক নিরসন করা হয়েছে বইটিতে। .
🔴অর্থসম্পদ জমা করা, ব্যয় করা, খাদ্যদ্রব্যের অপচয় এবং এই অপচয়ের প্রকারভেদ, সুদ, পোশাক-পরিচ্ছদে অপচয় ও মধ্যপন্থা এসকল বিষয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। এছাড়াও, রিযিক ছাড়া একজন মানুষ অচল। রিযিক মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অবলম্বন। সেই রিযিক ও জীবিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা স্থান পেয়েছে গ্রন্থে। .
🟥লেখক পরিচিতি: মূল বইটি রচিত হয়েছে ১২৫০ বছর আগে। অর্থাৎ ইমাম মুহাম্মাদ শাইবানি (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন একজন তাবে তাবেইন। তিনি ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ'র ছাত্র এবং ইমাম শাফি'ই রাহিমাহুল্লাহ'র শিক্ষক ছিলেন। .
◻️গ্রন্থনা ও ব্যখ্যা: বইয়ের গ্রন্থনা ও ব্যাখ্যা করেছেন "আল-মাবসূত" প্রণেতা শামসুল আইম্মা সারাখসি রাহিমাহুল্লাহ। .
◽️সম্পাদনা উৎসনির্দেশ: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজটি করেছেন আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রাহিমাহুল্লাহ। .
🔶অনুবাদ: বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে বইটি সহজ ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেছেন শায়েখ জিয়াউর রহমান মুন্সী (হাফিজাহুল্লাহ)। শায়েখের পরিচয় ছবিতে বইয়ের ব্যাক কাভারে দেয়া আছে। রিভিউ বড় হয়ে যাওয়ার কারণে এখানে বিস্তারিত লেখছিনা। .
🔷ব্যক্তিগত অভিমত: আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে হালাল জীবিকা সন্ধান আর হালাল পথে অর্জিত জীবিকার ব্যয় করাটা বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে আমাদেরকে আশ্রয় নিতে হয় বিদগ্ধ মুরুব্বি ওস্তাদদের। কিন্তু সবসময় তা সম্ভব হয়ে উঠেনা। জ্ঞানার্জন ফরজ, আর সেই জ্ঞানার্জন যদি হয় জীবিকা উপার্জন আর হালাল-হারাম বিষয়ে, তাহলে তো আর কথাই নেই! এই বইটি হালাল-হারাম বুঝতে এবং সম্পদের আয়ব্যয় সম্পর্কে জানতে সহায়ক বই হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে আলোচনা এই বইয়ে এসেছে, তা হচ্ছে: একজন ব্যক্তি, যিনি প্রসিদ্ধ নয়; তিনি কি পারবেন তার কাছে থাকা জ্ঞান প্রচার করতে? নাকি জ্ঞান প্রচার শুধু প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদেরই কাজ? উত্তর পেতে হলে পড়তে হবে বইটি...!
““ঈমানের পর সর্বোত্তম কাজ কোনটি?'—একব্যক্তি আবূ যার এ-কে এ প্রশ্ন করলে জবাবে তিনি বলেন, 'সালাত আদায় করা ও রুটি খাওয়া।' জবাব শুনে লোকটি তাঁর দিকে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকায়। তখন তিনি (এর ব্যাখ্যা দিয়ে) বলেন, 'রুটি না হলে তো আল্লাহ তাআলার দাসত্ব করা যায় না!”
আমাদের মাঝে কিছু লোক আছে যারা জীবিকার খোঁজে বেরিয়ে অখিরাত ভুলে যায়। অপরদিকে কিছু লোক আছে যারা দুনিয়াবিমুখতার নামে অলস জীবন বেছে নেয় যা তাকে পরবর্তীতে অন্যের অনুগ্রহে বেঁচে থাকতে বাধ্য করে। এই দুই শ্রেণীর লোকজনেরই হেদায়েত প্রয়োজন। বইটার ফোকাস সেদিকেই। জীবিকা অর্জন নি:সন্দেহে ফরয। কিন্তু কতটা উপার্জন ফরয কিংবা আপনার উপার্জনে কার কার প্রয়োজন মেটানো ফরয এসবই বইটাতে সাবলীলভাবে আলোচনা করা হয়েছে।