আবুল কাসেম ফজলুল হক ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর গোটা পেশাজীবন কাটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে গবেষণা ও শিক্ষকতায়। ২০১১ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি কবিতা, ছোটগল্প ও প্রবন্ধ লিখেছেন এবং পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করেছেন। তখন তাঁর লেখার বিষয়বস্তু ছিল সৌন্দর্য, প্রেম, প্রকৃতি ও জীবনদর্শনের অনুসন্ধিৎসা। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় তাঁর মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে তিনি ১৯৬০-এর দশকে ছাত্র-আন্দোলনের প্রগতিশীল ধারায় সক্রিয় ছিলেন। সংস্কৃতি সংসদ, সুকান্ত একাডেমি, উন্মেষ, বাংলাদেশ লেখক শিবির, স্বদেশ চিন্তা সঙ্ঘ প্রভৃতি সংগঠনে থেকে তিনি বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তা ও কর্মে সক্রিয় ছিলেন এবং সর্বজনীন কল্যাণ ও প্রগতিশীল নতুন ভবিষ্যতের আশায় ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে লিখে চলছেন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি ঢাকা শহরে থেকে পরিচিত ও স্বল্পপরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধানত অর্থ সংগ্রহ করে দিয়ে ও আশ্রয় দিয়ে সহায়তা করেছেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক ১৯৬০-এর দশক থেকে নতুন রেনেসাঁস আকাক্সক্ষা করেন। তিনি মনে করেন ভালো কিছু করতে হলে হুজুগ নয়, দরকার গণজাগরণ। সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ইত্যাদি সকল বিষয়ে তাঁর লেখায় প্রগতির তাড়না কাজ করে।
লেখার স্টাইল হাইপ তোলা টাইপ। পড়ার পরে মনে হবে জীবনে প্রেম, আনন্দ, সূক্ষ্ণ রসবোধই সব। বিজ্ঞানের বেইল নাই; টাকাপয়সা, কাজকর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতির বেইল নাই, এগুলো সব স্থূল জিনিস। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি এগুলো হইলো সূক্ষ্ণ জিনিস আর এগুলোরই সব বেইল। এইসব উচ্চমার্গীয় প্রবন্ধ লেখার পরে শ্যালিকা জাহানারার কন্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতে শুনতে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করে এই জিনিসই চিপা দিয়ে লেখক দেখায় গেছেন শেষে।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ পাঠ শেষে পাঠক হিসেবে আমার একটাই উপলব্ধি; লেখক আমাদের সভ্যতার সূক্ষ্ম সৌন্দর্য, নৈতিক মূল্যবোধ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মননশীলতার দিকে নিয়ে যেতে চান। বইয়ের প্রতিটি প্রবন্ধেই তিনি যেন উচ্চারণ করেন, মানুষের জীবন কেবল অর্থ, বৈষয়িক প্রাপ্তি কিংবা প্রযুক্তির চূড়ান্ত উৎকর্ষের জন্য নয়; বরং প্রকৃত জীবনের উদ্দেশ্য হলো আনন্দ, সৌন্দর্য, এবং আত্মিক উন্নয়নের সন্ধান।
বিশেষ করে "মূল্যবোধ ও যুক্তিবিচার" প্রবন্ধে লেখক স্পষ্ট করেছেন, সভ্যতার প্রকৃত চালিকাশক্তি হলো নৈতিকতা এবং যুক্তিবাদ। কেবল আবেগ বা স্থূল ভোগবাদে নয়, তিনি জীবনকে দেখতে শিখিয়েছেন যুক্তির আলোয়। আধুনিক সমাজের ভোগবাদী প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি আমাদের সতর্ক করেছেন। বস্তুগত আরামের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা যেন আত্মার আরাধনা ভুলে না যাই।
লেখার ভঙ্গি কখনো কখনো অতিমাত্রায় রোমান্টিক ও উচ্চমার্গীয় মনে হতে পারে। পাঠক হিসেবে অনুভব হয়, লেখক যেন জীবনের সমস্ত আনন্দ, প্রেম, এবং সূক্ষ্ম রসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। বিজ্ঞান, অর্থনীতি বা রাজনীতির মতো বিষয়গুলিকে তিনি তুলনামূলকভাবে স্থূল বলে এড়িয়ে গেছেন। তবে এটুকু মানতেই হয়, লেখকের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্নকিছু, তিনি পাঠককে স্থূলতা থেকে ছাড়িয়ে সূক্ষ্মতার দিকে আহ্বান জানান।
আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো, এই প্রবন্ধগুলিতে ব্যক্তিগত অনুভব ও সাহিত্যিক নান্দনিকতা অত্যন্ত সমৃদ্ধ। লেখক বারবার জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার কথা বলেছেন। জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয়তার বাইরেও যে গভীর আনন্দ ও সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তার প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেমন তিনি লেখেন, প্রয়োজনীয় আর অপ্রয়োজনীয় জিনিসের পার্থক্য বোঝা যেমন জরুরি, তেমনি জীবনের সার্থকতা বোঝার জন্যও দরকার সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই প্রবন্ধগুলো নান্দনিকতা ও নৈতিকতার এক আন্তরিক অন্বেষণ। বইটি আমাদের শেখায়, সভ্যতার প্রকৃত সাফল্য কেবল প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; বরং মানুষকে মানুষ করে তোলার ভিতরে যে আত্মিক উৎকর্ষ, নৈতিক শক্তি এবং আনন্দ রয়েছে সেইটাই মহান। মোতাহের হোসেন চৌধুরীর এই উচ্চমার্গীয় ভাবনা আমাদের চিন্তার পরিধিকে প্রসারিত করে। যদিও কখনো কখনো তা বাস্তব জীবনের কঠোর বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে না-ও হতে পারে। তবুও, তার চিন্তা-ভাবনার যে সৌন্দর্য ও ঔজ্জ্বল্য, তা যেকোনো পাঠক মনকে ছুঁয়ে যাবে বলেই আমার বিশ্বাস।
এই বইটা আমাকে জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।অবশ্যপাঠ্য একটি বই।
নিচে বইটির কয়েকটি লাইন তুলে দিলাম।
গল্প-উপন্যাস ও কবিতা পড়তে পড়তে মানুষের কি করে যে দ্বিতীয় জন্ম হয় মানুষ নিজেই তা টের পায় না।এখন থেকে সে রূপ ও রসলোকের অধিবাসী এবং সেখান থেকে সমস্ত জীবন রাজার মতো শাসন করা তার কাজ।এতদিন তার চালক ছিল ইন্দ্রিয়, এখন চালক হচ্ছে রূপবোধ, রসবোধ-- অন্যকথায় মূল্যবোধ।