এই গল্পগুলোর সঙ্গে প্রথম আলাপ হওয়ার সময় আমি বেশ বড়োই; মানে বুড়ো-ত্বের দিকে এগোতে শুরু করেছি— এমনই বলা চলে। আর এখন... বউয়ের চাপে রঙিন শার্ট পরতে হলেও মন বলে, অনেক তো হল! তা এহেন অবস্থায় এই ত্রিশটি ছোট্ট-ছোট্ট সু-অলংকৃত ও সুমুদ্রিত পুরোনো বন্ধুকে সামনে পেয়ে প্রথমেই ভয় হল? এই বয়সে, এই দড়কচা-মারা মনেও, গল্পগুলো ভালো লাগবে তো? লাগল! অদ্ভুত ভালো লাগল তাদের পড়তে গিয়ে। কখনও ঠোঁট ঠেলে বেরোল হাসি। কখনও চোখের কোণটা হল একটু ভিজে-ভিজে। আবার শেষ গল্প (যেটা 'আনন্দমেলা'-য় অন্য নামে বেরিয়েছিল) "অসুরদলনী" পড়ে এবারও অন্তিম মোচড়টা গা গরম করে দিল। দারুণ বই! বুড়ো (বা আধবুড়ো) বয়সেও ছোটোবেলার দুর্বল অথচ উন্মুক্ত পৃথিবীকে ছুঁতে চাইলে এই বই অব্যর্থ দাওয়াই। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন।
#কবিরাজদাদুর_ডায়রি লেখক – সৌরভ মুখোপাধ্যায় প্রকাশনী – দ্য ক্যাফে টেবল মূল্য - ৩৫০ টাকা । ক্যাফে টেবলের গত বছরের বইমেলায় প্রকাশিত বইগুলোর তালিকা দেখেই ঠিক করে নিয়েছিলাম এই একটা বই অবশ্যই কিনব। লেখকের নাম একে সৌরভ মুখোপাধ্যায় আর তায় কিশোরদের জন্য লেখা গল্পের সংকলন। আর কোন ভাবনার প্রশ্নই ওঠে না।
শুরু করার আগেই প্রথম ধাক্কাটা কিন্তু খেলাম উৎসর্গের পাতায়, অনেক ধরনের উৎসর্গ এখন অব্দি দেখেছি তা সে কোন কাছের মানুষ হোক কী এমন কেউ যাকে দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হয়েছি বারবার। কিন্তু এই সামনের খোলা পাতায় উৎসর্গের জন্য যে লাইন দুটো লেখা আছে, তা যেন আর সব কিছুর থেকে ভীষণ আলাদা, বড় আন্তরিক! শুরুতেই যেন বড় গভীর ভাবে বইটা ছুঁয়ে গেল মনকে! কী লেখা আছে? তা আপাতত নাহয় না বলাই থাক, নিজেরাই হাত বাড়িয়ে দেখে নিন একবার! তারপর শুরু হলো গল্পের জগতে এক এক পা করে এগিয়ে চলা, প্রথম গল্প ই-থিফ্ ডট কম, এই গল্পটিকে যেন এই বইটির একটি ভূমিকা রূপেই আমার বেশি মনে হয়েছে । যেন এই লেখাটির মধ্যে দিয়ে লেখক আমাদের পথ দেখাচ্ছেন কবিরাজ দাদুর ডায়রিকে খুঁজে বার করার। আর তাঁর দেখান সেই পথ ধরে একটু একটু করে এগিয়ে চলা খেলোয়ার রামখেলাওন, মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুসংবাদ, টংগুই এর মিষ্টি সুরের যাত্রী হয়ে। পড়তে পড়তে কতবার যে শুধু আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছি দমকা হাসি থামানোর, আর কতবার যে লোকজন চাপা হাসির শব্দে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তার হদিশ দেওয়া বোধহয় আমার গার্ডিয়ান এঞ্জেলেরও অসাধ্য! কিন্তু বইয়ের মাঝ বরাবর থেকেই হঠাতই সুরটা যেন এক নিমেষে কেমন বদলে যেতে লাগল, প্রাণ খোলা হাসি আর এক রাশ নির্ভেজাল আনন্দের জায়গা নিল এক অদ্ভুত মননশীলতা, এক অব্যক্ত অনূভূতি। তাকে ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আমার অন্তত নেই। মৃত্যুবাণ, কালবৈশাখীর রাতে, খাদের ধারে ভাঙা রেলিং, অবিনাশ, চকের গুঁড়ো, ভাঙা দেওয়াল, কবিরাজ দাদুর ডায়রি! কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলি? কে বলেছে এই বই শুধু কিশোরদের জন্য ? সহজ সুন্দর অনাবিল ভাষায় মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা সব থেকে দুর্মূল্য অনুভূতি গুলোকে কী অপূর্ব ভাবে লেখক সাজিয়ে রেখেছেন তাঁর বইয়ের পাতায় পাতায়! মিথ্যে বলব না, যে বই পড়তে শুরু করে প্রথমে কিছুতেই আটকাতে পারিনি এক পশলা দমকা হাসি, সেই বইই পড়তে পড়তে কখন যে চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে এলো সত্যি জানিনা। শুধু একটা সময় ঝাপসা চোখ দুটোই যেন বাধ্য করল বইটা নামিয়ে রেখে চশমার কাঁচ দুটো রুমাল দিয়ে মুছে নিতে। রাতেই বাড়ি ফিরে এসে আবার রওনা দিলাম অসম্পুর্ণ পথটুকুর উদ্দেশ্যে। না এখন অনেক পথ চলা বাকি ছিল বৈকী। হাসি কান্নার পর যে উপলব্ধি করা বাকি ছিল জীবনের আরেক সত্যিকে। “টুটবে আগল বারে বারে তোমার দ্বারে। লাগবে আমার ফিরে ফিরে ফিরে-আসার হাওয়া...। আমার যাওয়া তো নয় যাওয়া...।“ সত্যি তো যাওয়া মানে যে শুধু যাওয়া নয় বরং নতুন রূপে আবারো ফিরে আসার এক অঙ্গীকার করে যাওয়া। আর সেই চিরবাস্তবকেই লেখক এঁকে চলেছেন ফেয়ারওয়েল, ধামু, ঋণ আর প্রায়শ্চিত্তের নিখুঁত ছবিতে। না শুধু আনন্দ বা দুঃখের বেশেই আমাদের জীবনে পা রাখেনা নিয়তি সে আসে আরো গভীর এক উদ্দেশ্যে, বড় ভালবেসে আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় সে জীবনের এক অজানা দিককে চেনাতে! শুধু বিশ্বাস করে তাঁর বাড়ানো হাতটাকে আঁকড়ে ধরার অপেক্ষা! তিরিশটা অমূল্য রত্ন দিয়ে সাজানো এই রত্নভাণ্ডারের ভ্রমনসমাপ্তি হলো অবশেষে ‘অসুরদলনী’-র আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে। ঠিকই তো মন যখন আনন্দ আর দুঃখ দুই অনুভূতিকেই সমান ভাবে উপলব্ধি করতে পারে, তখনই তো আমাদের মনের মাঝে পা রাখবেন তিনি! আর এই সমাপ্তির পর সত্যি আর কিচ্ছু নতুন করে বলার নেই আমার। শুধু আগে যে কথাটা বলেছিলাম তা আবারো বলি। বড় নিশ্চিন্ত লাগছে যেন আজ, আগামী প্রজন্মের শিশু কিশোরদের জন্য প্রস্তুত থাকছে এক নতুন যুগের রত্নভাণ্ডার। দুলেন্দ্র ভৌমিক, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। যাদের লেখা পড়ে আমরা বড় হয়েছি তাদেরই মতন বড় ভালবেসে কচিকাচাদের জন্য কলম তুলে নিয়েছেন আরেক অসামান্য রচনাকার। সব শেষে ধন্যবাদ জানাই, দ্য ক্যাফে টেবলকে এই রকম অসাধারণ একটি বই আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য। ধন্যবাদ জালানাম প্রচ্ছদ ও অলংকরণ শিল্পী নচিকেতা মাহাতকে, প্রতিটি গল্পের সাথে তালমিলিয়ে এত নিখুঁত ছবি দিয়ে বইটিকে সাজিয়ে দিয়েছেন মানুষটি। লেখককে ধন্যবাদ দিতে পারলাম না, কারণ এই রত্নভাণ্ডার যিনি পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারেন, শুধু একটি ছোট্ট ধন্যবাদ দিয়ে তাকে ছোট করতে পারলাম না। শুধু মন থেকে প্রত্যাশা করলাম তাঁর হাত দিয়ে যেন এইরকম আরো আরো দুর্লভ কোহিনুরের জন্ম হোক! আর সেই প্রতীক্ষাতেই রইলাম আমরা, তাঁর পাঠককুল! *মিথিল...