সমগ্র বাংলা এক ভয়ানক দুর্যোগে আক্রান্ত, পলাশীর যুদ্ধের পর বক্সার এর যুদ্ধ, নীলকরদের অত্যাচার আর কিছু খুনে জমিদারদের অত্যাচারে বাংলায় শুরু হয়েছে দুর্ভিক্ষ। সাথে আছে এশিয়াটিক কলেরা,ঠগি আর না খেতে পেয়ে নিজের স্বগোত্রের মাংস খাওয়া নরখাদকের দল। বাংলার গ্রাম, পথ-প্রান্তর উজাড় হয়ে গেছে। এমই এক ভয়ানক ভয়ঙ্কর সময়ে রংপুরের প্রাচীন জমিদার পরিবার এর শেষ চিহ্ন, বক্সারের যুদ্ধের সেনাপতি আহ্মাদ নকীব চৌধুরী তার বাল্যবন্ধু ও তাদের নায়েব এর ছেলে লখাইকে নিয়ে কলকাতা যাবার উদ্দেশ্যে ভিটে ছাড়ে। পথিমধ্যে ওত পেতে থাকে ঠগি, নীলকর আর অত্যাচারী জমিদার এর সাথে নরখাদক তান্ত্রিকের দল। এসবের মাঝেও এগিয়ে চলে বাংলার শেষ সেনাপতি। পদে পদে বিপদ আর মৃত্যুর হাতছানির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলে তার পদযাত্রা। এই যাত্রাই কি হবে তার শেষযাত্রা? বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে নতুন কোন বসত কি খুঁজে পাবে সে, আর বাংলার বুলবুল খ্যাত জোহরা, তারই বা কি হবে? জলের উপর মানুষ খুন করা পাঙ্গু ঠগি, তাদের পরিণতি? এসব জানতে হলে পাঠককে ডুব দিতে হবে ৭৬ এর মহামনন্ত্বর এর সেই বিপদাচ্ছন্ন, দুর্যোগময় ও একই সাথে উত্তেজনাকর সময়ের আখ্যান, শেষযাত্রা'য়।
গল্পের মূল কাহিনী গড়ে উঠেছে রংপুর এলাকার জমিদারী হারানো জমিদার ফতেহ আলী চৌধুরীর পুত্র আহমাদ নকীব চৌধুরী এবং আরেক জমিদার কন্যা জোহরা বেগমকে ঘীরে। মূলত ইংরেজ শাসন শুরু হওয়ার পর বাংলার কৃষককে নীলচাষে বাধ্য করায় এবং কয়েকগুণ বেশী খাজনা দেয়ার আইন করায় যে মহাদুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়েছিলো সেসবই উঠে এসেছে পুরো বই জুড়ে।
বক্সার যুদ্ধফেরত নকীব আদমখোরদের (মানুষ খায় এমন লোক) দৌরাত্মে এবং বেঁচে থাকার তাগিদেই নিজ এলাকা ছেড়ে কলকাতা যাওয়ার পরিকল্পনা করে। সঙ্গী হয় লক্ষণ নামের আরেক বন্ধু। পথিমধ্যে পরিচয় হয় ঈশানী নামের এক মহিলার সাথে। পরবর্তীতে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তারা কলকাতা পৌছুতে পারে কিনা কিংবা কলকাতাতে আদৌ তারা পৌছুতে চায় কিনা সেসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে ১৫৮ পৃষ্টার এই বইয়ে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
প্রথমেই লেখককে ধন্যবাদ এরকম একটা সময়কে নিয়ে লেখার জন্য। আমার মনে হয়না বাংলায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তরকে নিয়ে খুব বেশী ফিকশন আছে। তবে ঐতিহাসিক বিষয়কে ভিত্তি করে ফিকশন লিখতে গেলে সবসময়ই ইতিহাস এবং ফিকশনের ব্যালান্সের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। আমার মনে হয়েছে লেখক ফিকশনেই বেশী মনোনিবেশ করেছেন।
একটা উদাহরণ দিই। লেখক পুরো বইয়ে শুধু ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কথাই উল্লেখ করেছেন অথচ মেদীনিপুরের বিদ্রোহ কিংবা সমরেশ গাজীর বিদ্রোহ কিন্তু তখন তুঙ্গে ছিলো। নীলচাষের কথা উল্লেখ করলে স্বন্দীপের কৃষক বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করাই যেতো। হয়তো বলা যায় কাহিনীর প্রয়োজনে আসেনি তবে ইতিহাসকে উপজীব্য করলে ইতিহাসের ঋণশোধের একটা ব্যাপারও কিন্তু থাকে। আরেকটা বিষয় লেখক খুব সুন্দর করে নিজের মতো ফুটিয়ে তুলেছেন। নীলচাষের বিরোধীতা করে কৃষকদের নীলকুঠি জ্বালিয়ে নীলকরদের তাড়িয়ে দেওয়া ছিলো তখনকার বিদ্রোহের মূল অস্ত্র। সেটা বেশ সুন্দর করে বলেছেন গল্পে।
সর্বোপরি আমার কাছে এভারেজ লেগেছে। আরো সময় নিয়ে আরো বড় পরিসরে লিখলে হয়তো আরো ভালো হতো। তবে এই গল্পে আমি স্যাটিসফাইড নই।