“All warfare is based on deception..” ― Sun tzu, The Art of War - ইনজুরি টাইম - নিজের সাথে ঘটে যাওয়া এক বিশেষ ঘটনার পরে পাশের দেশ ভারতে এসে পড়ে বাংলাদেশী পল্টু। সেখানে একইসাথে পড়া এক বন্ধুর আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যায় সে। কিন্তু সেখানেও অতীতের সেই ঘটনা তাকে তাড়া করে বেড়ায়। - এদিকে ভারতে পরপর কিছু নাশকতামূলক ঘটনা ঘটলে নড়েচড়ে বসে ভারতীয় কিছু গোয়েন্দা এবং সরকারি বাহিনী। এদের ভেতরে একটি গোয়েন্দা বাহিনী তাদের সেরা সিক্রেট এজেন্ট "হক" কে দায়িত্ব দেয় এই ঘটনা তদন্তে। নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেরা কিছু অফিসার নিয়ে হক সেই মিশনে নেমে বুঝতে পারে আতঙ্কবাদীরা ভয়াবহ কিছু প্লান করছে ভারতের বুকে, ধীরে ধীরে তাদের টিম জানতে পারে এ ব্যপারে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। - এখন এক বিশেষ আতঙ্কবাদী গোষ্ঠী কী ধামাকা করার পরিকল্পনা করছে ভারতে? এই পরিকল্পনার সাথে পশ্চিমবঙ্গের এক মফস্বল শহরের মানুষজন কীভাবে জড়িয়ে যায়? হক আর তার টিম কী পারবে সময়ের আগে সেই আতঙ্কবাদী গোষ্ঠীকে থামাতে? তা জানার জন্য পড়তে হবে লেখক দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায় এর পলিটিক্যাল থ্রিলার ঘরানার উপন্যাস "ইনজুরি টাইম"। - ইনজুরি টাইম উপন্যাসটির নামকরণ ফুটবলের একটি নিয়ম থেকে নেয়া হলেও বইটি মূলত পলিটিক্যাল থ্রিলারই মনে হলো। সাথে কিছুটা এসপিওনাজ এবং কন্সপিরেসি থ্রিলারের ভাইব ছিলো। বইটি প্রথমে ভারত থেকে দ্য ক্যাফে টেবিল প্রকাশ করলেও বইটির বাংলাদেশী সংস্করণ যেটা আমি পড়েছি সেটি প্রতিচ্ছবি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইয়ের প্লটটা এ অঞ্চলের জন্য ইন্টারেস্টিং ছিলো, তবে প্লট অনুসারে বইয়ের লেখনশৈলী আমার কাছে তেমন একটা ভালো লাগলো না। বইয়ের কিছু থিম খুবই জেনারেলাইজড ফরম্যাটে দেখানো হয়েছে। বইটির পেসিং অবশ্য বেশিরভাগ সময়েই মনে হয়েছে খুবই ফাস্ট, যা এ ধরনের থ্রিলারের জন্য আবশ্যক একটি ব্যপার। - ইনজুরি টাইম বইতে নানা ধরনের চরিত্র ছিলো বেশ ভালো পরিমাণেই। এই বইয়ের যে চরিত্রকে নিয়ে মূল টুইস্ট দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তা একটু ভালোভাবে পড়লেই হাফ টাইমের আগেই বোঝা যায়, তাই এই ব্যপারটা খুবই দুর্বল দিক লাগলো বইয়ের। বইয়ের ভাষাশৈলী এবং সংলাপও অ্যাভারেজ মানের লাগলো। বইয়ের কিছু ব্যপারে বিশেষ করে ফুটবল খেলার সময়ের ডিটেলিং অবশ্য বেশ ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। - ইনজুরি টাইম বইয়ের বাংলাদেশ সংস্করণের মান মুদ্রিত মূল্যের তুলনায় খুব একটা কোয়ালিটিফুল মনে হলো না। পুরো বইতে ছোটখাটো টাইপিং মিস্টেক তো ছিলোই, তবে সবথেকে দৃষ্টিকটু লেগেছে প্রতিটি "পি" এর বদলে "প্রি" প্রিন্টে আসার ব্যপারটা। এছাড়াও প্রচ্ছদও গতানুগতিক লাগলো বইটির। - এক কথায়, ইনজুরি টাইম বইতে এ অঞ্চলের রাজনৈতিক-আতঙ্কবাদের অবস্থা তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টা করা হয়েছে। যারা এ ধরনের বই পড়তে পছন্দ করেন তাদের হয়তো বইটি আমার থেকে বেশি ভালো লাগবে।
"রাত কত হল? উত্তর মেলে না। কেননা, অন্ধ কাল যুগ-যুগান্তরের গোলকধাঁধায় ঘোরে, পথ অজানা, পথের শেষ কোথায় খেয়াল নেই। ... সেখানে মানুষগুলো সব ইতিহাসের ছেঁড়া পাতার মতো ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে — মশালের আলোয় ছায়ায় তাদের মুখে বিভীষিকার উল্কি পরানো।"
অনেকদিন আগে সেই মানুষটি নিঃসীম অন্ধকারের ছবি আঁকতে গিয়ে এই কথাগুলো লিখেছিলেন। আজ, একবিংশ শতাব্দীর এক রাতে একটি বই শেষ করে মনে হল, ওই একই অন্ধকারে তলিয়ে আছি আমরা আজও। সেই অন্ধকারেই কিছু অন্ধ মানুষ লড়ে যায়। কেউ চায় রক্ত, কেউ বদলা, কেউ অর্থ, আর কেউ ক্ষমতা। আমরা এদের সব্বাইকে চিনি। ভোটের মরসুমে এরা আবরণ সরিয়ে বেরিয়েও আসে প্রকাশ্যে, আমার-আপনার মাঝে। কিন্তু আমরা কি কখনও এদের খেলাটা ভেঙে দিতে পারব? নাকি আমাদের বেঁচে থাকার সময়টা কেটে যাবে ইনজুরি টাইমের মতো করে গোল শোধ দেওয়ার মরিয়া চেষ্টাতেই?
এপার বাংলায় পলিটিক্যাল থ্রিলার লেখা সহজ নয়। যে আবহে আমরা বাস করি তাতে শত্রুপক্ষীয় বলে দেগে আমাদের বোন, স্ত্রী, বা মেয়েকে লাঞ্ছিত করে দেওয়া এই নীল-সাদা জমানায় নেহাত চাইল্ডস প্লে। এহেন পরিবেশে অধিকাংশ লেখকই 'আমি তো এমনি-এমনি খাই' নীতি নেন। কিন্তু দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায় তেমন নন। এর আগেও তিনি প্রমাণ করেছেন, সত্যি কথা স্পষ্ট করে বলতে, এবং সেই সত্যির ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে একটি রুদ্ধশ্বাস রহস্য উপন্যাস লিখতে তিনি ভয় পান না। এই উপন্যাসে যে বিস্ফোরক বিষয় নিয়ে দেবাঞ্জন একটি নো-হোল্ডস-বারড থ্রিলার লিখেছেন, তা লিখতে গেলে বুকের পাটা এবং কলমের জোর দুটিই লাগে বিপুল পরিমাণে। তাই আগে তাঁর উদ্দেশে একটি ঠকাস স্যালুট। এবার আসি উপন্যাসের কথায়। অত্যন্ত গতিময়, কিঞ্চিৎ অমসৃণ, কিন্তু শেষ বিচারে আনপুটডাউনেবল এই থ্রিলারের গল্প রীতিমতো জটিল। এতে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গা জুড়ে একটি মাকড়সার মতো জাল বিস্তার করে একদল সন্ত্রাসবাদী। তার সঙ্গেই জড়িয়ে যায় শাসক দলের ক্ষমতার রাজনীতি এবং এই বাংলার সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কার্যত সরকারি মদতে জামাতিকরণ। এসে পড়েন এক সাহসিনী অভিনেত্রী। আসে পুলিশ, অ্যান্টি টেররিস্ট ইউনিট। আসে মিডিয়া। আর এই চক্রব্যূহের মধ্যে পড়ে যায় বাংলাদেশের একটি ছেলে, গাজোলের একটা স্কুলের কিছু ছেলে, আর একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট। এই উপন্যাসের 'ইনজুরি টাইম' নামের সার্থকতা বুঝতে গেলে অবশ্য আপনাকে শেষ অবধি পড়তেই হবে। তাহলেই বুঝবেন, কীভাবে খেলা শেষ হয়েও শেষ না হওয়ার ওই সময়টুকুতে তৈরি হয় এক নতুন খেলা। কীভাবে উঠে আসে এক নতুন বিজেতা! এই বইয়ের একমাত্র সমস্যার দিক হল এর নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ। একসঙ্গে এত জায়গায় এত রকমের চরিত্র এসেছে এই উপন্যাসে যে ট্র্যাক রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছে। আর হ্যাঁ, বিষয়গত কারণেই এই উপন্যাস দেবাঞ্জনের লেখা অন্য উপন্যাসের তুলনায় রুক্ষ, এবং কিঞ্চিৎ দুষ্পাঠ্য। এ-বাদে এই উপন্যাসের বিরুদ্ধে আমি কিছু বলব না। সাম্প্রতিক কালে লেখা অন্যতম সেরা এই থ্রিলারটি অবশ্যই পড়া উচিত। শুধু বিনোদনের জন্য নয়। আমাদের সামনে একটি কালো আয়না তুলে ধরে বাস্তবকে দেখতে বাধ্য করার ভূমিকাও এই বইটি পালন করবে সগর্বে। তবেই তো আসবে সেই সময়, যখন~ "উদ্দেশ্য সকলের কাছে স্পষ্ট নয়, কেবল আগ্রহে সকলে এক; মৃত্যুবিপদকে তুচ্ছ করেছে সকলের সম্মিলিত সঞ্চলমান ইচ্ছার বেগ।" আশা রাখি, ভারতবর্ষ আর বাংলাদেশ তাদের শিশুতীর্থ খুঁজে পাবে একদিন। তবে তার আগের হিংসা ও দ্বন্দ্বয় ভরা চোট-আঘাতের দিনগুলোর খতিয়ান বুঝতে চাইলে অবশ্যই পড়ুন 'ইনজুরি টাইম।'
ধরুন আপনাকে বলা হল একটা গল্প লিখতে হবে Terrorism নিয়ে। আপনি বললেন ঠিক আছে। তারপর বলা হল এক layer politics ও জড়াতে হবে। আপনি বললেন ঠিক আছে, করাই যায়👍। তারপর বলা হল এর মধ্যে ফুটবল খেলাও দিতে হবে। আপনি বলবেন "দাদা কি নেশা করেছেন?" এই বই এর লেখক ঠিক এই জায়গাতেই আপনাকে ভুল প্রমাণ করবেন। 🌚
একদিকে একটা বিস্ফোরণ তার নেপথ্যে আছে বিরাট এক জঙ্গিগোষ্ঠী যাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা আরও ভয়ানক। একের পর এক ব্লগার দের খুন, এবং সব শেষে এক নায়িকার হাই প্রোফাইল মার্ডার। চলত�� থাকে তদন্ত।
গল্প এই টুকুতেই শেষ না, আরও layer আছে। এই সবের সাথে একটা এলাকায় বেআইনি অস্ত্রের কারবার, তার সাথে জড়িয়ে "ওপর মহল" এবং local S.I ভালো কাজের জন্য suspend ও হন।
তার সাথে আছে একটা টানটান ফুটবল টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি। ⚽🥅
🖌️ এত গুলো গল্প সব সমান্তরাল ভাবে চলছে। লেখক তার দক্ষতায় সবকটা শাখা প্রশাখাকে নিয়ে এত সুন্দর বিনুনি বুনেছেন সত্যি ভাবা যায়না। সব কটা দিককে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটারও খেই হারিয়ে গেছে এই অভিযোগ আপনি আনতে পারবেন না।
গল্পের প্লট খুব অরিজিনাল। এমন ভাবে দুটো পুরো আলাদা জগৎ কে সুন্দর করে যোগ করা স্বপ্নাতিত।
🤔🤔বইয়ের প্রধান উপাদান হচ্ছে বেগ আর রহস্য। এত দ্রুত জিনিস জড়িয়ে যাবে, আর এত গভীর হয়ে যাবে রহস্য যে আপনি বইয়ের ভেতরেই ঢুকে যাবেন। এমনকি বই রেখে দেওয়ার পরও ভাববেন কার পর কি হচ্ছে। শেষে এমন কয়েকটা টুইস্ট আছে যে কত্থেকে কি হয়ে গেল ধরতে পারবেন না। এরকম ভাবে গোল খাওয়া আপনারও ভালো লাগবে।
খুব জোর দুদিন লাগবে 250 পাতার এই বই সারতে। তাই লেগে পড়ুন এই নিয়ে আর দেখুন ইনজুরি টাইমে গোল দিয়ে আপনার দল যেতে নাকি। 😉
🔹বই সংক্রান্ত বিভিন্ন গ্রুপে বারবার রিভিউ দেখে প্রায় বছরখানেক আগেই কিনেছিলাম বইটি, পড়া হয়নি এতদিন । সপ্তাহ খানেক আগে হঠাৎই শুরু করেছিলাম এই বইটি । গল্প যত এগিয়েছে আমি ততই নিজেকে দোষারোপ করে গেছি বইটি এতদিন ফেলে রাখার জন্য । লেখক ‘দেবাঞ্জন মুখোপাধ্যায়’ দাদার কলম থেকে যে রুদ্ধশ্বাস থ্রিলারটি সৃষ্টি হয়েছে তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে যত থ্রিলার লেখা হয়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম ।
🔹এই থ্রিলারের জঁনরা কি ? সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয় , এটি একটি ‛সোশ্যাল-পলিটিক্যাল ক্রাইম থ্রিলার’ , যার আরেকটি সাবপ্লট হিসেবে আছে ফুটবল । একটা কথা স্বীকার করতেই হয়, পুরো উপন্যাস জুড়ে লেখকের কলম প্রতিটি প্লটকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে যেন কোনোটির অস্তিত্ব এবং আধিক্য অন্যগুলিকে ম্রিয়মাণ না করতে পারে ।
🔸একটি থ্রিলারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এর গতি । কলকাতা, বাংলাদেশ এবং দুই দেশের বর্ডারের প্রেক্ষাপটে তৈরী এই উপন্যাস যথেষ্ট গতিশীল এবং পাঠককে উপন্যাসের পাতার সাথে আটকে রাখতে সম্পূর্ণভাবে সফল । গল্প যতই এগিয়েছে ততই বাড়তে থেকেছে চরিত্রের আধিক্য এবং গল্পের গতি । এক কিশোরের প্রাণনাশের হুমকি, মেদিনীপুরের মফঃস্বলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, সীমান্তে জালনোট এবং ড্রাগস পাচার, আততায়ীর হাতে এক নামকরা অভিনেত্রীর খুন, অ্যাসিড ভিক্টিম সুমনার লড়াই - সবকিছু মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে গল্প । গল্পের প্রয়োজনেই এসেছে - সৎ পুলিশ অফিসার প্রতীক সেন, দূর্নীতিগ্রস্ত বিধায়ক, প্রতিবন্ধী ভিখারী - এইরকম নানা চরিত্র । এই সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে মফঃস্বলের একদল যুবক এবং তাদের ফুটবল টুর্নামেন্ট ।
🔹গল্পের মূল দুই চরিত্র হক (HAWK) এবং ইখলাস রুবেলকে যেভাবে যত্ন নিয়ে সৃষ্টি করেছেন লেখক তাতে পাঠক দুজনের প্রেমে পড়তেই বাধ্য । লেখকের গল্প বলার ভঙ্গী এতই সুন্দর যে পাঠককে সরাসরি নিয়ে গিয়ে ফেলে গল্পের মধ্যে , নিজেকে মনে হয় গল্পেরই চরিত্র । যেন পড়ার সাথে সাথে সব ঘটনা চোখের সামনেই ঘটছে । আদ্যোপান্ত সাসপেন্সে পরিপূর্ণ এই উপন্যাসের ক্লাইম্যাক্স বর্ণনা থ্রিলারটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে । সবমিলিয়ে বলা যায় বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এইরকম উপন্যাস খুব বেশি লেখা হয়েছে বলে অন্তত আমার মনে হয় না । চরম বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়াতে হলে অবশ্যই পড়ুন এই উপন্যাস ।
সমস্যা হল ম্যাচিওরিটি নিয়ে। প্রচ্ছদের ব্যাপারে যে ম্যাচিওরিটি দ্য কাফে টেবল সহ বেশ কিছু প্রকাশকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো চালু হওয়ার আগে অন্যদের মধ্যে সেই বোধ আসবে বলে মনে হচ্ছে না। সারাদিন ফেসবুক, সুলভ কমপ্লেক্সের ওপর ঝাঁ-চকচকে হোর্ডিং দেখেও কিছুতেই তাঁরা বুঝে উঠতে পারছেন না, যে মান্ধাতার আমল থেকে চলে আসা প্রচ্ছদে আর যাই হোক, নতুন প্রজন্মের চিঁড়ে ভেজবার নয়!
হ্যাঁ আগে যত খুশি ডিম, টমেটো, কথাঞ্জলি ছুঁড়ে নিন। তারপর স্টক শেষ হয়ে গেলে একটু জিরিয়ে নিয়ে ভাবুন, আপনি না হয় বইপত্তর পড়েন। বইয়ের কভার জ্যাকেট খুলে দিলেও দিব্যি পড়ে ফেলবেন। কিন্তু আজকালকার ছেলে-মেয়ে মানে যাদের নেশাটা নেই, বা আমার-আপনার মত বই-মাতাল নয়, তাদের স্টাডি টেবিলে ইনফিনিটি ওয়ারের পোস্টারওয়ালা ডিভিডি (বা ট্যাব) আর ঘনাদা সমগ্র রেখে দিন। তাহলে সে কোনটা তুলবে? নিশ্চয়ই ওই শিঙ্গাড়ামার্কা বোরিং মুখটা নয়! সে তার পেটের ভেতর যতই বিশ্বমানের কনটেন্ট থাকুক না কেন!
এখন এর জায়গায় ইনজুরি টাইম, মিশন পৃথিবী বা কালসন্দর্ভার মত কভারগুলো দিয়ে দেখুন। না আমি কখনই বলছি না সেগুলো মার্বেল গ্রাফিক্সের সাথে কমপিট করতে পারে। কিন্তু অ্যাটলিস্ট সে নেড়েচেড়ে দেখবে। আর কে না জানে এই নেড়েচেড়ে দেখা আর নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়ার মাঝে ফাঁকটা খুবই সামান্য। পৃথিবীর সমস্ত রকম নেশাই এইসব নেড়েচেড়ে দেখার খুচরো কৌতূহল থেকেই জন্ম নেয়। আর সেখানে বই তো নেশাদের রাজা!
তো যে জন্য এতকিছু বলা৷ ইনজুরি টাইমের কভার কারোর স্ট্যাটাস সিম্বল হিসেবে কাজ করলেও অবাক হব না। এত স্মার্ট আর অল্পতেই চোখে পড়ার মত কাজ বাংলা সাহিত্যে খুবই কম। গ্রাফিক্স শিল্পী একতা ভট্টাচার্য লেখকের আগের দুটি বইয়েরও (দ্য কাফে টেবল প্রকাশিত) কভার বানিয়েছিলেন। কিন্তু ইনজুরি টাইমের কাজ আগের সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে!
এবার ডুব দেওয়ার আগে কটা লাইফ জ্যাকেটের কথা বলে নিই। সেটা হল, উক্ত বইয়ের প্রচারে আমি সরাসরি যুক্ত। এমনকী বইয়ের কিছু কিছু অংশ পড়ার আগেই ব্রিফিংয়ের দৌলতে আমার জানা হয়ে গেছিল। তাই এই পাঠপ্রতিক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা আমার পক্ষে কিন্তু বেশ চাপের।
ওকে প্লট নিয়ে কিছু বলব না। খেটেখুটে লেখক আর আমি মিলে যখন টিজারখানা বানিয়েইছি, তখন নীচে সেটাই দিয়ে দিলাম।
সত্যি কথা বলতে কী, এ গল্প আমাদের খুব চেনা। প্রত্যেকটা নিউজ চ্যানেল এ গল্প আমাদের রোজ রোজ বলে যায়৷ ব্রেকফাস্টের সাথে কয়েকটা অস্ত্র উদ্ধার, মেট্রোর চাকায় স্ক্রল হতে থাকা ফেসবুকে একজন দুজন উল্টোমুখে হাঁটা মানুষের মুণ্ডুপাত বা ধরুন কাবাবের ওপর গোলমরিচ গুঁড়োর মত ছড়িয়ে যাওয়া কিছু আমিষ বিস্ফোরণ! এসব তো আমাদের রোজের রুটিন। আমাদের আজকের ইতিহাস!
না আমি খুন, রাজনীতি কোনটাই তেমন বুঝি না। খবরের কাগজ বলতে এখনও রবিবাসরীয় আর শব্দছকই মনে পড়ে। কিন্তু তবু আমাদের মত উদাসীন সেজে থাকা লোকদেরও এই বহুমাত্রিক ক্যানভাসে ডুবে যেতে অসুবিধা হয় না বিন্দুমাত্র।
বহুমাত্রিক বললাম কারণ, এখানে গল্প খুব কম সময়ের জন্যই লেখকের চোখে থেকেছে। তার থেকে অনেক বেশি গল্পের ক্যামেরা ঘুরে বেড়িয়েছে কখনও বর্ডার চেকপোস্টে ভিক্ষা করে খাওয়া প্রতিবন্ধীর চোখে, কখনও বা তা আশ্রয় করে অদ্ভুত প্রতিভাসম্��ন্ন পল্টুর কিশোর চোখের বিষ্ময়ে--- তো পরক্ষণেই ড্রোন শট হয়ে উড়ে বেড়ায় গোটা মালদা শহর। নিঃসন্দেহে লেখার অ্যাঙ্গেল নিয়ে নতুন ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চেয়েছেন লেখক। বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন একপেশে গল্প বলার থেকে। আর এভাবেই এই আখ্যান পেয়েছে অন্য গতি। অন্য এক ছুটে চলা। কিন্তু মাধ্যমটা যখন লেখনী, তাই বার বার পার্সপেক্টিভ বদলের ফলে কোথাও কোথাও জার্কশট এসে পড়েছে। যেমন এক জায়গায় ঢাকার একটা দৃশ্যের পরের প্যারাতেই চলে এসেছে মালদার কথা। এখানে অনুচ্ছেদ ভাগের স্পেসটা আরেকটু বাড়ানো দরকার ছিল।
আর যদি ওঠে ডিটেলিংয়ের কথা, তাহলে প্রথমেই ফুটবল ম্যাচগুলোর কথা বলতে হয়। গ্যালারিতে বসে নয়, পাঠক এখানে খেলা দেখবেন মাঠের মধ্যে থেকেই। আর এই যে যারা ফুটবল খেলছে তাদের জীবনযাপন, মুখের ভাষা খুব ভালভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। যেমন দুর্দান্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বর্ণনা জুড়ে তৈরি করেছেন ইখলাস রুবেল চরিত্রটিকে। চোখে পড়তে বাধ্য হকের খুঁটিনাটিও । কিন্তু তা বলে পাতার পর পাতা বর্ণনা দিয়ে রূপদর্শন করাননি লেখক। এ ব্যাপারে যথেষ্ট পরিমিতি বোধের পরিচয় রেখেছেন তিনি।
তবে অ্যাকশন সিকুয়েন্সগুলো আরেকটু ডিটেলড হলে ভাল হত। শুধু "এনটিসি এজেন্ট ভালই জানেন কবজা করতে" টাইপ না লিখে ক্যামেরায় আরেকটু ফোকাস দেওয়ার দরকার ছিল। আমি বলছি না wwe-এর রানিং কমেন্ট্রি করতে হবে। কিন্তু দিনের শেষে সব কিছুই যখন এসে পড়ে পাঠকের পাতে, তখন সে যাতে মনের এলইডিতে সবটা দেখতে পায়, তার দায় কিছুটা কলমের ওপর বর্তায় বৈকি।
এটাকে অবশ্য লেখকের সাংবাদিক সত্ত্বা বলেও ধরে নেওয়া যায়। বিশেষ করে আগের বইগুলোতে বহু জায়গায় উপন্যাস আটকা পড়েছিল প্রতিবেদনের খাঁচায়। যদিও ইনজুরিতে সেই দোষটুকু (যদি একে দোষ বলা যায় তো) অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন লেখক। খবরের কাগজ ছেড়ে অনেক বেশি মানুষের মাঝে নেমে এসেছে তাঁর কলম। আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে, এত বড় ক্যানভাসে সূক্ষ্ম তুলির কাজ করলে পাঠকের চোখে পড়ত না তেমন। তবে এটাও ভুলে গেলে চলবে না, মোটা ফ্ল্যাট ব্রাশও কিন্তু তৈরি হয় একটা একটা করে তন্তু জুড়ে জুড়ে। তাই ক্যানভাসের বন্ধুর পথ ধরে ছোটার সময় তাদের একেক জনের আঁচড় এড়াবেন কী করে? কী ভাবে এড়াবেন মূর্তি নদীর ওপর সূর্য ডুবে যাওয়ার দৃশ্য? রাস্তার মোড়ের সেই সাহসী মহিলা সুমনার "পাশে আছি..." বলে যাওয়াটুকু?
আরেকটা কথা, ঢাকার জনৈক সমাজ সেবকের এক পাতা বক্তৃতা ছুটতে থাকা কাহিনিতে বেশ খানিক হোঁচট এনে দেয়। বোধকরি এই কথাগুলো লেখক নিজের অনুভব থেকেই ওনার মুখ দিয়ে বলিয়ে নিতে চেয়েছেন। কিন্তু, এই অধ্যায় শোহবাবের ফোন রাখার পরে, শেষ করা গেলে গতিটা বজায় থাকত বেশ। ও হ্যাঁ, বলতেই ভুলে যাচ্ছিলাম। আগেরবার "হাতে কোনো তাস থাকছে না, একটা তাসের ওপরও নিজের ইনটিউশন বাজি রাখতে পারছি না" বলে বেশ ঝাঁপাঝাঁপি করেছিলাম। এবার কিন্তু সযত্নে তাসগুলো আড়াল করে রেখেছিলেন লেখক। এমনকী শেষ চ্যাপটারের আগে অব্দিও মূল কালপ্রিট থেকে যায় আড়ালে। অবশ্য দীক্ষিত পাঠক হলে একটা অংশে মাথার মধ্যে হালকা একটা সন্দেহ আসতে পারে। "তবে কী এই?” মার্কা ব্যাপার আর কী!
"Suspense is all about making promises to your reader. You are telling your reader, "I know something, you dont know. But I promise I'll tell you if you keep going"- Dan Brown.
আমার এই ধাঁচটাই বেশ পছন্দ। আর হাফটাইম ইনজুরি টাইমের ভাগগুলো খুবই অর্থবহভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অল্প কথায় আয়নার দৃশ্যটায় যা সুন্দর পোর্ট্রেট এসেছে না! লাজবাব!
ব্যস, দ্যাটস অল। অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে না বসলেও, হাতে একটু সময় নিয়ে পড়তে বসবেন। খাপছাড়াভাবে পড়লে থ্রিলার জমে না বস। তবে কী জানেন তো, এই উপন্যাসের চালচলন এত বেশি রকমের প্রাসঙ্গিক যে থ্রিলারের স্ট্যাম্প মেরে পাঠক বৃত্ত সীমিত করে দিতে মন চায় না। সময়কেও তো ধরে রাখা দরকার৷ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও তুলে রাখা দরকার ইতিহাসের সমস্ত ক্ষত। সমস্ত রকম না পাওয়াগুলো।
পুনশ্চ- বইয়ের ইলাস্ট্রেশনগুলো কল্যাণ দাসের করা। মোটামুটি ধরণের বলা যায়। কিন্তু---
১) গল্পে মুখে রুমাল বাঁধা লোকের কুড়ুল চালান আছে। ভাল্লুকের কুড়ুল চালানো কোত্থেকে এলো? ২) এক জায়গায় সাদা শিফনের ব্লাউজ হয়ে গেছে কুচকুচে কালো। ৩) বর্ণনায় স্পষ্ট লেখা আছে মানুষটার চুল ছোট ছোট করে ছাঁটা। কিন্তু আঁকায় দিব্যি ব্যাকব্রাশ করা চুল গজিয়ে গেছে!
জানি না ব্রিফিংয়ের প্রবলেম না শিল্পীর ভুল। কিন্তু শেষমেশ সব কিছুই যখন এসে ঠেকে প্রকাশকের টেবিলে, তাই গ্রিন লাইট দেখানোর আগে ক্রসচেক করে নেওয়াটা তাদের জন্য জরুরি। এমন “আপনি থাকছেন স্যার” টাইপ উপন্যাস আরেকটু স্পেশাল ট্রিটমেন্ট দাবি করতেই পারে। তাই না?