সত্যিকারের ঘটনা অবলম্বনে লেখা বই আমি সাধারণত পড়িনা। যে কারণে গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার, হারিয়ে যাওয়া খুনিরা এড়িয়ে গেছি। এই বইটা কেন কিনলাম জানিনা। কিন্তু পড়ার পর, কেন আরো আগে পড়লাম না ভাবতে বাধ্য হলাম।
এই বইটি তিন জন ডাক্তারের ডাক্তারি জীবনের কিছু ভুলতে না পারা বা মনে দাগ রেখে যাওয়া ঘটনা অবলম্বনে লেখা। কোনো গল্প বা উপন্যাস নয়, কিছু ঘটনা..। যেখানে ডাক্তারও যে সাধারণ মানুষ, এটা যে শুধুই একটা জীবিকা সেটা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
১ম লেখা অনির্বান ঘোষের- শুধু এই লেখাটার জন্যই 5/5 দেওয়া যায়। লেখার শেষের দিকের কটা লাইন...সারাজীবন মনে রাখার মতো। সত্যিই তো আমরা কত সামান্য কারণে মৃত্যু কামনা করি, ফেল করলে/ প্রেমিক, প্রেমিকা প্রতারণা করলে/ ধার দেনা শোধ করতে না পারলে.... কিন্তু মৃত্যু হয়তো আমাদের সাথেই আছে, যখন এই প্রতিক্রিয়া লিখছি, তখন হয়তো সে আমার পাশেই বসে আছে। আপনি যখন পড়ছেন তখনও হয়তো সে আপনার পাশে বসে আছে, একটু পরে কি হবে কে জানে...হয়তো তাকে পাশে নিয়েই শুতে যাচ্ছি আমরা। হয়তো রাতেই সে নিয়ে যাবে আমাকে বা আপনাকে। শুধু শুধু মনের দুঃখের সখের জন্য তাকে নাই বা ডাকলাম আমরা... এ ছাড়াও বেশ কিছু ঘটনা----চিকিৎসার জন্য শুধু ডাক্তার নয়, ভাগ্যের সাহায্যও দরকার হয়। ভাগ্য এবং ডাক্তারের চেষ্টায় কিছু রোগী যেমন প্রাণ ফিরে পায় সেরকম উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে।
২য় সব্যসাচী সেনগুপ্তের লেখা- বইয়ের সবচেয়ে দুর্বল অংশ এটা। ভাষার ব্যবহারে পাড়ার রকে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারছেন মনে হবে। প্রচুর আবেগ দিয়ে লেখা। সমস্যা হচ্ছে ডাক্তার ব্যক্তিগত জীবনে আবেগ প্রবণ হতেই পারেন, কিন্তু এই পেশা টা আবেগ কে গুরুত্ব দেয় না। উনি সরকারি হাসপাতালের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন, বিশেষ করে টিবির মতো চিকিৎসার ক্ষেত্রে।আমার মতে অনেক সুবিধা থাকা সত্বেও, ওনাকে বুঝতে হবে কেন সাধারণ মানুষ এটা এড়িয়ে যেতে চায়। সরকারি হাসপাতালের নার্সকে যেমন অনেক পেশেন্ট সামলাতে হয় সেরকম বেসরকারিতেও তাই, কিন্তু তাহলেও এই দুই ক্ষেত্রে ব্যাবহার সম্পূর্ণ আলাদা পেয়ে থাকি আমরা। এই পেশা টা কিন্তু অন্য পেশার থেকে একটু হলেও আলাদা। এখানে পেশেন্ট বা তার বাড়ির লোক একটু সহানুভূতি সম্পূর্ণ ব্যবহার আশা করতেই পারে। বেশ কিছু বানানে চোখে খটকা লাগে, এটা ইচ্ছাকৃত ভাবে আড্ডা বোঝানোর জন্য করা হয়েছে কিনা বুঝিনি।
৩য় সরিৎ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা- এটাও বেশ ভালো লাগলো। রাগী ডাক্তারবাবু, যে প্রয়োজনে রুগী কে বকে। কিন্তু তার মধ্যেও বেশ ভালোবাসার ছোয়া অনুভব করা যায়।
সারাংশ: ডাক্তার মানেই ভগবান নয়, ডাক্তারি একটা পেশা। তারাও মানুষ। তাদের মধ্যেও ভালো, খারাপ হয়। কোনো কিছু সমস্যা হওয়া মানেই ডাক্তার কে ধরে মারলাম, এটা কোনো সমাধান নয়। এই বইটিতে ডাক্তার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা সেতু বন্ধনের চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্যরকম ভাবনা চিন্তা নিয়ে লেখা একটা বই। এইরকম বিষয় নিয়ে লেখা ও সেটাকে বই হিসাবে প্রকাশ করার সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য প্রকাশক এবং লেখকদের অনেক ধন্যবাদ।