স্বনামধন্য এক চা বাগানের একজন এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ছিলেন লেখক। চা বাগান, চা বাগানে কর্মরত শ্রমিক ও চা বাগান সংক্রান্ত অন্যান্য অজানা বিষয় নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ ও অভিজ্ঞতার গ্রন্থিত রূপ এই বই।
বাড়ি থেকে অনতিদূরে চা বাগান। ছুটিছাটায় কতোবার যে গিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। সেখানে চাকরি করে এমন এক আত্মীয়ের বাংলোয় থাকা হয়েছে অনেকদিন। তখন খুব কাছ থেকে দেখেছি, নয়নাভিরাম চা-বাগানের পরতে পরতে মিশে আছে বঞ্চনা আর দুর্দশার গল্প। বিস্মিত করেছে মৌলিক অধিকারের ধারেকাছেও না ঘেষা চা-শ্রমিকদের অসম্ভব রকম ভালো ব্যবহার আর অতি অল্পে সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা। এতো কাছে থেকেও জানতাম না অনেককিছুই। জানলাম “চা বাগানের বিচিত্র জীবন” পড়ে।
লেখক মোরশেদ আলম হীরা, ১৯৭৭ সালের দিকে শ্রীমঙ্গলের ফিনলে চা বাগানে এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ একটা সময় চাকরি করার সুবাদে খুব কাছ থেকে দেখেছেন সেখানকার জীবনযাপন। সেই জীবনযাপনের গল্প নিঁখুত দক্ষতায় বলেছেন ‘চা বাগানের বিচিত্র জীবন’-এ। চা শ্রমিকরা কীভাবে এদেশে এলেন,চায়ের বিবর্তন,আবাদ,প্রক্রিয়াকরণ,নিপীড়ন সহ নানানকিছু উঠে এসেছে এই বইয়ে।
চা-শ্রমিকদের যে মুক্তিযুদ্ধে সংক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল সেটা জেনে চমৎকৃত হয়েছি। ক্রোধাক্রান্ত হয়েছি চা শ্রমিকদের প্রতি চা মালিকদের শোষণের গল্প জেনে। বিস্মিত হয়েছি চা বাগানের ভিন্ন নিয়ম, নানান উৎসব আর জীবনযাত্রায়। এ যেন দেশের ভেতর অন্য দেশ। যে দেশে নাগরিক অধিকার,স্বচ্ছল জীবনযাপন এক অলীক স্বপ্ন।
শ্রীমঙ্গলের যে চা-বাগানগুলোর ঘটনা লেখক শোনালেন সেগুলোর অবস্থান আমার বাসা থেকে বেশি দূরে নয়। ২০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বের একটিতে গিয়ে এ বইটির কিছু অংশ পড়েছি (পুরোটাই পড়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু গত দুই দিনের টানা বৃষ্টির জন্য সম্ভব হলো না)। এক নিকটাত্মীয়ের চাকরির সুবাদে এক সময় বিভিন্ন চা-বাগানের বাংলোতে থাকা হয়েছে অনেক। স্কুল ও কলেজে পড়ার সময় ছুটি কাটানোর প্রিয় জায়গা বানিয়ে ফেলেছিলাম চা-বাগানকে। এটা শুধু চা-বাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে নয়। মুগ্ধতা অল্প দিনে কেটে গিয়ে আমার আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল অতি নিরীহ এবং খুবই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত চা-শ্রমিকেরা। অবাক হয়ে লক্ষ্য করতাম, চা-বাগানগুলো আসলে স্বৈরশাসক শাসিত ছোট ছোট একেকটি রাষ্ট্রের মতো। শাসকের কথাই যেখানে শেষ কথা এবং যা হয় তা সবই শাসকের স্বার্থে। আবার বাগানে শ্রমিকদের অল্প একটু মাথা গোঁজার জায়গা দিয়ে, অমানুষিকভাবে খাটিয়ে, বিনিময়ে নামমাত্র মজুরি দিয়ে এবং নানান আইন-কানুনের গ্যাঁড়াকলে ফেলে তাদের যেভাবে নত করে রাখা হয়, তা মনে করিয়ে দেয় জমিদার প্রথা বা নানকার প্রথার নিষ্ঠুরতাকে।
গত বছর দৈনিক মজুরি বাড়ানোর দাবিতে প্রায় তিন সপ্তাহ আন্দোলন করেছিল চা-শ্রমিকেরা। তখন তথাকথিত এক বুদ্ধিজীবী বলেছিলেন,‘‘চা বাগানের কাজ ছেড়ে দিয়ে ওরা অন্য কিছু করলেই তো পারে।’’ এ রকম সহজ সমাধান দেওয়া যায় জীবনে কোনো দিন কাছে থেকে চা-শ্রমিকদের না দেখলে। চা-শ্রমিকদের অনেকেই বাগান ছেড়ে শহরে এসে রিকশা/অটো চালায় বা কামলা খাটে। কিন্তু এখানে দেখা যায় তারা আরও বেশি বৈষম্যের শিকার। ‘বাগানি’ পরিচয় তাদের প্রাপ্য ভাড়া বা মজুরি অন্যসব রিকশা চালক বা কামলার চেয়ে কয়েক ধাপ নিচে নামিয়ে দেয়। কারণ, ওরা নিরীহ, সাত চড়ে ওরা রা কাড়ে না। কেউ কেউ তো এ দুই কারণে বেছে বেছে চা-শ্রমিকদের দিয়েই কাজ করাতে চায়!
চা-বাগানে চাকরির অভিজ্ঞতার আলোকে মোরশেদ আলম হীরা লিখেছেন ‘চা বাগানের বিচিত্র জীবন : বাগানের ভেতরের অজানা গল্প’। তবে অধিকাংশ ঘটনাকেই আমার খুব একটা ‘বিচিত্র’ ও ‘অজানা’ লাগেনি। বাগানে থাকার দরুন মনে হয়েছে—হ্যাঁ, এমন ঘটে বা ঘটতে পারে। তবে অজানা ছিল ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের কথা। যে আন্দোলনে শত শত চা-শ্রমিকের প্রাণ গেলেও মুল্লুক যাওয়া হয় না তাদের। বইয়ের এই অংশ পড়ার পরে তিনজন চা-শ্রমিককে জিজ্ঞেস করে দেখলাম তারা জানে না তাদের পূর্বপুরুষদের এই মহান আত্মত্যাগের কথা।
চা, চা-বাগান ও চা-শ্রমিকদের ব্যাপারে বেশি কিছু জানা না থাকলে এবং জানতে চাইলে বইটি পড়া যেতে পারে।
লেখনশৈলী আহামরি কিছু না৷ তবে যা আছে তা যথেষ্ট৷ লেখকের ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো বেশ উপভোগ করেছি৷ ইতিহাসের টুকরো-টাকরার পাশাপাশি চা চাষ সংক্রান্ত ইনসাইডার ইনফো খুউব বেশি না থাকলেও চা বাগানের জীবন সম্পর্কে ভালই একটা ধারণা হবে বইটা পড়ার পর৷
চা বাগানে কর্মরত শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবন অন্যান্য বাংলাদেশিদের চেয়ে আলাদা। মূলগত দিক থেকে তারা বাংলাদেশি নয়, চা বাগানের বাইরে তাদের কোনো জায়গা জমি নেই, চা বাগানের বাইরে তাদের কোনো আত্মীয় স্বজন নেই।
শত শত বছর আগে ইংরেজ উপনিবেশিক আমলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে তাদেরকে চা বাগানের কাজের জন্য আনা হয়েছিল। দিন রাত পরিশ্রমের বিনিময়ে তাদেরকে দেওয়া হতো খাবার, আর নামে মাত্র অতি-অল্প পারিশ্রমিক। তারাও এসেছে, এসব কাজ করেছে, কারণ তখন ভীষণ অর্থকষ্ট ও খাদ্য কষ্ট ছিল তাদের। নিজ ভূম ছেড়েই হোক আর হাজার মাইল দূরেই হোক আর আত্মীয় স্বজন ছেড়েই হোক, আগে পেটের যন্ত্রণা সামাল দিতে হবে।
দিনে দিনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। দূর হয়েছে বাইরের দুনিয়ার ক্ষুধার কষ্ট। বেড়েছে কর্মসংস্থান। কম হোক বেশি হোক খাটতে জানলে একজন মানুষের উপার্জন হয়ই কোনো না কোনোভাবে। সময়ে সময়ে সারা ভারত উপমহাদেশের পরিবর্তন এলেও পরিবর্তন আসেনি চা বাগানের ভেতরের শ্রমিকদের। তারা চাইলেও চা বাগানের বাইরে যেতে পারবে না কারণ এর বাইরে তাদের কোনো জমি নেই। কোনো আত্মীয়ও নেই যে তাদের আশ্রয় কিংবা সাহায্য করবে। কারণ তারা তো এ এলাকার মানুষ নয়, তাদের পূর্বপুরুষ তো এলাকার মানুষ নয়।
শৃঙ্খল ভেঙে যে হাজার মাইল দূরে নিজে রাজ্যে ফিরে যাবে সে উপায়ও আর নেই। এত বছর পর তাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট নেই সেখানে। বাগানের বাইরে যে কিছু একটা করবে এ অবস্থাও নেই। কিছু একটা করতে গেলে তো টাকার দরকার, কিন্তু তাদের উপার্জন এত কম যে নিজেরা বেঁচে থাকতেই কষ্ট হয়। এই মনে করুন সারাদিন কাজ করলে মজুরি হয় ৮৫ টাকা। একমাস কাজ করলে ৩ হাজার টাকাও হয় না।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের পুরো জীবনটাই আটকে আছে জটিল সব জটিলতায়।
কিন্তু যত যা-ই হোক, জীবন থেমে থাকে না। আপনার কাছে অঢেল অর্থ থাকলে আপনার সমাজের অন্যান্য মানুষেরও অঢেল অর্থ থাকলে আপনার জীবনধারণ আর আপনার সমাজের সিস্টেম একরকম হবে। অর্থ কম থাকলে অন্যরকম হবে। অর্থ না থাকলেও কোনো না কোনোরকম হবে। সমাজ ও জীবন তার প্রয়োজন অনুসারেই নিজেকে সাজিয়ে নেয়। চা বাগানের ভেতরেও হয়েছে তা-ই।
তাদের জীবন থেমে নেই। সেখানে তাদের মতো করে ধারা গড়ে উঠেছে। তাদেরও বিয়ে হয়, তাদেরও যৌনতার আবেদন সমাজ ছাড়িয়ে চলে যায়। তাদেরও সমাজ আছে, তাদের সমাজও ভুল করা মানুষদের একসময় গ্রহণ করে নেয়। আবার তাদেরও রীতি-সংস্কৃতি আছে, আবার তাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে।
যেমন তাদের রীতি অনুসারে আয়োজন করে বিয়ে করতে হয়। কিন্তু এই আয়োজন করার অর্থ নেই ছেলে কিংবা মেয়ের কাছে। তাই তারা পালিয়ে যায় এবং কিছুদিন পরে ফিরে এসে ঘর তোলে বসবাস শুরু করে। খুব সহজ ভাষায় এ জিনিসটার নাম লিভ টুগেদার। বাংলার সমাজে রি রি পড়ে যেত, কিন্তু সেখানে সেটা স্বাভাবিক। এমন না যে তারা সেটা গ্রহণ করে, কিন্তু পরিস্থিতি মেনে না নিয়েও উপায় নেই। বাংলার স্বাভাবিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কারণে বাংলার প্রচলিত সামাজিক সংস্কৃতির প্রভাব থেকে তারা মুক্ত।
এদের পাশাপাশি আরো এক সমাজ আছে, এরা চা বাগানের মালিক, বড় কর্তা ও সম্মানিত অতিথি। পুরো চা বাগানের দেখভালের জন্য কিছু শিক্ষিত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। চা শ্রমিকদের কাছে যারা দেবতার সমান। তাদের সেবা শুশ্রূষা ও সম্মানের জন্য শ্রমিকদের আন্তরিকতার অন্ত নেই। তরুণ কোনো ছেলে জয়েন করলে তার একটু দেখা পাওয়ার জন্য, তার সাথে একটু কথা বলার জন্য, একটু সময় অন্তরঙ্গে কাটানোর জন্য প্রতিযোগিতার অন্ত থাকে না মেয়েদের মাঝে। বাংলার স্বাভাবিক সমাজে কোনো মেয়েই তার বান্ধবীদের কাছে গিয়ে বলবে না সে তার বড় অফিসারের সাথে অভিসারে গিয়েছিল। কিন্তু চা বাগানে এটা খুব গৌরবের বিষয়। অহংকার করে প্রচার করে এরকম খবর। শত শত বছর ধরে বিচ্ছিন্ন সে সমাজে এগুলোই এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা।
একজন সুশীল হিসেবে যে জিনিস আপনি এই সমাজে বাস্তবায়ন করতে চাইছেন, সেটা শত বছর আগেই নিজ গতিতে বাস্তবায়িত হয়ে আছে চা বাগানের পরোক্ষ কৃতদাসদের সমাজে।
এরকম হাজারো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ দেওয়া যাবে যা তাদেরকে আলাদা করেছে বাইরের জগত থেকে। বাইরের মানুষেরা তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন বলে তাদের ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও রীতিনীতির কথাগুলো উঠে আসে না কারো কলমে। দেখা যায় না তেমন কোনো ভিডিও। পত্রিকায় কখনো তাদের খবর পাওয়া যায় না, টেলিভিশনে তাদের কোনো ঘটনার কথা শোনা যায় না। হয় না তাদের নিয়ে তথ্যবহুল কোনো বই।
তবে তার মাঝেও কেউ কেউ কিছু করার চেষ্টা করেন। এমনই একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে মোরশেদ আলম হীরার এই বইটি। লেখক তার চাকরিজীবনের শুরুতে জেমস ফিনলে টি এস্টেটে কাজ করেছিলেন। ঘুরেছিলেন বাগানে বাগানে। কাছ থেকে দেখেছিলেন চা শ্রমিকদের জীবন। অনুধাবন করেছিলেন চা বাগানের সমাজ ও বাস্তবতা। সে বিষয়গুলো নিয়ে তিনি একটু একটু করে স্মৃতিচারণা করেছেন সময়ে সময়ে। সেসব স্মৃতিচারণার গ্রন্থিত রূপ হলো এই বই- 'চা বাগানের বিচিত্র জীবন'।
খুব সুন্দর উনার ভাষা। তরতর করে পড়ে ফেলা যায় একেকটি অধ্যায়। পড়ে মজা পাওয়া যায়। তবে বইটা চা বাগানের জীবন, সমাজ ও সিস্টেম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বই নয়। চা বাগান নিয়ে সে অর্থে গোছানো ও তথ্যবহুল নয়। আসলে এটা মূলত লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা ও অভিজ্ঞতার বই। অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকথার ফাঁকে ফাঁকে চা বাগানের নানা বিষয় উঠে এসেছে।
তবে এ বই পড়ে মনে হয়েছে, লেখক যদি চান এবং চেষ্টা করেন তাহলে চা শ্রমিকদের নিয়ে খুব সুন্দর, গোছানো ও তথ্যবহুল করে একটি বই তিনি লিখতে পারবেন। যে বই বাংলা ভাষায় এবং ইংরেজি ভাষায় থাকা খুবই জরুরি। এতদিন হয়ে গেল শত বছর পেরিয়ে গেল কিন্তু তাদের নিয়ে সে অর্থে ইনডেপথ কোনো বই নেই তা কীভাবে হয়? এই রিভিউয়ের মাধ্যমে লেখকের কাছে সেই আবেদন রইলো। ধন্যবাদ লেখককে চা বাগান নিয়ে বই লেখার জন্য।
চা বাগান ও চা শ্রমিকদের সম্পর্কে যারা আগ্রহী, তারা অবশ্যই এই বই পড়ে দেখবেন। #হ্যাপি_রিডিং
পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হতে না দেওয়া একটি উদ্দেশ্যমূলক প্রক্রিয়া। সচেতন হয়ে গেলেই তখন তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হবে। তাই যতটা পারা যায় তাদের অন্ধকারে রাখতে চায় মালিক শ্রেণি। কিছুদিন আগে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেখানেও দেখা গিয়েছে তাদের অধিকার রক্ষা হয়নি। নামমাত্র মজুরি বৃদ্ধি নিয়েই তাদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। গত শতাব্দীতে চা শ্রমিকদের অবস্থা যেমন ছিল, বর্তমান সময়ে এসেও খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
'চা বাগানের বিচিত্র জীবন' বইটি লেখকের চল্লিশ বছর পূর্বের চা বাগানকে ঘিরে স্মৃতিচারণমূলক বই। স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে টুকরো টুকরো করে চা বাগানের ইতিহাস, চা বাগানের ভেতরের কথাগুলো উঠে এসেছে। আমরা চা বাগানকে বাইরে থেকে যতটা সুন্দর দেখি ভেতরে ঠিক ততটাই কদর্য রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। ১৯৭৭ সালে লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার্স পাশ করে চাকরির খোঁজ করছিলেন। তখন চা বাগানে কর্মরত বন্ধুর মাধ্যমে খোঁজ পান যে, সেখানে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়া হবে। জেমস ফিনলে কোম্পানিতে আবেদন করেন এবং কিছুদিন পর ইন্টারভিউয়ের ডাক আসে। নির্দিষ্ট দিনে ইন্টারভিউ দেওয়ার উদ্দেশ্যে যখন সিলেটের ট্রেনে উঠেন, সেখান হতে প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র ও কাপড়চোপড়ের ব্রিফকেস চুরি হয়। এভাবে খালি হাতে ত আর ইন্টারভিউ দেওয়া যায়না! তবুও এক সহযাত্রীর কথায় সেভাবেই ইন্টারভিউ দিতে যান। আশা ছিল না যে চাকরি হবে। তবে তিনি চাকরি পান। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদে লেখকের প্রথম পোস্টিং হয় সিলেটের বারাউরা চা বাগানে।
বাংলাদেশে প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয় ব্রিটিশ আমলে; সিলেটের মালনীছড়া চা বাগান। ইউরোপীয়রা চা পাতার জন্য চীনের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু আফিম যুদ্ধের প্রভাবে চীনের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়। তখন ব্রিটিশ কর্তারা তাদের উপনিবেশগুলোতে চা চাষের উদ্যোগ নেন। ভারতীয় উপমহাদেশে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে দূরবর্তী অঞ্চলের শ্রমিকদের আনা হতো। দাস প্রথার অন্য এক রূপকে বাস্তবায়ন করেছিল ব্রিটিশরা এই চা বাগানে। উন্নত জীবনযাপনের প্রলোভন দেখিয়ে দালালরা দরিদ্র মানুষদের বাগান মালিকদের কাছে অনেকটা বিক্রি করে দিত। কিন্তু চা বাগানে কিছুদিন কাজ করার পরেই ভুল ভাঙে তাদের। নামমাত্র মজুরি এবং কোনোরকম আধপেটা খেয়ে সারাজীবন পরিশ্রম করতে হতো। বাড়ি ফিরে যাওয়ার উপায়ও নেই। কারণ ফিরতে গেলেই পুলিশে ধরে গারদে ভরে রাখবে।
চা বাগান দেশের মধ্যে আরেকটি দেশ। এই দেশে রয়েছে আলাদা আইন ও প্রশাসন ব্যবস্থা। ব্রিটিশ বাগান মালিকরাই সর্বেসর্বা তবে বাগান দেখাশোনার দায়িত্ব থাকতো ম্যানেজারদের উপর। এই ম্যানেজারদের অধীনে আবার একাধিক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার থাকতো। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজাররা আবার শ্রমিকদের মধ্যে যারা নেতৃত্বস্থানীয় তাদের মাধ্যমে শ্রমিকদের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখতেন। বাগানের সাহেবদের শ্রমিকরা দেবতাতুল্য মনে করে। সাহেবরা যা বলবে তাতেই মাথা নিচু করে পালন করা যেন তাদের জন্মগত দায়িত্ব। আবার এই সাহেবদের তুষ্ট করতে যেন তাদের চেষ্টার কোনো কমতি নেই।
চা বাগানের মানুষদের মধ্যে রয়েছে আলাদা রীতি-নীতি কিংবা সামাজিকতা। তাদের মাঝেও ঘটা করে বিয়ে হয়। তবে অনেকসময় দেখা যায় ছেলে মেয়ে একে অপরকে পছন্দ করেছে কিন্তু বিয়ে করার টাকা নেই; তখন তারা পালিয়ে যায়। আবার যখন ফিরে আসে তখন আলাদা ঘর তুলে সেখানেই ��িবাহ না করে বসবাস করতে থাকে। সোজা কথায় যাকে 'লিভ টুগেদার' বলা হয়। অনেক মহিলা শ্রমিকরা সাহেবদের সাথে ভাব জমানোর চেষ্টাতেও থাকে। কারণ কোনো সাহেবকে পটাতে পারলে, এই কষ্টের জীবন হতে মুক্তি মিলবে। আবার দেখা যায় সাহেবদের অবৈধ সন্তানের জন্ম দিয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছে কেউ কেউ।
চা বাগানের অফিসারদের জন্য রয়েছে ক্লাব। সেই ক্লাবে নিয়মিত পার্টি হয়। পার্টিতে সিনিয়র জুনিয়র নিয়�� মেনে অংশ নিতে হয়। লেখকের একাকীত্ব জীবনে এই ক্লাব কালচার কিছুটা হলেও নিঃসঙ্গতা দূর করেছে। লেখক ছাত্র অবস্থায় বাম রাজনীতির সমর্থক ছিলেন। তাই চা শ্রমিকদের শোষণের ব্যাপারটা অকপটে স্বীকার করেছেন। তিনি চেষ্টা করেছেন তাদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখতে। চা শ্রমিকরাও তার বিনিময়ে কৃতজ্ঞ থেকেছে সবসময়। একবার এক সহকর্মীর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া চাচাতো বোনকে নিয়ে লেখক ঘুরতে বের হয়েছেন। তখন মহিলা শ্রমিকরা নানা ঠাট্টা মশকরা শুরু করে। এতে মেয়েটি বেজায় রেগে যায়। আবার যাওয়ার সময় নিজের নাম্বারটা দিয়ে যায়; যাতে লেখক তাকে ফোন করে। কিন্তু প্যান্ট ধোয়ার সময় কাগজটি ভিজে যায়। ফলে নাম্বার উদ্ধার অসম্ভব হয়ে পড়ে। এভাবেই লেখকের জীবনে প্রেম এসেও এল না!
চা শ্রমিকরা এত শোষিত হয়েও এখানে রয়ে গেল কেন? তারা কি কখনো নিজ ভূমিতে ফেরত যেতে চায়নি? চেয়েছিল বৈকি। কিন্তু সেই চাওয়াটা সফল হয়নি। ১৯২১ সালের মার্চ মাসে সিলেটের প্রায় ৩০ হাজার চা শ্রমিক নিজ ভূমিতে ফেরত যাওয়ার জন্য বাগান হতে বেরিয়ে পড়ে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল চাঁদপুর লঞ্চ ঘাট। সেখান হতে কলকাতা এবং তারপর যার যার গ্রামে চলে যাবে। কিন্তু ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রে তাদের ট্রেনে উঠতে দেওয়া হয়নি। উপায় না পেয়ে তারা আড়াই মাস হেঁটে চাঁদপুর পৌঁছায়। কিন্তু সেখানে 'আসাম রাইফেলস' এর গুর্খা সৈন্যরা তাদের বাধা দেয় এবং পরে গুলি চালায়। এতে বিপুল সংখ্যক মানুষ মারা যায়। সঠিক হিসাব কখনো জানা যায়নি। এক পর্যায়ে জীবিত শ্রমিকরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে কোনোরকম চার দফা চুক্তি করে তাদের কাজে ফেরত নেওয়া হয়। আবারও সেই শোষণের পুনরাবৃত্তি!
চা শ্রমিকরা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা চা বাগানেও ব্যপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল কিংবা স্বাধীনতার এত বছর পরে চা শ্রমিকরা তাদের নূন্যতম মজুরি পায় না। সম্প্রতি চা শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা কিছুটা হলেও তাদের ব্যাপারে জানতে পেরেছি।
সিস্টেমের মধ্যে থেকে সেই সিস্টেম সম্পর্কে সবচাইতে ভালো জানা যায়। তবে সেই সিস্টেমের নেতিবাচক দিকগুলো অধিকাংশ ব্যক্তিরাই তুলে ধরেন না। তবে সেদিক দিয়ে মোরশেদ আলম হীরা ব্যতিক্রম। তিনি এমন অনেক তথ্যই দিয়েছেন, যা বাইরের কারো পক্ষে জানা সম্ভব না; যদি না কেউ চা বাগানকে কাছে থেকে দেখে থাকেন। তবে বইটিকে তথ্যবহুল ইতিহাসে বই ভাবলে ভুল হবে। এখানে লেখকের নিজের গল্প ও চা বাগানের গল্প মিলেমিশে একটি আখ্যান সৃষ্টি হয়েছে। বর্ননাভঙ্গি অনেক ভালো সেটা বলার উপায় নেই; তবে সহজ সরল ভঙ্গিমায় যেভাবে লেখক উপস্থাপন করেছেন তাতে পাঠক এক বসায় বইটি শেষ করতে পারবে। হ্যাপি রিডিং।
লেখজ ব্রিটিশ মালিকানাধীন ফিনলে চা বাগানে আ্যসিস্টেন্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করেছিলেন৷ চা বাগানের ভেতরের অভিজ্ঞতাগুলো এই বইয়ে শেয়ার করেছেন। চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন, নিয়ম-কানুন দেখে যেন মনে হলো এ যেন বাংলাদেশের ভেতরের আরেকটি দেশ। চা প্রক্রিয়াজাত কিভাবে হয় সেগুলোও জানা গেলো। ভালো লেগেছে লেখকের ভালো ও খারাপ সব ধরণের বাস্তব অভিজ্ঞতার বর্ণনায়।
কিছু দিন আগে চা বাগান শ্রমিকরা আন্দোলন করে তাদের বেতন বাড়ানোর জন্য। তখন আসলে বুঝতে পারি নাই এদের জীবন কত খারাপ। এই বইটা বলা যায় বাংলাদেশের সকল চা শ্রমিকদের জীবন কিছু বইয়ের পাতাতে তুলে ধরা হয়েছে। এত সুন্দর লেখা আর এত সুন্দর কাহিনী পড়তে পড়তে মনে হয়ছে চা বাগানে এমন একটা চাকরি লেখকের মত যদি পেয়ে যেতাম তাহলে খারাপ হত না। অসাধারণ বই। চা বাগান আর চা বাগানের শ্রমিক দের নিয়ে অজানা অনেক কিছু জানতে পারলাম।
সাম্প্রতিক কালে চা শ্রমিকদের আন্দোলনের কারনে চা বাগানের জীবন নিয়ে কিছুটা জানাশোনার আগ্রহ হয়। এই বই সেই ইচ্ছার বেশ খানিকটা পূরণ করে। লেখক জেমস ফিনলে চা বাগানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে কর্ম জীবন শুরু করেন। চা বাগান লেখকের ভাষায় 'রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র'। ব্রিটিশরা চা বাগানে তাদের সুবিধার জন্য যে rules and regulations তৈরি করে, শত বছর শেষে চা বাগানের পরিবেশ সেই একই রকম আছে। এখানে বাগানের ম্যানেজার দেবতা সমতুল্য। তার কথাই আইন। শ্রমিকরা প্রজা এবং সেবায়েত। ধর্মীয় ঘটনায় যেসব নিষ্ঠাবান ধার্মিকের উদাহরন পাওয়া যায়। এখানে ঠিক তেমনি।
"এক রাতে দশটার দিকে... দারোয়ানকে বললাম আমি বই পড়ছি, তুমি আমার পা টা একটু টিপে দাওতো। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা, ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখি ও খুব আস্তে আস্তে পা টিপে যাচ্ছে। ঘড়িতে দেখি রাত ৩ টা বাজে। আঁতকে উঠে বললাম, " আমি ঘুমিয়ে গেছি, তুমি চলে গেলেনা কেন?" ওর উত্তর, "সাহাব আপকো হুকুম থা পা টিপনেকে লিয়ে।" সর্বশেষ হুকুম সে পেয়েছে পা টিপতে। এভাবেই হুকুমকে তালিম করে তারা।"
পূজার প্রসাদ সবাইকে দেওয়া হয় 'সাহেবের প্রসাদ' হিসেবে। অপরাধের ক্ষমা তারা চায় "সাহেব তুই ভগবান। তুই মায়ে বাপ। মাফ করে দে" বলে। এই অন্ধ আনুগত্য এর বিনিময়ে শ্রমিকদের দেওয়া হয় নামমাত্র বেতন আর রেশন। আছে রেজিস্টার্ড মদের দোকান। বলার অপেক্ষা থাকে না, তাদের বেতনের অনেকটাই চলে যায় এই মদের পিছনে।
" ... এক শ্রমিক তার ঘরে একটু বসার আমন্ত্রণ জানালো, তার স্ত্রী রুটি ও লবণ চা বানিয়ে রাতের খাবারের আয়োজন করেছে। আমাকে খেতে অনুরোধ করলে আধা ইঞ্চি পুরু একটা রুটি থেকে সামান্য একটু ছিঁড়ে ওদের লবণ চা'তে ডুবিয়ে খেলাম। বাংলোয় ফিরে অনেক রাত পর্যন্ত ভেবেছি দিনের পর দিন এই বিস্বাদ জিনিস খেয়ে ওরা বেঁচে আছে কীভাবে।"
বাংলা ভাষায় চা বাগানের জীবন নিয়ে বেশী লেখা নেই। চা বাগান নিয়ে আগ্রহীদের জন্য অবশ্য পাঠ্য এই বই।
লেখকের জেমস ফিনলে টি স্টেটে চাকুরীরত সময়ের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সংকলনই "চা বাগানের বিচিত্র জীবন"। বইয়ে মোট ২৬ টি প্রবন্ধে লেখক ���র্ণনা করেছেন তার অভিজ্ঞতা। বইটিতে লেখক তুলে এনেছেন চা শ্রমিকদের অতি সামান্য বেতনে, বাগানের মধ্যে বাঁশ, শন, লাকড়ি দিয়ে তৈরি জীর্ণ বাড়িতে কোনো মত খেয়ে না খেয়ে কাটানো করুণ জীবনযাপনের কথা। এছাড়া উঠে এসেছে তাদের ধর্মীয়, সামাজিক আচার রীতি। বাগানে কর্মরত ম্যানেজার,এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজারদের প্রতি চা শ্রমিক ও বাংলোর কর্মচারীদের একপ্রকার দেবতাতুল্য সম্মানের ঘটনায় লেখক ম��গ্ধতা প্রকাশ করেছেন বারংবার। জেনেছি চা শ্রমিকদের মুক্তিযুদ্ধে অবদান আর তাদের বিহার, মধ্যপ্রদেশ,অন্ধপ্রদেশ,উড়িষ্যা থেকে এ অঞ্চলে আসা ও আবার তাদের স্বদেশে ফিরে যাওয়ার আন্দোলন " মুল্লুক চলো" এর সময় তাদের প্রতি ইংরেজদের চালানো নৃশংসতার অজানা ইতিহাস। আরো এসেছে লেখকদের বাগানে থাকাকালীন খেলাধুলা ও ক্লাব কালচার,ইংরেজ ও আমেরিকান দুই সমকামী তরুণী যুগল,চা শ্রমিক তরুণীদের সাথে লেখকের খুনসুটি ,বাগানের গাছ চুরিকে কেন্দ্র করে এক ম্যানেজারের করুণ পরিণতিসহ প্রভৃতি টুকরো টুকরো ঘটনা। এছাড়াও পরিশিষ্ট ১ ও পরিশিষ্ট ২ এ রয়েছে যথাক্রমে চীনাদের থেকে ব্রিটিশদের চায়ের ফর্মুলা চুরির ইতিহাস আর পরিশিষ্ট ২ এ লেখকের কন্ঠে ঝড়েছে চা শিল্পের অপার সম্ভাবনার বস্তবায়ন না হওয়ার হতাশা। লেখকের লেখনী আহামরি কিছু না হলেও ছিলো সরল ও গতিশীল। সময় থাকলে বইটি এক বসায় শেষ করে ফেলা যায়। সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে।
"চা বাগানের বিচিত্র জীবন" পড়ে মনে হলো- এমন বই কেন আরো বেশি লেখা হয় না? চা বাগানের জগৎ সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণাই ছিলো না। একদিকে স্বররগ, আরেকদিকে নরক, একদিকে রাজা, আরেকদিকে তাদের 'স্লেভ', একদিকে শ্যাম্পেইনের নহর আরেকদিকে বছরে একবার বা দুবার মাছ মাংস জোটে। তাদের ভুলিয়ে রাখার জন্যে সস্তা মদের অবিরাম সরবরাহ। পুরো বাংলাদেশের মানূষের মধ্যে জাতিগত বৈচিত্র যত-চা বাগানের 'স্লেভ'দের মধ্যে তার চেয়েও বেশি। চা-বাগান, এখানকার নিয়ম কানুন, রীতিনীতি সম্পর্কে না জানলে একটা অন্য জগৎ আপনার অধরা থেকে যাবে। লেখক মননে একজন রোমান্টিক কমিউনিস্ট, অথচ আয়রনি হচ্ছে তাকে এই তীব্রতম পুঁজিবাদের জগতে আসতে হয়েছে, নিজ হাতে বপন করতে হচ্ছে বৈষম্য। এই মানসিক দোলাচল তাকে সামলাতে হয়েছে। তিনি অন্যান্য আত্মজীবনীর মতো নিজেকে সাধু পুরুষ হিসেবে দেখান নি। হুইস্কি খাওয়া, চা বাগানের মেয়েদের সাথে খুনসুটি করা এসব গোপন করে যান নি। এই বইটি পড়ার পর বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ করা অদ্ভুত সব জায়গায় আমার যেতে ইচ্ছে করছে। কী করা যায় এখন!
বইয়ের শুরুর দিকে ফেসবুক স্ট্যাটাস এর মত ছোট ছোট ঘটনা পড়ে একটু নিরাশ এ হচ্ছিলাম। কিন্তু পরের দিকে অনেক বিষয়ে সুন্দরভাবে ডিটেইল এ লেখা। সবচেয়ে ভালো লেগেছে, লেখকের যেকোন বিষয় নিয়ে সহজ এবং অকপট স্বীকারোক্তি। কারন অনেকেই নিজের দুর্বলতা এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলো এড়িয়ে যায়।
বাংলাদেশের চাবাগান গুলোর ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ অন্য কোন দেশ মনে হবে। চা বাগান গুলো যেরকম প্রাকৃতিকভাবে সৌন্দর্যময় ঠিক বিপরীতে মানবিকভাবে কদর্য। লেখক তার কর্মজীবনের স্মৃতি কথা প্রকাশ করেছেন বইটিতে। সাথে আছে তার উপলব্ধি ও মন্তব্য:
" এদেশে আপেল গাছ নাই, তাই গাছ থেকে আপেল পড়ে না বলে কোন নিউটনের জন্ম হয় না। সরিষা ক্ষেতে প্রচুর আছে তাই তেল মারা লোকের অভাব নেই।
চাকরি জীবনে দক্ষতার চাইতে চাটুকারিতার মূল্য বেশি
অফিসারদের থেকে শ্রমিকদের নিয়ম ভিন্ন, সেনানিবাসের সাথে চা বাগানের তুলনা"