একদা ভূতভুতুম গ্রুপের সদস্য হিসেবে যে লেখকদের গল্প পড়ে একইসঙ্গে মুগ্ধ ও ভীত হওয়ার সুযোগ পেতাম, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শঙ্কর চ্যাটার্জি। মানুষটির সঙ্গে আলাপ হয়ে চমকে গেছিলাম। এমন সদাহাস্যময়, মাটির মানুষটি কীভাবে এরকম ভয়োৎপাদক গল্প লেখেন? স্ক্রল করে পড়া গল্পে তৃপ্ত না হয়ে তাঁর লেখা বই "কুহেলী" সংগ্রহ করে ফেলেছিলাম কয়েক মাস আগেই। বাছাই করা কিছু অলৌকিক কাহিনি স্থান পেয়েছে সিসৃক্ষা পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত এই সুমুদ্রিত সংকলনে। কাল রাতে সেটি পড়লাম। সিদ্ধান্তটা ঠিক ছিল না। কেন? বইয়ে কোনো ভূমিকা নেই। পাতা উল্টে আপনি একে-একে যাদের সম্মুখীন হবেন তারা হল~ ১) তর্পণ ২) কর্তব্যের টান ৩) ও একা ৪) আঁধারে থাকে ৫) শয়তানের বাসা ৬) নরকের রাস্তা ৭) তিন্নির পুতুল ৮) মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ৯) কুয়াশায় ঘেরা রহস্য এই গল্পগুলোর বিশেষত্ব দ্বিবিধ: প্রথমত, লেখক নিজস্ব জ্ঞান বা দক্ষতা প্রদর্শনের উদ্দেশ্য নিয়ে গল্পগুলো লেখেননি। বরং বিশুদ্ধ বৈঠকী কায়দায়, বহু পূর্বাপর প্রসঙ্গ তুলে, চরিত্রগুলোকে একেবারে জীবন্ত করে নিয়ে তবেই তিনি গল্প বলেছেন। এগুলো পড়ে সম্পাদকের হাত নিশপিশ করবে। কিন্তু ঘটনাক্রম যখন ওই চরিত্রদের নিজের জালে জড়িয়ে নেয়, তখন পাঠকের পক্ষে নৈর্ব্যক্তিক থাকা অসম্ভব হয়ে ওঠে। গলা শুকিয়ে যায়। দম বন্ধ হয়ে আসে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। দ্বিতীয়ত, অতি সাধারণ উপাদান, অতি ঘরোয়া পরিবেশে, বহুক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রেডিক্টেবল আদি-মধ্য-অন্ত নিয়ে লেখক যে ভয়ের আবহ নির্মাণ করেছেন, তা অতুলনীয়। এই গল্পগুলোর মধ্যে একমাত্র "তিন্নির পুতুল" গল্পটি ভীষণভাবে 'চাইল্ডস প্লে' এবং আরও একপাল বিদেশি গল্প-সিনেমার বঙ্গীকরণ বলে ওটি আমার পোষায়নি। কিন্তু বাকি গল্পগুলো খাঁটি দেশি জিনিস। দেশজ অলৌকিক গল্পের ধারা মেনে এরা পাঠককে ঠিক-ভুলের দোলাচলে না ফেলে একেবারে সোজাসুজি অশুভের কুয়োয় ফেলে দেবে। ফলে আগে পড়া থাকলেও এই গল্পগুলো যখন হ্যান্স জিমারের মিউজিকের মতো শেষের দিকে এগোয়, তখন ভয় হয়। সত্যিকারের ভয়! সেজন্যই বলছিলাম, কাল রাতে গল্পগুলো পড়ার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল না। লাইট অফ করার পর মনে হচ্ছিল, মাথার কাছে কে যেন... ভয় পেতে ভালোবাসেন? হারিয়ে যান এই কুহেলীতে।