বিজ্ঞানচর্চা ও তা প্রসারে নিবেদিত আসিফ ডিসকাশন প্রজেক্টের বক্তৃতার মাধ্যমে প্রথম সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কসমিক ক্যালেণ্ডার, সময়ের প্রহেলিকা, নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যু, প্রাণের উৎপত্তি ও বিবর্তন, আন্তঃনাক্ষত্রিক সভ্যতা বিষয়ক জটিল বিষয়ে দর্শনীর বিনিময়ে বক্তৃতার আয়োজনের মধ্যে আছে অভিনবত্ব ও কল্পনার দুঃসাহস। তিনি এরকম ৪৮টি ওপেন ডিসকাশন বা বক্তৃতা অনুষ্ঠানের সফল উদ্যোক্তা। আসিফ এর নিজস্ব গ্রন্থাগারে রয়েছে পাঁচ হাজার বইয়ের এক সংগ্রহ। পাশাপাশি বিজ্ঞান ও সভ্যতা ভিত্তিক প্রচুর ম্যাপ, চার্ট ও ডকুমেন্টারী ফিল্মের ভিডিও ক্যাসেট। শৈশব থেকেই তিনি এ সমাজ ও সভ্যতা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন ভিন্নভাবে। পদার্থবিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, জীববিজ্ঞান, দর্শন, সংগীত ও সাহিত্যের উপর পড়াশুনা করেছেন ধারাবাহিকভাবে। এর মধ্যে জ্যামিতি, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও আপেক্ষিকতত্ত্বের আধুনিক সমস্যাগুলো ছাড়াও সভ্যতার গতি-প্রকৃতি নিয়ে চিন্তা ভাবনা ও গবেষণা তার অন্যতম বিষয়। আসিফ ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বই প্রাকাশিত। তারমধ্যে সাহিত্য প্রকাশ-২০০১ থেকে লেখা কার্ল সাগান: এক মহাজাগতিক পথিক, সময় প্রকাশন-২০০৩ থেকে মহাজাগিতক আলোয় ফিরে দেখা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে ইউক্লিড ও তার এলিমেন্টস এবং খালেদা ইয়াসমিন ইতির সঙ্গে মহাবিশ্ব ও নক্ষত্রের জন্মমৃত্যু মোট ৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা একাডেমী জর্নালে আড়াই হাজার বছর আগের গ্রন’ ইউক্লিডের অ্যালিমেন্টস এর প্রথম খন্ড এবং তার বিশ্লেষণ বের হয়েছে। তিনি তার শৈশবের দিনগুলো সম্পর্কে বলেন, জীবনের এই স্বপ্নময় সময়ে কখনও অভিভূত হয়েছি রাশিয়ান লেখকদের সংকলন গ্রহান্তরের আগন্তুক, কখনো বাংলার লেখকদের রায়হানের রাজহাস বা নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়, কখনো বা তিতিরমূখী চৈতা পড়ে। আলেক্সান্দার বেলায়েভের উভচর মানুষ অথবা মার্ক টোয়েনের হাকলবেরী ফিন বা টম সয়্যার আমাকে দেখিয়েছে জীবন কত সুন্দর। ভিক্টরহুগোর লা-মিজারেবলের মতো গ্রন্থ দেখিয়েছে জীবনের বাঁক কত আকস্মিকভাবে পরিবর্তীতে হয়ে যেতে পারে। আর পরিকল্পনা করেছি ইভান ইয়েফ্রেমভ আর আর্থার সি ক্লার্কের রচনাকে সামনে রেখে। এগুলো আমাকে গতি দিয়েছে, চলার পথে আনন্দ দিয়েছে জীবনানন্দ ও কার্ল সাগানের ভাষা। তারা আমাকে শিখিয়েছে দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে এই পৃথিবীর যে কোন অঞ্চলই মহাজাগতিক সাগরের বেলাভূমি।
বিজ্ঞান বক্তা আসিফের সাম্প্রতিকতম বই “মানব প্রজাতির অনিশ্চিত গন্তব্য” । লক্ষ বছরের সামজিক-অর্থনৈতিক-শারীরিক- বৈজ্ঞানিক ক্রম বিবর্তনের উপর আলো ফেলে খুঁজে ফিরেছেন মানুষের ভবিষ্যৎ। আর ভবিষ্যৎ যে ঠিক অতীতের মতই মসৃণ হবে না তার ইঙ্গিতই দিয়েছেন। যুক্তি আর মানবিকতার ধারাল-পেলব বহিঃপ্রকাশ বইটির প্রবন্ধগুলো জুড়ে। বরারবই আসিফ বুঝতে-ভাবতে-কল্পনা করতে তাগিদ দিয়েছেন। তার লেখা আর বিষয়বস্তুগুলো সবসময়ই এক মহাজাগতিক পথচলার সঙ্গী করে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রবন্ধগুলো ধীরে ধীরে বলে যায় কেমন করে পৃথিবী প্রতিটি দিন কাটাচ্ছে মহাজাগতিক আর মানুষের সৃষ্ট বিপর্যয়ের সম্ভাবনাকে সঙ্গী করে, কি করেই বা আমরা কোটি কোটি বছরের প্রাণের বিবর্তনের ফসল আর-কমপ্লেক্সের ঊর্ধ্বে গিয়ে সেরেব্রাল কর্টেক্সকে জয়ী করে দিতে পারি । হয়তোবা আর-কমপ্লেক্সের প্রবণতায় আমাদের ধ্বংস অনিবার্য। তবে তারপরও “এর থেকে মুক্ত হওয়ার একটা উপায় হলো, অন্তহীন জ্ঞানচর্চা । যা আমারদের সেরেব্রাল কর্টেক্সকে বিকশিত করবে এবং ক্রমে আর-কমপ্লেক্সকে দুর্বল করে দেবে। আর জ্ঞানচর্চা তথা গণিত, বিজ্ঞান, সঙ্গীতচর্চা ও কবিতা লেখার মধ্যদিয়ে আমাদের নিয়ে যাবে ওই উপলব্ধিতে যা আমাদের শেখাবে মহাবিশ্বের তুলনায় মানুষ কত ক্ষুদ্র, কত অল্প সময় অধিকার করে আছে ক্ষমতা লোভ কত অর্থহীন ।” বইয়ের ২৫টি প্রবন্ধই আসিফের চিরচেনা মানবিক সুরে মূর্ছিত। আসিফ যথার্থই কার্ল সাগানের কাব্যিক ধারাভাষ্যের যোগ্য উত্তরসূরি। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় মহাজাগতিক স্বপ্নের আলোয় আলোকিত করেছেন নতুন প্রজন্মের তরুণদের হৃদয়-মানস। স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন আবার কৌতূহলীও করেছেন। তারপরও খানিকটা অপ্রাপ্তি থেকে গেছে। বইয়ের এক-তৃতীয়াংশ লেখার সাথেই আগে প্রকাশিত তার কোন না কোন লেখার মাধ্যমে পরিচয় ছিল। যেহেতু তার ভুরিভুরি লেখা অহরহ পড়বার সৌভাগ্য হয় না তাই কিছুটা বঞ্চিত মনে হয়েছে। তারপরও স্বপ্ন দেখি মানুষের চল্লিশ হাজারতম প্রজন্ম পড়বে, ভালবাসবে তার নিজের অস্তিত্ব-অন্যকে-তার ঘর পৃথিবীকে । বিস্ময় আর কৌতূহল নিয়ে তাকাবে ভবিষ্যতের আলোয় ।