"মেঘবালিশে মাথা রেখে তারারা যে শোনে, আকাশ গল্প বলো"। ছোটোবেলায় এই গানটা শুনতে-শুনতে আমার একটুও অবাক লাগত না। মনে হত, এটাই তো স্বাভাবিক। হাওয়া বইবে, শব্দরা ছুটি নেবে। কিন্তু তারারা কি তক্ষুনি ঘুমোবে নাকি? অবাধ্য খোকাখুকু গল্প না শুনে ঘুমিয়েছে কখনও কোথাও?! আজও আমরা সুযোগ পেলেই গল্প শুনতে বসে পড়ি। নতুন, পুরোনো, আর পুরোনোতুন গল্পদের খোঁজে আমরা মনে মনে "সন্ধান চাই!" হাঁক পেড়ে গল্পের বই কিনি। কখনও সে বই আমাদের হতাশ করে, আবার কখনও আমরা খুশিয়াল হয়ে উঠি গল্পগুলো পড়ে। এই বই পড়ে আমার কেমন লাগল?
'আনাড়ি মাইন্ডস' গ্রুপের সঙ্গে ফেসবুকে সচল অনেকেই পরিচিত। সেই গ্রুপে লেখালেখি করা একঝাঁক আনকোরা লেখকের লেখা, মোট কুড়িটা গপ্পের সমাহার এই বই। অনির্বাণ ঘোষ ও অরিজিৎ গাঙ্গুলি লিখিত 'ভূমিকা' পেরিয়েই আমরা ঢুকে পড়ি সেই গপ্পোদের রাজত্বে। তারা হল: ১. পিউ দাশ-এর 'চকমকি': স্মার্ট, সংযত, আদ্যন্ত নাগরিক, এবং মিতকথনে সিদ্ধিলাভ করা সুখপাঠ্য গল্প এটি। ২. দেবপ্রিয় মুখার্জি-র 'মেঘবালিকা': এ গল্পের পটভূমি গ্রামীণ, কিন্তু ঘটনাক্রম ভীষণ নাগরিক। গল্পটা ছকেবাঁধা পথে অনেকদূর চলে বড়ো হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল। ৩. অনির্বাণ ঘোষ-এর 'হাতছানি': ডিস্টোপিয়ার এক অমোঘ আখ্যান এই গল্প। বিষয়ের কারণেই একটু চিৎকৃত ঠেকল লেখাটা, কিন্তু পড়ার পর থমকে যেতে হয়। ৪. অরিজিৎ গাঙ্গুলি-র 'সুজনবাবুর সারমেয়': গল্পটা পড়তে ভালোই লাগল। তবে সত্যজিৎ রায় আর অদ্ভুতরসের পাঞ্চিং হয়ে যে এটা ঠিক কীসের মেটাফর হল, বুঝলাম না। ৫. সপ্তর্ষি বোস-এর 'ভাগ': এই অনুচ্চ কিন্তু দাগ রেখে যাওয়া গল্পটি আমাকে সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কিছু গল্প মনে করিয়ে দিল। অতিশয়োক্তি নয়, যা মনে হল তাই লিখলাম। ৬. পিয়া সরকার-এর 'নিশিগন্ধা': এই গা-ছমছমে প্রাপ্তমনস্ক আখ্যানটি সময় নিয়ে, প্রেফারেবলি রাতে একা পড়বেন। সলিড লেখা! ৭. অর্ক ভট্টাচার্য-র 'উড়তে উড়তে': ডিস্টোপিয়া আর এক্সপেরিমেন্টেশন মিশে গিয়ে গল্পটাকে ঘেঁটে ঘ করে দিয়েছে। ৮. দেবপ্রিয় মুখার্জি-র 'এক যে ছিল': এ হল সেই গল্প যা পড়ে খুব ভালো লাগে, আর একই সঙ্গে হাপুস নয়নে কাঁদতে ইচ্ছে করে। ৯. নির্বাণ রায়-এর 'আনাড়ি': বস্তাপচা গল্প। নির্বাণের মতো ক্ষুরধার ও রসবোধের আধার লেখকের কাছ থেকে এমন একটি লো-ভোল্টেজ স্পার্ক পেয়ে আমারই ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেল। ১০. অরিজিৎ গাঙ্গুলি-র 'জিহাদ': আগুনের প্রত্যাবর্তন! দুর্ধর্ষ গল্প। ১১. অনির্বাণ ঘোষ-এর 'সমাপিকা': নাহ! বড়োই ইয়ে টাইপের গল্প। পড়ে পিত্তি চটকে গেল। ১২. ছন্দক চক্রবর্তী-র 'আবার বছর কুড়ি পরে': এটা গল্প নয়, একটা ম্যানিফেস্টো, তবে সুখপাঠ্য। ১৩. সুব্রত কুমার আচার্য্য-র 'কাগজ': আগুনের গল্প লিখতে পারতেন লেখক। কাদাতেই থেমে গেলেন। ১৪. স্নিগ্ধা সাহু-র 'স্মৃতি': ছিমছাম, কিন্তু এই রকম এক অক্ষৌহিণী গল্প লেখা হয়ে গেছে বাংলায়। ১৫. দেবপ্রিয় মুখার্জি-র 'কিডন্যাপ': শীর্ষেন্দু কিশোরদের জন্য ডিস্টোপিয়ার গল্প লিখলে বোধহয় এরকম কিছুই লিখতেন। ১৬. পিউ দাশ-এর 'সর্বম চ যুজ্যতে': বাস রে! এই হল গল্প। মানে একেবারে "মা কসম!" টাইপের অনুভূতি হয় এই জিনিস পড়ার পর। ১৭. সপ্তর্ষি বোস-এর 'রোদ্দুরে পাওয়া বিকেলবেলা': স্মরণজিৎ রিভিজিটেড। ১৮. দেবপ্রিয় মুখার্জি-র 'সোনার বাংলা': গল্পটা ভালো, কিন্তু এত বেশি জিনিস চেপে রাখা হয়েছে যে গল্পের শেষে পাঠককে (অন্তত আমাকে) মাথা চুলকে ভাবতেই হবে, কেসটা কী ছিল? ১৯. অরিজিৎ গাঙ্গুলি-র 'রতনবাবুর রত্ন': দুর্ধর্ষ! এর বেশি কিছু লিখছি না। ২০. অনির্বাণ ঘোষ-এর 'মায়াডোর': শেষ পাতে চোখের জলে মিষ্টিমুখ করতে হল এটি পড়ে।
সব মিলিয়ে এটাই বলার, এই সংকলনে নানা স্বাদের, নানা মানের, নানা মনের গল্প মিশে গিয়ে রাতের আকাশের এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঢেকে দিয়েছে নরম চাদরে। একে পড়ার পর তারারা ঘুমোবে। ঘুমোবেন আপনিও, তবে একটা দাবি নিয়ে। ছোটোগল্প তো "শেষ হয়ে হইল না শেষ" হয়ে থাকে। তাহলে ছোটোগল্পের সংকলন এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায় কেন? আর এক রাউন্ড হয়ে যাক না!