কথাশিল্পী মশিউল আলমের ‘বাংলা দেশ ও অন্যান্য গল্প’ বইটি যখন পড়া শেষ করছি, তখনই ফেসবুকের স্ক্রলে ভেসে উঠল শ্রীলংকান ওয়েব ম্যাগাজিন ‘হিমাল’ আয়োজিত ‘ছোটগল্প প্রতিযোগিতা ২০১৯’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে তাঁর ‘দুধ’ শীর্ষক গল্পটি, ‘মিল্ক’ শিরোনামে শবনম নাদিয়ার অনুবাদে। আমার নিজের খুব পছন্দের গল্প এটি। এই গল্পের পাশাপাশি আমার সীমিত পাঠ থেকে লেখকের ‘বিরজুকে নিয়ে গল্প লেখার কৈফিয়ত’, ‘জামিলা’, ‘পাকিস্তান’, ‘রূপালী রুই’, ‘মাংসের কারবার’, ‘আবেদালির মৃত্যুর পর’, ক্ষুধার্ত আকালু, ‘কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না’গল্পগুলোর কথা স্মরণ করতে পারি। ‘বাংলা দেশ ও অন্যান্য গল্প’গল্পগ্রন্থে ৮টি গল্প আছে। গ্রন্থটি ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত। সামগ্রিকভাবে এই সংকলনটি মশিউল আলমের অন্যান্য গল্পগ্রন্থের চেয়ে কিছুটা দুর্বল বলে মনে হয়েছে। অন্তত লেখকের উল্লিখিত গল্পের সঙ্গে উচ্চারিত হতে পারে এরকম গল্প আমি এ গ্রন্থে পেয়েছি কিনা ভেবে বলতে হবে। ‘বাংলা দেশ’ ও ‘রূপনগর থেকে দূরে’ গল্পদুটিতে আমি লেখককে পেয়েছি বটে, কিন্তু অনেকদিন মনে থাকবে এমন নয়।
মশিউল আলমের গল্পের কিছু নিজস্বতা আছে, যে কারণে তাঁর গল্পগুলোকে সমকালীন অন্যান্য লেখকের গল্প থেকে সহজেই আলাদা করা যায়। সময়ের একধরনের দ্বান্দ্বিক উপস্থিতি ঘটে তাঁর লেখায়। গল্পকার মশিউল আলম ভীষণভাবে সমকালিন। তাঁর অধিকাংশ গল্পের বিষয় পরিবর্তিত সময়, স্বকালে ঘটে যাওয়া ঘটনা। আমরা জানি পেশায় তিনি সাংবাদিক, সুতরাং ঘটনার বহির্বয়ান ও অন্তর্বয়ান কোনোটাই তাঁর অজানা নয়। তাঁর গল্পে এ দুটি বয়ানই থাকে। এটা গেল গল্পের বিষয়বস্তু বা বক্তব্যের দিক। নির্মিতির দিক থেকে তিনি নিরন্তর না হলেও অনেকটাই নীরিক্ষাপ্রবণ। তাঁর কোনো কোনো গল্পে অতিবাস্তবতার ভেতরও চমৎকারভাবে জাদুবাস্তবতার মিশেল ঘটে। কখনো আবার জাদুবাস্তবতার চেয়ে পরাবাস্তবতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শুরু থেকে এক ধরনের আকর্ষণীয় কাঠামোর ভেতর দিয়ে গল্প এগিয়ে যায়। এক্ষেত্রে মেদহীন সতস্ফূর্ত গদ্য পাঠকের জন্য গল্পটিকে আরো উপভোগ্য করে তোলে। চরিত্রের অতি বয়ান বা পরিস্থিতির অপ্রয়োজনীয় কাব্যিক বয়ানের দিকে তিনি ঝোঁকেন না। এই পরিমিতিবোধ তাঁর গদ্যভাষার প্রধান শক্তি বলে আমার মনে হয়।
আলোচ্য গল্পগ্রন্থ সম্পর্কে দুয়েকটি কথা বলার আগে মশিউল আলমের গল্পের সাধারণ প্রকৃতি নিয়ে আমার নিজস্ব মত তুলে ধরার মধ্য দিয়ে আমি এটুকু বলতে চাচ্ছি, ‘বাংলা দেশ ও অন্যান্য গল্প’ বইতে মনে রাখার মতো মশিউল আলমকে না পেলেও তাঁর যে গল্পবলার স্বকীয় স্বর সেটি অনুপুস্থিত নয়। অর্থাৎ গল্পগুলো পাঠক হিসেবে আমার কাছে অবশ্যপাঠ্য মনে না হলেও সুখপাঠ্য বলে মনে হয়েছে।
গ্রন্থের সূচনা গল্পের নাম ‘প্রতিদিন মনে পড়বে’। গল্পটি দ্বিজেন শর্মার স্মৃতিবিজরিড়। স্বপ্নবাস্তবতার মতো গল্পের কথক মশিউল আলম মস্কোর একটি হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটের ভেতর ঢুকে পৌঁছে গেলেন ঢাকার রমনা পার্কে। সেখানে অপেক্ষা করছেন আইসিইউতে ভর্তি থাকা দ্বিজেন শর্মা। দুজনে একসঙ্গে হাঁটেন। আমরা জানি, মশিউল আলম এবং দ্বিজেন শর্মা অনেকটা বছর সোভিয়েত ইউনিয়নে ছিলেন। দুজনে বিপ্লব, ক্যাপিটালিজম, সমাজতন্ত্র, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। গল্পে প্যাঁচার মুখে কণ্ঠস্বর তুলে দিয়েছেন কথক। প্যাঁচা পণ্ডিতের মতো বলে, ‘ক্যাপিটালিজম কোনো ইজম না, স্পন্টেনিয়াসলি গড়ে ওঠা একটা সিস্টেম।’ রমনার পথ তুষারে ঢেকে গিয়ে মস্কোর রাস্তা হয়ে ওঠে। ওদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে লেলিনের, সঙ্গে ভোলান্দ। দ্বিজেন শর্মার মৃত্যু দিয়ে গল্পটি শেষ হয়। গল্পটিতে স্থান বা সময়হীনতার ব্যাপার আছে। পাঠকের বেশ মনোযোগ দাবি করে।
‘বাংলা দেশ’ গল্পে দেশভাগের ফলে দুই বাংলার মানুষের মনের মধ্যে যে ক্ষত, বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সন্দেহ ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে সেটি উঠে এসেছে। সাতচল্লিশের পর কলকাতায় চলে গেছেন নবীনচন্দ্র চক্রবর্তী, নাতি অভিজিৎকে সঙ্গে করে এতটা বছর পর বাংলাদেশে এসেছেন। নবীনচন্দ্র বাংলাদেশকে স্বদেশ এবং ভারতকে বিদেশ বললে এদিক থেকে আপত্তি তোলে রেজাউল। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি এদেশে থাকতে পারবেন না বলে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। এভাবেই অপ্রয়োজনীয় বাদানুবাদের ভেতর দিয়ে গল্প এগিয়ে যায়। গল্পটি বক্তব্যপ্রধান। শুরুটা আগ্রহউদ্দীপক হলেও শেষের দিকে কিছুটা ঝুলে গেছে। গল্পের ভেতর থেকে বাস্তবতা উঠিয়ে আনা, আর চরিত্রের উপর বাস্তবতা আরোপ করা—দুটো আলাদা জিনিস। কোথাও কোথাও লেখক আরোপ করছেন বলে মনে হয়েছে।
‘এটা মনিকা’ গল্পে নগরজীবনে পিতামাতার দাম্পত্যকলহ-পরকীয়ার ফলে উঠতি বয়সী সন্তানের মনে যে প্রভাব পড়ে তার কিছুটা উঠে এসেছে। ‘রমজানের ১০ তারিখ’ প্রেমের গল্প। অতিপ্রাকৃত বা অব্যাখ্যাত বিষয় এ গল্পে আছে। গল্পে কৈফিয়ত অংশটি অতিরিক্ত মনে হয়েছে। নাস্তিক আবু রায়হানকে ওর সাবেক প্রেমিকা দশ রমজানের শেষরাতে ফোন করে সেহরি খেয়ে রোজা রাখতে বলে ফোনটা কেটে দেয়। আবু রায়হান স্ত্রীকে না জানিয়ে সেহরি খেয়ে রোজায় থাকে। এরপর থেকে প্রতিবছর সে রোজা করে আর প্রতি বছর দশম রোজায় একটা ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করে। জানা যায়, যে মেয়েটি পাঁচ বছর আগে ফোন করেছিল সে তারও ছয় বছর আগে মারা গেছে। এরপর আবু রায়হান রোজা করে এবং মেয়েটির ফোন কলের জন্য অপেক্ষা করে। আবু রায়হানকে শুরুতে নাস্তিক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং একটি ফোনকলের ভিত্তিতে তাকে নিয়োমিত রোজাদার, কিন্তু নামাজি না, করে তোলার ভেতর দিয়ে লেখক কি বোঝাতে চেয়েছেন তা আমার কাছে পরিস্কার না। হয়ত পুরনো প্রেমিকার প্রতি রায়হানের নিবেদন হয়ে থাকবে। এছাড়াও অন্যান্য গল্পের মধ্যে ‘রূপনগর থেকে দূরে’ গল্পটির কথা বলতে চাই। গল্পটি মুক্তিযুদ্ধচলাকালে একটি গ্রামের কতগুলো মানুষের কথা বলা হয়েছে যারা পাকিস্তানপন্থী। একসময় তারা এই গ্রামের মানুষ ছিল না, এটি ছিল হিন্দুদের গ্রাম, নাম ছিল বিষ্ণুপুর, দেশভাগের পর ওপার থেকে আসা মুসলমানদের কারণে গ্রামটি নাম বদলে হয়েছে রসূলপুর। গ্রামের মানুষের ধারণা তারা যেহেতু নৌকায় ভোট দেয়নি এবং তারা পাকিস্তানের পক্ষে, তাই তাদের কোনো ক্ষতি করবে না পাকিস্থানি মিলিটারি। গ্রামের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আশরাফ এবং তার পরিবারের করুন পরিণতি এবং গ্রামটির জেগে ওঠার মধ্য দিয়ে গল্পটি শেষ হয়। ছোটগল্পের টান ও টনটনে ভাব দুটোই এই গল্পে অনুপুস্থিত। উপন্যাসের মতো ডিটেলিং এবং প্রেডিকটেবল কাহিনির কারণে গল্পটি ধরে রাখতে পারে না। আমি দু বসাতে শেষ করেছি।