বেলাল চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৮ ফেনীতে, মৃত্যু ২০১৮ তে। ১৯৬৩ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত তিনি কলকাতায় ছিলেন, সখ্য লাভ করেছিলেন সেখানকার সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সাথে। কৃত্তিবাসের কয়েকটি সংখ্যা তিনি সম্পাদনা পর্যন্ত করেছেন। তার কলকাতা বাসের স্মৃতি নিয়ে তিনি কোন ধারাবাহিক রচনা করে যেতে পারেন নি, যদিও এরকম একটা পরিকল্পনা ছিলো, শেষ পর্যন্ত তা আর হয়ে ওঠে নি। কলকাতা বাসের স্মৃতি নিয়ে তার লেখা টুকরো কিছু স্মৃতিকথা ও কলকাতা নিয়ে লেখা কবিতা ও কলকাতার কিছু ছবি একত্রে সংকলিত করে এই বই।
কয়েকদিন আগে শামসুর রাহমানের "আমার ঢাকা" পড়েছিলাম। ভালো লেগেছিল। সে সুবাদে বেলাল চৌধুরীর "আমার কলকাতা " পড়া। বড্ড অগোছালো লেগেছে লেখাগুলো,মানে কেমন জানি ঠিক ভাবে সাজানো হয়,কয়েকটা লেখা কেমন শুধু অর্ধেক টা দিয়েছে মত মনে হয়েছে । তবে বেলাল চৌধুরী সম্পর্কে আগ্রহ জেগেছে,এটাই বড় কথা।
আশা ছিলো বেশি, তাই বোধহয় হতাশ হলাম। বেলাল চৌধুরীর নামের সাথে আমার পরিচয় সুনীলের বদৌলতে, কবিতা যে পড়ি না। কবি বেলাল চৌধুরী ষাট আর সত্তরের দশকে তখনকার পূর্বপাকিস্তান মানে আমাদের বাংলাদেশ থেকে কলকাতা পাড়ি দিয়েছিলেন। টান টা ছিলো বোধহয় সাহিত্যের। সুনীলের অর্ধেক জীবনে বেলাল চৌধুরীকে বলেছেন এক ছদ্মবেশী রাজকুমার, যিনি ষাটের দশকের ভারত-পাকিস্তান স্নায়ু আর সম্মুখ যুদ্ধের সময়ে কোন যাদুমন্ত্রবলে ওপার বাংলায় পাড়ি দিয়ে জয় করে নিয়েছিলেন সেখানকার আবাল বৃদ্ধ বনিতার মন। জড়িয়ে পড়েছিলেন সেখানের সাহিত্যিক গোষ্ঠীর সাথে, লিখেছেন কবিতা, সম্পাদনা করেছেন কৃত্তিবাস। বইয়ে আছে সেই সময়ের কিছু টুকরো স্মৃতি, কিছু আলোকচিত্র( যার বেশিরভাগই এযুগের), কলকাতা নিয়ে কবিতা। টুকরো স্মৃতির ধারাবাহিকতা নেই, ধারাবাহিকভাবে লেখা হয় নি বলেই। কলকাতার স্মৃতি নিয়ে আলাদা একটা বই লেখার কথা ছিলো তার, হলো না, মৃত্যু কেড়ে নিলো যে। তবু ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু তো ছিলো, তাই কুড়িয়ে বাড়িয়ে এই বই। ষাটের দশকের, সত্তরের দশকের কলকাতা, কফি হাউস, কৃত্তিবাস গোষ্ঠী, হঠাৎ বেড়াতে চলে যাওয়া, খালাসীটোলা, সুনীল, শক্তি, ইন্দ্রদা, সৌমিত্র, কমলকুমার মজুমদার ঘুরে ফিরে এলেন। তবু মন ভরলো না, লেখকের দোষ নেই, কারণ সেভাবে যে লেখাই হয় নি। লেখায় বেশ একটা কলকাত্তাইয়া ছাপ আছে, তবু যেন সব পেলাম না। বইয়ের কলেবরের তুলনায় দাম বোধহয় একটু বেশিই। তবু বেশ বেলাল চৌধুরীর সাথে ষাট আর সত্তরের দশকের কলকাতা ঘুরে আসা গেলো, অপূর্ণতা তো রইলোই, থেকেই যাবে।
নগর কলকাতার নাগরী বিপ্রলব্ধা কম্পিত হৃদয় সে এক ধাতব রুপালি হাঁস অটুট তার ছন্দ সংহতি উদ্বেলিত তরঙ্গে নৃত্যপর তার দোদুল্যমান দেমাকি
ঠাট ও কারুকৃতি
রহস্যের ও জাদুর শহর যদি হয় ঢাকা তবে কবি, সাহিত্যের নগরী হচ্ছে কলকাতা। কলকাতার অলিগলিতে যেনই ছড়িয়ের আছে সাহিত্যের ভান্ডার। কলকাতা যেন বেড়েই উঠেছে তাদেরই হাত ধরে। সেই জোন চর্বাক থেকে এখন পর্যন্ত যেন কলকাতা তার রাস্তা ঘাট অলি গলি সব কিছুতেই যেন সাহিত্যের ছোয়া জুড়ে আছে। . কলকাতা শুধু যেন একটি শহর নয়, যেন সাহিত্যের উত্থান যেন এখন থেকেই গড়ে উঠেছে। কলকাতার সাথে কার সম্পর্ক নেই। সবাই যেন এক সুতোয় বাধা। সুনীল, শক্তি, থেকে শুরু করে সত্যজিত, সৌমিত্র, শুভেন্দু পর্যন্ত। সবাইকে যেন কলকাতা আগলে রেখেছে। কেউ যেন এই শহরকে ছেড়ে যেতে পারেননি। পারেনি তাদের এই কলকাতাকে ভুলে যেতেও। যেন সবাই শেষ পর্যন্ত এখানেই ফিরে আসতে চেয়েছেন। . তবে বেলাল চৌধুরীর “আমার কলকাতা” বইটির শুরুতে যেভাবে লেখা হয়েছিল তাতে কিছুটা আশাবাদী হলেও পরবর্তিতে কিছুটা হতাশ হয়েছি। কলকাতার পুরাতন ইতিহাসের চেয়ে লেখকের নিজস্ব ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি বেশি প্রকাশ পেয়েছে। যার বেশির ভাগ শক্তি চট্টোপাধ্যায় কে ঘিরেই লেখা হয়েছে। তবে এটা অস্বীকার করা যাবে না যে বইটিতে কলকাতার বর্ণনা নেই। কলকাতাকে ঘিরে দেশ ভাগ, নাকশাল বা মুক্তিযুদ্ধ সব কিছুর ছোয়া পেয়েছে এই শহর। . মুলত এটি একটি স্মৃতিচারণমুলক লেখা। এখানে লেখকের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে কিছু লেখা এক সাথে করে সেটা প্রকাশ করা হয়েছে। কলকাতাকে ঘিরে লেখার যেই স্মৃতিচারণ মুলত সেগুলোই এই বইটিতে স্থান পেয়েছে। এছাড়া কলকাতাকে ঘিরে কিছু কবিতাও এই বইটিতে স্থান দেয়া হয়েছে এবং সেই সাথে কিছু ছবি। যেই ছবি গুলো স্মরণ করিয়ে দেয় বেলাল চৌধুরীর লেখক জীবন ও তার সাথের মানুষদের। . আমি কবিতার মানুষ নই। তবুও কবিতার ভাষা আমার কাছে ভাল লাগে। পড়তে ভাল লাগে। সব কিছুর ভেতর একটি ছন্দ থাকে। আমার কলকাতাও সেই ছন্দের এক অপূর্ব অভিব্যক্তি। লেখক তার লেখক জীবন থেকে শুরু করে তার সাথে যারা ছিলেন তার স্মৃতি খুব সুন্দর ভাবে তুলে এনেছেন। বলা যায় লেখার মুগ্ধতায় সেই সময়টাকে যেন এখন উপলদ্ধি করা যায়।
নাম ধারনা দেয় যে , বইটি হয়ত কলকাতা শহরের আদিকথা, রূপকথা, ইতিহাস, বেড়েউঠা, কোথায় এর মধ্যে জমা হয়েছে একটু দুঃখ এগুলো জানাবে। এই নাম করনের যথার্থতা যে একদম ভুল তা নয়, আবার গিনি সোনার মত শুদ্ধও নয় । বইয়ের প্ররম্ভেই লেখকের দেখার দৃষ্টি আপনাকে আকর্ষন করবে, মুগ্ধ করবে। পরিসংখ্যন গত তথ্য দেখিয়ে দেয়, লেখকের দেখার দৃষ্টি যেন হীরকের জওহরের মতই, দেখেই বেছে বইএর পাতায় তুলে ধরেছেন কলকাতার অলিগলির নিত্যদিনের, তবে একদম গোড়ার গল্প।চতুষ্পদী গো জাতীর গল্প আপনাকে হাসাবে , জন সাধারনের নিত্যজীবন কে অঙ্কের সূত্রে ফেলা পাঠক হৃদয়কে বিস্মিত করে, তৃপ্ত করবে । তবে ক্রম বিকাশ ধারাবাহিক ও সংগঠিত নয়। বাউন্ডুলে জীবনের চিত্র দিতে কোন কার্পন্য লেখক করেননি ।একটি বড় অঙ্গই ছিল ইচ্ছাকৃত অবচেতন হওয়ার গল্প। সাথে উঠে এসেছে কফি হাউসের আড্ডার দিন গুলোর কথা, এসেছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় , শক্তি চট্টোপাধ্যায় মত কবিদের কথা বন্ধুত্বের কথা। তবে বইএর বেড়ে উঠা নিয়ে আক্ষেপ পরিনত রূপ লাভ করার আগেই লেখক বৈদগ্ধ শব্দশৈলী দ্বারা তুলে ধরেছেন ৭১ এই চোখে দেখা ইতিহাস, ধরেছেন কফি হাউসের সোনালী দিন গুলোর উপখ্যান , ধরেছেন চন্দ্রাহত হওয়ার গল্প। বইটি পড়ার সমাপ্তি এক ধরনের হাহাকার তৈরী করেছে আমার মধ্যে তা হল, লেখকের চমৎকার পর্যবেক্ষনের বর্ননা নিয়ে কার্পন্য । শেষ করব লেখকের উক্তি দিয়ে , 'তাই বর্তমান এই কাহিনীতে বর্নীত খন্ড খণ্ড উপখ্যান কোন ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে নয় ,নামধামের ঢাকঢোল বাজানো নয় ,একান্ত ভাবেই মহানগরী কলকাতার এবং কলকাতারই নিজস্ব কাহিনী। ' এই সাথে একমত হবেন নাকি হবেন না , তার জন্য কবি বেলাল চৌধুরী রচিত 'আমার কলকাতা ' পড়ে দেখা প্রয়োজন ।