বহুতল আপার্টমেন্টের জানালা দিয়ে স্পষ্ট দেখা যায় ভরা পুর্নিমার চাঁদ।
কাঁসার থালার মত বিশাল একটা চাঁদ একটু একটু করে উঁকি দেয় দিগন্ত রেখায়, তারপর ধীরে ধীরে উঠে শুরু করে মধ্য আকাশে। বিশাল বিশাল জানালাগুলির সার্সি গলে প্রবেশ করে রুপালি জোসনার আলো, মাতাল করা জোসনায় ভেসে যেতে থাকে চারপাশ...
বড় অস্বস্তি বোধ করেন তিনি এই সময়ে। বড় অস্বস্তি!
শহুরে এই ঘরদোর, পরিবার-পরিজন, ঘর- সংসার সবকিছুকেই তখন মনে হয় কুৎসিত এক কারাগারের মতন। এ তো তার গ্রাম নয়। এখানে চাইলেই ভরা পূর্নিমার রাতে উঠোনে হাত-পা মেলে বসে থাকা যায় না। মন চাইলেই চাঁদ মধ্য আকাশে রেখে...
না, আর ভাবতে চান না আসিয়া খাতুন। ভাবলে কেবল জ্বালা বাড়ে, বললে কেবল তৃষ্ণা বাড়ে। নিজের চিরচেনা ঘরদোরে ফিরে যাবার জন্যে বুকের মাঝে উথাল পাথাল হয়।
বয়স নব্বই ছুঁই ছুঁই তার। সেই কবে বিধবা হয়েছিলেন এখন আর মনেও নেই। একলাই ছেলেপুলে মানুষ করেছেন। লেখাপড়া শিখিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেপুলেরা যখন এক এক করে শহরে গিয়ে সংসার পেতেছে, তিনি কিন্তু রয়ে গেছেন সেই গ্রামেই। নিজের শুন্য ঘরদোরই পরম মমতায় আগলে ধরে বসে ছিলেন। ছেলেপুলে নেই তো কী হয়েছে। গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, বাড়ির কামলা-যোগালি আর কাজের মানুষজন নিয়েই দিব্যি সংসার পেতে বসেছিলেন।
কিন্তু এখন অবস্থা বদলেছে। চোখে প্রায় কিছুই দেখতে পান না, কান দুটিও ধোঁকা দেয় প্রায়ই। গেঁটে বাতে এমন নাজেহাল হয়েছেন যে একা কোথাও হেঁটে যাওয়াও মুশকিল। ছেলেপুলের দল তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তাকে ধরে এনেছে একরকম, নিজেদের শহুরে ঘরদোরে বড় যত্নে লালন-পালন করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু আসিয়া খাতুনের এসবে মন টেকে না। বিশেষ করে পুর্নিমার রাতগুলিতে তিনি বড় অস্থির বোধ করেন। বাড়ির পেছনের বাঁশের ঝাড়টার জন্যে মন কেমন কেমন করে, মাতাল করা জোসনার জন্যে মন কেমন কেমন করে।
চাঁদ যত উজ্জ্বল হয়, ততই যেন বাড়তে থাকে তার পিপাসা। মনে হয় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে, ছাতি ফেটে মরে যাবেন যে কোন মুহুর্তে। মনে হয় আজন্ম বুঝি ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত তিনি। মনে হয়... মনে হয়...
ভাবতে ভাবতে ছটফট করেন আসিয়া খাতুন। ছটফট করতে থাকেন ভরা পুর্নিমার আলোতে। তার মত প্রাণীদের জন্যে পুর্নিমা ক্ষুধা ছাড়া আর কিছু নিয়ে আসে না। এই সময়ে তাঁদের জীবন্ত কিছু একটা খেতে হয়...
কোন জীবন্ত প্রানীর উষ্ণ রক্ত... কাঁচা মাংস... আহা... আহা...
গ্রাম দেশে এসবের অভাব হয় না। গোয়ালে কচি কচি বাছুরগুলি থাকে, খোঁয়াড়ে থাকে মুরগি। বাড়ি ভরা কুকুর-বেড়াল কিছু একটা ধরে নিলেও হয়। কেউ টেরটি পর্যন্ত পাবে না। সকালে কোন চিহ্ন পেলেও ধরে নেবে শেয়ালে নিয়েছে।
কিন্তু এই শহুরে জীবনে সে সুযোগ কই! এখানে সবকিছু হিসেবের। সবকিছু মাপা মাপা। সবকিছু অন্যের নজরদারির মাঝে।
‘ও দাদীজান, খারাফ লাগে নি? আফা মনিরে বুলামু?’ কাজের মেয়ে রুনা, আসিয়া খাতুনের দেখাশোনার ভার এই রুনার উপরেই ন্যাস্ত।
বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলেন আসিয়া খাতুন। এমন সময়ে তাকে একা থাকতে হয়, এমন সময়ে একা থাকাই নিয়ম। এমন সময়ে আশেপাশে মানুষ থাকা বড় বিপদজনক।
‘ধুরো বেডি, যা এইহান থেইকা। তরে লাগলে আমি ডাকুম। ধমকে আরও চিন্তিত হয় কিশোরী মেয়েটা। এগিয়ে আসে কাছে। ‘ও দাদীজান, ঠিক কইরা কন। খারাফ লাগে নি? চউখ বন করছেন ক্যান? আফা মনিরে ডাকুম?‘ ‘জ্বালাইস না তো বেডি। যা কইলাম!‘ আরো কাছে এগিয়ে আসে মেয়েটি। ‘আমারে কন, দাদীজান। কী হইসে?’ ‘কিচ্ছু অয় নাই। তুই যা!‘ ‘কিচ্ছু হয় নাই মানে কী? মাথায় ব্যাদনা? মালিশ কইরা দিব?’ ‘কিচ্ছু লাগত না, তুই যা।‘ ভয়ানক এক তৃষ্ণায় কাতর আসিয়া খাতুন খেঁকিয়ে ওঠেন। মন বলে এই মেয়েকে ভাগিয়ে দিতে যে করেই হোক। নতুবা ঘটে যাবে অনর্থ... অনেক বড় অনর্থ...
কিন্তু হতভাগিনি এগোয় কাছে... আরো কাছে। ‘কিচ্ছু হইব না, দাদীজান। আপনে চউখ বন রাখেন, আমি মাথা মালিশ কইরা দেই। দ্যাখবেন সবকিছু ঠিক হইয়া যাইব...’
বলতে বলতে কপালে হাত রাখে মেয়েটি। আহ, কী উষ্ণ একটা হাত। কী উষ্ণ, নরম আর কচি কচি। মাংস নয়, যেন মাখনের দলা... আহ... আহ... !
নিজেকে হারিয়ে ফেলেন আসিয়া খাতুন। বয়স হয়েছে, এখন আর ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এই বয়সটাই খারাপ। এই বয়সে কিছু এবার খেতে ইচ্ছে করলে নিজেকে আটকে রাখা যায় না।
এমন কচি কচি মাখনের দলার মত মাংস... ভরা পুর্নিমার রাতে এমন মাংস না খেলে কি হয়?
আসিয়া খাতুন ভাবতে থাকেন আর ভাবতেই থাকেন। ভাবতে ভাবতে শরীরের মাঝে অন্যরকম শিহরণ খেলা করে যায়। বাস্তব আর অবাস্তবতার মাঝে অন্য রকম এক ভুবনে ঝুলে থেকে বড় লোভাতুর হয়ে ওঠেন আসিয়া খাতুন।
উষ্ণ খানিকটা রক্তের জন্যে। কচি খানিকটা মাংসের জন্যে। কাঁচা মাংসের খানিকটা উগ্র গন্ধের জন্যে... হোক তা কোন প্রাণীর... কিংবা মানুষের স্বয়ং!
বইটা হাতে নিয়েছিলাম ভয় পাবার জন্য। একটুও ভয় পাইনি। বই এর প্রচ্ছদটা সুন্দর। প্রচ্ছদ দেখেই বইটা কিনেছিলাম। এখানে তিনটা গল্প আছে। গল্পগুলোকে ঠিক ছোট গল্পও বলা যায় না। তিনটা অন্য ধাঁচের গল্প।অবশ্যই হরর জন্রাতে পড়ে কিন্তু ভয় পাওয়া কেন গেলোনা সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারছিনা। এই লেখিকার পড়া এটাই আমার প্রথম বই। উনি অনেক অনেক বই লিখেছেন। এবং বই এর নামগুলো পড়তে গিয়েই বুঝলাম হরর জন্রায় অনেক গল্প লিখেন। আমার মতো একজন হররপ্রেমী পাঠক এই লেখিকার খোঁজ এতোদিন পেলো না কেন সেটাও এক বিস্ময়! লেখিকা খুবই ঝরঝরে ভাষায় গল্প লিখেন। একটানা বইটা পড়তে গিয়ে কোথাও মনে হয়নি একটু রাখি। লেখনীর জাদুময়তার জন্যই তিন তারা দিলাম। গল্পগুলোও ভালো। কিন্তু একদম শেষে 'শেষের পরে' অংশটা পড়ে ভালোই লাগলো না। তাই দুই তারা কেটে নিলাম। একটু ভিন্নধর্মী হরর গল্পের স্বাদ পেতে চাইলে পড়তে পারেন এই বইটা।
আমি বইটা কিনেছি বইটই অ্যাপ থেকে। অ্যাপে লেখিকার এই বইটা সহ আরো বেশ কিছু বই আছে। ফোনে বই পড়তে চাইলে নিঃসন্দেহে সেই অ্যাপ থেকে কিনে পড়ে নিতে পারেন। হ্যাপি রিডিং!!