শঙ্খ ঘোষ বলেছিলেন, 'আমরা যখন সত্যিকারের সংযোগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতো একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়। পারি না হয়তো, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।" সেই খোঁজ ইন্দ্রাণীর এই গল্প সংকলনে।
আমি সত্যিই লজ্জিত, লেখিকা ইন্দ্রানীর কলমের সঙ্গে আমার আগে পরিচয় হয়নি। হয়তো আমার মতো অনেকেই আছেন, যারা তাঁর লেখা সম্পর্কে অবগত নয়। কিন্তু বুকে হাত রেখে বলছি, এই ছোট গল্প সংকলনটা আমাকে প্রথম গল্প থেকেই ছিটকে দিল, না... বলা উচিত শুন্যে তুলে মহাকাশে নিক্ষেপ করল। শুধু তাই না, সংকলনের খান পাঁচেক লেখা আমার পাঠক মনের সেই গোপন তারে আঘাত দিয়ে ফেলল, যা সম্ভবত সমসাময়িক সময়ে কোনো গল্প সংকলনের কোনো গল্পই পারেনি। বলছি না যে আমি সব লেখাই পড়ে ফেলেছি, অথবা ছোটগল্প বিশ্লেষণ করার খুব একটা বুদ্ধি আমার আছে, এ একান্তই পাঠক হিসেবে আমার নিজস্ব অনুভূতি।
ইন্দ্রাণীর ভাবনার ফসল যে কোথায় কোথায় গেছে আর কী ধরনের গল্প বুনেছে সেটা হাতেকলমে আলোচনা করা সম্ভব নয়। মনের অচেনা গলিতে আমাদের ভাবনারা যে লাগামছাড়া ভাবে ঘুরে বেড়ায় আর পরিচিত- অপরিচিত জীবনের মুহুর্তে মানুষ যে কল্পনা ও বাস্তবের দোলাচলে ঘোরাফেরা করে, এই সংকলের বেশিরভাগ গল্পই সে জায়গাটা একদম স্বাভাবিক ভাবে ছুঁয়ে গেছে। জানি না লেখিকার দীর্ঘ প্রবাসের ফসল না অন্য কিছু, এই গল্পগুলোর ধাঁচটাও একেবারেই অন্য স্বাদের, হয়তো সকলকে এক ভাবে স্পর্শ নাও করতে পারে। লেখিকার চরিত্র, ভাষা, বর্ণনা, উপমা, গল্পের গ্রাফ সবই কিছুটা অন্যরকম। বাইরে থেকে চেনা চেনা ঠেকে ঠিকই, কিন্তু আসলে ভিতরে অন্য মালমশলা আছে। হ্যাঁ, কিছু চেনা ছবি ও প্লটও আছে, কিছু গল্প অপেক্ষাকৃত ভাবে খানিকটা ফিকে, কিন্তু বেশিরভাগ গল্পই স্টারমার্ক পাবে। গল্পে আচমকা এমন এমন এক একটা অনুচ্ছেদ আসে, তাতে গল্পটা আগের জায়গা থেকে হাইজাম্প দিয়ে অন্য স্তরে পৌঁছে যায়। সেটা পুরো গল্পটা না পড়লে বোঝা সম্ভব নয় যদিও তাও দু একটা জায়গা দিলাম।
ধরুন এই জায়গাটা...
**
খেলনার দোকানে একবার একটা পুতুল দেখেছিল পরিতোষ। সাজগোজ করা মেয়ে পুতুল। কার্ডবোর্ডের বাক্সের মধ্যে পুতুল, সামনে সেলোফেন-- যার ভেতর দিয়ে পুতুল দেখা যাচ্ছে। পুতুলের হাতের পাতাদুটি বাক্সের বাইরে ছিল-- নাচের মুদ্রায়। একটি হাতের পাতা ওপর দিকে, অন্যটি নিচে। বাক্সের ওপর লেখা ছিল -- হোল্ড মাই হ্যান্ডস। পরিতোষ দেখছিল, দোকানে আসা বাচ্চা, তাদের মা-বাবা হাতের দুই তর্জনী দিয়ে পুতুলের হাত স্পর্শ করছে, সঙ্গে সঙ্গে পুতুলের বুকের মধ্যে লাল নীল আলো জ্বলে উঠছে, সঙ্গে খুব সুরেলা একটা বাজনা। পরিতোষের আলো জ্বালাতে ইচ্ছে হয়েছিল। পুতুলের হাত ধরেছিল আলতো করে-- আলো জ্বলেনি। হাতের জোর বাড়িয়েছিল পরিতোষ। তাও জ্বলেনি আলো। পুতুলটা খারাপ মনে করে, অন্য রঙের পুতুলের হাত ধরেছিল পরিতোষ। এবারেও আলো জ্বলেনি। পরিতোষ আচমকাই অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল-- একটার পর একটা পুতুলের বাক্স তুলে নিচ্ছিল, দু'আঙুল দিয়ে ধরছিল পুতুলের দুই হাত, চাপ দিচ্ছিল পুতুলের দুই হাতে। আলো জ্বলছিল না। দোকানের মেয়েটি কাছে এসে বলেছিল -- "প্রোব্যাবলি ইওর হ্যান্ডস আর টু ড্রাই!"
** সমরেশের জীবনদেবতা সম্ভবত এই বইয়ের সেরা লেখা। এ হল গল্প খোঁজার গল্প, অথবা আরো ভালো করে বলতে গেলে গল্পের আড়ালে নিজেকে খোঁজার গল্প। কয়েক পাতার এই গল্পে যে লেখিকা কী কান্ড ঘটিয়েছেন পড়ে আমার মাথা গুবলেট হয়ে গেল। দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এই তুখোড় গল্প থেকে দু এক লাইন তুলে দিলাম...
**
--ঘোড়াকে গল্প বলছিলেন? কী গল্প?
--ওর নাম সুলতান। আমারই লেখা গল্প বলছিলাম। কলকাতার গঙ্গোত্রী প্রকাশন-- চেনেন? সেখান থেকে তিনটে বই বের করেছিলাম। 'নীল পাহাড়ের হাতছানি', 'সাগরজলের শব্দ' আর 'জঙ্গলের গল্প'। কেউ পড়ল না স্যার, এক কপিও বিক্রি হয়নি। আর ছাপাইনি কিছু। এখানেই ডাক্টারি করি আর গল্প লিখি। তবে মানুষকে আর পড়াই না। কুকুরদের শোনাতাম, গরুদের। তবে সুলতানের থেকে বড় শ্রোতা হয় না। অন্ধ তো, দেখতে পায় না। সব শোনে। এই যে আপনি বসলেন-- মোড়া টানার শব্দ হল-- শুনেছে। ওই ডালটা খসে পড়ল-- কান খাড়া হল-- দেখলেন না? সুলতান আমার কথা বোঝে।"
**
এই শান্ত কিন্তু বিস্ফোরক বইটা সত্যিই এক রত্নখনির সমান। এরকম 'জেম' যে মাত্র সত্তর টাকায় পাওয়া যায় সেটাই আশ্চর্য। গুরুচণ্ডা৯র চটি বই সিরিজে যে নানা মণিমুক্তা আছে, তার মধ্যে এই বইটা আমার জন্যে প্রথম সারিতেই থাকবে।
নিত্যদিনের ছোটাছুটি। ঘোড়দৌড় , ইঁদুরদৌড় বা বেঁচে থাকার লড়াই যাই হোক, ক্লান্ত করে দিচ্ছে শারীরিক মানসিক ভাবে। এই দৌড়ে পাশের যে মানুষটা, হয়তো সহমর্মী, হয়তো সমব্যাথী; কিন্তু আমরা দেখছি আরেক প্রতিযোগী হিসাবে। দূরে সরে যাচ্ছি অজান্তে কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে। যদি ঘোড়ার চোখের দুপাশে লাগানো ঠুলি সরিয়ে, শুধুই একগুঁয়ের মতো একদৃষ্টে সামনে না তাকিয়ে একটু মাথা ঘোরাই। উপরে আকাশ , পিছনে ফেলে আসা সময় আর আশেপাশে আরও কিছু মানুষ পেতে পারি যারা ছক ভাঙছে। যোগাযোগ থেকে এভাবেই হবে সংযোগ। চলে যাওয়ার আগে বাঁচার উপাখ্যান তৈরী হবে। এরকমই কিছু দলছুট মানুষ আর তাদের কথা। গভীর ভাবনা , মহান দর্শন নয় শুধু কেমনকরে বেঁচে আছি সেই টুকরো টুকরো কাহিনী। এমন ১০ টা গল্প নিয়ে "পাড়াতুতো চাঁদ" ভালো লাগলো লেখিকার গল্পবলার ধরণ আর বিশেষ করে "সমরেশের জীবনদেবতা" গল্পটা। কাগজ কেটে বইটার অপূর্ব প্রচ্ছদ করেছেন তৃণা লাহিড়ী। এবারের বইমেলার একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্রয়।