জয় জগন্নাথ! এক বিরাট সংখ্যক বাঙালির কাছে আজও বেড়ানো মানে দিপুদা (দিঘা-পুরী-দার্জিলিং)। তাই এই ধ্বনির সঙ্গে আমাদের পরিচয় প্রায় আজন্ম। সচরাচর এই ধ্বনি আমরা শুনি বাৎসরিক পুরী ভ্রমণের সময় মন্দির প্রাঙ্গনে। কিন্তু এই বছর কলকাতা বইমেলার ঠিক আগেই এই ধ্বনি উঠতে শুরু করে বইপাড়ায় আর সোশ্যাল মিডিয়ায়। আরও অনেকের মতো আমিও কৌতূহলী হই। তাহলে কি এবার মা সরস্বতী রথে চেপে আসছেন? ভুল ভাঙে যখন বুঝি, এটি একটি প্রকাশিতব্য বইয়ের নাম। বইটির লেখক যাঁদের সমনামী তাঁদের একজন মা সরস্বতীর বরপুত্র তথা এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক। তাই প্রথমে ভেবেছিলাম, এটা বোধহয় কোনো গল্পের বই। ভালোভাবে খোঁজ নিয়ে সে ভুল ভাঙল। জানলাম, এটি পুরীর শ্রী জগন্নাথদেবকে নিয়ে একটি গবেষণা গ্রন্থ। বইটা নিয়ে মুখে-মুখে ছড়িয়ে যাওয়া কথা শুনে সবিশেষ কৌতূহলী হলাম দুটি কারণে: প্রথমত, জগন্নাথ মন্দির, বিগ্রহ ও বিশ্বাস নিয়ে বাংলায় আগেও বই লেখা হয়েছে। তাহলে এই বইটি নিয়ে এত কথা উঠছে কেন? এ কি শুধুই হাইপ, না আধুনিক পাঠক এই বিষয়টি নিয়ে একটি আদ্যন্ত নতুন বিশ্লেষণ চাইছেন? দ্বিতীয়ত, গত কয়েক বছরে সোশ্যাল মিডিয়ায় দু'জন বাঙালির মৃত্যুরহস্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিট ও বাইট ব্যয় হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের কথিত গুমখুনের জায়গা ওই জগন্নাথধাম। তাহলে কি এই বই সেই প্রসঙ্গে কোনো নতুন তথ্য বা তত্ত্ব দিতে চলেছে আমাদের? সেজন্যই কি এত মানুষের মধ্যে বইটা নিয়ে এত কৌতূহল? মেলায় লেখকের সঙ্গে দেখা হল। এত কমবয়সী এক যুবক নন-ফিকশন বই নিয়ে মেলামুখী জনতার মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখিয়েছেন দেখে বাঙালির সারস্বত সাধনা নিয়ে আশাবাদী হলাম। তারপর বইটা তাঁর কাছ থেকেই উপহার হিসেবে পেলাম একটিই শর্তে~ বইটা পড়ে যা মনে হল তা তাঁকে জানাতে হবে। অতঃপর এই পাঠ, ও তার শেষে প্রতিক্রিয়া জ্ঞাপন। কী আছে এই বইয়ে? Foreword ও 'গ্রন্থকারের নিবেদন'-এর পর এই বইয়ে যে অধ্যায়গুলো আছে তারা হল: প্রথম অধ্যায়~ ওড়িশা: নামকরণ এবং কালানুক্রমিক বিতর্ক দ্বিতীয় অধ্যায়~ জগন্নাথ: পৌরাণিক উৎস ও অসঙ্গতি তৃতীয় অধ্যায়~ জগন্নাথ: মূর্তি বিতর্ক এবং নিহিত দর্শন চতুর্থ অধ্যায়~ নবকলেবর: সংশ্লিষ্ট তত্ত্ব, ইতিহাস এবং আচার পঞ্চম অধ্যায়~ শ্রী জগন্নাথ: সেবক প্রসঙ্গ ষষ্ঠ অধ্যায়~ রথ: দেবতা, পার্শ্বদেবতা এবং অন্যান্য এছাড়া আছে একটি 'চিত্র সংকলন' অংশ। শ্রীচৈতন্যের মৃত্যুরহস্য নিয়ে কোনো অনুমান বা প্রকল্প, বা এই মন্দিরের স্থাপত্য নিয়ে কোনো আলোচনা নেই বইটিতে। তার বদলে এই বইয়ের আসল জোরের জায়গা হল পুরাণের সারাৎসার তুলে ধরায় তার দক্ষতা। সুললিত গদ্যে এই বইয়ে লেখক এক ভক্তের মতোই অক্ষর আর শব্দের অর্ঘ্য দিয়ে সাজিয়েছেন জগন্নাথ বিগ্রহ এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা বিশ্বাস, প্রথা ও আচারকে। তার্কিকের বদলে এক সহানুভূতিশীল মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি বর্ণনা করেছেন প্রতিটি কিংবদন্তিকে। তাই সঙ্কীর্ণমনা ঐতিহাসিকদের দ্বারা উপেক্ষিত ও পরিহাসের বিষয় হয়ে থাকা স্থান, কাল ও পাত্র এই বইয়ে এতটাই সজীব হয়ে উঠেছে যে পড়তে-পড়তে মনে হয়েছে, আমিও যেন নীলমাধবের নাম শুনতে পাচ্ছি! কিন্তু... কিন্তু এই বইয়ে দুটো প্রকাণ্ড সমস্যা আছে। সেগুলো হল, (১) সুললিত গদ্য মানেই যে তৎসম শব্দের লূতাতন্তুজাল নির্মাণ বা লোষ্ট্রবৎ সেই শব্দাবলি ক্ষেপণ নয়, এ-কথা লেখককে বুঝতে হবে। আলোচ্য বিষয়বস্তু পৌরাণিক হলে এবং সংসদের সমার্থক শব্দকোষ হাতের কাছে থাকলেই যে আওয়াজকে শীৎকার বলা যায় না, এই ধারণাটি মগজস্থ না করলে চাপ আছে। (২) বইয়ে লেখক ইতিহাস ও নৃতত্ত্বের বদলে পুরাণ ও কিংবদন্তিকে ঐতিহাসিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এই নিয়ে এমনিতে কোনো সমস্যা নেই। তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ভাবনাপ্রসূত বইপত্র লিখে স্বার্থান্বেষী ও সরকারি মদতপুষ্ট পণ্ডিতম্মন্যরা আমাদের ইতিহাস আমাদেরই ভুলতে প্রায় বাধ্য করেছেন, এ-কথা অনস্বীকার্য। তাই পুরাণ ও কিংবদন্তির মধ্যে লুকিয়ে থাকা সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরা এখন খুব বেশিরকম জরুরি হয়ে উঠেছে। কিন্তু ইতিহাস আর পুরাণ এক জিনিস নয়। তেত্রিশ কোটি-র 'কোটি' যেমন সংখ্যা নয়, স্তরবাচক (যথা~ উচ্চকোটিতে অবস্থান), তেমনই পুরাণের মধ্যে বহু-বহু তথ্য রূপকাকারে বিধৃত। তাই এই বিষয়টি তুলে ধরার সময় কিঞ্চিৎ অবিশ্বাসী মানসিকতা দেখালেই সত্য-উদ্ঘাটন সহজতর হত। তার জন্য দরকার ছিল নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বের আলোয় কিংবদন্তির বিশ্লেষণ। এই ব্যাপারটা কীভাবে করা যায়, তা কিন্তু আজ থেকে পঁচিশ বছর আগেই একটি বইয়ে দেখানো হয়েছিল। গ্রন্থপঞ্জি দেখে বুঝলাম লেখকই সেই বইটি সম্বন্ধে জানতেন না। সুশীল মুখোপাধ্যায়-এর লেখা "রহস্যে ঘেরা পুরীর শ্রীজগন্নাথ" (নিউ বেঙ্গল প্রেস) নামক সেই বইটি যেভাবে এই বিষয়টিকে নিয়ে এগিয়েছিল তা বোঝানোর জন্য সেই শীর্ণকায়, মাত্র ৮৬ পৃষ্ঠার বইটির অধ্যায়-বিন্যাস এখানে তুলে ধরলাম: [১] পুরাবৃত্ত ও পরিশিষ্ট [২] ভারতীয় সংস্কৃতি ও আদিবাসী সমাজ [৩] শবর জাতি [৪] আদিবাসী ধর্মবিশ্বাস ও শাওড়া দেবদেবী [৫] জগন্নাথ বিগ্রহ ও বিভিন্ন ধর্ম-বিশ্বাস [৬] জগন্নাথ বিগ্রহ ও কিংবদন্তি [৭] সূর্য পূজা [৮] জগন্নাথ সংস্কৃতি - উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বুঝতেই পারছেন, বিষয়গতভাবে দুই বইয়ে খুব বেশি বৈসাদৃশ্য নেই। প্রাচীনতর বইটি আবেগ সম্পূর্ণ বর্জন করে এগোনোয় তার লেখকের পক্ষে অপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া সহজতর হয়েছে, যা আলোচ্য বইয়ে লেখক নিতে পারেননি। কী ধরনের অপ্রিয় সিদ্ধান্ত? সেটা জানতে গেলে আপনাকে বইটা পড়তে হবে যে! তবে হ্যাঁ, এই বইয়ের মুদ্রণ, চিত্রমালা, এবং সামগ্রিক পরিবেশন প্রাচীনতর বইটির তুলনায় শ্রেষ্ঠতর। বানান ভুল খুব একটা দেখিনি, তবে সংসদ বা আকাদেমির বানানবিধি অনুসৃত হয়নি এই বইয়ে। সামগ্রিকভাবে একটিই কথা বলব। যদি আপনি জগন্নাথ মূর্তি ও পূজার সঙ্গে জড়িত কিংবদন্তি ও পৌরাণিক কাহিনিগুলি জানতে চান, তাহলে এই বই আপনার কাছে অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। কিন্তু যদি সেই কিংবদন্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা জনজীবনের ধূলিধূসর তথ্যগুলো জানতে হয়, তাহলে প্রাচীনতর বইটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য। এই গবেষণা গ্রন্থটি প্রকাশ করে ট্রামলাইন বুকস আমাদের কাছে ধন্যবাদার্হ হলেন। তাদের, এবং লেখকের উদ্দেশেও রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা।