গাজিপুরের কোন এক গ্রামে একটা মেয়ে ছিল, মরিয়ম। এক ছেলে, এক মেয়ে, ব্যবসায়ী জামাই। লোকটা ব্যবসার কাজে সারাক্ষণ থাকতো বাইরে বাইরে। একবার অনেকদিন হয়ে যাচ্ছে সে ঘরে আসে না। তার স্ত্রী যাকেই পায় জিজ্ঞেস করে - রাস্তায় কোন সমস্যা হল কি না, কোন দুর্ঘটনা ঘটলো কি না।
ভূতের গল্প পড়া বা শোনার নেশা সেই ছোটবেলা থেকেই। সেসময় পাঁচ টাকায় একদম ছোট ছোট বই পাওয়া যেত। রুপকথার গল্প, ঈশপের গল্প, ভূত-প্রেত এর গল্প আরো কত কি! সবচেয়ে যেই মলাটটাতে ভয়ের তকমা বেশি মিলতো সেটাই বগলদাবা করে বাসায় ফিরতাম। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই একটা অভ্যাস কখনো যায়নি, সেটা হচ্ছে—ব্যাখ্যাতীত এই জনরার প্রতি বিশাল কৌতুহল!
বহুদিন পর সেই ধাঁচের একখানা বই পড়লাম। ঠিক হারিকেন এর যুগে ক্রমাগত ঝুঁকে ঝুঁকে বইয়ের পাতা উল্টানোর স্মৃতি রোমান্থন হলো যেন!
তো গল্পের কথায় আসি। প্রথম গল্পগুলো বেশি ভালোলেগেছে। "টোকা" শিরোনামের গল্পটা ভালো যদিও আরেকটু ডিটেইলিং হলে ভালো হত! ছোট গল্প মানছি, তবুও গল্পের শেষটায় যেমন টুইস্ট সে অনুযায়ী বিল্ড আপ হয় নি। "নিশাচর" আর "হুরপতঙ্গ" গল্পটার আবহ খুব সুন্দর ছিলো। সবচেয়ে ভালো লেগেছে "পোড়া"। ব্যাখ্যাতীত এই ঘটনার ভৌতিক পরিবেশ আর স্টোরিটেলিং অসাধারণ ছিলো! "প্যাপিলন" গল্পের কিছু অংশ কোরিয়ান ড্রামা "স্ট্রেঞ্জারস ফ্রম হেল" এর ২/১ টা দৃশ্য বা ওইরকম একটা পরিবেশ এর সাদৃশ্য এনে দিচ্ছিলো যদিও প্লটের সাথে কোনো মিল নেই আর এই গল্পটা আর "গুড্রবঙ্গা" কেমন জানি একটু খাপছাড়া খাপছাড়া লাগছিলো।
লেখা বেশ ঝরঝরে ছিলো তবে বানান ভুল, একই বাক্যে বারবার একই শব্দের প্রয়োগ ব্যাপারটা বিশ্রী রকমের অশান্তি দেয়। তবে, বই পড়ে মজা পেয়েছি। গল্পগুলো সব রাতে পড়া এজন্য কিছুটা ভয় ও পেয়েছি। হরোর ভালোবাসেন যারা তারা পড়ে দেখতে পারেন কিন্তু!
লোডশেডিং এর যুগ ফিরে আসছে, নিয়ে আসছে অন্ধকার। অন্ধকার মাটি খুঁড়ে টেনে আনে ভয়। অন্ধকারে জমাট ভূতের গল্পের মজা পেয়েছেন কখনো? আমি পেয়েছি সেই মজা বহুবার। ভূতের ভয় আমার কোনোকালেই ছিলোনা। সেকারণে এই বইয়ের শেষ গল্পের অতিউৎসাহী ছেলেপেলেদের মতো ভূত খোঁজার বহুত হাস্যকর কৃতকর্ম আছে আমার জীবনে।
আবরার আবীর হরর গল্পে কতটা সিদ্ধহস্ত, এই বইটাতে প্রমাণ পেয়ে গেছি কিছুটা। হরর গল্প আসলে সব ঘুরে ফিরে একইরকম মনে হয়। এজন্য হরর সিনেমা, বই এখন আর পড়া হয়না। কিন্তু সেই গুড ওল্ড স্টোরিজ গুলোই যেন বেশ আনন্দ নিয়ে পড়লাম অনেকদিন পর। এককথায় এর মূল কারণ হলো লেখনী। ভয়ের আমেজ আর পরিবেশ সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতা এই লেখকের আছে। পাশাপাশি লেখার স্বরে তাল লয়ের মতো উঁচু নিচু আছে। নিশাচর, হুরপতঙ্গ গল্পদুটি অসাধারণ লেগেছে। আপনার যদি গ্রাম্য পরিবেশ, লোকগল্পের সাথে পরিচয় থাকে, শীমঙ্গল-চাবাগান জায়গাগুলো দেখা থাকে, কিংবা লেট নাইট লং ড্রাইভের অভিজ্ঞতা থাকে, গল্পগুলো আরও রিলেট করতে পারবেন।
হরর পড়তে যাদের ভালো লাগে এই ছোটগল্পের বইটি পড়ে দেখতে পারেন, ভয় পান কি না পান, লেখকের সৃষ্ট ভৌতিক আবহ আপনাকে মুগ্ধ করবে।
লেখকের গদ্য সাবলীল ও ঝরঝরে। বইয়ের প্রথম কয়েকটা গল্প মোটামুটি ভালো। সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'নিশাচর।' পরেরদিকের কয়েকটা গল্পের প্লট অতিরিক্ত প্যাঁচানো।হুরপতঙ্গ ও গুড্রবঙ্গা গল্পে কাহিনি বিসদৃশভাবে মোড় নেয়।শুরু আর শেষে মিল নেই একদম।মোটেও ভালো লাগেনি এ দুটো গল্প।ভৌতিক গল্পে অনেক লেখক উপযুক্ত ভয়ের আবহ তৈরি করতে পারেন না।আবরার আবীর এ ব্যাপারে দারুণ সফল।এজন্য কয়েকটা গল্পের কাহিনি ভালো না হওয়ার জন্য আফসোস হচ্ছে বেশি।
হুরপতংগ একটা ভৌতিক গল্প সংকলন।ছয়টি গল্প নিয়ে এই সংকলন।এই সংকলনের মধ্যে দুইটা গল্পে "আরবান লেজেন্ডস " জিনিস টা ভালোভাবে উঠে এসেছিল। বিভিন্ন দেশের পুরানো লোককাহিনী নিয়ে গড়ে উঠা মিথ বা অলৌকিক গল্প আরবান লেজেন্ডস।এই সংকলনের "নিশিরাত" গল্পটি তে তে যেন উঠে এসেছিল বাংলাদেশের সেই আরবান লেজেন্ডস এর মেছো ভুতের গল্প,তারপর গভীর রাতে জ্বিন এসে মিষ্টি নিয়ে যায় যুগ যুগ ধরে বর্ণিত সেই গল্পগুলো।হ্যাঁ এটাই এ সংকলনের সেরা গল্প।বাদ বাকি যে পাঁচটি গল্প আছে তা গড়পড়তা মানের
পোড়া- সাধারণ মানের গল্প।খুব বেশি ভালো ও না,খারাপ ও না।
টোকা- খুব ই ছোট গল্প।এভারেজ।
হুরপতংগ - এটাও এভারেজ।তবে লেখকের ভয়ের যে আবহ সৃষ্টি করেছিল তা দারুণ।
পাপিলন - পুরান যুগের হরর কাহিনী।অপঘাতে কারো মৃত্যু হয় এরপর সেই জায়গায় ভুতের উৎপাত।নাথিং নিউ।
গুড্রবংগা- প্রথম টা খুব আগ্রহজাগানিয়া ছিল কিন্তু পরে গল্পটা আর আগ্রহ ধরে রাখতে পারে নি।এটা তাও চলে।
লেখকের লেখনী প্রশংসনীয়।সবগুলো গল্পতে ভয়ের আবহ সৃষ্টি করেছে ভালমতোই।সুন্দর প্লট হলে আরো দারুণ হতো সংকলন টা।
লেখনী অসাধারণ মাশ'আল্লাহ। কিন্তু গল্পের প্যাঁচে আটকা পরে বের হতে পারছিলাম না। রহস্য থেকে যাওয়া আর অনেক প্রশ্ন থেকে যাওয়ার মাঝে পার্থক্য আছে। সেই অনেক প্রশ্নে ঝুলে রইলাম!
নবীন এই লেখকের আগে কোন লেখা পড়েছি বলে মনে পড়ে না, তাই পাঠক হিসেবে এই বইটা দিয়েই তার লেখার সাথে পরিচিতিটা হয়ে গেল। ৬টি ছোট-বড় ভৌতিক গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে সংকলনটি, যার মধ্যে প্রথম গল্প "পোড়া"কেই সব থেকে এগিয়ে রাখব। 'পোড়া' গল্পটা জেলখানার এক অন্ধকার সেলের দুই কয়েদিকে নিয়ে; সিম্পলের মধ্যে এক্সিকিউশনটা ভাল ছিল। তবে অধিকাংশ গল্পেই হরর এন্টিটিগুলো কম-বেশি টিপিক্যাল আর বিদেশি লিজেন্ডের আদলে হলেও গল্পগুলো আসলে প্রত্যেকটাই ভাল ভাবে উতরে গেছে লেখকের পাঠককে ধরে রাখার মত সাবলীল ও গতিময় লেখনীর জোরে। একাধিক গল্পে আবার ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে (একই গল্পের মধ্যে) পর্যায়ক্রমে দেখা দিয়েছে একাধিক এন্টিটিদের উপদ্রব; "নিশাচর" গল্পে যেমন ঘর থেকে পালিয়ে আসা একটা মেয়ের সাথে গুলশানের এক কফি শপে মধ্যরাতে পরিচয় হয়ে যায় এক রহস্যময় যুবকের, যে কিনা মূলত গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে ঢাকা ও তার আশেপাশে কিছু প্যারানরমাল এন্টিটিদের 'হট স্পটে' ঢু মারতে। আবার টাইটেল গল্পটার (হুরপতঙ্গ) প্রেক্ষাপটে দেখা যায় জেলেদের এক গ্রাম, যেখানে ভোর রাতে একদল জেলে বেরিয়ে পড়ে আলো ফোটার আগেই আয়েশ করে ভাল মত মাছ ধরবে বলে, কিন্তু নদীতে স্বয়ং নিজেরই ফেলা জালে যখন কেউ লাশ হয়ে ভেসে ওঠে তখন লাশবাহী ভ্যান চালকের পিছুপিছু গল্প মোড় নেয় অন্য কোন এক অজানা আতংকের ছক কেটে। পাঠককে এমনই একাধিক ভৌতিক উপাদানে সন্তুষ্ট করার তাগিদ থেকে শেষ গল্প 'গুড্রবঙ্গা'ও বাদ পড়েনি। মজা লেগেছে একাধিক গল্পে নির্দিষ্ট একটা টাইম উল্লেখ করে লেখকের গল্প শুরু করার ব্যাপারটাও, 'রাত ১১টা বেজে ৫৬ মিনিট' কিংবা 'বিকেল ৫টা বেজে ১৩ মিনিট'...হতে পারে এভাবে গল্প শুরু করাটায় হয়তো এই নবীন লেখক সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন বেশি, এতে করে সম্ভবত গল্প গড়িয়ে নিতে তার সুবিধা হয় বলে মনে হল। 'টোকা' গল্পটার মধ্যে অনলাইনে মাঝে মধ্যে পড়া কিছু টুইস্টেড দুই-চার লাইনের অণুগল্পের স্বাদ পাওয়া গেলেও সংকলনের সর্বাপেক্ষা এই ছোট গল্পটি সব মিলিয়ে জায়গা করে নিয়েছে ৪ থেকে ৫ পৃষ্ঠা। পুরান ঢাকার এক ঘিঞ্জি গলিতে 'প্যাপিলন"-এর পটভূমিটা ইনিশিয়ালি ইন্টেরেস্টিং লাগলেও এই গল্পটাই বলতে গেলে সংকলনের সব থেকে সাদামাটা গল্প ছিল।
সবমিলিয়ে আবারো লেখনীর প্রশংসা করে বলতে হয় আবরার আবিরের ভৌতিক গল্পগ্রন্থ "হুরপতঙ্গ" হরর প্রেমীদের জন্য পরখ করে দেখার মতই একটি সংকলন, লোডশেডিং কিংবা ঠান্ডা হাওয়ার নিঝুম রাতগুলোতে সময় কাটানোর জন্য যা সঙ্গী হিসেবে মন্দ হবে না।
সব মিলিয়ে মোটামুটি লেগেছে। ৬ টা গল্পের মধ্যে ২/৩ টার কাহিনীতে ভিন্নতা ছিল। বাকিগুলো বেশ খানিকটা সাদামাটা মনে হয়েছে। তাছাড়া গল্পের ভাষা যথেষ্ট সাবলীল।
This entire review has been hidden because of spoilers.