এই বইটা পড়েই মূলত ম্রোদের সম্পর্কে জানতে পারি গতবছর। এই বইটা পড়ার পর প্রায় একমাস ইন্টারনেট ঘেঁটে ম্রোদের নিয়ে একটা ফিচার লিখেছিলাম। ফিচারটা লিখতে গিয়ে ম্রোদের সম্পর্কে আরো জানতে পেরেছি। যাকগে, সেসব কথা। বইটা গতবছর পড়েছি। আজকে কেন জানি আবার হঠাৎ পড়তে ইচ্ছে করলো। ভালো কথা, এটার তো পরের সংস্করণ গেল বছর বের হলো। সেটা গুডরিডসে দেখলাম না। সেটাও পড়েছি ইদানীংকালেই। দুটো সংস্করণই বেশ ভালো লেগেছে। তবে প্রুফরিডের অভাব চোখে লেগেছে। একটা জাতির রূপকথা নিয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থের এই উদ্যোগটা ভালো লেগেছে। এই ধরণের আরো কাজ হোক। সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ হোক।
ম্রো সমাজে প্রচলিত ৩৫টি রূপকথার গল্প। গল্পগুলা নতুন। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগটা সত্যি সুন্দর। একই গল্প প্রথমে ম্রো ভাষায়, এরপর বাংলা ভাষায় ছাপা। ম্রো ভাষায় গল্পগুলো কেমনভাবে লেখা আছে জানিনা, কিন্তু বাংলা অনুবাদ একেবারেই ভালো লাগেনি। আক্ষরিক অনুবাদ এতটাও খারাপ লাগেনা যতটা এই বইতে লেগেছে। প্রুফ রিডিং ও একবারেই ভালো ছিল না। আমাদের দেশেরই একটা অঞ্চলে প্রচলিত সুন্দর কতগুলি রূপকথার গল্প, তাদের জীবনের অনেক কিছুর সাথেই হয়তো মিশে আছে গল্পগুলো। চাইলেই অনেক সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়।
ম্রোদের রূপকথার গল্প জানা যাবে এই খুশিতেই কেনা। গল্পগুলোও ভাল। আরো যেটা ভাল লাগলো এরকম একটা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর গল্পগুলো এভাবে তুলে ধরে ইতিহাসের অংশ করে ফেলাটা। ম্রোরা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী হলেও তাদের গল্প, ইতিহাস সমৃদ্ধ। একই সাথে উপরি পাওনা ম্রো ভাষায় লেখার পাশাপাশি গল্পগুলো বাংলাতেও লেখা হয়েছে।
এরকম উদ্যোগ নেয়ার সাথে সাথে সম্পাদনার গুণগত মান বজায় রাখাও জরুরী ছিল। অনেক বানান ভুল চোখে পড়েছে। কিছু কিছু গল্প লেখার সময় খাপছাড়া মনে হয়েছে। পরবর্তী সংস্করণে ভুল শুধরে নেবার অনুরোধ থাকল।
নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে উপকথার কাহিনীগুলো ম্লান হয়ে গেছে যথার্থ প্রুফরিডিং এর অভাবে। আশা করি এটাই শেষ নয়, বাংলাদেশ এর অন্যান্য আদিবাসীদের নিয়েও শিঘ্রী আরও কিছু পাব।
চাকমা, মারমা, গারো- এই গোষ্ঠীদের কথা আমরা সবাই জানি। বাংলাদেশে কিন্তু আরো অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। ম্রো'রা তেমন একটি গোষ্ঠী, যাদের সম্পর্কে খুবই কম জানি আমরা। বইয়ের রিভিয়ের বদলে বরং বই থেকেই পাওয়া এই ছোট সম্প্রদায়টির ব্যাপারে একটু জেনে আসা যাক।
🍂
ম্রো বা মুরং জাতিগোষ্ঠীর মূল আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলায়। নিজেদের তারা "মারুচা" বলে অভিহিত করে থাকে। তাদের নিজস্ব কথ্যভাষা থাকলেও বর্ণমালার ব্যবহার শুরু হয়েছে বেশিদিন হয়নি। সমাজব্যবস্থা পিতৃতান্ত্রিক ও একই গোত্রভুক্ত ছেলেমেয়ের বিয়ে নিষিদ্ধ। সম্পত্তির সিংহভাগ পায় কনিষ্ঠ পুত্র। ম্রো'দের প্রধান পেশা জুমচাষ ও নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক রয়েছে।
🍂
ম্রোদের জীবনযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে কান ফুটো করা। কান ফুটা করাকে ম্রো ভাষায় বলে "রইক্ষারাম"। এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ছেলেমেয়ে সবাইকেই কান ফুটা করতে হয়। এই ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং।
🍂
ম্রোদের তিনজন দেবতা আছেন- তুরাই (বিশ্ব সৃষ্টিকারী), সাংতুং (পাহাড়ের দেবতা) ও ওরেং (নদীর দেবী)। তাদের কোনো ধর্মগ্রন্থ, ধর্মগুরু বা মন্দির নেই। ম্রোদের একাংশ খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী।
🍂
এইবার বইটার ব্যাপারে আসি। বইটা ম্রোদের মধ্যে প্রচলিত বিভিন্ন লোককাহিনীর একটি সংগ্রহ। কাকের রঙ কেন কালো, মানুষের কেন পুনর্জন্ম হয় না, ঝাড়ু কেন অশুভ- এসব নিয়ে তাদের সমাজে নানা গল্প রয়েছে। এখানে মোট গল্প আছে ৩৫টি। পুরো বইটা ম্রো বর্ণমালা দিয়ে লেখা, প্রতিটি গল্পের শেষে বাংলা অনুবাদ দেয়া আছে। বইটার প্রকাশক বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। আমার মতে, এইটা সংগ্রহে রাখার মতো একটা বই। পড়ে বেশ মজা পাওয়া যায়। আমি ব্যক্তিগত ভাবে রূপকথার গল্প অনেক পছন্দ করি, সেই হিসাবেও এই বইটা অনেক সুন্দর। কিছু কিছু জায়গায় পড়ে মনে হতে পারে বাংলা লেখাগুলো একটু অসংলগ্ন, অগোছালো। আমি সেটাকে সম্পাদনার সামান্য ত্রুটি হিসাবেই দেখেছি।
ম্রো সমাজে প্রচলিত ৩৫টি রূপকথার গল্প। গল্পগুলা নতুন। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগটা সত্যি সুন্দর। একই গল্প প্রথমে ম্রো ভাষায়, এরপর বাংলা ভাষায় ছাপা। ম্রো ভাষায় গল্পগুলো কেমনভাবে লেখা আছে জানিনা, কিন্তু বাংলা অনুবাদ একেবারেই ভালো লাগেনি। আক্ষরিক অনুবাদ এতটাও খারাপ লাগেনা যতটা এই বইতে লেগেছে। প্রুফ রিডিং ও একবারেই ভালো ছিল না। আমাদের দেশেরই একটা অঞ্চলে প্রচলিত সুন্দর কতগুলি রূপকথার গল্প, তাদের জীবনের অনেক কিছুর সাথেই হয়তো মিশে আছে গল্পগুলো। চাইলেই অনেক সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়।
রূপকথা আমার খুব পছন্দের জনরা। রূপকথা নিয়ে যা পাই পড়ে ফেলতে চেষ্টা করি। আর এটা তো এমন একটা রূপকথা যাদের সম্পর্কে আমরা এমনিতেই জানি খুব কম। আমাদের আদিবাসীদের যে ফোকলোর/লোক কথা আছে সে বিষয়ে আমআদের জানা উচিত। কিন্তু এই জানানোর কাজটা কেউই করছে না। তাই "ম্রো রূপকথা" ব���য়ের লেখককে সাধুবাদ জানাই এম্ন দারুণ একটা কাজ করার জন্য। বইয়ের প্রতিটি গল্পে উঠে এসেছে ম্রো'দের নানান আচার আচরণ এবং সংস্কৃতির বর্ননা। বেশ অনেক কিছুই জানা গেলো। সাহিত্য মানে যাবো না।রুপকথার বই সাহিত্য মান দিয়ে বিচার করা যায় না। তবে লেখা আরেকটু গুছিয়ে লিখতে পারলে দারুণ হতো। সবচেয়ে দারুণ ছিলো। প্রতিটি গল্প ম্রো ভাষায় লেখা এবং পাশে বাংলায় তর্জমা করা। দারুণ একটি উদ্যোগ। এরকম আমাদের বাকি আদিবাসীদের রূপকথা নিয়ে কাজ হলে বেশ হয়