‘উষসী’ গ্রামবাংলার নিম্নবিত্ত কিংবা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের গল্প। এটি ঝোপঝাড় থেকে ছিঁড়ে নেওয়া উপকরণে নকল ‘ভাত-সালুন ভাতি’র আয়োজন থেকে বাস্তব জীবনে নুন, পান্তা আর তরি-তরকারি যোগানের গল্প। এখানে চরিত্রগুলো ঘুরে বেড়ায় সবুজ ঘাসের ঝোপ থেকে ধানকাটা-পরবর্তী বিরান মাঠের প্রান্তরে, পুইলতার মাচার নিচ থেকে ধুন্দুলের মাচার নিচে কিংবা ঘুরে বেড়ায় জামতলা থেকে বটতলায়। এখানে জীবন এসে ধরা দিয়েছে শিশুতোষ খেলাধুলায়, অতীত স্মৃতিচারণায়, প্রাত্যহিক বৈচিত্র্যময় কিংবা সাদামাটা দিন যাপনে। ‘উষসী’ তে আছে বুলা আর তার মায়ের কথা। বুলা, যে একজন শিশু মাত্র, নিজস্ব বোধবুদ্ধি দিয়ে সে যেন জীবন-পথে তার ভ্রমণ শুরু করেছে। এ অভিজ্ঞতা লাভের বাস্তবতায় কখনও সে নিজে ঘটনাপ্রবাহে ভূমিকা রাখে, কখনও সে হয় একজন দর্শক মাত্র। বুলার মা, তরুণী সখি অতীতের অপ্রাপ্তিকে পেছনে ফেলে মনে সযতনে রেখে চলেছে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন । বুলা আর সখিকে ঘিরে আরও আছে নানা চরিত্র। এই যেমন, এখানে আছে গুন্দিয়া। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা শেষে যার জীবনে নিশ্চয়তা আশার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এ উপন্যাসে আরও আছে খতিজা খাতুন, জগীরার মা, লেদিয়াদের কথা। জীবন-সায়াহ্নে থাকা এ মানুষগুলোর দিন সদৃশ বেঁচে থাকায় সব শেষে নেমে এসেছিল একাকী সন্ধ্যা।
স্থবির গল্পে গতিশীলতার প্রাণসঞ্চার করাই কথা শিল্পীর সার্থকতা। শুরুর ৩ পৃষ্ঠা পরে আশার সঞ্চার হয়েছিল, অনেকদিন পর হয়ত একটা উপন্যাস পড়ব, যেখানে কাহিনী পাঠককে কোন লক্ষ্যের দিকে টেনে নিয়ে যাবে না, বরং গল্পের পরিক্রমা পাঠককে সুন্দরপুরের গৎবাধা জীবনের অংশ করে লক্ষ্যে পৌছানোর চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই দিবে না। লেখিকার উদ্দেশ্য সফল, বইয়ের প্রতিটি পাতা আমার মনযোগ ধরে রেখে নিখাদ ভালোলাগায় আবিষ্ট করে রেখেছিল। বুলা বা বুলার মায়ের জন্য মায়া হয়ত পড়েনি, কিন্তু তাদের জীবন আমাকে আমার যান্ত্রিকজীবনকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। অনেকদিন পর কোন বইকে হয়ত পাচে পাচ দিব।
আর দুর্বোধ্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকে কাহিনীর আবহ দিয়ে এত নিপুনভাবে প্রান্জল করে তোলার জন্য লেখিকা আলাদা একটা ধন্যবাদ পাবেন।