রাজকপালি মেহেরজান। স্বাচ্ছন্দে থাকা মানুষগুলো সুখের আবহ টের পায় না, যেমন সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত না গেলে আলোকিত দিনের পার্থক্য বোঝার কথা নয়। কিশোরী মেহেরজান যে আসলে সুখে আছে সেটা বুঝতেই তার দুঃখ কি তা জানা দরকার। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে একটা কথা বলে ‘মাইয়া, পরের বাড়ি গ্যালেই বোঝবা’। তাই তো, নারীর তো নিজের বাড়ি নেই! বাবার বাড়ির পরে স্বামীর বাড়ি। তথাকথিত সেই পরেরবাড়ির অর্থ স্বামীর বাড়ি। সুখ আর দুঃখের পার্থক্য জানতেই মেহেরজানের বিয়ে হবে।
বিয়ে! ওহ, এতো বাঙালি সমাজের নিয়ম। সদ্য কৈশোরের ঈশাণে মেহেরজানকে এবার হেঁটে দেখাতে হবে, পাত্রপক্ষের কেউ তার চুল দেখবে, দাঁত দেখবে! এ যেন মাছের বাজারের ডালা সাজিয়ে মাছ বিক্রির মোচ্ছব! কিন্তু মেহেরজান তা নয়, তাকে যেন ভাঙতে হবে সেই নিয়ম। আর মেহেরজান উপন্যাস সেই নিয়ম ভাঙার গল্প! উপরোক্ত গল্প একজন নারীর জীবন আখ্যান প্রকাশে যথেষ্ট নয়, মেহেরজান হলো এক কিশোরী থেকে আটপৌরে গৃহবধু হয়ে ওঠার গল্প। মানুষ অপূর্ণ বাসনাকে চিরায়ত নিয়মের বাইরে গিয়ে পূর্ণ করে, সমাজ কখনো সেটা গ্রহণ করে, কখনো নয়। মেহেরজান দেখেছে মুদ্রার দুই পিঠের গল্প।
সামাজিক উপন্যাসে চরিত্রকে মিশে যেতে হয় সময়কালের গহ্বরে, মেহেরজান স্বাধীনতা উত্তরকালের পারিবারিক চিত্রের সাথে সাথে সমসাময়িক আধুনিক যুগে টেনে এনে উপলব্ধির বুনন শৈল্পিক করতে চেয়েছে। তাই মেহেরজানে আবর্তিত গল্পটি বিশেষ চরিত্র ও সময়ে আঁটকে থাকেনি।
গল্প লেখা অনেকটা খিদের মত, এই খিদে আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় গল্প গাঁথুনিতে, এক ঘেয়ে গল্পের বাইরে মানবতা, সামাজিকতার চিত্র তুলতে ভালবাসি। মাঝে মাঝে মনে হয় যাপিত জীবনের এত এত গল্প শুধু আমার হবে কেন? হৃদয়ের পটে আটকানো গল্পগুলো হয়ে উঠুক সবার।
তাই গল্প বলি, মাটির গল্প, মানব পটের গল্প। প্রেম, দ্রোহের বাইরেও সমাজের গল্প, সম্প্রীতির গল্প। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও বৃষ্টিভেজা মেঠোপথে হেটে মনে হয় মেঘ হব, গল্প করবো মেঘের সাথে। বলে কয়ে বৃষ্টি ঝরাবো। শুভ্র পবিত্রতার গল্পে মানুষের কথা বলতে গিয়ে ঘুরি তেপান্তরে। আলাদা মানুষ, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সাথে। সুনীলের একনিষ্ঠ ভক্ত আমি। ভালবাসি সৈয়দ সামসুল হকের কবিতা। বিশ্ব নাগরিক হিসাবে স্বপ্ন দেখি সম্প্রীতির চেতনার কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলা সাহিত্য ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বজুড়ে।