বই লেখা, বই তৈরি করা, বই বাজারে পাচার করা, বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, নিজে নিয়ন্ত্রিত হওয়া এবং সব মিলিয়ে 'নিজস্বতা' প্রমাণ করার যে উন্মাদনা অথবা নিজেকে প্রতিস্থাপন করার যে ইঁদুর-দৌড়, সেখানে বিদ্যমান গোপন এক চক্র ক্রমশ তার হাত কেবলই প্রশস্ত করে চলেছে। গণতন্ত্রের জানালা নিয়ে একদিন যে হল্লা শুরু হয়েছিল তার পরম্পরায় আজ অনুমান হয়, বিশ্বায়ন-তত্ত্ব খুব সহজেই আমাদের হৃদয় ও মস্তিষ্কে নতুন এক উপনিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম। আমাদের ফ্রাঙ্কেন ফুডের ফিকশন, আমাদের জি.ই খাদ্যের পোয়েট্রি, আমাদের গোল্ডেন রাইসের মুভি জগতের লক্ষ-কোটি বুভুক্ষু মানুষকে কবে সোনালি দিন উপহার দেবে এখন আর জানতে পারি না! সত্যি বলতে কি, আমনিতর বিবিধ উদ্বিগ্নতা এড়ানোর জন্য যেসব মানুষের সঙ্গে দল বেঁধে হেঁটে গেছি একদিন - এই পুস্তিকা তাদেরই টিপসই এবং জলছাপ।
মামুন হুসাইন ৪ মার্চ ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন কুষ্টিয়া জেলা শহরের কমলাপুরে। শৈশব-কৈশোর কেটেছে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ জেলায়। পড়ালেখা করেছেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৭৭ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৯ সালে আইএসসি পাস করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এমবিবিএস করেন ১৯৮৫ সালে। এরপর বাংলাদেশ সরকারী কর্ম কমিশন-এর অধীনে ডাক্তার হিসেবে সরকারি চাকুরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ এর মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত আছেন। মামুন হুসাইনের সাহিত্যে হাতেখড়ি আশির দশকে হলেও প্রাথমিক অবস্থায় তিনি সাহিত্যের ছোটকাগজগুলোতেই লিখতেন। বেশ পরে ১৯৯৫ সালে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি’ প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি প্রকাশের আগেই তিনি বাংলাদেশের গল্পধারায় সিরিয়াসধর্মী গল্পকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কথাসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য মামুন হুসাইন ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন।
শেষ পর্যন্ত বহুলশ্রুত মামুন হুসাইনের সাথে আলাপ হলো অক্ষরের দুনিয়ায়।
মানুষ ভাষাকে আশ্রয় করে শুধু যোগাযোগের জন্যই নয় বোধহয়, ভাষাকে সে আশ্রয় করে ভাষাহীন সব অনুভূতি কি বোধকে প্রকাশ করতেও। আর প্রচলিত ভঙ্গীর বাইরে ভাষাকে থাপ্পড় মারা গেলে, বাঁচার জন্য ভাষা দুটো কাজ করে। অধিকাংশ সময় ভেঙচি কাটে, আর কখনো কখনো নতুন রাস্তা বানিয়ে নেয় নিজের জন্য। আর নতুন রাস্তায় উঠলে লিখিত শব্দের বাইরেও অলিখিত অনেক কিছু প্রকাশ করার সামর্থ্য তার হরলিক্স খাওয়া ছাড়াই বাড়ে। ভাষার সম্ভাবনা তাই লুকিয়ে থাকে সেটাকে নতুন করে ভাঙতে যাবার মাঝেই।
মামুন হুসাইনের ভাষাভঙ্গী অনেকদিনের মাঝে আমার পড়া সুন্দরতম। অসম্ভব আগ্রহ নিয়ে তার ফিকশন পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
মামুন হুসাইনের নিজস্ব ভাষাভঙ্গিতে আমি মুগ্ধ। কেমন যেনো একটা ঘোরগ্রস্ততা বাক্যের অন্তঃস্থ প্রত্যেকটি শব্দের ফাঁকে ভীষণ সরব। আত্মস্মৃতি থেকে শুরু করে বিশ্বসাহিত্য, নানান অনুষঙ্গ 'কথা ইশারা'য় উঠে এসেছে। এতো যে ভাষার মোহজাল - শব্দের পর শব্দ সাজানোর খেলা তারপরও কি আমাদের কথা বলা হয়ে উঠা হয়? নাকি কথা ইশারার ভাজে অনুচ্চারিত সমস্ত কথা আমাদের বুঝে নিতে হয় ভাষার পরম নৈঃশব্দ্য থেকে?
গদ্য দুরূহ তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একবার মনোনিবেশ করতে পারলে এ বইয়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠা কঠিন। অবিন্যস্ত স্মৃতিকথন - পুস্তক সমালোচনা - বিশ্বসাহিত্য বহুকিছুই এসেছে লেখকের কথার ইশারায়। কিছু অংশ বারবার পড়া যায়। অনর্গল বাক্যস্রোতে ভেসে যেতে যেতে বুঝতে পারি - এই গদ্য মামুন হুসাইনের সযত্ন নির্মাণকৃত।তিনি যা বলতে চান, যা প্রকাশ করতে চান তা আপাত বক্ররৈখিক ও সর্পিল না হলে এর অন্তর্গত বিষাদ বা বিশ্বাস কোনোটাই এতো জোরালোভাবে পাঠকের মর্মমূলে প্রবেশ করতো না।
কথাসাহিত্যিক মামুন হুসাইন নামটির সাথে পরিচয় ছিল। লেখার স্বাদ পরখ করার সুযোগ আগে হয়নি৷ আজ হলো। মুগ্ধতার আবেশ দীর্ঘদিন রইবে পাঠকমনে - এই কথা হলফ করে বলতে পারি।
'কথা ইশারা' কোন ধরনের গ্রন্থ? এ প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়া কঠিন। দুই শ' ২৪ পাতার বই জুড়েই মামুন হুসাইনের স্মৃতিকাতরতার রেশ বেশ। তা যথেষ্ট চনমনেও।কলম ধরতে হলে আগে কালির লেখা পড়তে হয়। স্রেফ পড়ে যাওয়া নয়। পড়তে পড়তে পাওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ। মামুন হুসাইন অনেক পড়েছেন। তাই তাঁর কলম বখতিয়ারের ঘোড়ার মতো টগবগিয়ে ছুটে বেরিয়েছে দ্বিগ্বিদিক। তাতে সাধারণ পড়াশোনাওয়ালা রেঞ্জের পাঠক হিসেবে আমার খুব ঝক্কি পোহাতে হয়েছে। লেখকের নিজস্ব চিন্তার গভীরতাই বলুন কিংবা প্রখরতা হিসেবেই চিহ্নিত করুন না কেন তা মাপতে আমি পারিনি। এতে হতাশ হয়েছি। না, মামুন হুসাইনের অনবদ্য গদ্যশক্তির ওপর নয়। নিজের অজ্ঞানতার উচ্চতার পরিচয় পেয়ে।
বিষয়বস্তু অনেকটাই এলোঝেলো।আত্মস্মৃতি, বিশ্বসাহিত্য, চলচ্চিত্র প্রভৃতি বিষয়ই প্রধানত এসছে।দুরন্ত গতিতে কলম চলেছে মামুন হুসাইনের। সেই সাথে 'কথা ইশারা'র পাঠক হিসেবে আমিও দ্রুত লয়ে পড়েছি বইটি। আগ্রহ জেগেছে ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত মামুন হুসাইনের লেখা নিয়ে। আফসোস হয়েছে কেন আগে পড়িনি এমন একজন সুন্দর লেখকের লেখা।