আমাদের এই শহরে হেমন্ত আসে না। এলেও তার সশঙ্ক, নিঃশব্দ পদচারণ আমাদের কানে পৌঁছয় না। এতদিন শুধু গানে বা গল্পেই আমরা পেয়েছি হৈমন্তী কুয়াশার কথা, যার আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে থাকে রত্নখচিত আকাশ। যার অবগুণ্ঠনের পেছনে বেড়ে ওঠা সোনার ফসল বুকে নিয়ে শুয়ে থাকে চরাচরব্যাপী ধানক্ষেত। খুনখারাপি, কল্পবিজ্ঞান, বা ভুতুড়ে কারবারে ক্লান্ত আমি কিছুটা বেখেয়ালেই একটা পাতলা বই হাতে নিয়েছিলাম ক’দিন আগে। পড়তে গিয়ে বুঝলাম, সমাপতনের ব্যাপারে ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’-র লালমোহনবাবু-কেও ছাপিয়ে গেছে ঘটনাটা। এই বই যে গদ্যে লেখা তাকে হেমন্তিকা ছাড়া কিচ্ছু বলা যায় না! আজ্ঞে হ্যাঁ, সন্মাত্রানন্দ-র অনুপম গদ্য এক রহস্যময়ী কুয়াশার মতোই এই লেখাগুলোতে আমাকে বারবার বিভ্রান্ত করেছে। বারবার মনে হয়েছে, আমি কি পথ হারিয়েছি? কোথায় চলেছে এই কাহিনি? এর শেষ কোথায়? সম্পূর্ণ অকারণে, ভয়-পাওয়ার মতো কিচ্ছু না পড়েও আমার গায়ে কাঁটা দিয়েছে। অতি সামান্য গল্পেও রাগ-অনুরাগের কথা পড়তে গিয়ে চোখে বাষ্প জমেছে। অনেকের চরণচিহ্ন বওয়া গল্পপথও এক নতুন চেহারায় উদ্ভাসিত হয়েছে স্রেফ এই গদ্যের মহিমায়। কী আছে এই বইয়ে?
এই বইয়ের দু’টি অংশ। প্রথমটি সন্মাত্রানন্দের কয়েকটি গল্পের সংকলন, যার নাম ‘কথাবস্তু’। এতে যেসব গল্প আছে তারা হল~ ১] নদীতমা ২] ঘাতক ৩] আয়না ৪] চিত্রিতার পিতা ৫] কুসুম কুসুম ভোর ৬] আসমানি নেশা ৭] নিরুদ্দিষ্ট নায়ক ৮] আদিমানবিক ৯] বস্তুকথা এদের মধ্যে কোনোটি ভূতের গল্প, কোনোটি ভয়ের। কোনোটি প্রতিহিংসার গল্প, কোনোটি বা হারিয়ে ফেলা শৈশব আর স্মৃতির জন্য ‘দু-চারিটা অশ্রুজল’। কিন্তু সেগুলো পড়তে গিয়ে আমার মতো গণ্ডারবৎ পাঠকও কেঁপে গেল স্রেফ ভাষার স্পর্শে। উদাহরণ চান? “এক অকৃতার্থ ঘাতকের অপমৃত শরীরের ভগ্নাংশ নদীবান্ধবীর শ্রোণিদেশে লগ্ন হয়ে থাকবে জন্মপাপ ধুয়ে দেবার আকুলতায়।” বা “এমনি করে চাঁদ আর টিলার অতিশয়োক্তিপূর্ণ সংলাপ শুনতে শুনতে আমি হাঁটি। পথের দুপাশে গল্পের জোনাকিরা ঝিলমিল করে। ভাবি, এইসব কচু কসাড় জঙ্গলের আড়ালে কত গল্প জমে আছে।”
দ্বিতীয়টি কৃষ্ণার্পিত সম্বিৎ-এর কয়েকটি ইংরেজি গল্পের ‘ছায়ানুবাদ’; এই অংশটির নাম ‘অনুকথাবস্তু’। এখানে যে গল্পগুলো আছে তারা হল~ ১) এণাক্ষীগাথা (The Ballad to Enakshi) ২) মল্লার (The Tune) ৩) অথ নিষাদকথা (Thus Spake the Hunter) ৪) রাত্রিসূক্ত (The Hymn to Eternal Night) গল্প হিসেবে এরা অসামান্য নয়। আমাদের চেনাজানা ছোটো প্রাণ, ছোটো কথা, ছোটো-ছোটো দুঃখব্যথারই স্বাক্ষর বহন করছে এরা। কিন্তু ভাষার মূর্ছনা এদের এমন এক ব্যঞ্জনা দিয়েছে যা পড়লে অলস মায়া জড়িয়ে ধরে। মনের মধ্যে মেঘ জমে। কুয়াশাঘেরা পথে হারিয়ে যায় পাঠক।
এই হৈমন্তী বইটি পড়ে আমার ক্লান্ত মন দু’দণ্ড শান্তি পেল। লেখকের উদ্দেশে রইল অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা। পাঠকবন্ধুদের কাছে রইল বইটি পড়ে দেখার অনুরোধ।