কথাচ্ছলে আমার এক শিক্ষক বইটির প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, 'পড়ে দেখো। রাজনীতিক মওদুদ আর লেখক মওদুদে অনেক ফারাক। '
পরের মুখে ঝাল খেতে নেই। তাই নিজেই প্রায় পাঁচ শ টাকা খরচ করলাম। উদ্দেশ্যে হালাল। নিজেই ঝাল চেখে দেখবো। যা আস্বাদন করলাম। তা টক,ঝাল তো বটেই। খানিকটা মিঠাও।
মওদুদ বাংলাদেশের রাজনীতির এক বিচিত্র চরিত্র। এতবেশি সময় ধরে মন্ত্রী থাকার নজির এদেশে হাত দিয়ে গোণা যায়। তিনি একজন বহুগামী রাজনীতিবিদ। এই পাঁচ শ ৩৪ পাতার বিশাল বপুর গ্রন্থে নিজেই অকপটে সেসব কথা লিখেছেন।
'১৯৮৩-১৯৯০' মানে স্বৈরাচার এরশাদ (গণতন্ত্রকামী দলগুলোর মহানুভবতায় 'কুইন মেকার ' হিসেবে প্রমোশনপ্রাপ্ত) শাসনামলের পুরোটাই কাভার করছে বলে মনে হয়। বইটির শিরোনাম অন্তত সেইদিকেই ইঙ্গিত করে। যদিও তা ভ্রম।
ছাত্রজীবনে ইসলামপন্থী ছাত্রসংগঠনের চাঁই ছিলেন। এরপর ব্যারিস্টারি পড়তে যান। বিলেতে। সেখানকার সমাজ, রীতি সম্পর্কে সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন। বাংলাদেশি কমিউনিটি কীভাবে পাকিস্তান আমলেই স্বাধীনতার কথা ভাবতো তা নিয়ে কিছু তথ্য আছে। বুঝতে পারবেন পুঁজিবাদের প্রতি মওদুদ সাহেবের মোহের কারণ। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দেওয়ার ঝোঁক ছিল মওদুদ সাহেবের। জিয়া ও এরশাদ ব্যাপক আকারে ব্যক্তিমালিকানায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেন। বাছবিচার ছাড়াই। এই পুঁজিবাদী মানসিকতাকে উৎসাহিত করেছেন তৎকালীন ক্ষমতাধর উজির মওদুদ। তাঁর এই মাত্রাতিরিক্ত পুঁজিবাদ প্রেমের উৎস কিন্তু বিলেত। বিলেতে বসবাসকারী তাঁর বন্ধু,শুভাকাঙ্ক্ষীগণ। যাঁরা বড় বড় পদে ছিলেন। এবং বেশিরভাগই কট্টর দক্ষিণপন্থী।
মোটামুটি নিজের বাল্যকাল থেকেই শুরু করেছেন মওদুদ আহমদ। টেনে বলে গিয়েছেন কিছু অতীত কথা। থেমেছেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আগে। শেখ মুজিব তখনো 'বঙ্গবন্ধু ' উপাধি পাননি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে উত্তাল দেশ। মওদুদ দাবি করেছেন, শেখ মুজিবের মামলা এদেশিয় আইনজীবীরা লড়তে সাহস পাচ্ছিলেন না। তরুণ ব্যারিস্টার মওদুদ ব্রিটিশ রাণীর আইনজীবী উইলিয়াম কিউসিকে শেখ মুজিবের পক্ষে লড়তে অনুরোধ করেন। লবিং করেন। অবশ্য আস্তে করে বলছেন, বিলেতের বাংলাদেশি বাঙালি কমিউনিটির জোরদার ভূমিকার কথা।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শেখ মুজিবকে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করল। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর অবৈতনিক সহকারী হিসেব বছরখানেক কাজ করেছেন বলেও দাবি মওদুদ আহমদের। বলা যায় তখনই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে হাতেখড়ি মওদুদের।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশর প্রথম পোস্টমাস্টার জেনারেল ছিলেন মওদুদ। যুদ্ধত্তোর দেশ আওয়ামী লীগের থেকে দূরে সরে যান কিংবা যেতে হয় তাঁকে। অনেকে বলেন, পোস্টমাস্টার জেনারেল পদের অপব্যবহার করেছিলেন মওদুদ। দেশের ক্রান্তিকালে অনুদানের লাখ লাখ টাকা পকেটস্থ করেছেন। যুদ্ধের পর টাকার হিসাব দিতে পারেন নি। তাই দল ও পদ থেকে নকআউট।
বঙ্গবন্ধু শাসনামল নিয়ে মওদুদ সাহেবের একটি আস্ত বই আছে। আগ্রহীজন অবশ্যই ইংরেজি বইটা পড়বেন। বাংলা অনুবাদ হজমের অযোগ্য।
এই বইতেও তিনি বঙ্গবন্ধু শাসনামলের কথা সংক্ষেপে লিখেছেন। তাত মওদুদ সাহেবের সফলতাও কিছু রয়েছে। তিনি যেমন একেবারে অযাচিত সমালোচনা করেন নি ; তেমনি যে প্রশংসা বঙ্গবন্ধু প্রাপ্য তাঁকে তা দিতেও কার্পণ্য দেখান নি। তবুও মনে রাখবেন, বঙ্গবন্ধু তাঁকে জেলে পুরেছিলেন। বুঝতেই পারছেন ওভারঅল ট্রিটমেন্ট কেমন দিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর অনেকগুলো পৃষ্ঠা খরচ করেছেন মওদুদ সাহেব। সামরিক শাসন দেশ ও জনতার জন্য গজব হিসেবে কীভাবে নাজিল হয় তার তাত্ত্বিক বয়ান করেছেন। খুব ভালো লিখেছেন। যে কেউ বুঝতে পারবেন সামরিক শাসনের কুফল। যারা সেনাশাসনের 'অান্ধা' সমর্থক, তারাও মওদুদ সাহেবের সেনাশাসনের ভয়াবহতা সম্পর্কিত বয়ান পড়লে দ্বীনে ফিরে আসবেন। অর্থাৎ সেনাশাসন নিয়ে ভুল ভাঙবে।
যে মানুষটি এতক্ষণ সেনাপতি শাসনের বিরোধিতা করলেন। কিছুদিন পর তিনিই সেনাশাসক জিয়ার মন্ত্রিসভায় জাঁকিয়ে বসলেন। দলের প্রধান পরামর্শক হয়ে গেলেন। এ কেমন দ্বিচারিতা!
জিয়ার বিভিন্ন দলে ভেঙে নিজ দল গড়ার কর্মসূচি। ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ ইত্যাদি নিয়ে যেমন ধারণা পাবেন। তেমনি তার শাসনামলে বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সাথে সম্পর্কের বিষয়টিও জানা যায়। ভারত আর আমেরিকা পলিসি এখানে পরোক্ষভাবে এসেছে।
দুর্নীতির অভিযোগে মওদুদ মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন। ইতিমধ্যে জিয়া নিহত হন। সাত্তারের রাষ্ট্রপতি পদলাভ। বিএনপির দলীয় কোন্দল। আর সেনাপ্রধান এরশাদের ক্ষমতা দখলের ভেতরকার অনেক তথ্য এতে উঠে এসেছে। এসেছে আশু সেনাশাসন নিয়ে মওদুদের তাত্ত্বিক সমালোচনাও।
এরশাদ এসে দুর্নীতির মামলায় জেলে দেয় মওদুদকে। দশবছর সাজাও হয়। 'কীভাবে কীভাবে' যেন মুক্তিও পান মওদুদ। যেই এরশাদ তাঁকে কারাবন্দি করলো, তারই মন্ত্রিসভায় যোগ দিলেন মওদুদ। অথচ বেশ কটুকাটব্য করেছেন এরশাদের। আবারও দ্বিচারিতা!
এরশাদের শাসনামলের উপজেলা নির্বরশাদের শাসনামলের উপজেলা নির্বাচন, আওয়ামী লীগের সাথে এরশাদের 'অন্যরকম' যোগাযোগ প্রভৃতি প্রসঙ্গ এসেছে। আর এরশাদের পতন পূর্ববর্তী কিছু ঘটনা রোমাঞ্চকর লেগেছে আমার কাছে।
মওদুদ দ্বান্দ্বিকতার পূর্ণ এক রাজনীতিবিদ। বারবার লিখেছেন গণতন্ত্র কেন অপরিহার্য। বলেছেন সেনাশাসন দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। তাত্ত্বিক জায়গা থেকে বিস্তর লিখেছেন তৃতীয়বিশ্বের উন্নয়নের অন্তরায় কেন উর্দিশাসন। অথচ নিজে বারবার এই সেনাশাসকদের দলে ভিড়েছেন। সামরিক শাসকদের অশুভ শক্তিকে আরো বলবান করেছেন৷ বিরোধী নিধনের রাজনৈতিক কৌশল বাতলে দিয়েছেন। মওদুদ সাহেব 'মুখে খারাপ বলি, কাজে উল্টো করি'- নীতিতে বিশ্বাসী।
যিনি জানেন তিনি অপরাধ করছেন, তারপরেও বারবার সেই অপরাধের দিকে ছুঁটে যাওয়া ছোট নয়, মাঝারি নয়, মহাপাপীর লক্ষণ! জ্ঞানপাপী তো বটেই।
বইটি পড়তে আমার বেশ সময় লেগেছে। প্রায় সপ্তাহখানেক। লেখক মওদুদ সাহেবের বাংলা যুতসই নই। সুখপাঠ্য তো পরের কথা। শব্দ ব্যবহারে তিনি নিম্নমাঝারি লেখকদের কাতারে থাকবেন। বানানরীতিও দৃষ্টিকটু। বাংলা লেখায় তাঁর অপারঙ্গমতা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। তাই এ নিয়ে আর কিছু বলার নেই। স্মৃতিকথার ভঙিতে রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে যাঁদের লোভ আছে তাঁরা এই বই পড়তে পারেন। তবে সাবধান ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে এই বই পড়তে গেলে। যেমনটি সপ্তাহখানেক আমি দিয়েছি। সামরিক শাসন আর উন্নয়ন বিষয়ক কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি বিরক্ত করেছে বিস্তর।