লেখকের সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্বে রচিত হলেও এর গুরুত্ব ও বৈচিত্র্য অস্বীকার করার উপায় নেই। বৎসরের ছয় ঋতুর মতন এগুলি চরিত্রগতভাবে স্বতন্ত্র এবং বর্ণময়। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক ‘জীবনায়ন’ উপন্যাসটি। মাত্র একটি দিনের কাহিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা— দশ বারো ঘণ্টা— এই সময়ের মধ্যে নতুন এক পরিবেশ ও প্রকৃতির। পটভূমিকায় অসংখ্য চরিত্র ও তাদের আনন্দ-উচ্ছলতা, সুখ-দুঃখ, অভিমান-ক্ষোভ, স্বপ্ন ও হতাশার খণ্ড খণ্ড ছবি ও সম্পর্কের কাহিনি। তবে এই খণ্ডচিত্রগুলিই সব নয়, জীবনের এক পরিপূর্ণ আভাসও যেন এখানে ধরা পড়ে— যখন দেখা যায় উচ্ছলতা সুখ আনন্দের পরও রয়েছে মৃত্যুর একটি বেদনাময় ছেদ। জীবনের এ-এক যথাযথ চিত্র। ‘পরিচয়’ উপন্যাসটির আপাতলঘুতা, মাধুর্য, তারুণ্যের প্রাণচঞ্চলতার পাশাপাশি থেকে গিয়েছে অতৃপ্ত জীবনের এক বিষাদ-কাহিনি। ‘খড়কুটো’ লেখকের অতি প্রসিদ্ধ এক রচনা। বহু পঠিত ও আলোচিত। সন্দেহ নেই উপন্যাসটির মূল আবেগ প্রেম, কিন্তু নিছক ভালবাসার বৃত্তান্ত নয় ‘খড়কুটো’। যে-ধর্মবোধ ভ্রমরের মতন অসুস্থ মৃত্যুমুখী একটি মেয়েকে জীবনের ভালবাসার প্রতি আশ্বাস ও বিশ্বাসকে দ্বিধাহীন করতে পারে— তার মূল্য কী কম! দীর্ঘ তিন যুগেও এই কাহিনির আকর্ষণ বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। অন্য তিনটি উপন্যাস— ‘নির্বাসন’, ‘পরম্পর’, ‘গ্রহণ’— অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, মানুষের জীবনের অতি গভীরতম চেতনায়— নিত্য যে দ্বিধা দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ বিরক্তি, ন্যায় অন্যায়, গ্লানি ও পাপবোধের পীড়ন তাকে জর্জরিত করে— তার বিশ্বস্ত কাহিনি এই রচনাগুলি। ‘নিবার্সন’-ই বোধ হয়, লেখকের প্রথম লেখা যেখানে সাবালক সুভদ্র একটি মানুষের আত্মনিগ্রহ ও একাকিত্বের বেদনাময় ছবিটি গভীরভাবে ফুটে উঠেছে। সমাজের সত্য-মিথ্যা বিচারের মানদণ্ডটি কতই না হাস্যকর, নয়তো এই উপন্যাসের হৃদয়বান নায়কটির অকারণ এমন একাকীত্ব কেন! লেখক হিসেবে বিমল করের সকল বৈশিষ্ট্যই এখানে পাওয়া যায়। সুপাঠ্য এই ছয়টি উপন্যাস একত্রে প্রকাশ নিঃসন্দেহে পাঠককে তৃপ্ত করবে।
Bimal Kar (Bengali: বিমল কর) was an eminent Bengali writer and novelist. He received 1975 Sahitya Akademi Award in Bengali, by Sahitya Akademi, India's National Academy of Letters, for his novel Asamay.
বিমল কর-এর জন্ম ৩ আশ্বিন ১৩২৮। ইংরেজি ১৯২১। শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। জব্বলপুর, হাজারিবাগ, গোমো, ধানবাদ, আসানসোল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। কর্মজীবন: ১৯৪২ সালে এ. আর. পি-তে ও ১৯৪৩ সালে আসানসোলে মিউনিশান প্রোডাকশন ডিপোয়। ১৯৪৪-এ রেলওয়ের চাকরি নিয়ে কাশী। মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরাগ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক, পরে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকা ও ‘সত্যযুগ’-এর সাব-এডিটর। এ-সবই ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সালের মধ্যে। ১৯৫৪-১৯৮২ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২-১৯৮৪ ‘শিলাদিত্য’ মাসিক পত্রিকার সম্পাদক। বহু পুরস্কার। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৭ এবং ১৯৯২। অকাদেমি পুরস্কার ১৯৭৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার ১৯৮১। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহদাস পুরস্কার ১৯৮২। ‘ছোটগল্প—নতুন রীতি’ আন্দোলনের প্রবক্তা।
উপন্যাস সমগ্রের এই প্রথম খণ্ডটিতে বিমল করের ভীষণ জনপ্রিয় একটি উপন্যাসের পাশাপাশি, পড়তে পাওয়া যায় এমন পাঁচটি লেখা, যাদের হদিস খুঁজে পাওয়া খোদ লেখকের জীবদ্দশাতেই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এদের বেশিরভাগই বয়সে অনেক পুরোনো। সময়ের ভারে ন্যুব্জ। বিস্মৃত। লেখক-জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে রচিত এমন কটা লেখা যারা হয়তো বা সর্বাঙ্গ-সুন্দর নয়। এদের উদগ্রীব কপালে, ভাবালুতার ফোঁটা। গলায়, সূক্ষ্ম উৎকণ্ঠার মালা। তবুও লেখাগুলো আমার কাছে সুদৃশ্য। সাহিত্যের দাঁড়িপাল্লায়, আন্তরিক ও পরীক্ষিত।
প্রবীণ সাহিত্যিকের ঔপন্যাসিক স্বরূপের ভুল-ত্রুটি নিয়ে সরাসরি সরব না হয়েও, এসব লেখার খারাপটুকু, ভালোর তীক্ষ্ণতায় চেছে ফেলা যায়। নির্দ্ধিধায় এগিয়ে আসা যায় প্রিয় কলমের চিরায়ত আহ্বানে। পিঠ দিয়ে বসা যায়, সেপিয়া সকালের মধ্যবিত্ত লালে।
তবে, প্রথম উপন্যাস, 'জীবনায়ণ', আমার মতে, বইয়ের দুর্বলতম লেখা। একগুচ্ছ (অতিরিক্ত) চরিত্রদের সমন্বয়ে একটি পিকনিক-রুপি মিলনমেলায় রত হয়েছেন লেখক। টুকরো টুকরো ক্যারেক্টার স্কেচ ও অন্তর্ভেদী কথপোকথন দিয়ে একটি জনবহুল নাটক ছকেছেন উনি। মানুষ-মনের ধূসর চাহিদাগুলো হাতড়ে বেড়িয়েছেন ঢিমেতালে। লেখাটি, অ্যাম্বিশনে দৃপ্ত, সেটা বলাই যায়। কিছু চরিত্রের পরিণয় ও ভবিতব্য পাঠক মনকে রীতিমত ভাবিয়ে তোলে। কিন্তু তা সত্বেও, অনেকটা বিভ্রান্তি ও অনেকগুণ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে হারিয়ে যায় গল্পের পূর্ণাঙ্গ অভিঘাত। পড়ে আনন্দ পাই না শেষমেশ।
দ্বিতীয় উপন্যাস, 'নির্বাসন'-এর শরীরে অন্ধকারের ঝিল্লীরব। স্ত্রীকে অ্যাটেম্পটেড হত্যার মামলায় কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয় ললিত। বেকসুর খালাস পেতে কেটে যায় বেশ ক'বছর। বাড়ি ফেরে ও। বিছানায় স্ত্রী, বিভা। শয্যাশায়ী, রুগ্ন, এক কঙ্কালসার ফসিল। চোখে অব্যক্ত প্রশ্ন। মাঝে জন্মান্তরের ফারাক। লেখকের গল্পবলিয়ে তীক্ষ্ণতায়, উন্মোচিত হয় সামাজিক চালচিত্র। পেন্ডুলাম মাফিক দোল খায় চাহিদা ও অধিকারের ট্র্যাজিক সমীকরণ। লেখাটি মাঝ-পর্যায়ে সামান্য অসংযত। মনস্তত্ত্বের তাড়নায়, শ্লথ। তবুও এর ক্লস্ট্রোফোবিক আবহ ও দাম্পত্যের অন্ধকার অসঙ্গতি, তৈরি করে এক রুক্ষ, কোমল, অভিনব হোমকামিং। মাকড়সার জালের মতো চকচকে, ঘুটঘুটে এক প্রহসন। এক কথায়, দুরন্ত!
তৃতীয় উপন্যাস, 'খড়কুটো' নিয়ে অহেতুক বকে লাভ নেই। লঘু ও হালকা হয়েও, লেখকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সর্বাধিক পঠিত উপন্যাস বুঝি এটাই। সেই অমল। সেই ভ্রমর। স্বল্প পরিসরে, টিনেজ প্রেমের মিঠে, মনকেমনীয়া, কষ্ট-লাগা উপাখ্যান। প্রথমবার পড়ে স্পৃহা, সাধনা ও ভালোলাগার এক অপরিবর্তনশীল ব্যথায় ভুগে অল্প কটা কথা লিখেছিলাম এই সাইটেই। স্রেফ কটা লাইন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া যাকে বলে। আজ প্রায় তিন বছর বাদে, লেখাটিকে বদলাতে ইচ্ছে করলো না আর। থাকুক যেমন আছে। আমার যাবতীয় আশা, প্রত্যাশা ও প্রার্থনার মোমবাতি হয়ে জ্বলুক যতদিন জ্বলবে। ভালো হোক ভ্রমরের। ভালো হোক ভালোবাসার।
এই ভালো হওয়ার বার্তা নিয়েই বইয়ের চতুর্থ উপন্যাস। 'পরস্পর'। যাতে এক সদ্য-পরিণীত দম্পতি, বৈবাহিক ছন্দের স্বাভাবিক ছাঁচে, ধীরেসুস্থে মানিয়ে নিতে চায় নিজেদের সাংসারিক সত্ত্বা। চেষ্টা করে যায়, প্রাথমিক আড়ষ্টতা কাটিয়ে, সংকীর্ণ মধ্যবিত্ততায় খুঁজে নিতে ভালো থাকার মাশুল। লেখাটি পড়ে যারপরনাই আশ্চর্য হলাম আমি। 'বালিকা বধূ' পড়েছি এর আগে। তবে সে জিনিসের সাথে এই চমৎকার উপন্যাসটির প্রভেদ এর সহজ প্রাপ্তবয়স্কতা। কী সুন্দর। কী মিষ্টি এই চেনার আনন্দ। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ রোমান্স নিয়ে যেই হাহাকার হালফিলের বাজারে আকছার দেখা যায়, তা এই হোলসাম তবুও বাস্তবসম্মত লেখাটির দ্বারা নির্দ্ধিধায় পূর্ণতা পায়। শেষ-পাতে, বিষাদের মেঘ অল্পের জন্য দেখা দিলেও, রোদ ঝিলিক দেয় সাহচর্যের সান্নিধ্যে।
ঠিক এভাবেই ভালো থাকা ও ভালোলাগার সুরে বাজে সংকলনের পরবর্তী লেখাটি। স্বার্থকনামা উপন্যাস এই 'পরিচয়'। পুজোর আবহে চেঞ্জপ্রার্থী বাঙালিদের দুটো দল গিয়ে মেশে হাজারীবাগের বুকে। একদিকে এক প্রবীণ মাই-ডিয়ার দম্পতি। অপরভাগে একগুচ্ছ তরুণ-তরুণীদের কাইমাই টোলি। কথায় বলে, হিতে মিতে বিপরীতে। অপোজিটস অ্যাট্রাক্ট। এখানেও সেই স্রোতে ভেসে ফুটে ওঠে মায়ার অপার্থিব চারা। সাথে প্রেম, বাৎসল্য ও মনখারাপের হিম হিম ছোঁয়া। দূরে শোনা যায় ঢাকের বাদ্যি। দলা পাকানো বিদায়-বেলার সাবেকি মমত্ব। বেশি বলবো না আর। নিজেরা পড়ে নেবেন পারলে। পাবেন জ্যৈষ্ঠের গরমে, শিউলির সুবাস। সাথে চোখ-টোখ ভিজে এলেও আশ্চর্য হবো না আমি...
এই মায়াটে ট্রিলজিটা পেরিয়ে পড়ে থাকে সমগ্রের শেষ লেখা, 'গ্রহণ'। যা মন্দ না হলেও, ক্লান্তিকর। বাকিগুলোর তুলনায় যথেষ্ট ফিকে। লেখাটিতে মাত্র চারটে মূল চরিত্রকে নিয়ে একটি ভীষণ সম্ভাবনাময় কাঠামো ছকতে চেয়েছেন লেখক। মানব মানবী সম্পর্কের ভিতে বিশ্বাস, কুণ্ঠা ও অসহযোগের জল ছিটিয়ে তৈরি করতে চেয়েছেন একটি সুগঠিত চতুষ্কোণ। আফসোস, লেখাটি শেষ অবধি কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে না। মাঝপথে দাঁড়িয়ে, হারিয়ে যায় অহেতুক বর্ণন ও অতিকথনের ভাজে। এইতো।
তবুও, খারাপ কী? ছয়টি উপন্যাস। চারটে অসাধারণ। একটি বিভ্রান্তিকর। আর একটি পাঠকমাত্রই বদলে বদলে যাবে। ভিন্ন-রূপে ধরা দেবে সবাইকে। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের খাতিরে এটুকু কষ্ট সইতে পারবেন না, বলুন দেখি?
জানি, আধুনিক যুগে বিমল কর বলতেই আমরা ছোটগল্পের এক নিরীক্ষণশীল জাদুকরকে মনে করি আগে। মনে করি, গোয়েন্দা কাহিনী রচয়িতা এক পিতৃসম বটগাছকে যার ছায়ায় এক কালে লালিত হয়েছে কালজয়ী সব নাম। তবে ভুলে গেলে চলবে না, মানুষটি সাহিত্য আকাদেমি পেয়েছিলেন উপন্যাসের খাতিরেই। তাই নিয়ম করে ওনার এই বড় লেখাগুলো নিয়ে আরেকটু সিরিয়াস হওয়া সাজে। তা সে হোক না প্রথম দিকের সেফ, সহজ কিছু কাহিনী। সবই তো আখেরে বিমল কর। সুন্দর ও অনাড়ম্বর?