কাশ্মীরের পটভূমিতে লেখা ভিন্নধারার উপন্যাস। পড়বো বলে অনেকদিন ধরে, তক্কে-তক্কে ছিলাম। আজ সেটা করে, বেজায় বিখন্ডিত হয়ে আছি। প্রথাগত রিভিউয়ের পাড়া আর না মাড়ানোই শ্রেয়। কেবল, ভালো লাগা ও না-লাগার একটা ছোট্ট তালিকা বানিয়ে রেখে যাই।
ফিল্ম-টেলির দৌলতে, কাশ্মীরের যেই অপরূপ মনোগ্রাহী ছবি বরাবর তুলে ধরা হয়। কিছুটা তার বিরুদ্ধে হেঁটেছেন লেখিকা। গোটা বইতে কাশ্মীরকে রোমান্টিসাইজ করা থেকে বিরত থেকেছেন। গদ্য গড়তে চিনার-লিডার-ডাল লেকের বর্ণনা এঁকেছেন ঠিকই, তবে তা স্বল্প। আতস কাঁচের নিচে কেবল কাশ্মীরের গরীব কটা মানুষ। ডাল লেকের কোণে, নোংরা, পানা আবৃত জলে, অস্থায়ী কিছু বাড়ি-ঘরে, শিশমহলের বাসিন্দারা।
তাদের দুঃখ, কষ্ট, রাগের সাথেই সম্মিলিত সন্ত্রাসের সমান্তরাল হাতছানি। দারিদ্র্য ও উগ্রবাদের জোড়া প্রকোপে, লেখিকা বলেছেন এক কাশ্মীরের গল্প। যার কথা, আমরা ভুলে থাকতে ভালোবাসি। কাশ্মীরের সেই প্রতিচ্ছবি, যা বাস্তবের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত। ডিপ্লোম্যাসির গন্ধ পেলেও, লেখিকা পক্ষপাত করেননি। ইসলামী মৌলবাদ থেকে উগ্র হিন্দুত্ববাদ, দাগিয়েছেন সবটাই। সাথে লিখেছেন, অবদমিত কাশ্মীরে ভারতীয় আর্মির ধূসর অবদান। যা সচরাচর সাদা কি কালো রঙে মাপা মুশকিল।
রোমান্টিসাইজ যদি কিছু করে থাকেন, সেটা সেই মানুষদেরই। তাদের সংকুলিত স্বপ্ন, নৈরাশ্য ও বিষাদের গাঁথাকে, বুনেছেন লালনের সুরে। কাশ্মীর নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছেন, যা বোঝা যায়। বইজুড়ে বাংলা, হিন্দি ও পাঞ্জাবির পাশে, স্থান পেয়েছে কাশ্মীরি সংলাপ। এ জিনিস, বইয়ের গতি রদ করে। বিশেষত, যখন একটি সংলাপের পরেই, শব্দকোষের ন্যায় মানে বুঝিয়ে দেওয়া হয় বারংবার। দোসর হিসেবে মেলে, শায়েরির ছড়াছড়ি। আর্মির অফিসার থেকে শিশমহলের বাসিন্দা, সবার মুখেই গালিব-বিসমিলের এপিডেমিক। ফলস্বরূপ, বইটি ভোগে গতিহীনতায়।
কাশ্মীরি ইতিহাস উপস্থাপনের জন্য এক জিহাদী চরিত্রকে বেছে নিয়েছেন লেখিকা। যা অল্প হলেও, ইনফো-ডাম্পিংয়ের পর্যায়ে এসে পড়ে। 'মানব বোমা' হয়ে, গাড়িতে বসে আর যাই হোক, ছোটবেলায় রাস্তার ধারের কোনো অচেনা ব্যক্তির মুখে শোনা ইতিহাসের পুঙ্খানুুঙ্খ স্মৃতিচারণা, স্রেফ অবিশ্বাস্য। পরে সেটা স্বপ্নদৃশ্যে রূপান্তরিত হলে, তাও কিছুটা স্বাভাবিকতা মেলে। এ ছাড়াও, বইয়ের শেষ চল্লিশ কি পঞ্চাশ পৃষ্ঠা বিস্তর সিনেমাটিক। অতিনাটকের প্রকোপে, উপন্যাসটি কোনো সূক্ষ্ম মানবিক পরিণতি থেকে বঞ্চিত হয়। শুরুর সাথে খুব একটা মেলাতে পারি না শেষটা। কোথাও যেন একটা প্রচ্ছন্ন টোনাল শিফ্ট... একটা বদল চলে আসে।
এবং এটাই বুঝি 'শিশমহল'এর সবচেয়ে বড় খামতি। একটি পূর্ণাঙ্গ ক্লাসিকের মালমশলা থেকেও, উপন্যাসটির অন্তর্নিহিত ধন্দ প্রচুর, যার ফলে ন্যারেটিভ ক্রমাগত দিকভ্রান্ত হয়। মিলিটারি ড্রামা? সামাজিক উপন্যাস? স্পাই থ্রিলার? নাকি সবটা মিলিয়েই 'শিশমহল'? হলে, এ জিনিস, আড়াইশো পৃষ্ঠার চেয়ে অনেক বড় কোনো ক্যানভাস দাবী করে।
রাজনীতি ও ধর্মের জটিল করালগ্রাসে বন্দী কাশ্মীর নিয়ে লিখতে বসে, লেখিকা কাঠগড়ায় এনেছেন পভার্টি ও দারিদ্র্যকে। মন বলে, শুধুই কি তাই? উলুখাগড়ার বনে, আম-আদমির পতন? ক্ষুদার জ্বালায় সন্ত্রাসের ধোয়া? লেখিকার এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত হওয়া বা না হওয়া, পুরোটাই পাঠকের মর্জি। আমার মতামতও অগ্রাহ্য করতে পারেন সাগ্রহে। দিনের শেষে, সবটাই সাবজেক্টিভ। তবে, অমন চড়া দাগের পরিসমাপ্তিটির জেরে, কিছুটা হতাশা প্রযোজ্য। সেই নিয়েই ইতি টানছি।
২.৭৫/৫